📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 মুখবন্ধ

📄 মুখবন্ধ


রসূলুল্লাহ (সাঃ) কিভাবে নামায পড়েছেন এ বিষয়টি জানার পর তাঁর নামায এবং সহীহ হাদীসের আলোকে নামায এবং অযু-গোসলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও আলোচনার দাবী রাখে। আমরা সচরাচর নামাযে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখি যা জানলে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। নামায সহীহ-শুদ্ধ হোক এটা সবারই কামনা। কেননা, বিশুদ্ধ নামাযই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, ত্রুটিপূর্ণ নামায কবুল হয় না। অনুরূপভাবে, অজু-গোসলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও আলোচনা হওয়া দরকার।
ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো হাদীসের পরিপন্থী। যদি বিরাট সংখ্যক লোকও সে ভুল করে তাহলেও সেটা ভুল। আর একজনও যদি হক বা সত্যকে অবলম্বন করে তাহলে তা-ই সত্য এবং এ ব্যাপারে কোন সমস্যা নেই। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন: হক বা সত্যের অনুসারী একজন আলেমও সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলীল-প্রমাণ ও এজমা'র দাবী করতে পারেন, যদিও গোটা দুনিয়া তার বিরোধীতা করে। ১
নাঈম বিন হাম্মাদ বলেন: কোন দল বা সমষ্টি নষ্ট হয়ে গেলে তুমি তাদের খারাপ হওয়ার পূর্বের অবস্থা অনুসরণ করবে যদিও তুমি একা। তখন তুমিই মূলতঃ সমষ্টি। ২
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের সময় তিনি ছাড়া অন্য সবাই যেমন, খলীফা, উজির-নাজির, আলেম-ওলামা, মুফতীরা 'কোরআন সৃষ্ট' এ মতবাদের অনুসারী হয়ে যান। একমাত্র ইমাম আহমদ এর বিরোধীতা করেন। সমষ্টির যুক্তি ছিল, আমরা সবাই নাহক এবং তিনি একাই হকের উপর আছেন, এটা হতে পারে না। তাই খলীফা তাঁকে গ্রেফতার করে বেত্রাঘাত পর্যন্ত করেন। তা সত্ত্বেও তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। সত্যের জন্য অনেকে অকাতরে জীবন বিলিয়ে গেছেন। ভুল ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকারীদের সংখ্যাই বিরাট। এক্ষেত্রে ভুল সংশোধনকারী হয়ত সংখ্যালঘু। তাই আল্লামা শাতেবী (রঃ) বলেছেন: 'অতীতের নেক লোকেরা হকের উপর আমলের জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং সংখ্যালঘু হওয়ার ভয় করতে নিষেধ করেছেন।'৩
তিনি আরো বলেছেন: সাধারণ লোকের এজমা বা মতৈক্যের কোন মূল্য নেই, এমনকি তারা নেতৃত্ব বা ইমামতির দাবী করলেও না। ৪
রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুসরণ, তাঁর আদেশ-নিষেধ মানা, তিনি যা করেছেন তা করা, সেগুলোর প্রচার ও প্রসার ঘটানো, তাঁর ভাল ও পসন্দনীয় কাজগুলোর প্রচলন করা এবং মুসলিম উম্মাহকে সেগুলো অনুসরণের জন্য উৎসাহিত করাই মূলতঃ সুন্নত। সুন্নতের উদাহরণ হল, হযরত নূহ (আঃ)-এর নৌকার মত। যে তাতে আরোহণ করবে সে মুক্তি পাবে।
হাদীস সহীহ হলে তা গ্রহণ করাই ঈমান ও যুক্তির দাবী। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) এ মর্মে ইমাম মালেকের সাথে ইমাম আবু ইউসুফের সা' এবং মোদ সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ মোদ-এর পরিবর্তে ইমাম মালেকের সা'-এর ভিত্তিতে সদকা-ফিতরা দানের যুক্তি গ্রহণ করে নিজ মত পরিবর্তন করেছেন। ইমাম মালেক মদীনার বিভিন্ন লোককে তাদের মাপযন্ত্র- সা' হাজির করার আহ্বান জানালে অনেকে তা হাজির করেন। তারা তাদের দাদা-দাদীর বরাত দিয়ে বলেন: এগুলো দিয়ে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে ঈদুল ফিতরের সদকাহ দেয়া হত। ইমাম মালেক প্রশ্ন করেন, তারা কি মিথ্যা বলছে? আবু ইউসুফ বলেন, না, তারা মিথ্যা বলছে না। ইমাম মালেক ইরাকী জনগণের জন্য তাদের ৫ রতল এবং আরেক রতলের এক তৃতীয়াংশকে এক সা'-এর সমান ধার্য করেন। আবু ইউসুফ ইমাম মালেককে বলেন, হে আবু আবদুল্লাহ! আমার বন্ধু ইমাম আবু হানিফা আমি যা দেখলাম তা দেখলে তিনিও আমার মতো আপনার মতের প্রতি প্রত্যাবর্তন করতেন।
ইমাম বারাবহারী (রঃ) বলেনঃ তোমরা ছোট ছোট নতুন নতুন এবাদত তৈরির ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকবে। ছোট ছোট বেদআতগুলোর পুনরাবৃত্তি বড় বেদআতের জন্ম দেয়। উম্মাহর মধ্যে প্রথম যে বেদআতগুলো ঢুকে সেগুলো ছোট আকৃতির থাকে এবং তাকে হক মনে হয়। ফলে বহু লোক ধোঁকায় পড়ে যায় ও তাতে অংশ নেয়। তারপর আর তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এটা ফুলে-ফেঁপে বড় হতে থাকে, দ্বীনের অংশে পরিণত হয় এবং সেরাতুল মোস্তাকীম তথা সরল পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটায়।
এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বড় চমকপ্রদ। আমর বিন সালামাহ বলেন: আমরা চাশতের নামাযের আগে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর ঘরের দরজায় বসা ছিলাম। তিনি বের হলেন। আমরা তাঁর সাথে মসজিদে চললাম। আবু মূসা আশআরী (রাঃ) আসলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আবু আবদুর রহমান কি আপনাদের কাছে এসেছে? আমরা বললাম, 'না'। তিনিও আমাদের কাছে বসলেন। এমন সময় আবু আবদুর রহমান অর্থাৎ আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) আসলেন। আমরা সকলে দাঁড়িয়ে গেলাম। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন: হে আবু আবদুর রহমান! আমি প্রথমে মসজিদে ঢুকে কিছু অপসন্দনীয় কাজ দেখি। তবে আমি যা দেখেছি তা ভাল হবে বলে মনে করি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, সেটা কি? তিনি জবাব দেন, আপনিও দেখতে পারবেন। আমি মসজিদে একদল লোককে গ্রুপে গ্রুপে বসে নামাযের জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম।
প্রত্যেক গ্রুপের একজন লোকের হাতে ছিল কঙ্কর। তিনি দলের লোকদেরকে ১শ' বার তাকবীর, ১শ' বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ১শ' বার তাসবীহ পড়তে (সোবহানাল্লাহ) বলেন। লোকেরা তাই করল। অর্থাৎ সে কঙ্কর দিয়ে তার হিসেব গুনতো। ইবনে মাসউদ জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি বলেছেন? তিনি বলেন, আমি আপনার মতের অপেক্ষায় কিছু বলিনি। ইবনে মাসউদ বলেন, আপনি তাদেরকে কেন তাদের গুনাহগুলোর গুনতির কথা বললেন না? আমি তাদের নেকসমূহ নষ্ট না হবার গ্যারান্টি দিচ্ছি। এরপর আমরা সবাই তাঁর সাথে একটি গ্রুপের কাছে যাই। তিনি সেখানে দাঁড়ান এবং জিজ্ঞেস করেন, আমি তোমাদের একি কাজ দেখছি? তারা বলল: হে আবু আবদুর রহমান, আমরা কঙ্কর দ্বারা তাকবীর, তাহলীল ও তাসবীহর হিসেব রাখি। তিনি বলেন: তোমরা তোমাদের গুনাহর হিসেব রাখ। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, তোমাদের নেক সামান্যও নষ্ট হবে না। হে উম্মতে মোহাম্মদ, তোমাদের জন্য আফসোস। তোমাদের ধ্বংস এত তাড়াতাড়ি আসন্ন! নবীর এ সকল সাহাবায়ে কেরাম বিদ্যমান আছেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর এই তরতাজা শুকনো কাপড় এবং তাঁর তৈজসপত্রগুলো এখনও পর্যন্ত অক্ষত। আমার প্রাণ যার হাতে সে সত্ত্বার শপথ করে বলছি, তোমরা হয় উম্মতে মোহাম্মদীর সর্বাধিক হেদায়েত প্রাপ্ত কিংবা সর্বাধিক গোমরাহ লোক হবে। তাঁরা বলেন, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহর কসম, আমাদের নেক উদ্দেশ্যই এর পেছনে কাজ করেছে। তিনি উত্তর দেন, বহু ভাল কাজের আকাঙ্খী লোক ঠিক পথে নেই। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, একদল লোক কোরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের গলার ভেতর প্রবেশ করবে না।
আল্লাহর কসম, আমি জানিনা যে, তোমরাই সে দলের সংখ্যাধিক্য লোক কিনা?
আমর বিন সালামাহ বলেন: আমরা নাহরাওয়ান যুদ্ধে তাদের অধিকাংশকে খারেজী সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখেছি।
দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত এবাদত শেষ পর্যন্ত চরম গোমরাহীর দিকে ঠেলে দেয়। তাই যে কোন বেদআত থেকে মোমেনদেরকে দূরে থাকতে হবে।
এখন প্রশ্ন হল, মানুষ কেন হাদীসের খেলাপ কাজ করে এবং নামাযসহ বিভিন্ন এবাদতে বহু ভুল-ত্রুটি করে? উত্তরগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:
১। দুর্বল ও জাল হাদীস সম্পর্কে পার্থক্য করার ক্ষমতা না থাকার কারণে সহীহ হাদীস অনুযায়ী আমল করা সম্ভব হয়না। ফলে ঐ সকল ভুল-ত্রুটি হতে থাকে। এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত না হওয়াটাই বড় কারণ।
২। কিছু কিছু ফকীহ এজতেহাদ করে মাসলা ঠিকই বলেছেন, কিন্তু শরয়ী কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন নি। অথচ জনগণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়ে আছে।
৩। পূর্বসূরীদের মধ্যে পরবর্তীতে কিছু লোকের অন্ধ অনুসরণ এর অন্যতম কারণ।
৪। যাদের ফতোয়া দানের যোগ্যতা নেই তাদের ফতোয়ার ফলে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
এ সকল কারণে লোকেরা সুন্নত ত্যাগ করেছে এবং ভুল জিনিস আঁকড়ে ধরে আছে।
মাজহাব কিংবা মাজহাবের ইমামদের কোন দোষ নেই। তারা সহীহ হাদীস গ্রহণের তাকিদ দিয়ে গেছেন এবং সহীহ হাদীস বিরোধী হলে নিজেদের প্রদত্ত মাসলাগুলো ত্যাগ করার আদেশ দিয়েছেন। এখন সকল দায়-দায়িত্ব মোকাল্লেদ বা অনুসারীদের।
আমি এ বইতে, হাদীসের আলোকে নামাযের ৭৬টি, জুমু'আর নামাযের ৭টি এবং অযু গোসলের ১৮টি প্রচলিত ভুলের সংশোধন উল্লেখ করেছি। এ বইটি প্রতিটি মুসলমানের জন্য খুবই মূল্যবান। আল্লাহর কাছে আমলের তওফীক কামনা করি। আমিন!
এ. এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
বাংলা বিভাগ, রেডিও জেদ্দা
সৌদী আরব।
১৪/২/১৪২২ হিঃ
৮/৫/২০০১ খ্রীঃ

টিকাঃ
১. মিম্ মোখালিফাত-আততাহারাহ ওয়াসসালাহ। আবদুল আযীয বিন মোহাম্মদ সাদহান, দারু তাইয়েবাহ প্রকাশনী। রিয়াদ, ১৪১২ হিঃ।
২. ঐ
৩. আল-এ'তেসাম, ২য় খণ্ড, ১১১ পৃঃ।
৪. এরশাদ আস্-সারী ৩য় খণ্ড, ১০৭ পৃঃ।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের আলোকে প্রচলিত ৭৬টি ভুল সংশোধন

📄 রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের আলোকে প্রচলিত ৭৬টি ভুল সংশোধন


(১) নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা: নবী করীম (সঃ) তা করেন নি। নিয়ত হচ্ছে মনের ব্যাপার, মন থেকেই তা করতে হয়। এটা মুখের বিষয় নয়। মুখে উচ্চারণ করলে সেটা আর নিয়ত থাকে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, মুখে নিয়তের উচ্চারণ দ্বারা দ্বীনের ক্ষতি হয়। কেননা, এটা বেদআত। তাই অযু, গোসল, নামায, রোযা ইত্যাদি এবাদতে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা যাবে না। এ কাজ যদি ভাল ও সওয়াব হত, তাহলে আমাদের পূর্বসূরীরা এ কাজ নিজেরা করতেন এবং অন্যদেরকে করার জন্য বলতেন। এটাকে যদি আমরা হেদায়েতের অংশ মনে করি, তাহলে নাউজুবিল্লাহ, তারা এ বিষয়ে হেদায়াত লাভ করেন নি, বরং গোমরাহ হয়েছেন। আর তারা যা করেছেন সেটা যদি হেদায়েত হয়, তাহলে হেদায়েতের পরে আর কি কথা? সেটা গোমরাহী বই কি। মহানবী (সঃ) সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবয়ে তাবেঈরা মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেন নি। শুধু মনেই মনে নিয়ত করেছেন। তাঁরা শুধু হজ্জের এহরামের সময় মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেছেন।
(২) মসজিদে নামায পড়ার সময় মুসল্লীর জোরে কেরাত, জিকির ও দো'আ পাঠ করা: ইমাম শুধু জোরে কেরাত পড়বেন। মুসল্লীরা গোপনে পড়বেন। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমরা নামাযে আল্লাহর সাথে কানাঘুষা করে থাক। তাই জোরে কোরআন পড়বে না এবং মোমেনদেরকে কষ্ট দেবে না। (বাগওয়ী)
নবী করীম (সঃ) এক রাত্রে ঘর থেকে বের হন। তিনি হযরত আবু বকরকে নিম্নস্বরে এবং হযরত ওমর (রাঃ)-কে জোরে কেরাত পড়তে দেখেন। পরে তারা দু'জন নবী (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন। তিনি বলেন: হে আবু বকর! আমি আপনার কাছ দিয়ে অতিক্রমের সময় আপনাকে নিম্নস্বরে কেরাত পড়তে দেখলাম। আবু বকর বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল, আমি যাঁর সাথে গোপনে কাকুতি-মিনতি করেছি, তাঁকে তো শুনিয়েছি। তিনি ওমরকে বলেন, তুমি জোরে শব্দ করে নামায পড়ছিলে। ওমর বলেন: জোরে পড়ার উদ্দেশ্য হল তন্দ্রা দূর করা এবং শয়তান তাড়ানো। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হে আবু বকর, আপনি একটু শব্দ করে পড়বেন এবং ওমরকে বলেন, আপনি একটু ছোট আওয়াজে পড়বেন।
সৌদী আরবের পরলোকগত মুফতী জেনারেল শেখ আবদুল আযীয বিন বাজকে নামাযের জামা'আতে মুসল্লীদের শব্দ করে কেরাত ও দো'আ-জিকরের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দেন, মোক্তাদীর জন্য সুন্নত পদ্ধতি হল গোপনে কেরাত, দো'আ ও জিকর করা। কেননা, তা প্রকাশ্যে পড়ার পক্ষে কোন প্রমাণ নেই বরং শব্দ করে পড়লে পাশের মুসল্লীদের অসুবিধে হবে। (সাপ্তাহিক আদদাওয়া পত্রিকার প্রশ্নোত্তর)
(৩) দেয়াল কিংবা খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়া: শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ বলেছেন, ফরজ নামাযে এরূপ করা জায়েয নেই। কেননা, সক্ষম ব্যক্তির সোজা হয়ে দাঁড়ান ফরজ। তবে নফল নামাযে তা করা জায়েয। কেননা, সক্ষম ব্যক্তির জন্য নফল নামায বসে বসে পড়াও জায়েয। তবে দাঁড়িয়ে ও হেলান দিয়ে পড়া বসে পড়া অপেক্ষা উত্তম।
(৪) একাধিক আয়াতকে একসাথে মিলিয়ে পড়া: সুন্নত পদ্ধতি হল, এক এক আয়াত করে পড়া। উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কেরাত পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তরে বলেন: রসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক আয়াত করে পড়তেন। তিনি এভাবে পড়েছেন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। আররাহমানির রাহীম। মালিকি ইয়াওমিদ্দীন। (আবু দাউদ, তিরমিজী, দারু কুতনী, তিনি হাদীসের সনদকে সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস বলেছেন। হাকেম বলেছেন, বোখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী হওয়ায় এটি সহীহ। আল্লামা জাহাবীও একই মত পোষণ করেন। ইবনু খোজাইমা এবং ইমাম নওয়ীও একে সহীহ বলেছেন।)
আল্লামা ইবনুল কাইয়েম উপরোল্লিখিত হাদীসটি উল্লেখের পর বলেছেন, ইমাম যোহরী বলেছেন: রসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক আয়াত করে পড়েছেন। আর এ পদ্ধতিই উত্তম। যদিও আগের আয়াত পরের আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট। কোন কোন কারী উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণের ভিত্তিতে আয়াতের শেষে ওয়াফ্ফের কথা বলেছেন। কিন্তু নবী করীম (সঃ)-এর অনুসরণই সর্বোত্তম হেদায়াত। ইমাম বায়হাকীও এই মত পোষণ করেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, প্রত্যেক আয়াতের শেষে ওয়াক্ত করা সুন্নত। যদিও পরবর্তী আয়াত আগের আয়াতের সাথে বাক্য গঠনের দিক থেকে কিংবা বিশেষ্য-বিশেষণ হওয়ার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট।
(৫) কেয়াম ও বসার সময় পিঠ সোজা না করা: দেখা যায় কোন সময় ডানে বা বামে কিংবা বাঁকা হয়ে দাঁড়ায় বা বসে। এটা নিষিদ্ধ। পিঠ সোজা রাখতে হবে। নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'আল্লাহ সে বান্দাহর নামাযের দিকে তাকান না, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না।' (আহমদ, তাবরানী)
নবী করীম (সঃ) ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: 'তারপর তুমি মাথা তুলে এমনভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াবে যেন হাড় তার নিজ নিজ অবস্থানে থাকে।' অন্য এক বর্ণনায় এসেছে 'তুমি মাথা তুলে এমনভাবে দাঁড়াবে যেন হাড়গুলো নিজ নিজ জোড়ার দিকে ফিরে যায়। কেউ এরূপ না করলে তার নামায পরিপূর্ণ হবে না।'
(৬) রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা না করা: একবার নবী করীম (সঃ) নামায পড়ার সময় আড় চোখে এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখেন যে, সে রুকু ও সাজদায় নিজ পিঠ সোজা করে নি। নামায শেষ করে তিনি বলেন: 'হে মুসলমান সম্প্রদায়! যে ব্যক্তি রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা না করবে তার নামায হবে না।' (ইবনু আবি শায়বা, আহমদ, ইবনু মাজাহ)
নবী করীম (সঃ) আরো বলেছেন, নামায চুরি সর্বাধিক নিকৃষ্ট কাজ। লোকেরা প্রশ্ন করল, নামায কিভাবে চুরি করে? তিনি বলেন, ঠিকমত রুকু ও সাজদা না করার নাম নামায- চুরি।' (ইবনু আবি শায়বা, তাবরানী, হাকেম, আল্লামা জাহাবী একে সহীহ বলেছেন)
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঠ সোজা করার মানে কি? উত্তর, নবী করীম (সঃ) যখন রুকুতে যেতেন তখন পিঠ সমানভাবে বিছিয়ে দিতেন। (বায়হাকী সহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছে।)
রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকুতে এমনভাবে পিঠ বিছিয়ে দিতেন যে, পিঠের উপর পানি ঢাললে তা স্থিতিশীল থাকত। (ইবনু মাজাহ, তাবরানী)
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: রুকুতে গেলে দু'হাতের কজি দু'হাঁটুতে রাখবে, তোমার পিঠকে সম্প্রসারিত করবে এবং রুকুর জন্য অর্থাৎ ঝুঁকে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে। (আহমদ, আবু দাউদ)
তিনি রুকুতে গেলে মাথাকে পিঠ থেকে উপরের দিকেও রাখতেন না এবং নিচের দিকেও বেশি ঝুঁকাতেন না।
(৭) দুই সাজদার মাঝখানে আঙ্গুল না নাড়ানো: এটা ঠিক নয়। 'নবী করীম (সঃ) দুই সাজদার মাঝে শাহাদত আঙ্গুলী দিয়ে ইশারা করতেন বলে মোসনাদে আহমদের ৪র্থ খণ্ডের ২১০ পৃষ্ঠায় একটি হাদীস বর্ণিত আছে।' এটা হল দু' সাজদার মাঝের জলসা। (হেদায়াতুন নাবী, ৭৫ পৃঃ)
(৮) ইমাম সাজদায় থাকলে মাথা তোলা পর্যন্ত এবং বসা থাকলে দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভুল: বিশুদ্ধ পদ্ধতি হল, ইমাম রুকু, সাজদা, দাঁড়ান কিংবা বসা যে অবস্থায়ই থাক না কেন সর্বাবস্থায় অনতিবিলম্বে নামাযে শামিল হওয়া এবং দেরী না করা। কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা নামাযের জন্য আসলে প্রশান্তিসহকারে আসবে, যতটুকু নামায পাবে ততটুকু পড়বে এবং যতটুকু পাওয়া যায়নি ততটুকু পরিপূর্ণ করবে।' - (বোখারী)
ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) ফতহুল বারী গ্রন্থে লিখেছেন, উপরোক্ত হাদীসের মাধ্যমে যা বুঝা যায়, তাহলো ইমামকে যে অবস্থাতেই পাওয়া যায় দেরী না করে সাথে সাথে সে অবস্থায় নামাযে শরীক হওয়া দরকার। আবদুল আযীয বিন রাফী এক আনসারী সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি আমাকে রুকু, সাজদা বা দাঁড়ানো অবস্থায় পাবে সে যেন সে অবস্থায়ই আমার সাথে নামাযে শরীক হয়।' (ইবনু আবি শায়বা)
(৯) সাজদায় ৭টি অঙ্গকে ঠিকমত না রাখা: আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (সঃ)-কে সাত অঙ্গে সাজদা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সময় যেন কেউ চুল কিংবা কাপড় ধরে না রাখে। সে সাত অঙ্গ হল কপাল, দু'হাত, দু'পা ও দু' হাঁটু।
ইবনে আব্বাস থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ 'আমাকে ৭টি অঙ্গে সাজদার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি হাত দিয়ে নিজ নাক, দু'হাত, দু'হাটু ও পায়ের আঙ্গুলের প্রতি ইশারা করে দেখান এবং বলেন, এ সময় যেন আমরা কাপড় ও চুল টানাটানি না করি।' (বোখারী)
এ হাদীস থেকে জানা গেল (ক) যারা সাজদায় দু'পা জমীন থেকে সামান্য উপরে তোলে, কিংবা এক পা অন্য পায়ের উপর রাখে তাদের সাত অঙ্গে সাজদা হয় না। সাজদার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পা উপরে রাখলে তার নামায হবে না। কেননা, সে নামাযের একটি অঙ্গ ত্যাগ করেছে। পা একবার মাটিতে রেখে পরে তুললে নামায হবে, তবে এরূপ করা ঠিক নয়। (ফতোয়া সাদীয়াহ, ১৪৭ পৃঃ) (খ) কারো কারো সাজদার সময় নাক মাটিতে লাগে, কপাল লাগে না। তাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
(১০) কুকুরের মত দুই উরু দাঁড় করে নিতম্বের উপর বসা: এভাবে বসা নিষেধ। কিন্তু দুই সাজদার মাঝে বসার ব্যাপারে মতভেদ আছে। মুসলিম শরীফে তাউস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমরা আবদুল্লাহ বিন আব্বাসকে দুই পায়ের পাতা দাঁড় করে বসার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তর দেন, এটা মহানবী (সঃ)-এর সুন্নত। শুধু দুই সাজদার মাঝে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে তা বৈধ। ইবনে আব্বাসের ব্যাখ্যা হল, নিতম্বের সাথে পায়ের গোড়ালী মিলবে। অপরদিকে, নিতম্ব মাটিতে বিছিয়ে দুই পা দাঁড় করানো এবং দুই হাত মাটিতে রাখা, এটাই কুকুরের মত বসা। আর হাদীসে এটাকেই নিষেধ করা হয়েছে।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমার বন্ধু নবী করীম (সঃ) আমাকে তিনটি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। ১. মোরগের মত সাজদায় ঠোঁকর মারা অর্থাৎ তাড়াহুড়া করে সাজদা করা। ২. কুকুরের মত বসা এবং ৩. শিয়ালের মত এদিক-ওদিক উঁকি-ঝুঁকি মারা। (আহমদ, আবু ইয়ালী)
এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা গেল, দুই সাজদার মাঝে বসার পদ্ধতি দুই রকম। ১. বাম পা বিছিয়ে দিয়ে ডান পা দাঁড় করানো। এটাই নবী করীম (সঃ)-এর প্রসিদ্ধ সুন্নত। অন্যান্য সকল বৈঠকে এভাবেই বসার নিয়ম। ২. দুই পায়ের গোড়ালীর উপর দুই নিতম্ব রেখে বসা।
নামাযে এদিক-ওদিক ঝুঁকে যাওয়া কিংবা বিনা প্রয়োজনে আগে-পিছে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ, এটা নামাযের বিনয় বা খুশুর খেলাপ। ইবনে আওন বলেছেন, মুসলিম বিন ইয়াসার নামক প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও ইমাম নামাযে এমনভাবে দাঁড়াতেন যেন তাকে কোন কিছুর সাথে পেরেক মেরে সোজা করে রাখা হয়েছে। তিনি মোটেও নড়াচড়া করতেন না।১
(১১) প্রথম জাম'আত না পেলে দ্বিতীয় জাম'আত না করা এবং লোক থাকা সত্ত্বেও জাম 'আত ছাড়া একাকী নামায পড়া ভুল। কেননা, জাম'আতে নামায পড়ার ব্যাপারে অধিকাংশের মত হল তা ফরজ। একমাত্র হানাফী মাজহাবে এটাকে ওয়াজিবের কাছাকাছি সুন্নতে মোআক্কাদা বলা হয়েছে। এর নিচে আর কেউ বলেনি। কোন ফরজ বা ওয়াজিব ছুটে গেলে সময় থাকলে অবশ্যই সে সময়ের ভেতর তা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
'আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে একা নামায পড়তে দেখে বলেন: 'এমন কে আছে, যে এ ব্যক্তির জন্য সদকার নিমিত্ত তার সাথে নামায পড়বে?' (আবু দাউদ- 'একই মসজিদে দ্বিতীয়বার জামাতে নামায আদায়' অধ্যায়)
তিরমিজী শরীফে 'যে মসজিদে একবার জামাত হয়েছে সে মসজিদে দ্বিতীয়বার জামাত অনুষ্ঠান' অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে, 'যখন নবী করীম (সঃ)-এর নামায শেষ হল, তখন এক ব্যক্তি আসল। তিনি বলেন: 'কে আছে এমন যে তার সাথে ব্যবসা করবে?' তখন এক ব্যক্তি দাঁড়াল ও তার সাথে নামায আদায় করল।'
এ দুটো হাদীস দ্বারা একই মসজিদে ২য় জামাতের পরিস্কার প্রমাণ মিলে। কোন কারণে একাধিক লোকের একই নামায কাজা হলে তাও জাম'আত সহকারে পড়ার বিধান রয়েছে। এমনকি, সুন্নতে মোআক্কাদা নামায ফরজের আগে পড়তে না পারলে জাম'আতের পর পুনরায় তা পড়ে নিতে হয়।
যারা মসজিদে ২য় জাম'আত দ্বারা ১ম জাম'আতের গুরুত্ব কমে যায় এ যুক্তিতে ২য় জাম'আত করেন না, তাদের এ যুক্তি খুবই দুর্বল। এ দুর্বল যুক্তি দ্বারা কোরআন ও হাদীসের অকাট্য প্রমাণসমূহ বাতিল হতে পারে না।** নামায জাম'আতে পড়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কয়েকটা প্রমাণ পেশ করছি।-
أَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَأتُو الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ
"তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।" (সূরা বাকারা ৪৩)
এ আয়াতে একদিকে নামায কায়েম এবং অন্যদিকে রুকুকারীদের সাথে রুকু আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নামায কায়েমের মধ্যে জাম'আতে নামাযও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ 'রুকুকারীদের সাথে রুকু কর' এ আয়াত পরিস্কার জাম'আতে নামায আদায়ের নির্দেশ দিচ্ছে। জাম'আত ছাড়া একই সাথে 'রুকুকারীদের সাথে রুকু আদায়ের' আর কোন ব্যবস্থা হতে পারে না।
সূরা নেসার ১০২ নং আয়াতে যুদ্ধকালীন নামাযের পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে। ঐ কঠিন মুহূর্তেও জাম'আতসহকারে নামায পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যুদ্ধের সময়ে যদি জাম'আতসহকারে নামায আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়, তাহলে শান্তির সময় জাম'আতের আদেশ আরো জোরদার হবে।
শুধু তাই নয়, কোন কারণে কেউ জাম'আত না পেলে কোন সুন্নত ও নফল আদায়কারীর পেছনে দাঁড়িয়ে ফরজ নামায জাম'আতসহকারে পড়তে পারে। এ মাসলা বোখারী ও মুসলিম এ দু'টো হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ আছে। সাহাবী মোআ'জ (রাঃ) নবী করীম (সঃ)-এর সাথে এশার নামায জামাতে পড়ে পরে নিজ পল্লীতে এসে অন্যান্য মুসল্লীদের এশার জামা'আতের ইমামতির ঘটনা খোদ বোখারী শরীফেই বর্ণিত আছে। তাই ২য় জাম'আত হোক বা ৩য় জাম'আত হোক, নামায অবশ্যই জাম'আতে পড়তে হবে। এমনকি ঘরে এসে স্ত্রীর সাথে হলেও জাম'আতে নামায পড়তে হবে। তাই দ্বিতীয় জাম'আতকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
(১২) মুসল্লীর প্রথম তাশাহহুদ শেষ হয়ে গেলে তখনও যদি ইমামের তাশাহহুদ শেষ না হয় বরং ইমাম তখনও বসা- এমতাবস্থায় তাশাহ্হুদের পুনরাবৃত্তি করা ঠিক নয়। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা যখন প্রত্যেক দুই রাকাত শেষে বস, তখন তাশাহহুদ অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু... আবদুহু ওয়া রসূলুহু পর্যন্ত পড় এবং যেকোন ভাল দোআ নির্বাচন করে তা পড়। (নাসাঈ, আহমদ, তাবরানী) আল্লামা নাসেরুদ্দিন আলবানীও দোআ পড়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন।
(১৩) নামাযে ইমামের আগে আগে কাজ করা: এটা বিরাট ভুল। এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ কি আল্লাহকে ভয় করে না? ইমামের আগে কেউ মাথা তুললে আল্লাহ তার মাথাকে গাধার মাথা কিংবা তার চেহারাকে গাধার চেহারায় রূপান্তরিত করবেন।' - (বোখারী)
ইমামের সাথে নামায পড়ার ব্যাপারে চারটি অবস্থা হতে পারে। এর মধ্যে তিনটি নিষিদ্ধ এবং একটি আদিষ্ট। চারটি অবস্থা হল:
১. مُسَابَقَةُ (মোসাবাকা): ইমামের আগে আগে রুকু-সাজদাসহ বিভিন্ন কাজ করা।
২. مُوَافَقَةُ (মোআফাকা): মোটেও দেরী না করে ইমামের সাথে সাথে রুকু-সাজদাসহ বিভিন্ন কাজ করা।
৩. مُتَابَعَةَ (মাতাবাআ) : ইমাম কোন কাজ করলে এর সামান্য পরে সে কাজটি করা।
৪. مُخَالَفَةُ (মোখালাফা): ইমাম কোন কাজ শেষ করেছেন। তা সত্ত্বেও বেশ দেরী করে সে কাজটি করা।
এর মধ্যে কেবল ৩নং متابعة (মোতাবাআ) কাজটি করার জন্য আমরা আদিষ্ট। বাকি তিনটি কাজ ইমামের অনুসরণের খেলাপ। একটি অগ্রগামীতা, একটি পশ্চাদগামীতা, একটি সাথে সাথে করা। কেবল ইমামের অনুসরণ কাম্য।
ইমামের অনুসরণের ব্যাপারে আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: পূর্ণ অনুসরণের ভিত্তিতে নামায পরিপূর্ণ করার জন্য ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তোমরা ইমামের বরখেলাপ করবে না। ইমাম তাকবীর বললে তোমরাও তাকবীর বলবে এবং রুকু করলে রুকু করবে, তিনি যখন سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ বলবেন, তোমরাও বলবেন, এবং তিনি যখন সাজদা করবেন তখন তোমরাও সাজদা করবে।' - (বোখারী, মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ)
এ হাদীসে ইমামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোন কিছুতে ইমামের অগ্রগামীতা বা পশ্চাতগামীতা অথবা বরখেলাপী করা নিষিদ্ধ।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: 'হে লোকেরা! আমি তোমাদের ইমাম, তোমরা রুকু, সাজদা, কেয়াম, বৈঠক ও সালাম ফিরানোর সময় আমার অগ্রগামী হবে না।' - (মুসলিম, আহমদ)
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: ইমামের অনুসরণের মাধ্যমে নামাযকে পূর্ণ করার জন্য ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই ইমাম রুকুতে যাওয়ার আগে তোমরা রুকুতে যাবে না এবং ইমাম উঠার আগে তোমরা উঠবে না।' (বোখারী)
এ হাদীসগুলোতে অগ্রগামীতা ও পশ্চাদগামীতা ব্যতিরেকে ইমামের যথার্থ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
(১৪) দ্রুত মসজিদে যাওয়া: বিশেষ করে ইমাম রুকুতে যাওয়ার পূর্ব সন্দিক্ষণে তাড়াহুড়া করে নামাযে শামিল হওয়ার চেষ্টা করা। এ জাতীয় তাড়াহুড়া নিষিদ্ধ। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'যখন নামাযের একামত দেয়া হয় তখন দৌড়ে এসোনা, বরং স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আস, ধীরে-সুস্থে আস; যতটুকু নামায পাও ততটুকু পড়, আর যতটুকু পাওনি তা পূর্ণ কর।' (বোখারী, মুসলিম, আহমদ, ও অন্য চারটি বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ)
ধীরে-সুস্থে এবং তাড়াহুড়া না করে নামাযে যোগদান কাম্য। তাড়াহুড়া করে নামাযে আসলে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়। কিন্তু স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস সহকারে এবং দ্রুততা পরিহার করে নামাযে শরীক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এ মর্মে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। আবু বাকরাহ সাকাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি যখন মসজিদে পৌঁছলেন তখন নবী করীম (সঃ) রুকু অবস্থায় ছিলেন। তিনি নামাযের কাতারে শামিল না হয়ে কাতারের বাইরেই রুকুতে শামিল হলেন। তিনি নবী করীম (সঃ)-কে একথা জানান। নবী করীম (সঃ) বলেন: আল্লাহ তোমার আগ্রহ বৃদ্ধি করুন, তবে আর এরূপ করবে না।' (বোখারী)
ইবনে হাজার আসকালানী হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'আর এরূপ করবে না' এর অর্থ হল, তুমি যেভাবে দ্রুত এসেছ, কাতারবিহীন রুকুতে শামিল হয়েছ, তারপর কাতারে শরীক হয়েছ' আর এরূপ করবে না।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমরা যখন একামত শুনবে, তখন নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা হবে, তবে শান্তভাবে ও সম্মানের সাথে চলবে, তাড়াহুড়া করবে না, যে পরিমাণ নামায পাবে তা পড়বে এবং যে পরিমাণ পাবে না সে পরিমাণ পূর্ণ করবে।' (বোখারী)
এ হাদীসগুলোতে নামাযের একামতের সময় তাড়াহুড়া না করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অন্য আরেক বর্ণনায় নামাযের কথাও এসেছে, 'তোমরা যখন নামাযের জন্য রওনা হবে'। তাই তাড়াহুড়া নামায এবং একামত দু' অবস্থায়ই নিষিদ্ধ।
ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) বলেছেন: একামতের সময় তাড়াহুড়া করে না আসার একটি হেকমত হল, তাড়াহুড়া করে আসলে এবং নামাযে শরীক হলে বিনয় ও খুশু আসবে না। বরং যে আগে আসবে তার মনে সে খুশু বিদ্যমান থাকবে।
অন্য আরেক হাদীসে তাড়াহুড়া না করার আরেকটি হেকমত উল্লেখ আছে। আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। আগে বর্ণিত হাদীসের শেষে উল্লেখ আছে: তোমাদের কেউ নামাযের ইচ্ছা পোষণ করে রওনা হলে সে নামাযের মধ্যেই বিবেচিত হবে। (মুসলিম) অর্থাৎ তার হুকুম মুসল্লীর হুকুমের মতই। তাই মুসল্লীর যা করণীয় ও বর্জনীয় তারও তা করণীয় ও বর্জনীয়। অর্থাৎ তাড়াহুড়া বর্জনীয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেন: 'হে ঈমানদারগণ, যখন শুক্রবারে তোমাদেরকে জুম'আর নামাযের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণ ও জিকরের দিকে দ্রুত ধাবিত হও।' এ আয়াতে فَاسْعَوْا শব্দের অর্থ হচ্ছে দ্রুত ধাবিত হও। এ শব্দের ভিত্তিতে নামাযের জন্য তাড়াহুড়া করার বিধান রয়েছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: এ আয়াতে سَعْی শব্দের অর্থ দৌড়-ঝাঁপ করা নয়। বরং উপরোল্লিখিত হাদীসে, ধীরে সুস্থে আসাকেই এর অর্থ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ইমামগণ বলেছেন: কোরআনে سَعَى শব্দের অর্থ হল, কাজ করা ও কর্ম তৎপর হওয়া। অর্থাৎ আজান শুনার পর নামাযের প্রস্তুতি নেয়া, দ্রুততা বা তাড়াহুড়া নয়। যেমন, কোরআনের অন্য আয়াতেও এ শব্দটি কাজ-কর্মের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُورًا.
"যে ব্যক্তি আখেরাতের ইচ্ছা করে, সেজন্য আমল করে এবং সে যদি মোমেন হয় তাহলে তাদের আমল ও চেষ্টা-তৎপরতার যথার্থ মূল্যায়ন হবে।"
আল্লাহ আরো বলেন, إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى 'নিশ্চয়ই তোমাদের তৎপরতা ভিন্ন ভিন্ন।'
আল্লাহ আরো বলেন:
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমীনে ফেতনা-ফাসাদের চেষ্টা করে তাদের শাস্তি হল...।
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে سُحْقُ শন্দের অর্থ হল কাজ ও তৎপরতা, তাড়াহুড়া কিংবা দ্রুততা নয়। এ সকল আয়াত দ্বারা উল্লেখিত প্রশ্নের সমাধান হয়েছে।
এছাড়াও হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) আয়াতটি নিম্নোক্তভাবে পড়েছেনঃ فَامْضُوا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ অর্থাৎ 'আল্লাহর জিকরের তথা নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা কর।' ইবনে তাইমিয়ার জবাব এখানেই শেষ।
ইবনে হাজম তাঁর 'মোহাল্লা' গ্রন্থে আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: কেউ নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা হলে রাস্তায় থাকা অবস্থায় নামাযের একামত হলে সে যেন তাড়াহুড়া না করে এবং আগের চলার গতি অপেক্ষা যেন দ্রুত না চলে। বরং যতটুকু ইমামের সাথে পাবে ততটুকু পড়বে এবং যতটুকু না পাবে ততটুকু পূর্ণ করে নেবে।
সুফিয়ান বিন যিয়াদ থেকে বর্ণিত। যোবায়ের বিন আওয়াম তাকে রাস্তায় দ্রুত চলতে দেখে বলেন: পরিমিত গতিতে চল, তুমি নামাযের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, প্রতিটা পদক্ষেপে আল্লাহ তোমার একটি মর্যাদা বাড়াবেন অথবা একটি গুনাহ মাফ করে দেবেন।
(১৫) ভালভাবে কাতার সোজা না করা: বহু মুসল্লী নামাযের কাতার সোজা করে না এবং নিজেদের পরস্পরের মধ্যকার ফাঁক বন্ধ করে না। এটা বিরাট ভুল। নোমান বিন বশীর থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা হয় নিজেদের কাতার ঠিক কর, না হয়, আল্লাহ তোমাদের মনে ব্যবধান সৃষ্টি করে দেবেন।' (বোখারী)
মহানবী (সঃ) আরো বলেন: 'তোমরা কাতার ঠিক কর এবং গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়াও।' (বোখারী)
নবী করীম (সঃ) আরো বলেন: 'নামাযের কাতার ঠিক কর, কাতার ঠিক করা নামাযের সৌন্দর্যের অংশ।' (বোখারী)
ইমাম বোখারী 'কাতার সোজা না করলে গুনাহ হবে' এ শিরোনামে এক অধ্যায়ে বাশীর বিন ইয়াসার আনসারী থেকে বর্ণনা করেছেন। আনাস বিন মালেক যখন মদীনায় আসেন তখন তাঁকে বলা হল, আপনি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় থেকে এ পর্যন্ত আমাদের কোন ত্রুটির কথা বলেননি। তিনি বলেন, আমি আপনাদের একটা বিষয় ছাড়া আর কোন জিনিসকে খারাপ জানিনা। সেটা হল, আপনারা নামাযের কাতার সোজা করেন না।
কোন কোন ওলামায়ে কেরাম বলেছেন: উপরে বর্ণিত নোমান বিন বশীরের হাদীসে 'মনের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি' দ্বারা বুঝা যায়, কাতারের মত বাহ্যিক কাজ মনের মত গোপন জিনিসের উপর প্রভাব বিস্তার করে। কাতার সোজা না করলে তা মনের সম্পর্কে বাধা সৃষ্টি করে।
কাতার সোজা করার ব্যাপারে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি কাতার ঠিক করে এবং গায়ে গায়ে মিলিত হয়, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রাখেন। আর যে ব্যক্তি কাতার ঠিক করে না এবং ফাঁক রাখে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। - (নাসাঈ, হাকেম)
(১৬) কাঁচা রসুন-পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে আসাঃ এ মর্মে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি এ গাছ (রসুন) খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে।' - (বোখারী)
জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'যে ব্যক্তি কাঁচা রসুন ও পেঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের থেকে দূরে থাকে কিংবা সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে এবং নিজ ঘরে বসে থাকে।' - (বোখারী)
হযরত আনাসের এক বর্ণনায় এসেছে, 'যে ব্যক্তি এ গাছ খায়, সে যেন আমাদের কাছে না আসে, অর্থাৎ সে যেন আমাদের সাথে নামায না পড়ে।' - (বোখারী)
হযরত ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'আমি নবী করীম (সঃ)-কে দেখেছি, তিনি যদি মসজিদে কারো মধ্যে এ দু'টোর গন্ধ পেতেন তাকে বাকী কবরস্থান পর্যন্ত পাঠিয়ে দেয়ার আদেশ দিতেন। কেউ যদি এ দু'টো খেতে চায় সে যেন রান্না করে খায়।' - (মুসলিম)
নবী করীম (সঃ) আরো বলেছেন: 'আদম সন্তান যে সকল জিনিস দ্বারা কষ্ট পায় ফেরেশতারাও সে সকল জিনিস দ্বারা কষ্ট পায়।' - (মুসলিম)
দুর্গন্ধের কারণে কাঁচা রসুন-পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে যাওয়া নিষেধ। রান্না করে খেলে মুখে গন্ধ থাকে না। তখন মসজিদে গেলে কোন দোষ নেই।
(১৭) ধূমপান করার পর মসজিদে যাওয়া: যে কারণে পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে যাওয়া নিষেধ, সে কারণে ধূমপান করেও মসজিদে যাওয়া উচিত নয়। সে কারণটি হল মুখের দুর্গন্ধ। কোন কোন আলেমের মতে ধূমপানের দুর্গন্ধের হুকুম কাঁচা রসুন-পেঁয়াজের হুকুম অপেক্ষা আরো বেশি মারাত্মক। হোজাইফা বিন ওসাইদ থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ
مَنْ أَذَى الْمُسْلِمِينَ فِي طُرُقِهِمْ - وَجَبَتْ عَلَيْهِمْ لَعْنَتُهُمْ -
'যে ব্যক্তি রাস্তায় মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়, তার উপর তাদের অভিশাপ জরুরী হয়ে যায়।' (তাবরানী, আবু নাঈম ও ইবনে আদী)
রাস্তায় কষ্টদানকারী যদি অভিশাপের উপযোগী হয় তাহলে, মসজিদে কষ্টদানকারীর অবস্থা কিরূপ হবে? অবশ্যই এটা বিরাট অপরাধ। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে লেখকের 'ইসলামের দৃষ্টিতে ধূমপান ও গান-বাজনা' বইটি দ্রষ্টব্য।
মুনীর দামেস্কী বলেছেন, পেঁয়াজ-রসুনের উপকার সত্ত্বেও দুর্গন্ধের কারণে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। আর ধূমপানের ক্ষতি ছাড়া কোন উপকারই নেই এবং এর দুর্গন্ধ পেঁয়াজ-রসুন অপেক্ষা বেশি। তাই ধূমপানের পর মসজিদে যাওয়ার হুকুম আরো বেশি কঠিন।
(১৮) নামাযে এদিক-সেদিক দেখা: বিনা প্রয়োজনে এদিক-সেদিক তাকানো যাবে না। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নামাযে এদিক-সেদিক দেখার ব্যাপারে প্রশ্ন করি। তিনি উত্তরে বলেনঃ এটা হচ্ছে বান্দাহর নামায থেকে শয়তানের ছোঁ মারা।' (বোখারী)
নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা যখন নামায পড়বে তখন এদিক-সেদিক দেখবে না। বান্দাহ যে পর্যন্ত নামাযে এদিক-সেদিক না তাকায় সে পর্যন্ত আল্লাহ নিজ চেহারা তার চেহারার দিকে নিবদ্ধ রাখেন।' (তিরমিজী, হাকেম)
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ) নামাযে তিন জিনিস নিষেধ করেছেন। (১) মোরগের মত সাজদায় ঠোঁকর খাওয়া। (২) কুকুরের মত বসা এবং (৩) শিয়ালের মত এদিক-সেদিক তাকানো।' (আহমদ, আবু ইয়ালী)
আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: বান্দাহর নামাযের সময় আল্লাহ তার দিকে মুখ করে থাকেন যতক্ষণ না সে এদিক-সেদিক দেখে, যখন সে এদিক-সেদিক দেখে, আল্লাহ তার থেকে নিজ মুখ ফিরিয়ে নেন। (আবু দাউদ)
কোন প্রয়োজন দেখা দিলে এদিক-সেদিক তাকানো যায়। এর প্রমাণ হল, বোখারী শরীফে বর্ণিত সহল বিন সা'দ আস-সায়েদীর হাদীস। 'নবী করীম (সঃ) বনি আমর বিন আওফ গোত্রে তাদের মধ্যে আপোষ-রফার জন্য গেলেন। নামাযের সময় হওয়ায় মোআজ্জিন এসে আবু বকর (রাঃ)-কে বলেন, আপনি যদি নামায পড়ান তাহলে আমি একামত দিতে পারি। আবু বকর (রাঃ) নামায পড়াতে লাগলেন। ইতিমধ্যে নবী করীম (সঃ) আসেন এবং কাতারের মধ্যে দাঁড়ান। লোকেরা হাত তালি দেয়। আবু বকর (রাঃ) নামাযে কখনও এদিক-সেদিক তাকাতেন না। লোকদের তালির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তিনি পেছন ফিরে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কাতারে দেখেন। নবী করীম (সঃ) তাঁকে ইমামতির জন্য নিজ স্থানে অবস্থানের উদ্দেশ্যে হাত দিয়ে ইশারা করেন।... হাদীসের শেষাংশে আছে, 'তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে হাতে তালি দিতে দেখলাম কেন? নামাযে ইমামের সংশোধনের প্রয়োজন অনুভব করলে তাসবীহ (সোবহানাল্লাহ) বলবে। তাসবীহ বললে তাসবীহর প্রতি খেয়াল করা হবে। আর হাতে তালি তো মহিলাদের জন্য।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন: এ হাদীসে 'প্রয়োজন হলে এদিক-সেদিক তাকানো এবং মুসল্লী কর্তৃক কথা বলার চেয়ে হাতে ইশারা করা উত্তম' বলে জায়েয প্রমাণিত হয়।
(১৯) নামাযের ফরজ রোকনগুলো আদায়ে ইমামের তাড়াহুড়া : রুকু ও সাজদাসহ বিভিন্ন রোকন এত তাড়াহুড়া করে আদায় করা যে, মুক্তাদীর পক্ষে তিনবার তাসবীহ পড়া সম্ভব হয় না বরং ইমামকে ধীরে সুস্থে ঐ রোকনগুলো আদায় করতে হবে যেন মুসল্লীরা তার পেছনে তা ঠিকমত অনুসরণ করতে পারে।
(২০) সামনের কাতারে জায়গা খালি থাকা সত্ত্বেও পেছনে আলাদা কাতার তৈরি করা : এটা দুই কারণে করা হয়ে থাকে। তাড়াতাড়ি রুকু ধরা কিংবা অলসতার কারণে সামনে অগ্রসর না হওয়া। এর ফলে সামনের কাতারে ফাঁক থেকে যায়। কেননা, সে নিজে আলাদা আরেকটি কাতার তৈরি করেছে। বিচিত্র নয় যে, এরপর অন্য মুক্তাদীরাও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। তখন কাতারের দুই পাশ অপূর্ণ থাকবে। নিম্নের হাদীসের কারণে তা নাজায়েয। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : 'যে ব্যক্তি কাতার অপূর্ণ বা বিচ্ছিন্ন রাখে, আল্লাহ নিজেও তার সাথে বিচ্ছিন্ন থাকেন।' (আহমদ, আবু দাউদ, নাসাঈ)
নিম্নের হাদীসটিও এর সমর্থন করে। নবী করীম (সঃ) বলেছেন : 'তোমরা কাতার ঠিক কর, নচেৎ আল্লাহ তোমাদের অন্তরে মতপার্থক্য সৃষ্টি করে দেবেন।' (আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান)
এর সমর্থনে নিম্নোক্ত হাদীসটিও পেশ করা যায়।
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: لَا صَلَاةَ لِفَرْدٍ خَلْفَ الصَّفِّ 'কাতারের পেছনে কোন ব্যক্তির একাকী নামায নেই।' (ইবনে খোজাইমা)
এক্ষেত্রে যা করণীয় তা হল, ডান-বামে তাকিয়ে আরেকজন লোক পাওয়ার চেষ্টা করা। তবে সামনের কাতার থেকে লোক টেনে আনার ব্যাপারে বর্ণিত দু'টো হাদীসই দুর্বল। আল্লামা নাসেরুদ্দীন আলবানীর দুর্বল হাদীস সংকলনের ৯২১ নং ৯২২ নং হাদীসদ্বয় দ্রষ্টব্য। সামনের কাতার থেকে লোক টেনে আনলে কয়েকটা ক্ষতি হয়।
১. সামনের কাতারে ফাঁক সৃষ্টি হয়। যার কারণে কাতারে ফাঁক সৃষ্টি হল, হাদীসে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন থাকে বলে উল্লেখ আছে। (আহমদ, আবু দাউদ)
২. লোক টানার ফলে কাতারের শূন্যতা পূরণের জন্য সকল মুসল্লীকে ব্যস্ত করে দেয়া হয়।
৩. ঐ মুসল্লীর নামাযের খুশু অর্থাৎ বিনয়কে বাধাগ্রস্ত করা হয় এবং তাকে সামনের কাতারের উত্তম ফজীলত ও মর্যাদা থেকে পেছনে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদাসম্পন্ন কাতারে আনা হয়।
৪. মাসয়ালা না জানা থাকলে কাউকে টেনে আনলে সে জোর করবে এবং পেছনের কাতারে আসতে চাইবে না। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
এ সকল সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন: এমতাবস্থায় মুসল্লী পেছনে দাঁড়িয়ে একাকী জাম'আতে নামায আদায় করবে এবং তাতে কোন অসুবিধে নেই। ইনশাআল্লাহ।
(২১) সাজদায় দুই হাত ও উরুদ্বয় একসাথে মিলানো ঠিক নয়: এক্ষেত্রে যা করণীয় তা হল, পেটকে উরু থেকে এবং দুই বাহুকে দুই পার্শ্বদেশ থেকে সাধ্যমত দূরে রাখতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করাও কাম্য নয়। যেমন, এমন করা উচিত নয় যে, পিঠকে বেশি সম্প্রসারিত করে দিয়ে নিজ মাথাকে সামনের কাতারে নিয়ে ঠেকানো। স্বাভাবিকভাবে সব কাজ করা উচিত।
(২২) চাদর কিংবা জামা মাটি পর্যন্ত ঝুলানো: আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে শরীরের কাপড় ঝুলাতে নিষেধ করেছেন।' (আহমদ, তিরমিজী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ, হাকেম) অর্থাৎ এমনভাবে কাপড় ঝুলিয়ে দেয়া যে, কাপড়ের দুই পাশকে কাঁধের মধ্যে মিলানোর পরিবর্তে ছেড়ে দেয়া। ফলে তা মাটি স্পর্শ করে। হাত ভেতর থেকে বের করে রুকু-সাজদা করে। যেমন, চাদরের দুই পাশ দুই কাঁধে না রেখে ছেড়ে দেয়া। ফলে তা মাটি স্পর্শ করবেই। এভাবে কাঁধে কাপড় ঝুলিয়ে দেয়া ইহুদীদের কাজ। খাল্লাল তাঁর 'আল-এলাল' গ্রন্থে এবং আবু ওবায়েদ তাঁর 'আল-গরীব' গ্রন্থে আবদুর রহমান বিন সাঈদ বিন ওহাব থেকে বর্ণনা করেছেন। একদিন হযরত আলী (রাঃ) বের হন। তিনি কিছু লোককে শরীরে কাপড় ঝুলিয়ে নামায পড়তে দেখে মন্তব্য করেন: 'তারা যেন ইহুদীদের স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছে।'
(২৩) বুকের উপর হাত না বাঁধা : বোখারী শরীফে সহল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, লোকদেরকে নামাযে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।' মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে, 'নবী করীম (সঃ) বাম হাতের উপর ডান হাত রাখতেন।'
আহমদ, আবু দাউদ ও ইবনু খোযায়মাহ বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (সঃ) বুকের উপর দুই হাত রাখতেন।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী 'ফতহুল বারী' গ্রন্থে লিখেছেন: নবী করীম (সঃ) নিজ বুকের উপর দুই হাত রাখতেন। বাজ্জারও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা মারওয়াজী মাসায়েল গ্রন্থে লিখেছেন, এসহাক বিন রাহওয়াই আমাদেরকে নিয়ে বিতরের নামায পড়েন। তিনি কুনুতে দুই হাত তুলতেন, রুকুর আগে কুনুত পড়তেন, তারপর দুই হাত নিজ দুধের উপর কিংবা দুধের নিচে রাখতেন।
ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, এটা হচ্ছে লজ্জিত প্রার্থনাকারীর রূপ যা বেহুদা কাজের উত্তম প্রতিরোধক এবং বিনয়ের সহায়ক। যারা নামাযে দুই হাত ছেড়ে দেয় কিংবা নাভীর নিচে বা উপরে হাত রাখে এবং যারা ঘাড়ে হাত রাখে এগুলোর কোনটাই ঠিক নয়। নাভীর নিচে হাত রাখার ব্যাপারে আহমদ ও আবু দাউদে হযরত আলী থেকে যে বর্ণনা এসেছে এর সনদ দুর্বল। তিনি বলেছেন, 'নাভীর নিচে এক হাতের কজীর উপর অন্য হাতের কব্জি রাখা সুন্নত।' এ বর্ণনায় আবদুর রহমান বিন এসহাক ওয়াসেতী দুর্বল রাবী। আল্লামা জাহাবী আবদুর রহমানের ব্যাপারে বলেছেন, মোহাদ্দেসীন কেরام তাকে দুর্বল রাবী বলেছেন।
(২৪) একামতের পর কাতার সোজা করার জন্য না বলা: নবী করীম (সঃ) নামাযের একামতের পর মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাক্যে কাতার সোজা করার অনুরোধ জানাতেন, আমাদের দেশে একামত শেষ হবার আগেই অর্থাৎ قَدْقَامَتِ الصَّلَاةَ বলার সাথে সাথেই ইমাম তাকবীরে তাহরীমা উচ্চারণ করে হাত বেঁধে ফেলেন। ফলে তাতে দু'টো ভুল হয়।
১. একামত সম্পন্ন হওয়ার পরই তাকবীরে তাহরীমা উচ্চারণ করে নামাযের সূচনা করতে হবে। অথচ, একামত অসম্পূর্ণ রেখে তাড়াহুড়া করে নামায শুরু করা সুন্নতের খেলাপ।
২. একামতের পর কাতার সোজা করার লক্ষ্যে নবী করীম (সঃ)-এর পদ্ধতির অনুসরণ না করা।
তিনি একামতের পর বলতেন:
اَقِيْمُوا صُفُوفَكُمْ وَتَرَاصُّوا
'কাতার সোজা কর এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে দাঁড়াও।' (বোখারী)
রসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলতেন:
أَقِيمُوا الصَّفَ فِي الصَّلَاةِ فَإِنَّ إِقَامَةَ الصَّفِ مِنْ حُسْنِ الصَّلَاةِ
'তোমরা কাতার সোজা কর, নামাযের সৌন্দর্য হল কাতার সোজা করা।' - (বোখারী)
তিনি আরো বলতেন:
سَوُّوا صُفُو فَكُمْ فَإِنَّ تَسْوِيَةَ الصُّفُوفِ مِنْ إِقَامَةِ الصَّلَاةِ
'কাতার সোজা কর, কাতার সোজা করা নামাযেরই অংশ।' - (বোখারী)
তিনি আরো বলতেন:
أَحْسِنُوا إِقَامَةَ الصُّفُوفِ فِي الصَّلَاةِ
'নামাযে কাতার সুন্দর কর।' (মোসনাদে আহমদ)
তিনি আরো বলতেন:
رَصُّوا صُفُوفَكُمْ وَقَارِبُوا بَيْنَهَا
'মজবুতভাবে কাতারবন্দী হও এবং পরস্পর কাছাকাছি দাঁড়াও।' (আহমদ, আবু দাউদ)
এক হাদীসে এসেছে, 'বেলাল (রাঃ) আযানের মত একামতের পূর্ণ জওয়াব দিতেন।' (আবু দাউদ, মেশকাত- ৬৬ পৃঃ) এ হাদীস প্রমাণ করে যে, একামত সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর একামতের জওয়াব দিয়ে ইমামের তাকবীরে তাহরীমা বলা সুন্নত।' (নাইলুল আওতার, ১ম খণ্ড, ৩৫৩ পৃঃ)
খোলাফায়ে রাশেদাও একামত শেষ না হলে তাকবীরে তাহরীমা বলতেন না। বর্ণিত আছে, হযরত ওমার (রাঃ) একামত শেষে একজন লোককে কাতার সোজা করার দায়িত্ব দিতেন এবং কাতার সোজা হওয়ার খবর না পাওয়া পর্যন্ত তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলতেন না। হযরত ওসমান এবং আলী (রাঃ)-ও অনুরূপ করতেন। (তিরমিজী-১ম খণ্ড)
ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ)-এর মত হল, একামত শেষ হলে তাকবীরে তাহরীমা বলা।
যারা বলেন, حَى عَلَى الصَّلَاةِ বললে ইমাম ও মোক্তাদী দাঁড়াবে এবং قَدْقَامَتِ الصَّلَاةُ বললে ইমাম তাকবীরে তাহরীমা বলবেন, তাদের এ বক্তব্য সহীহ হাদীসের পরিপন্থী। তাই একামত শেষে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসরণে আমাদেরকেও কাতার সোজা করার কথা বলতে হবে।
(২৫) খতমে কোরআনের অযুহাতে তারাবীহর নামাযে তাড়াহুড়া করাঃ রমজানের প্রত্যেক রাত্রে তারাবীহর নামায সুন্নত। বহু ইমাম অজ্ঞতার কারণে কোরআন খতমের নামে তাড়াহুড়া করে তারাবীহর নামায পড়ান। তারা রুকু, সাজদা ঠিকমত আদায় করেন না এবং তাসবীহও ঠিকমত পড়ার সুযোগ দেননা। বলা যায় তারা মোরগের ঠোঁকর মারেন। এগুলো নিষিদ্ধ এবং এ দ্রুততা শয়তানের কাজ। নামায ফরজ হোক আর নফল-সুন্নতই হোক, নামাযের কেরাত, রুকু-সাজদা ধীরে-সুস্থে আদায় করতে হবে এবং বিনয় ও খুশু রক্ষা করতে হবে। আয়াত এবং রুকু-সাজদার তাসবীহ ও দোআগুলোর অর্থের দিকে খেয়াল করতে হবে। নবী করীম (সঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম কিংবা ইমামগণ খতমের নামে তাড়াহুড়া করে তারাবীহ আদায় করেন নি। ইমাম ও মুসল্লীগণ মনে করেন যে, তাড়াতাড়ি না করলে মুসল্লীরা নামাযে অংশ নিতে চাইবে না, তাদের উচিত ঐ সকল মুসল্লীকে তারাবীহর ফজীলত বুঝানো।
আল্লামা গাজালী (রঃ) বলেছেন, যারা নামাযের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য রক্ষা ব্যতীত বাহ্যিক দিকগুলো বাস্তবায়ন করে, তাদের উদাহরণ হল, কোন বাদশাহকে মৃত প্রাণী উপহার দেয়া যার প্রাণ নেই। আর যে বাহ্যিক দিকগুলোতে ত্রুটি করে তার উদাহরণ হল, বাদশাহকে অঙ্গহীন কানা-খোঁড়া প্রাণী উপহার দেয়া। এ উভয় উপহারদানকারীই আল্লাহর অধিকার নষ্ট করার দায়ে শান্তি ও আজাবের সম্মুখীন হবে।
মোটকথা, নামাযে প্রশান্তি, স্থিরতা ও ধীর-সুস্থ পরিবেশের অভাব হলে নামাযের বিরাট একটি রোকনের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে এ নামায বিশুদ্ধ হয় না। তাই এ জাতীয় নামায পড়িয়ে অসুস্থ ও বৃদ্ধসহ বিভিন্ন লোকদেরকে কষ্ট দেয়া ইমামের উচিত নয়। পবিত্র কোরআন এ জাতীয় নামাযকে মোনাফেকদের নামায হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেঃ
وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كَسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلا -
'তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসের মত দাঁড়ায়, তারা লোক দেখানোর কাজ করে, তাদের খুব কম সংখ্যকই আল্লাহকে স্মরণ করে।' তাদের নামায মোমেনদের সে আকঙ্ক্ষিত নামায নয় যাদের সম্পর্কে আল্লাহ কোরআনে বলেছেন:
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ - الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ -
'সে মোমেনরাই সফল হয়েছে যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী।' (সূরা মোমেন: ১-২)
তারাবীহ খুবই ফজীলতপূর্ণ নামায। তাই তা ভালভাবে আদায় করা দরকার।
(২৬) বিনা প্রয়োজনে নামাযে দু'চোখ বন্ধ করা: আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন: নামাযে চোখ বন্ধ করা নবী করীম (সঃ)-এর সুন্নতের পরিপন্থী। তিনি কখনও নামাযে এরূপ করতেন না। বরং তিনি নামাযে তাশাহহুদের বৈঠকে দোআর সময় আঙ্গুলের ইশারার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ইবনুল কাইয়েম (রঃ) চোখ বন্ধ না করার বিষয়ে খোমাইসা আবি জাহামসহ অন্যদের বর্ণিত কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। এর সমর্থনে আরো বলা যায় যে, কসুফের নামাযের সময় তার বেহেশতের আঙ্গুরের ছড়া ধরার চেষ্টা, একবার নামাযে দোজখ এবং তাতে বিড়ালের কাহিনী বিশিষ্ট মহিলাকে দেখা এবং তাঁর নামাযের সামনে দিয়ে পশু অতিক্রমের সময় তাকে বাধা প্রদানসহ বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি নামাযে চোখ বন্ধ রাখতেন না।
নামাযে চোখ বন্ধ রাখার ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মতভেদ আছে। ইমাম আহমদসহ একদল আলেমের মতে এটা মাকরূহ। তাঁরা বলেছেন, এটা ইহুদীদের কাজ। তবে অন্য একদল আলেমের মতে, তা জায়েয এবং তাঁরা এটাকে মাকরূহ বলেন নি। বরং তারা বলেছেন, এর মাধ্যমে নামাযের প্রাণ খুশু ও বিনয় অর্জন সহজ।
বিশুদ্ধ মত হল, চোখ খোলা রাখলে যদি তা খুশুর জন্য ক্ষতিকর না হয় তাহলে খোলা রাখাই উত্তম। আর যদি সামনে কারুকার্য, ডিজাইন বা অন্য কিছুর প্রতি দৃষ্টির কারণে খুশু বাধাপ্রাপ্ত হয় তাহলে চোখ বন্ধ রাখা মাকরূহ হবে না বরং শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হওয়ার কারণে তা মোস্তাহাব।২
(২৭) প্রথম রাকাত অপেক্ষা ২য় রাকাত কিংবা প্রথম দু'রাকাত অপেক্ষা শেষ দু'রাকাতকে দীর্ঘ করা: নবী করীম (সঃ) এর বিপরীত করতেন। অর্থাৎ তিনি ১ম রাকাতকে ২য় রাকাত এবং প্রথম দু'রাকাতকে শেষ দু'রাকাত অপেক্ষা দীর্ঘায়িত করতেন।
আবু কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) জোহরের প্রথম রাকাতগুলোকে দীর্ঘ এবং শেষ রাকাতদ্বয়কে সংক্ষিপ্ত করতেন। তিনি ফজরের নামাযেও এরূপ করতেন।' (বোখারী) আরেক বর্ণনায়, তিনি আসরের নামাযেও এরূপ করতেন বলে বর্ণিত হয়েছে। (বোখারী)
(২৮) টাখনু বা পায়ের ছোট গিরার নিচে কাপড় পরা: আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় চেঁচানো অবস্থায় নামায পড়ছিল। রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেন: 'যাও, অযু কর।' তারপর সে আসল। নবীজী আবার তাকে অযু করে আসার নির্দেশ দেন। সে আবার গেল এবং অযু করে আসল। এক লোক নবী করীম (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করল: আপনি তাকে অযু করার আদেশ দেয়ার পর চুপ করে রইলেন কেন? তিনি জবাব দেন, লোকটি টাখনুর নিচে কাপড় পরে নামায পড়ছিল। আল্লাহ কাপড় চেঁচানো ব্যক্তির নামায কবুল করেন না।' (আবু দাউদ)
ইমাম নওয়ী বলেছেন, ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসের সনদ সহীহ। কেউ কেউ হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু এ মর্মে অন্যান্য হাদীসের কারণে এ দুর্বলতা দূর হয়ে গেছে।
টাখনুর নিচে কাপড় চেঁচানোর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী রয়েছে। আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টি দেবেন না এবং, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। তারা হল:
১. টাখনুর নিচে কাপড় চেঁচানো ব্যক্তি।
২. যে ব্যক্তি কোন কিছু দান করে খোঁটা দেয়।
৩. মিথ্যা কসম করে পণ্যদ্রব্য বিক্রেতা। -(মুসলিম)
জাবের বিন সোলাইম থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তুমি ইজার হাঁটুর মাঝামাঝি পর্যন্ত পর, যদি তা না কর, তাহলে, পায়ের টাখনু বা ছোট গিরা পর্যন্ত পরতে পার, তবে টাখনুর নিচে কাপড় চেঁচানোর বিষয়ে হুঁশিয়ার। এটা হচ্ছে, লোক প্রদর্শন। আল্লাহ নিশ্চয়ই লোক প্রদর্শনকারীদেরকে পসন্দ করেন না....। (আবু দাউদ)
আরেক হাদীসে মহানবী (সঃ) বলেছেন:
مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَهُوَ فِي النَّارِ -
'দুই টাখনুর নিচে ইজার (লুঙ্গি) পরলে তার ঠিকানা হল দোজখ।' (বোখারী)
এখন এটা ইচ্ছা করে বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাখনুর নিচে চেঁচালে উল্লেখিত হাদীসের কারণে তা নিষিদ্ধ হবে। কেননা, এটা সাধারণত গর্ব-অহঙ্কার ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়। কারো লোক প্রদর্শন বা গর্ব-অহঙ্কারের ইচ্ছা না থাকলেও তা লোক প্রদর্শন ও গর্ব-অহঙ্কারের উপায়। তাছাড়াও তাতে মহিলাদের সাথে সাজুয্য এবং তাতে ময়লা ও নাপাকী লাগতে পারে। অপচয় এর আরেকটি দিক। তাই লুঙ্গি, পাজামা, প্যান্ট ও জামা অবশ্যই টাখনুর উপর থাকতে হবে। এর নিচে গেলে গুনাহ হবে।
(২৯) একামতের সময় সুন্নত বা নফল নামায পড়া: আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
إِذَا أُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَلَاصَلَاةَ إِلَّا الْمَكْتُوبَةَ
'নামাযের একামত হয়ে গেলে ফরজ নামায ছাড়া আর কোন নামায নেই।' (মুসলিম)
আবদুল্লাহ বিন বোহাইনা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামাযের একামতের সময় এক ব্যক্তিকে দু'রাকাত নামায পড়তে দেখেন। নবী করীম (সঃ)-এর নামায শেষে লোকেরা তাকে ঘিরে ফেলল। তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করেন, 'ফজরের ফরজ নামায কি ৪ রাকাত? ফজরের ফরজ নামায কি ৪ রাকাত?' (বোখারী, মুসলিম)
অর্থাৎ একামতের পর তো মাত্র দু'রাকাত ফরজ নামায পড়ার কথা। কিন্তু লোকটি তো ৪ রাকাত পড়ল।
হাদীসের আলোকে ইবনে হেজাম বলেন: ফজরের ফরজ নামাযের একামত শুনার পর ফজরের দু'রাকাত সুন্নত পড়লে যদি জাম'আত কিংবা তাকবীরে তাহরীমা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে ঐ দু'রাকাত সুন্নত আগে পড়া জায়েয নেই। কেউ তা পড়লে আল্লাহর নাফরমানী করবে।
ইমাম নওয়ী (রঃ) বলেছেন, একামত শুনার পর অন্য নামায না পড়ার পেছনে যে যুক্তি রয়েছে তাহল, ফরজ নামাযের জন্য প্রথম থেকেই পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়া এবং সুন্নত ও নফলের দ্বারা ফরজের সামান্যও ঘাটতি না করা।
ইবনে আবদুল বার বলেছেন, একামতের সময় নফল ও সুন্নত ত্যাগ করে ফরজ পড়ার পর তা আদায় করা সুন্নতের উত্তম অনুসরণ। একামতের মধ্যে حَتَّى عَلَى الصَّلَاةِ -এর অর্থ হল, এখন যে ফরজ নামায অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে দ্রুত এসে শরীক হও। তাই একামতের সময় নফল-সুন্নত না পড়ে ফরজ নামাযে শামিল হতে হবে।
কেউ কেউ হযরত আলী থেকে বর্ণিত হাদীসের বরাত দিয়ে বলেছেন: একামতের সময় নফল নামায পড়া জায়েয। সে হাদীসে আছে: 'নবী করীম (সঃ) একামতের সময় দু'রাকাত নামায পড়তেন।' (ইবনু মাজাহ)
এ হাদীসের ভিত্তিতে দলীল দেয়া যাবে না। কেননা, হাদীসটি দুর্বল। হাদীসের সনদে হারেস আওয়ার নামক রাবী দুর্বল। আল্লামা জাহাবী তাঁর 'মীজানুল এতেদাল, গ্রন্থে লিখেছেন: মুগীরা শাবী থেকে বর্ণনা সূত্রে বলেছেন, হারেস আওয়ার আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছে। সে ছিল মিথ্যাবাদী। ইবনু মুঈন তাকে দুর্বল এবং জারীর বিন আবদুল হামিদ তাকে মিথ্যুক বলেছেন, শাবী বলেছেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, সে মিথ্যুক।
কিছু কিছু আলেম একামতের সময় কিংবা পরে ফজরের সুন্নত পড়াকে জায়েয বলেছেন। ইমাম ইবনুল কাইয়েম তাঁর إِعْلَامُ الْمُوْقِعِيِينَ লিখেছেন: মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী একামত হয়ে গেলে ফরজ ছাড়া আর কোন নামায নেই। তাই একামতের পর ফজরের সুন্নত পড়া উপরোক্ত হাদীসের বিরোধী। তিনি বলেন, আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসের শেষে 'ফজরের দু'রাকাত সুন্নত ব্যতীত' এ অংশটি যোগ করাকে অস্বীকার করেছেন। তার মতে, শেষ অংশটুকু হাদীস নয়।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
إِذَا أَقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَلَا صَلَاةَ إِلَّا الْمَكْتُوبَةَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ وَلَا رَكْعَتَى الْفَجْرِ ؟ قَالَ : وَلَا رَكْعَتَي الْفَجْرِ -
'যখন নামাযের একামত দেয়া হয় তখন ফরজ ব্যতীত আর কোন নামায নেই। রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করা হল, ফজরের দু'রাকাত সুন্নতও নয়? তিনি জবাবে বলেন: না, ফজরের দু'রাকাত সুন্নতও নয়।' (বায়হাকী)
তবে, ফজরের ফরজ পড়ার পর দু'রাকাত সুন্নত পড়ে নিলে সুন্নতের ফজীলতও লাভ করা যায়। ফরজের পর সুন্নত না পড়ার কোন নিষেধাজ্ঞা হাদীসে নেই। তবে একামতের পর কেউ যেন নতুন করে নফল-সুন্নত নামায শুরু না করে। কেউ যদি একামতের আগে নফল-সুন্নত শুরু করেন তাহলে হালকাভাবে তা শেষ করে জামাতে শরীক হলে নিম্নোক্ত আয়াতের পরিপন্থী হবে না :
وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
'তোমাদের আমল বরবাদ করো না।'
(৩০) নামাযের মধ্যে ইশারায় সালামের জবাব না দেয়া: কেউ মসজিদে প্রবেশ করে সালাম দিলে মুখে সালামের জবাব দেয়া যাবে না। কিন্তু ইশারার মাধ্যমে জবাব দেয়া যাবে। এ মর্মে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) বলেন: 'আমি বেলালকে জিজ্ঞেস করলাম, নবী করীম (সঃ) কিভাবে নামাযে আনসারদের সালামের জবাব দিতেন? বেলাল বলেন, তিনি এভাবে জবাব দিতেন। একথা বলে বেলাল নিজ হাতের অগ্রভাগ সোজা করে দেখান।' -(আবু দাউদ, তিরমিজী)
আল্লামা সানআনী বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, কথার মাধ্যমে নয়, বরং ইশারার মাধ্যমে সালামের জবাব দিতে হবে।
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এক কাজে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নামাযে পেলেন। তিনি তাঁকে সালাম দেন। নবীজি ইশারায় জবাব দেন।' (মুসলিম)
ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'তিনি নবী করীম (সঃ)-কে নামাযের মধ্যে সালাম দিলে তিনি মাথা নেড়ে সালামের জবাব দেন।' (বায়হাকী)
এ সকল হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, কথার মাধ্যমে সালামের উত্তর দেয়া সম্ভব না হওয়ায় তিনি ইশারার মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন। মাথা, হাত বা আঙ্গুলের ইশারায় সালামের উত্তর দিলে চলবে।
প্রশ্ন হল, নামাযের মধ্যেও কেন সালামের উত্তর দিতে হয়? উত্তর হল, আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন:
وَإِذَا حُيِّتُمْ بِتَحِيَّةِ فَحَيُّوا بِأَحْسَنِ مِنْهَا أَوْرُدُّوهَا
'আর তোমাদেরকে কেউ সালাম দিলে তোমরাও তার জন্য তার চাইতে উত্তম জবাব দাও অথবা তার অনুরূপ সালামই দাও।' (সূরা নেসা-৮৬)
আল্লাহর আদেশ হল সালামের জবাব দেয়া। নামাযে কথার মাধ্যমে উত্তর • দেয়া সম্ভব না হওয়ায় ইশারায় উত্তর দিতে হয়।
(৩১) নামায কাজা হলে সাথে সাথে কাজা আদায় না করা: অনেকে পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করে এবং কাজা আদায় করে। এটা বিরাট ভুল, সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে কিংবা মনে পড়ার সাথে সাথে কাজা আদায় করতে হবে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ تُصَلِّيهَا إِذَا ذكَرَهَا
'কেউ ভুলে কিংবা ঘুমের কারণে নামায না পড়ে থাকলে স্মরণ হওয়া মাত্র তা আদায় করা এর কাফফারা।' (বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজী)
(৩২) ইমাম পরবর্তী রাকাতের জন্য উঠা সত্ত্বেও মোক্তাদীর কিছুক্ষণ বসে থাকা : এটা ঠিক নয়, বরং সুন্নতের খেলাপ। ইমামের অনুসরণ করা ফরজ। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন :...
إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامَ لِيُؤْتَمَّ بِه
'অনুসরণের জন্যই ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছে।' (বোখারী, মুসলিম)
(৩৩) আজান, একামত কিংবা তাকবীরের মধ্যে 'আল্লাহু আকবার' الله أَكْبَارُ অর্থাৎ আকবার শব্দকে দীর্ঘায়িত করা। এর ফলে অর্থের বিকৃতি ঘটে। أَكْبَارُ-এর একবচন کَبَرُ অর্থাৎ এক মুখ বিশিষ্ট ঢোল। অভিধানে এর আরেকটি অর্থ হল এক ধরনের দীর্ঘজীবি উদ্ভিদ। অথচ 'আল্লাহু আকবার' এর অর্থ হল, আল্লাহ সবচাইতে বড় ও মহান।
(৩৪) ১ শব্দটি না বাচক অর্থ বুঝালে তাকে মদ সহকারে দীর্ঘায়িত না করা। এর ফলে অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যায়। বিশেষ করে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ এর মধ্যে ভুল উচ্চারণের কারণে শিরকের গুনাহ হবে। মদ সহকারে পড়লে এর অর্থ দাঁড়ায়: 'আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ ও উপাস্য নেই।' আর মদ ছাড়া তাড়াতাড়ি পড়লে অর্থ দাঁড়ায়, 'আল্লাহ ছাড়া অবশ্যই আরো মাবুদ এবং উপাস্য আছে।' নাউজুবিল্লাহ। কাফেরকে মুসলমান বানানোর জন্য যে কালেমার প্রবর্তন, ভুল উচ্চারণের কারণে একই কালেমা দ্বারা মোমেন পুনরায় কাফের ও মোশরেকে পরিণত হয়ে যায়।
অনুরূপভাবে, সূরা কাফেরূনের চার জায়গায় ১-কে লম্বা করে মদ সহকারে না পড়লে এরূপ বিভ্রাট সৃষ্টি হতে পারে। যেমন: لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ - وَلَا أَنْتُمْ - عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ - وَلَا أَنَا عَابِدُ مَّا عَبَدُ تُّمْ - وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ -
অর্থ : তোমরা যার এবাদত কর, আমি তার এবাদত করি না। আর আমি যার এবাদত করি তোমরা তার এবাদত কর না। তোমরা যার এবাদত কর আমি তাদের এবাদতকারী নই এবং আমি যার এবাদত করি তোমরাও তার এবাদতকারী নও।'
এখানে ৪টি জায়গায় ১ শব্দকে মদ সহকারে না পড়লে অর্থ হবে এরূপ:
তোমরা যার এবাদত কর আমি অবশ্যই তার এবাদত করি। আর আমি যার এবাদত করি তোমরা অবশ্যই তার এবাদত কর। তোমরা যার এবাদত কর আমি অবশ্যই তাদের এবাদতকারী এবং আমি যার এবাদত করি তোমরাও অবশ্যই তার এবাদতকারী।'
এভাবে মোশরেকদের মূর্তি ও দেবতার পূজাকে তাকিদ সহকারে স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে। ফলে, মোমেন আর মোমেন থাকতে পারছে না। এরূপ আরো বহু আয়াত ও দোআয় এ সমস্যা দেখা দেবে। কেউ জেনে বুঝে ইচ্ছা করে এরূপ উচ্চারণ করলে এবং এর এ অর্থকে গ্রহণ করলে শতকরা ১শ' ভাগ কাফের-মোশরেক হয়ে যাবে। কিন্তু যারা অর্থ বুঝে না এবং এরূপ উল্টা নিয়তও যাদের নেই তাদের ব্যাপারটি আল্লাহ ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায়। কিন্তু বাঁচার সঠিক পদ্ধতি হল, ঠিকমত উচ্চারণ করা।
(৩৫) বেশি পাতলা কাপড়ে নামায পড়া যাতে সতর দেখা যায় : পুরুষের নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং স্ত্রীলোকের সারা শরীর সতর। পাতলা কাপড়ের ভেতর দিয়ে যদি শরীরের সতরের অংশের চামড়া দেখা যায় তাহলে সতর ঢাকা হবে না।ফলে নামাযও শুদ্ধ হবে না। হাঁ, যদি পাতলা কাপড়ের ভেতর অন্য কোন পোশাক থাকে যেমন, পুরুষের পাজামা, লুঙ্গি এবং মেয়েলোকের অন্য কোন কাপড় তাহলে নামায বিশুদ্ধ হবে। নামাযে পুরুষের কাধ ঢাকা থাকতে হবে। গেঞ্জী থাকলেও চলবে। কেননা, রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন :
لَا يُصَلِّ أَحَدُكُمْ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ لَيْسَ عَلَى عَاتِقِهِ مِنْهُ شي
'তোমরা একটিমাত্র কাপড়ে এমনভাবে নামায পড় না যে, কাঁধের উপর কিছু না থাকে।' (বোখারী, মুসলিম)
এমন পোশাক পরে নামায পড়লেও হবে না যার ফলে সতরের কোন অংশ বেরিয়ে পড়ে।
(৩৬) নামাযে চুল ও কাপড় গুছানো: আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةٍ لَا أَكُفُ شَعْرًا وَلَا ثَوْبًا ...
'চুল ও কাপড় না গুছিয়ে আমাকে সাত অঙ্গে সাজদার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।' (বোখারী)
কেউ কেউ রুকু-সাজদার সময় বিনা প্রয়োজনে শরীরের কাপড় টেনে ধরে এবং কাপড়কে সম্প্রসারিত হতে দেয় না। কেউ কেউ দাঁড়ি কিংবা মাথার চুল ধরে নাড়াচাড়া করে। একবার এক ব্যক্তি এরূপ করায় নবী করীম (সঃ) বলেন, তার অন্তরে খুশু ও বিনয় থাকলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তা করতে পারেনা। এরূপ করলে নামাযের খুশু ও বিনয় নষ্ট হয়।
(৩৭) বাইরে সুতরাহ ছাড়া নামায পড়া: মসজিদে নামায পড়লে ইমামের স্থান মেহরাব সুনির্দিষ্ট থাকে বলে সেখানে সুতরার দরকার হয়না। কিন্তু অন্যত্র কিংবা মসজিদের পেছনের অংশে নামায পড়লে সুতরাহ দিতে হবে। আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'তোমরা সুতরাহ ছাড়া নামায পড়বে না এবং তোমাদের নামাযের সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দেবে না। যদি সে না মানে তাহলে, তার সাথে লড়াই কর। কেননা, তার (শয়তান) সঙ্গী তার সাথে আছে।' (ইবনু খোযাইমাহ, হাকেম, বায়হাকী) হাকেম বলেছেন, মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং আল্লামা জাহাবী একে সমর্থন করেছেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ নামায পড়লে যেন সামনে সুতরাহ রাখে এবং এর নিকটবর্তী হয়। কেউ সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে তার সাথে লড়াই করবে; সে হচ্ছে শয়তান।' (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, বায়হাকী, ইবনু খোযাইমা এবং ইবনে আবি শায়বা)
সুতরার দূরত্বের পরিমাণ : ৪
সুতরার ও মুসল্লীর মধ্যকার দূরত্বের পরিমাণ কতটুকু হওয়া দরকার? এ বিষয়ে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'তিনি নিজে কা'বার ভেতর প্রবেশ করে দরজাকে পেছনে রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হতেন এবং কা'বার দেয়াল থেকে প্রায় তিন হাত দূরে অবস্থান করে নামায পড়তেন। হযরত বেলাল (রাঃ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবী করীম (সঃ) সে জায়গাতেই নামায পড়েছিলেন। এর দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, তাঁর ও সুতরার মাঝখানের দূরত্ব ছিল প্রায় তিন হাত।' (বোখারী)
সহল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) মোসাল্লা ও কা'বার দেয়ালের মাঝে একটি ভেড়া অতিক্রমের জায়গা ছিল।' ইমাম নওয়ী (রঃ) তাঁর শরহে মুসলিম গ্রন্থে লিখেছেন, এখানে 'মোসাল্লা' বলতে, সাজদার জায়গা বুঝানো হয়েছে।
আউন বিন আবি জোহাইফা থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, আমি আমার বাপের কাছে শুনেছি, নবী করীম (সঃ) (মক্কার মাআবদায়) বাতহায় দু'রাকাত করে জোহর ও আসর আদায় করেছেন। তাঁর সামনে ছিল আ'নজাহ। তাঁর সামনে দিয়ে নারী ও গাধা অতিক্রম করেছে।' (বোখারী, মুসলিম)
ইবনুল আসীর তাঁর 'আন-নেহায়া' গ্রন্থে লিখেছেন, আ'নজাহ হচ্ছে, তীরের অর্ধেক বা আরো একটু বড় ঠিক এ পরিমাণ। আ'নজায় তীরের মত দাঁত আছে।
আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ)-এর সামনে হারবাহ নামক যুদ্ধাস্ত্র দাঁড় করানো হত এবং তিনি এর দিকে ফিরে নামায পড়তেন।' (বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ)
'হারবাহ' হচ্ছে সুঁচালো মাথা বিশিষ্ট লোহার তৈরি ছোট যুদ্ধাস্ত্র।
আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ) নিজ সওয়ারীকে সামনে রেখে নামায পড়তেন।' (বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)
সুতরাহর পরিমাণ: সুতরাহ কত বড় হবে? এ মর্মে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, তাবুক যুদ্ধে নবী করীম (সঃ)-কে সুতরাহর পরিমাণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাবে বলেন: সওয়ারীর পিঠে রাখা আসনের কাঠের মত উঁচু হলেই চলবে।' (মুসলিম)
তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, নামাযের সময় সামনে সওয়ারীর আসনের কাঠের মত উঁচু জিনিস দাঁড় করালেই চলবে। এরপর সামনে দিয়ে কি যায় তা নিয়ে আর কোন পরোয়া নেই।' (মুসলিম)
ইমাম নওয়ী বলেছেন: সওয়ারীর আসনের শেষ মাথায় লাগানো কাঠের পরিমাণ হল হাতের হাড়ের পরিমাণ, অর্থাৎ হাতের দুই-তৃতীয়াংশ। পুরো হাত পরিমাণ নয়।
দাগ কি সুতরার বিকল্প হতে পারে? দাগ সুতরার বিকল্প হতে পারে না। তাই উঁচু সুতরাহ ব্যবহার করতে হবে। যে হাদীসে সুতরাহ না পেলে বিকল্প হিসেবে দাগ দেয়ার কথা এসেছে সে হাদীসের সনদ দুর্বল। তাই সে হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। ইমামের সুতরাহ মোক্তাদীর জন্য যথেষ্ট।
দুর্বল হাদীসগুলোর একটা হল: আবু মাহজুরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবী করীম (সঃ)-কে মসজিদে হারামে বাবে বনি শায়বা দিয়ে প্রবেশ করতে দেখেছি। তিনি কা'বা শরীফের সামনে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ান, একটি দাগ বা রেখা টানেন, তারপর তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে নামায শুরু করেন। লোকেরা কা'বা ও ঐ দাগের মাঝে তওয়াফ করতে থাকে।' (আবু ইয়ালী) এ হাদীসের সনদে হাসান বিন ওবাদ অজ্ঞাত ব্যক্তি। ইমাম জাহাবী বলেন, তিনি কে আমরা জানিনা। এছাড়াও সনদে ইবরাহীম বিন আবদুল মালেকও দুর্বল ব্যক্তি। তাই হাদীসটি দুর্বল। এ বিষয়ে এরূপ আরো কয়েকটি দুর্বল হাদীস রয়েছে।
দুই হারাম শরীফে সুতরাহর প্রয়োজনীয়তা: দুই হারাম শরীফ অর্থাৎ মক্কার মসজিদে হারাম এবং মদীনার মসজিদে নবওয়ীতেও সুতরাহর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কেননা, সুতরার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ সকল মসজিদের জন্য প্রযোজ্য। তা থেকে কোন মসজিদকে বাদ দেয়া হয়নি। তাই দুই হারাম শরীফও ঐ আদেশের শামিল। যদি ইমাম মসজিদের দেয়াল কিংবা মেহরাবের কাছে না দাঁড়ান।
সুতরাহ সম্পর্কিত একাধিক হাদীস তিনি মদীনার মসজিদে নবওয়ীতে বসেই বলেছেন। অপরদিকে মক্কার মসজিদে হারামে সুতরাহ সম্পর্কে আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) ওমরাহ করেন, বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেন এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়েন। তাঁর সাথীরা মানুষ থেকে তাঁকে আড়াল করে রাখেন।' (বোখারী)
ইয়াহইয়া বিন আবি কাসীর থেকে সহীহ সনদ সহকারে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, আমি মসজিদে হারামে আনাস বিন মালেককে সামনে লাঠি দাঁড় করিয়ে নামায পড়তে দেখেছি।' (ইবনে আবি শায়বা)
সালেহ বিন কাইসান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি ইবনে ওমারকে কা'বার দিকে মুখ করে নামায পড়তে দেখেছি। তিনি তাঁর সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দেননি। বরং বাধা দিয়েছেন।' (বোখারী)
(৩৮) মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করা: এটা বিরাট গুনাহ। আবুল জোহাইম থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যদি মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানত যে, তার কি গুনাহ, তাহলে তার জন্য মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অপেক্ষা ৪০ পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম হত।' এ হাদীসের এক বর্ণনাকারী আবুন নাদ্র বলেন: আমি জানিনা, নবী করীম (সঃ) ৪০ দিন, মাস না বছর বলেছেন। (শরহে মুসলিম, ইমাম.নওয়ী)
আবু সালেহ সাম্মান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: 'আমি আবু সাঈদ (রাঃ)-কে জুমার দিন লোকদেরকে আড়ালকারী একটি জিনিসের দিকে মুখ করে নামায পড়তে দেখেছি। আবু মুঈত গোত্রের এক যুবক তাঁর সামনে দিয়ে পার হওয়ার ইচ্ছা করল। আবু সাঈদ (রাঃ) তাঁকে নিজ বুক দিয়ে ঠেলা দেন। যুবকটি পারাপারের অন্য কোন পথ না দেখে আবারও তাঁর সামনে দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করে। এবারও আবু সাঈদ পূর্বাপেক্ষা আরো জোরে ঠেলা দেন। যুবকটি আবু সাঈদের এ আচরণের বিরুদ্ধে শাসক মারওয়ানের কাছে অভিযোগ করে। আবু সাঈদও তাঁর পেছনে পেছনে মারওয়ানের কাছে যান। মারওয়ান জিজ্ঞেস করেনে, হে আবু সাঈদ, আপনার ও আপনার ভাতিজার ঘটনা কি? আবু সাঈদ বলেন: আমি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ মানুষ থেকে আড়াল সৃষ্টিকারী সুতরার দিকে নামায পড়ার সময় সামনে দিয়ে কেউ অতিক্রম করতে চাইলে তাকে ঠেলে সরিয়ে দেবে। সে সরতে না চাইলে তার সাথে যুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই সে শয়তান।' (বোখারী)
ইমাম নওয়ী বলেছেন, ১ম হাদীসে নামাযের সামনে দিয়ে পার হওয়াকে হারাম করা হয়েছে। তাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও হুমকীর উল্লেখ আছে।
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, হাদীসের মর্মানুযায়ী এটা কবীরা গুনাহর শামিল। তিনি আরো বলেন, প্রকাশ্য হাদীসের দাবী হল, মুসল্লীর সামনে দিয়ে মোটেও অতিক্রম করা যাবে না। জায়গা না থাকলে অপেক্ষা করতে হবে যে পর্যন্ত না মুসল্লী নামায থেকে অবসর হয়। আবু সাঈদের কাহিনী একথার সহায়ক।
আল্লামা শাওকানী বলেছেন, নামাযীর সামনে দিয়ে পার হওয়া জাহান্নাম ওয়াজিবকারী কবীরা গুনাহ। তাতে ফরজ ও নফল-সুন্নত সমান।
সৌদী আরবের প্রয়াত মুফতী জেনারেল শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ (রঃ) বলেছেন: প্রকাশ্য হাদীসের দাবী হল, মুসল্লীর সামনে দিয়ে যাওয়া হারাম এবং মুসল্লীর তা প্রতিরোধ করার অধিকার আছে। তবে কেবলমাত্র একটি সময়ে মুসল্লীর সামনে দিয়ে যেতে পারবে যখন পার হতে বাধ্য হয় এবং এছাড়া আর কোন পথ না থাকে। তবে মুসল্লী থেকে দূর দিয়ে অতিক্রম করলে এবং তার সামনে সুতরাহ না থাকলেও গুনাহ হবে না। সেটা সুতরার সামনে দিয়ে অতিক্রম করারই সমান।
দূরত্বের পরিমাণ: এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, মুসল্লী থেকে কতটুকু দূর দিয়ে গেলে গুনাহ হবে না? এ প্রশ্নের জবাব হল, বহু সংখ্যক ওলামায়ে কেরামের মতে, সুতরাহ ছাড়া মুসল্লী যে জায়গায় দাঁড়াবে সে জায়গা থেকে তিন হাত পরিমাণ দূর দিয়ে গেলে গুনাহ হবে না। গুনাহ কেবল সে ব্যক্তির হবে যে ঐ তিন হাতের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করবে।
ইবনু হাজমের মতে, যে ব্যক্তি মুসল্লী থেকে তিন হাতের বেশি দূর দিয়ে অতিক্রম করবে, তার গুনাহ হবে না এবং মুসল্লীও অতিক্রমকারীকে বাধা দেবে না। কিন্তু যদি তিন হাত বা এর কম পরিমাণ দূর দিয়ে যায় তাহলে অতিক্রমকারী ব্যক্তি গুনাহগার হবে। সুতরাহ হলে, এর পেছন দিয়েই অতিক্রম করতে পারবে। তখন আর গুনাহ হবে না।
ইমামের সামনে সুতরাহ থাকলে মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে কোন অসুবিধে নেই। ইমাম বোখারী 'ইমামের সুতরাহ পেছনের মোক্তাদীর সুতরাহ' এ শিরানামে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: 'আমি একটি গর্ধভীর উপর আরোহণ করা অবস্থায় মিনায় পৌঁছি। তখন আমি বালেগ ছিলাম। নবী করীম (সঃ) সেখানে সামনে দেয়ালবিহীন এক স্থানে লোকদেরকে নিয়ে নামায পড়ছিলেন। আমি একটি কাতারের সামনে দিয়ে অতিক্রম করি, তারপর সওয়ারী থেকে অবতরণ করি এবং গর্ধভীটিকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেই। তারপর জাম'আতে ঐ নামাযে শামিল হই। কেউ আমার প্রতি আপত্তি জানান নি।'
ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে আব্বাসের এ হাদীসের ভিত্তিতে বলেছেন, ইমাম ও মোক্তাদী কারো সামনে ৩ হাতের মধ্য দিয়ে পার হওয়া ঠিক নয়।
সৌদী সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জিবরীন বলেছেন, নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম না করার কারণ উভয়ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। আর তা হল, নামায থেকে মুসল্লীর মন অন্য দিকে সরিয়ে নেয়া। পক্ষান্তরে, ইবনে আব্বাসের হাদীস দ্বারা একথা বুঝা জরুরী নয় যে, তিনি নামাযের কাতারের একেবারে সামনে দিয়ে অতিক্রম করেছেন। হাতে পারে, তিনি তিন হাত দূর দিয়ে অতিক্রম করে বলেছেন, আমি কাতারের সামনে দিয়েই অতিক্রম করেছি।
অনেকে দূর দিয়ে পর্যন্তও নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে ইতস্ততঃ করে আসলে এ ইত্যস্ততার কোন দরকার নেই।
(৩৯) নামাযে নাড়াচাড়া করা: কেউ কেউ নামাযে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে বেশ কিছু কাজ করে। তাতে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাড়াচাড়া হয়। এর উদাহরণ অনেক। যেমন (১) নাক পরিস্কার করা। এটা নামাযের বাইরেই অপসন্দনীয়, নামাযের ভেতর কিভাবে পসন্দনীয় হবে? (২) মাথা নাড়ানো। (৩) পাগড়ী, টুপি ও মাথার রূমাল ঠিক করা। (৪) পকেটের জিনিস খুঁজে দেখা। (৫) দাঁত পরিস্কার করা। (৬) ঘড়ি নাড়ানো কিংবা ঘড়ির দিকে তাকানো। (৭) দাঁড়ি নাড়াচাড়া করা। (৮) দু'আঙ্গুলের মাঝখানে সর্বদা মেসওয়াক রাখা।
এক ব্যক্তি সৌদী আরবের পরলোকগত প্রধান মুফতী শেখ আবদুল আযীয বিন বাজকে প্রশ্ন করেন যে, আমি নামাযে অধিক নাড়াচাড়াকারী ব্যক্তি। শুনেছি, তিনবার নাড়াচাড়া করলে নামায বাতিল হয়ে যায়। এ প্রশ্নের জবাবে শেখ বিন বাজ বলেন: মোমেনের জন্য নিয়ম হল, ফরজ, নফল ও সুন্নত নামাযে শারীরিক মানষিক বিনয় সহকারে নামায আদায় করা। কেননা, আল্লাহ বলেছেন:
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ - الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُوْنَ -
'মোমেনরা অবশ্যই সফল হয়েছে। যারা নামাযে বিনয়ী।' (সূরা মোমেনুন : ১-২)
বিনয় ও প্রশান্তি নামাযের অপরিহার্য রোকন। নবী করীম (সঃ) ভুল নামায আদায়কারীকেও এ কথাই বলেছিলেন। তাই এটা ছাড়া নামায বিশুদ্ধ হবে না।
তবে, তিনটি কাজ করলে নামায বাতিল হবে বলে যে কথা প্রচলিত আছে, তা কিন্তু হাদীসে নেই। বরং সেটা কোন আলেমের কথা যার সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই। তবে, নামাযে অপ্রয়োজনীয় কাজ ও নাড়াচাড়া করা মাকরূহ। যেমন, নাক ঝাড়া, দাঁড়ি নাড়ানো, কাপড়-চোপড় নাড়াচাড়া করা ইত্যাদি। বেশি বেহুদা কাজ দ্বারা নামায বাতিল হবে। তাই বিনয় ও প্রশান্তির লক্ষ্যে অল্প ও বেশি সব ধরনের নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
অল্প কাজ বা নাড়াচাড়া দ্বারা নামায বাতিল হবে না। বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কাজ দ্বারাও নামায নষ্ট হবে না। এর প্রমাণ হল, একদিন নবী করীম (সঃ) নামাযরত অবস্থায় হযরত আয়েশার জন্য দরজা খুলে দেন।
আবু কাতাদার বর্ণিত হাদীসে এসেছে, একদিন নবী করীম (সঃ) লোকদের নামাযের ইমামতি করেন, তাঁর কাঁধে ছিল তাঁর মেয়ে যয়নাবের কন্যা উমামা। তিনি সাজদায় গেলে তাকে নিচে নামিয়ে রাখতেন এবং দাঁড়ালে আবার তাকে তুলে নিতেন।
(৪০) কেরাত উৎকৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও ছোট হওয়ার কারণে তাদেরকে ইমামতি করতে না দেয়া: ইমামতি করার যোগ্য সে, যে অপেক্ষাকৃত বেশি বিশুদ্ধ কোরআন পড়তে জানে। অথচ, অনেকে এর পরিবর্তে বয়স্ক লোককে ইমাম বানায়। এটা বিশুদ্ধ হাদীসের পরিপন্থী। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
إِذَا كَانُوا ثَلَاثَةً فَلْيَؤْمَهُمْ أَحَدُهُمْ وَأَحَقُّهُم بِالْإِمَامَةِ أَقْرَؤُهُمْ
'তিন ব্যক্তি একত্রিত হলে একজনকে ইমাম হতে হবে। ইমামতির জন্য সে অধিকতর উপযুক্ত যে অপেক্ষাকৃত ভাল কোরআন তেলাওয়াতকরী।' (আহমদ, মুসলিম, নাসাঈ)
আবু মাসউদ আকাবা বিন আমের থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'আল্লাহর কিতাবের উত্তম তেলাওয়াতকারীই হবে কোন সম্প্রদায়ের ইমাম। সবাই কেরাতে সমান পারদর্শী হলে হাদীস সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানী ব্যক্তিই হবে ইমাম। হাদীস জানার ক্ষেত্রে সমান পারদর্শী হলে যিনি আগে হিজরতকারী, তিনিই ইমামতির জন্য অধিকতর যোগ্য।' (আহমদ, মুসলিম)
অন্য এক হাদীসে এসেছে, 'হিজরতের বেলায় সমান হলে বয়স্ক ব্যক্তিকে ইমাম বানাতে হবে।'
বয়স্ক লোকের মর্যাদা হল ৪র্থ পর্যায়ে। এর আগে প্রথমে ভাল কেরাত, দ্বিতীয়ত হাদীস সম্পর্কে জ্ঞান এবং তৃতীয়ত হিজরতের পর্যায় রয়েছে।
জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন বালক যদি বিশুদ্ধ কোরআন পাঠ করতে পারে এবং সেখানে যদি বয়স্ক কেউ ভাল কোরআন তেলাওয়াত করতে না পারে, তাহলে সে বালকের ইমামতির অগ্রাধিকার রয়েছে। এ মর্মে'আমর বিন সালামাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: 'মক্কা বিজয়ের সময় সকল সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করল, আমাদের গোত্র থেকে আমার পিতাও ইসলাম গ্রহণ করে নিজ গোত্রের কাছে ফিরে যান। তিনি বলেন: আমি সত্য নবীর কাছ থেকে এসেছি। তিনি অমুক অমুক সময়ে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন নামাযের সময় উপস্থিত হবে, তখন তোমাদের একজন আজান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে বিশুদ্ধতম কোরআন তেলাওয়াতকারী ইমামতি করবে।
তারা সবাই বিশুদ্ধতম কোরআন তেলাওয়াতকারী খুঁজে আমাকে ছাড়া আর কাউকে পায়নি। ফলে আমাকে ইমামতির জন্য পেশ করল। আমি পথিক কাফেলা থেকে কোরআন শিক্ষা করতাম। তখন আমার বয়স ছিল ৬ কি ৭ বছর....। (বোখারী)
আবু দাউদের এক বর্ণনায় এসেছে 'আমার বয়স তখন ৮ বছর'।
(৪১) নামাযে ভাল পোশাক না পরা: নামাযে ভাল ও সুন্দর পোশাক পরা দরকার। অনেকেই এ বিষয়ে যথেষ্ট গাফলতি করে। তারা নামাযের সময় যেন-তেন একটা কাপড় পরেই নামায শেষ করে। কেউ একটা গেঞ্জি পরে, কেউ চাদর বা গামছা পরে এবং কেউ পুরাতন বা ছেঁড়া অথবা ময়লা কাপড় পরে। কেউ সম্পূর্ণ খালি গায়েও নামায পড়ে। অথচ এ পোশাক পরে তারা কেউ হাট-বাজার, অফিস-আদালত ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যায় না। আল্লাহর দরবারের হাজিরা সেগুলো অপেক্ষা সর্বোত্তম সৌন্দর্যের দাবীদার। আল্লাহ নিজে সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। তাই নামাযে সুন্দর ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরতে হবে। মসজিদ আল্লাহর ঘর। সে মসজিদে নিজের কাছে মওজুদ সর্বোত্তম পোশাক পরে হাজিরা দিতে হবে। নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ তাই নির্দেশ করেছেন।
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِيْنَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِرٍ .
'হে আদম সন্তান, তোমরা মসজিদে প্রত্যেক নামাযে তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ কর।' (সূরা আরাফ-৩১)
এ আয়াতের মর্মানুযায়ী, নামাযের সময় মেসওয়াক করা, সুন্দর পোশাক পরা এবং খুশবু লাগানো শামিল রয়েছে। জুম'আ ও ঈদের নামাযে এ সুন্নতের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি।
আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমাদের কেউ নামায পড়লে সে যেন তার দু'কাপড়ে নামায পড়ে। সৌন্দর্য প্রকাশের অগ্রাধিকার আল্লাহর জন্যই।' (তাহাওয়ী, বায়হাকী, তাবরানী)
(৪২) একামতের সময় قَدْقَامَتِ الصَّلَاةَ বললে এর উত্তরে أَقَامَهَا اللَّهُ وَأَدَامَهَا বলা : যারা এটা বলেন, তাদের প্রমাণ হল, আবু উমামা কিংবা অন্য একজন সাহাবীর বর্ণিত হাদীস। সে হাদীসে এসেছে, 'বেলাল একামতের সময় যখন قَدْقَامَتِ الصَّلَاةُ বলতেন, নবী করীম (সঃ) বলতেন :
أَقَامَهَا اللَّهُ وَأَدَامَهَا
আল্লাহ নামাযকে কায়েম রাখুন ও স্থায়ী করুন।' (আবু দাউদ)
এ হাদীসটি দুর্বল। তাই এর উপর আমল করা যাবে না। মোনজেরী বলেছেন, হাদীসের, সনদে একজন অজ্ঞাত রাবী রয়েছেন। তাছাড়াও সনদে শাহর বিন হাওশাব নামক বর্ণনাকারীকে একাধিক মোহাদ্দেস দুর্বল বলেছেন।
সনদে মোহাম্মদ বিন সাবেতকে হাফেজ আজ-জাহাবী সত্যবাদী, তবে হাদীসের ব্যাপারে নমনীয় আখ্যায়িত করে তার বর্ণিত হাদীসকে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।
তবে এ ব্যাপারে দ্বিমতও রয়েছে। সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জিবরীন বলেছেন: আবু দাউদ এ হাদীসের সনদের ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করেছেন। তিনি যে হাদীসের সনদের ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করেন তা তাঁর কাছে প্রমাণ হিসেবে পেশ করার যোগ্য। পক্ষান্তরে, শাহর বিন হাওশাবকে ইমাম আহমদ ও ইয়াহ্ইয়া বিন মুঈন নির্ভরযোগ্য বলেছেন। তাছাড়া, এ বাক্যটি একটি দো'আ মাত্র। আর দো'আর ক্ষেত্র সম্প্রসারিত। তাতে স্থান, কাল ও পাত্রের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই এ সময় কেউ ঐ বাক্য পড়ে নামাযের স্থায়ীত্বের জন্য দো'আ করলে কোন ক্ষতি নেই। এমনকি হাদীস দুর্বল হলেও না।
(৮০) قَدْقَامَتِ الصَّلَاةُ বলার আগ পর্যন্ত মোক্তাদীদের না দাঁড়ানোঃ ধারণা করা হয় যে, এটা সুন্নত। আসলে তা সুন্নত নয় এবং এ পর্যন্ত অপেক্ষা করাও ঠিক নয়। একামতের শুরুতেই দাঁড়িয়ে নামাযের প্রস্তুতি নেয়া দরকার।
যারা قَدْقَامَتِ الصَّلَاةُ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তাদের প্রমাণ হল নিম্নোক্ত হাদীস। 'আওয়াম বিন হাওশাব আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন বেলাল (রাঃ) قَدْقَامَتِ الصَّلَاةُ বলতেন, তখন নবী করীম (সঃ) উঠে দাঁড়াতেন ও তাকবীর বলতেন।'
ইমাম আহমদ বলেছেন, হাদীসের সনদের বর্ণনাকারী আওয়াম বিন হাওশাব আবদুল্লাহ বিন আবি আওফার সাক্ষাত লাভ করেন নি। এদিকে ইবনে কাসীর বলেছেন, হাদীসটি মোনকাতে'। আর এ কারণে তা দুর্বল। সম্ভাবনা আছে যে, তা সনদের মাঝখানে কোন দুর্বল বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে ও মতভেদ আছে। কিছু কিছু ইমাম উপরে বর্ণিত হাদীসের উপর আমল করেছেন এবং একনা ও মোকনে কিতাবে (ফেকাহ) এর উল্লেখ করা হয়েছে।
(৪৪) অধিকাংশ সময় ছোট ছোট সূরা বা সংক্ষিপ্ত কেরাত পড়া : নামাযে সূরা-কেরাতের পরিমাণ সম্পর্কে সুন্নত পদ্ধতির অনুসরণ না করে কেবলমাত্র সংক্ষিপ্তাকারে সূরা-কেরাত পড়ে নামায শেষ করা ঠিক নয়। শেখ এমাদ নামক জনৈক বুজুর্গের নামাযে সুন্নত পদ্ধতি অনুসরণে দীর্ঘ কেরাতের পর এক ব্যক্তি আর তাঁর পেছনে নামায না পড়ার অঙ্গীকার করে। শেখ এমাদ তা শুনে বলেন: কোন রাজা-বাদশাহর দরবারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরী হলে কেউ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয় না। বরং বাদশার সাহচর্য দীর্ঘ হওয়ায় খুশীর পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু দোজাহানের রব মহান আল্লাহর দরবারে একটু দেরী হলে এবং কেরাত লম্বা হলে আর সহ্য হয় না। মজলিশে দীর্ঘ আলোচনায় আমরা বিরক্ত হইনা। কিন্তু নামায দীর্ঘ হলে বিরক্ত হই। আল্লাহর কাছে আমাদের পানাহ চাওয়া দরকার।
কেউ কেউ নিম্নোক্ত হাদীসের কারণে নামায সংক্ষিপ্তকরার পক্ষে যুক্তি দেন। আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমাদের কেউ নামাযের ইমামতি করলে সে যেন সংক্ষেপে নামায আদায় করে। কেননা, মুসল্লীদের মধ্যে রয়েছে দুর্বল, রোগী ও বৃদ্ধ লোক।' (বোখারী)
আরেক হাদীসে নবী করীম (সঃ) দীর্ঘ নামাযের জন্য মোআজ বিন জাবালকে ভর্ৎসনা করে ৩ বার বলেন: 'তুমি কি ফেতনা সৃষ্টিকারী? তিনি তাঁকে মাঝারী ধরনের লম্বা সূরা পাঠের নির্দেশ দেন।'
হযরত আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: 'আমি নবী করীম (সঃ)-এর পেছনে ছাড়া সংক্ষিপ্ত অথচ এমন পূর্ণ নামায আর কারো পেছনে পড়িনি। سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলে এ পরিমাণ দাঁড়াতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি হয়তো সাজদায় যাওয়ার কথা ভুলে গেছেন। তারপর তিনি সাজদায় যেতেন এবং দু' সাজদার মাঝে এ পরিমাণ বসতেন, আমরা বলতাম যে, তিনি আরেক সাজদার কথা ভুলে গেছেন।
আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, হযরত আনাসের বর্ণিত হাদীস দ্বারা নবী করীম (সঃ)-এর সংক্ষিপ্ত অথচ পরিপূর্ণ নামাযের অবস্থা আমরা বুঝতে পারি। অর্থাৎ নবী করীম (সঃ) কেয়াম ও কেরাত সংক্ষিপ্ত করতেন কিন্তু রুকু ও সাজদার মাঝে সোজা হওয়ার পূর্ণতা বিধান করতেন। ফলে একদিকে সংক্ষিপ্ত কেয়াম ও কেরাত এবং অন্যদিকে রুকু ও সাজদার মাঝে দীর্ঘ প্রশান্তির মাধ্যমে নামাযের পূর্ণতা সাধন করতেন। এর ফলে আনাসের এ মন্তব্যের সত্যতা প্রতিভাত হয় যে, 'আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায অপেক্ষা এত সংক্ষিপ্ত অথচ এত পূর্ণ নামায আর দেখিনি।'
ইবনুল কাইয়েমের এ বিশ্লেষণ খুবই বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু আজকাল আমরা এর বিপরীত নামাযই দেখতে পাই। আমরা দেখি, লোকেরা কেয়াম ও কেরাত করলেও রুকু ও সাজদায় ঠোঁকর খায়। আবার কেউ কেউ কেয়াম-কেরাত এবং রুকু-সাজদার সব কিছুতেই মোরগের মত ঠোঁকর মারে।
হযরত মোআজকে সংক্ষিপ্তাকারে নামায পড়ার জন্য মহানবীর আদেশ মোরগের ঠোঁকর খাওয়া নামাযীদের সংক্ষিপ্ত নামাযের জন্য দলীল নয়। বরং এর অর্থ হল নামাযের রোকন ও ওয়াজিবগুলো প্রশান্তি সহকারে আদায় করা, তাকে বেশি দীর্ঘায়িত না করা কিংবা ঠোঁকর খাওয়ার মত সংক্ষেপ না করা।
হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী আবদুল ওয়াহেদ মাকদেসী ফরজ নামাযে দাঁড়ালে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে 'আউজুবিল্লাহিমিনাশ শায়তানির রাজীম' পড়ে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতেন, তারপর বড় করে তাকবীর বলতেন এবং সোবহানাল্লাহ পড়তেন। বর্ণনাকারী বলেন, 'তাঁর চেয়ে কাউকে এত উত্তম নামায, এত পরিপূর্ণ বিনয় ও খুশু' এবং সুন্দর কেয়াম, বসা ও রুকু করতে দেখিনি।'
নবী করীম (সঃ) নামাযে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাত্রায় কেরাত পড়েছেন। এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি প্রথম রাকাতে এত লম্বা কেরাত পড়তেন যে, একজন বাকী নামক স্থানে গিয়ে পেশাব-পায়খানা সেরে অযু করে এসে দেখত যে তিনি তখনও রুকুতে যাননি।
(৪৫) পুরুষের আগে মহিলাদের নামায না পড়া: কেউ কেউ মনে করেন, পুরুষদের নামায শেষ হবার আগে নারীরা ঘরে নামায পড়তে পারে না, পড়লে সেটা ভুল হবে। এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। নামাযের সময় হলেই নারীরা নামায পড়তে পারবে। পুরুষের পরে পড়ার কোন নির্দেশ নেই।
(৪৬) নামাযে সালাম ফিরানোর সময় মাথা নাড়ানো: কেউ কেউ সালাম ফিরানোর সময় মাথা নাড়ে, মাথা উঁচু করে, তারপর নিচু করে। এভাবে সালাম শেষ করে। এটা ঠিক নয়। সালাম ফিরানোর সময় মাথা সোজা রাখতে হবে। 'নবী করীম (সঃ) ডানদিকে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ' বলে সালাম ফিরানোর সময় তাঁর ডান গাল মোবারকের শুভ্রতা দেখা যেত। অনুরূপভাবে, বামদিকে সালাম ফিরানোর সময়ও বাম গালের শুভ্রতা পরিলক্ষিত হত।' (আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজী) তিনি মাথা নাড়াতেন বলে কোন বর্ণনায় আসেনি।
(৪৭) নামাযের পর পার্শ্ববর্তী মুসল্লীর সাথে মোসাফাহ করা: ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে নামাযের সালাম ফিরানোর পর মোসাফাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন: এটা সুন্নত নয়, বরং বেদআত। ৩.
ইমাম ইয্য বিন আবদুস সালামকে ফজর ও আসরের নামাযের পর মোসাফাহ করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, সেটা বেদআত। হাঁ, নবাগত ব্যক্তির সাথে মোসাফাহ করা যায়। কেউ বাইরে থেকে আসলে তার সাথে মোসাফাহ করা যায়। পক্ষান্তরে, সালাম ফিরানোর পর মহানবী (সঃ) তিনবার এস্তেগফার সহ বিভিন্ন দোআ ও জিকর-আজকার করতেন, কারো সাথে হাত মিলাতেন না। মহানবীর অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। ৪
ইমাম নওয়ীও এটাকে বেদআত বলেছেন। তাঁর মতে সাক্ষাতের সময় মোসাফাহ করতে হয়। নামাযের পরে নয়। ৫.
(৪৮) তাসবীহর ছড়ার ব্যবহার ও আঙ্গুলে তাসবীহ পাঠ না করা: সৌদী আরবের পরলোকগত মুফতী জেনারেল শেখ আবদুল আযীয বিন বাজকে হাতে তাসবীহ না গুনে তাসবীহর ছড়া ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করায় তিনি জবাব দেন, তাসবীহর ছড়া ব্যবহার না করা উত্তম। কোন কোন আলেম এটাকে মাকরূহ বলেছেন। তিনি মহানবীর অনুসরণে হাতের আঙ্গুল দ্বারা তাসবীহ পড়াকে উত্তম বলেন। বর্ণিত আছে, 'রসূলুল্লাহ (সঃ) তাসবীহ ও তাহলীল হাতের আঙ্গুল দ্বারা করার আদেশ দিয়ে বলেছেন, এগুলো দায়িত্বশীল ভাষা প্রকাশক।' (আবু দাউদ)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ) ডান হাতে তাসবীহ পাঠ করতেন।' (আবু দাউদ)
রসূলুল্লাহ (সঃ) অযু-গোসল, জুতা পরিধান ও জুতা পায়ে দেয়ার সময় সর্বদা ডান দিক হতে আগে শুরু করাকে পসন্দ করতেন। সে ভিত্তিতে ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে তাসবীহ পাঠ করা উত্তম। তবে দু'হাতের আঙ্গুলেও তাসবীহ পাঠ করা যায়। কিছু হাদীসে হাতের আঙ্গুল দ্বারা তাসবীহ পাঠের কথা উল্লেখ আছে। হাত বলতে দু'হাতকে বুঝানো হয়।
তাসবীহর ছড়ার মাধ্যমে তাসবীহ পাঠ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো জাল ও দুর্বল। দাইলামী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে: 'তাসবীহর ছড়া কতইনা উত্তম স্মরণকারী।' মোহাদ্দেসীনে কেরام এটাকে জাল হাদীস বলেছেন।
আরেক হাদীসে এসেছে: 'নবী করীম (সঃ) এক মহিলার কাছে প্রবেশ করে দেখেন, তার সামনে রয়েছে কতগুলো দানা বা কঙ্কর। সেগুলো দিয়ে তিনি তাসবীহ গুণেন। নবী করীম (সঃ) বলেন, আমি কি তোমাকে এর চেয়ে সহজ ও উত্তম জিনিস সম্পর্কে বলবনা? তিনি বলেন: আর সেটা হল:
سُبْحَانَ اللهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاءِ .۱ (আবু দাউদ, তিরমিজী)
হাদীসটির সনদ দুর্বল। বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি রয়েছেন।
'হযরত সফিয়াহ (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সঃ) আমার কাছে প্রবেশ করেন। তখন আমার সামনে ছিল ৪ হাজার দানা...। (তিরমিজী)
হাদীসের সনদ দুর্বল।
সৌদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি তাসবীহর ছড়া ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেছে, নবী করীম (সঃ) হাতে তাসবীহ পাঠ করেছেন বলে প্রমাণিত। তাই নবী করীম (সঃ)-এর অনুসরণের মধ্যে রয়েছে সকল কল্যাণ। বিশেষ করে এবাদতের ক্ষেত্রে তা অধিক প্রযোজ্য। এবাদত স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত, সৃষ্টি কর্তৃক সৃষ্ট নয়। তাই আল্লাহ কিংবা তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে না আসলে কোন জিনিসকে এবাদত হিসেবে নতুন করে চালু করা যাবে না। যেহেতু, তাসবীহর ছড়ার স্বপক্ষে শরীয়তের কোন দলীল-প্রমাণ নেই, তাই তা ব্যবহার করা ঠিক নয়। বরং একজন সাহাবী এর বিরুদ্ধে স্পষ্ট কথা বলেছেন। 'আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এক মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় তাকে তাসবীহর ছড়া দিয়ে তাসবীহ করতে দেখে তা ছিড়ে ফেলে দেন। তারপর তিনি আরেক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে কঙ্কর দিয়ে তাসবীহ পাঠ করতে দেখে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলেন: তোমরা অন্যায়ভাবে বেদআতী কাজ করছ অথবা তোমরা এলেম-জ্ঞানের দিক থেকে রসূলুল্লাহর (সঃ) সাহাবায়ে কেরামের উপর প্রাধান্য লাভ করেছ। ৬
এ দু'টো বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হাতের আঙ্গুলের পরিবর্তে তাসবীহর ছড়া, কঙ্কর ও দানা দিয়ে তাসবীহ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা, তাসবীহ হচ্ছে এবাদত। আর তাসবীহর ছড়ার বিষয়ে মহানবী (সঃ) থেকে কোন বর্ণনা নেই। সেজন্য তা বেদআত।
এদিকে, প্রখ্যাত সাহাবী আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর কাছে একটা সূতো ছিল যাতে দু' হাজার গিরা ছিল। তিনি যতক্ষণ ঐ গিরাগুলো দ্বারা তাসবীহ না পড়তেন, ততক্ষণ শুতে যেতেন না। (মোসনাদে আহমদ)
এ বর্ণনা এবং উপরে বর্ণিত দুর্বল হাদীসগুলোকে সামনে রেখে কোন কোনো আলেম তাসবীহর ছড়ার ব্যবহারকে জায়েয বলেছেন। তবে তারা আঙ্গুলে তাসবীহ গণনাকে উত্তম বলেছেন।
(৪৯) এদিক-সেদিক তাকানো: নামাযে আকাশের দিকে তাকানো নিষেধ। নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'সম্প্রদায়ের লোকেরা নামাযে আকাশের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকবে, নতুবা তাদের চোখ তাদেরকে ফেরত দেয়া হবে না।' - (মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, ইবনু খোযায়মা)
সুন্নত পদ্ধতি হল, মুসল্লী নিজ সাজদার জায়গায় দৃষ্টি রাখবে। এ মর্মে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) কা'বা শরীফে প্রবেশ করে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত সাজদার জায়গা থেকে দৃষ্টি সরাননি। (হাকেম তাঁর মোসতাদরাক গ্রন্থে লিখেছেন, বোখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এটা সহীহ হাদীস। আল্লামা জাহাবী তা সমর্থন করেছেন)
নবী করীম (সঃ) তাশাহহুদের সময় শাহাদত আঙ্গুলীর দিকে তাকিয়েছিলেন। এ মর্মে আহমদ ও ইবনু খোজাইমা ভাল সনদ সহকারে আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন। 'নবী করীম (সঃ) তাশাহ্হুদের সময় বাম উরুর উপর বাম হাত এবং ডান উরুর উপর ডান হাত রেখেছেন। শাহাদত আঙ্গুলী দিয়ে ইশারা করেছেন এবং ইশারার দিকে তাকিয়েছিলেন।' এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তাশাহহুদের সময় শাহাদত আঙ্গুলীর দিকে তাকানো যায়।
(৫০) হাই তুলে মুখ বন্ধ না করা: হাই তুললে মুখ বন্ধ করতে হবে.. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ নামাযে হাই তুললে যথাসাধ্য মুখবন্ধ করার চেষ্টা করবে। কেননা, শয়তান ভেতরে প্রবেশ করে।' (আবু দাউদ)
অন্য রেওয়ায়েতে যথাসাধ্য মুখ বন্ধের চেষ্টার অর্থ হল, হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করা। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমাদের কেউ হাই তুললে সে যেন হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করে।' (মুসলিম)
অলসতার কারণে এবং কোন সময় পেট ভরা থাকলে হাই তোলার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। ইবনুল আজ্জি বলেছেন, সর্বাবস্থায় হাই তোলার সময় মুখ বন্ধ করতে হবে। নামাযকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হল, নামাযই হচ্ছে তা প্রতিরোধের উত্তম স্থান, যাতে করে নামাযের ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়। যদিও সর্বাবস্থায় হাই তুললে হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করতে হয়।
(৫১) আজান হওয়ার পর মসজিদ থেকে বের হওয়া: ইমাম মোনজেরী বলেছেন, ওজর ছাড়া আজান হবার পর মসজিদ থেকে বের হওয়া খুবই খারাপ কাজ। তিনি এ মর্মে উল্লেখ করেছেন: 'আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি আজানের পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেল। তিনি বলেন, এ লোকটি আবুল কাসেম হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর নাফরমানী করল।' (মুসলিম)
ইমাম আহমদ আরো একটু বেশি বর্ণনা করেছেন। 'তোমরা মসজিদে থাকা অবস্থায় আজান হলে নামায পড়া ছাড়া বের হবে না।'
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: কোন ব্যক্তি আমার এ মসজিদে আজান হওয়ার পর কোন প্রয়োজনে বের হয়ে ফেরত না আসলে সে মোনাফেক ছাড়া আর কিছু নয়।' (তাবরানী)
ইমাম তিরমিজী (রঃ) বলেছেন, নবী করীম (সঃ)-এর সাহাবায়ে কেরام-এর উপরই আমল করেছেন। আজানের পর কেউ অযু কিংবা অন্য কোন জরুরী কাজ ছাড়া বের হতেন না।
(৫২) সূরা ফাতেহা পড়ার পর ইমামের দীর্ঘ মৌনতা: কিছু সংখ্যক মোহাক্কেক আলেম বলেছেন, মোক্তাদীর জন্য ইমামের সূরা ফাতেহা পড়ার লক্ষ্যে দীর্ঘ মৌনতা বেদআত। ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর মাজমু'উল ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন: ইমাম আহমদ (রঃ) মোক্তাদীর সূরা ফাতেহা পড়ার সময় পরিমাণ মৌনতাকে পসন্দ করতেন না কিন্তু তাঁর কিছু সাথী তা পসন্দ করতেন। নবী করীম (সঃ) যদি একই উদ্দেশ্যে দীর্ঘ মৌনতা অবলম্বন করতেন তাহলে, সাহাবায়ে কেরাম তা অবশ্যই বর্ণনা করতেন এবং ঐ সময়ে তাদের নিজেদের সূরা ফাতেহা পড়ার কথা উল্লেখ করতেন। নবী করীম (সঃ) যে, সূরা ফাতেহার পরে মৌনতা অবলম্বন করেননি তা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সঃ) নামাযের তাকবীরে তাহরীমার পর একটুখানি চুপ থাকতেন। আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি তাকবীর ও সূরা ফাতেহার মাঝে চুপ থেকে কি পড়েন? তিনি উত্তরে বলেন: আমি নিম্নোক্ত দো'আটি পড়ি:
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ
রসূলুল্লাহ (সঃ) যদি সূরা ফাতেহার পর মোক্তাদীদের তা পড়ার জন্য ঐ পরিমাণ সময় চুপ থাকতেন তাহলে তারা প্রথম মৌনতার মতো ২য় মৌনতার বিষয়েও অনুরূপ প্রশ্ন করতেন। ৭.
সৌদী আরবের পরলোকগত জেনালে মুফতী শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন: প্রকাশ্য কেরাতবিশিষ্ট নামাযে মোক্তাদীর সূরা ফাতেহা পড়ার জন্য ইমামের চুপ থাকার বৈধতার ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন প্রমাণ নেই। তবে ইমাম চুপ থাকলে মোক্তাদীর জন্য সূরা ফাতেহা পড়া বৈধ। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে মোক্তাদী ইমামের কেরাত পড়া অবস্থায় মনে মনে সূরা ফাতেহা পড়তে পারবে এবং এরপর চুপ থেকে ইমামের কেরাত শুনবে। কেননা, নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'যে সূরা ফাতেহা পড়ে না, তার নামায হয় না।' (বোখারী, মুসলিম)
আরেক হাদীসে নবী করীম (সঃ) জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা সম্ভবত ইমামের পেছনে কেরাত পড়ে থাক? তাঁরা জবাবে বলেন, 'হাঁ'। তিনি বলেন, সূরা ফাতেহা ব্যতীত এরূপ করবে না। কেননা, যে সূরা ফাতেহা পড়েনা, তার নামায হয়না।' (আবু দাউদ ও ইবনে হিব্বান-হাদীসের সনদ ভাল)
উপরোক্ত হাদীসন্বয় কোরআনের আসন্নোক্ত আয়াত এবং হাদীসের হুকুমকে বিশেষভাবে গ্রহণ করেছে। আয়াতটি ২১২,
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَانْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ
'যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তা ভাল করে মনোযোগ দিয়ে শুন; তাহলে আশা করা যায় তোমাদের উপর রহম করা হবে।' অর্থাৎ কোরআন তেলাওয়াতের সময় চুপ থাকতে হবে।
হাদীসটি হল:
إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ فَلَا تَخْتَلِفُوا عَلَيْهِ - فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا وَإِذَا قَرَأَ فَانْصِتُوا
'অনুসরণের জন্যই ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তোমরা ইমামের বিরোধীতা করনা। ইমাম যখন তাকবীর বলে, তোমরাও তাকবীর বল এবং তিনি যখন কেরাত পড়েন তখন তোমরা চুপ করে তা শুন।' (মুসলিম)
শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন: মোক্তাদীর সূরা ফাতেহা পড়া ওয়াজিব কিনা এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মতভেদ আছে। যারা ওয়াজিব বলেছেন, তারা উপরোল্লিখিত প্রমাণাদির ভিত্তিতে এবং উল্লেখিত পদ্ধতিতে তা পড়ার কথা বলেছেন। অপরদিকে যারা বলেছেন, মোক্তাদীর জন্য এটা ওয়াজিব নয় তাদের প্রমাণ হল, আবু বাকরাহ সাকাফীর হাদীস। এ হাদীস অনুযায়ী বুঝা যায়, মোক্তাদী সূরা ফাতেহা পড়তে ভুলে গেলে কিংবা তা পড়ার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে অজ্ঞ হলে, তা তার জিম্মা থেকে কেটে যাবে। যেমন কোন ব্যক্তি ইমামকে রুকুতে পেলে সে ইমামের সাথে রুকুতে যাবে এবং ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তার নামায সহীহ হবে। 'আবু বাকরাহ সাকাফী মসজিদে নববীতে এসে নবী করীম (সঃ)-কে রুকুতে পেয়ে কাতারে শামিল না হয়ে পেছনে রুকুতে যান এবং পরে কাতারে শামিল হন। নবী করীম (সঃ) সালাম ফিরিয়ে বলেন, আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিন। তবে আর কখনও এরূপ করবে না।' অর্থাৎ কাতারে শামিল হওয়া ছাড়া নামাযে প্রবেশ করবে না। তিনি তাকে সূরা ফাতেহা না পড়ার কারণে সে রাকাতটি পরে আদায় করার নির্দেশ দেননি।
(৫৩) পিলারের সারিতে কাতার বাঁধা: মসজিদের যে সারিতে খুঁটি বা পিলার আছে সে সারিতে কাতার দাঁড়ানো ঠিক নয়। বরং আগে-পরে কাতার দাঁড় করানো উচিত। এ মর্মে কাররাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় খুঁটিসমূহের মাঝে আমাদেরকে কাতার বাঁধতে নিষেধ করা হত এবং আমাদেরকে খুঁটি থেকে হটিয়ে দেয়া হত। (ইবনু মাজাহ, ইবনু খোজাইমাহ, ইবনু হিববান, হাকেম, বায়হাকী, তায়ালেসী। হাকেমের মতে হাদীসের সনদ সহীহ এবং আল্লামা জাহাবী তা সমর্থন করেছেন)
আবদুল হামিদ বিন মাহমুদ থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, আমি জুম'আর দিন হযরত আনাস বিন মালেকের সাথে নামায পড়েছি। তখন আমাদেরকে খুঁটির দিকে ঠেলে দেয়া হলে আমরা আগে-পিছে হলাম। তখন হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমরা নবী করীম (সঃ)-এর আমলে খুঁটি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতাম।' (আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজী, ইবনু হিব্বان, হাকেম)
ইমাম বায়হাকী বলেছেন, কাতারের মাঝে খুঁটি থাকলে তা কাতারের পরিপূর্ণতা সাধনে বাধার সৃষ্টি করে। তবে একাকী নামায আদায়কারী খুঁটির পাশে দাঁড়ালে কোন অসুবিধে নেই। কেননা, বোখারী শরীফে বর্ণিত আছে, 'নবী করীম (সঃ) কা'বা শরীফে প্রবেশ করে সামনের দুই খুঁটির মাঝে নামায পড়েছেন।'
ইমাম শাওকানী বলেছেন, জাম'আতের কাতার পিলারের সারিতে মাকরূহ, একাকী নামায আদায়কারীর জন্য মাকরূহ নয়। কেননা, জাম'আতে খুঁটির কারণে কাতারে অপূর্ণতা থাকে।
ইমাম মালেকের মতে, ভীড়ের সময় মুসল্লীর সংকুলান না হলে পিলার বিশিষ্ট সারিতে জাম'আতে নামায আদায় করতে অসুবিধে নেই।
(৫৪) নামাযে একবার আগে, একবার পিছে যাওয়া: বিনা প্রয়োজনে শারীরিক চালচলন নামাযের বিনয় ও খুশুর পরিপন্থী। তাই তা করা ঠিক নয়।
(৫৫) কেউ একাকী নামায পড়তে থাকলে তার সাথে এসে কেউ জাম'আতে শরীক হতে চাইলে নিষেধ করা: সৌদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি বলেছে, কেউ একাকী নামায আদায়কারীর সাথে এসে যোগ দিয়ে জাম'আত করতে চাইলে সেটা জায়েয। তাই তাকে একা নামায আদায়কারীর নিষেধ করা উচিত নয়, এমনকি একা নামায আদায়কারী ফরজ না পড়ে নফল বা সুন্নত আদায় করলেও তার সাথে অন্য ব্যক্তি এসে ফরজ আদায় করতে পারবে। নফল ও সুন্নত আদায়কারীর পেছনে ফরজ নামায আদায় করা যায়।
এর প্রমাণ হল, 'হযরত মোআজ (রাঃ) নবী করীম (সঃ)-এর সাথে জাম'আতে ফরজ নামায আদায়ের পর নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের ফরজ নামাযের ইমামতি করেছেন। তাঁর নামায ছিল নফল আর অন্যদের নামায ছিল ফরজ।' - (বোখারী, মুসলিম)
'নবী করীম (সঃ) যুদ্ধের ময়দানে ভয়কালীন নামাযে একদলকে নিয়ে দু'রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়েছেন এবং পরে অন্য দলকে নিয়ে আরো দু'রাকাত নামায পড়েছেন।' (আবু দাউদ) তাঁর ২য় নামাযটি ছিল নফল।
(৫৬) নামাযে সূরার ক্রমধারা অব্যহত রাখার উপর জোর দেয়া: কোরআন শরীফের সূরাগুলোর ক্রমধারা কি আল্লাহ প্রদত্ত, না সাহাবায়ে কেরামের এজতেহাদ প্রসূত সে বিষয়ে মতভেদ আছে। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে কাসীরের মতে, তা এজতেহাদ প্রসূত। তাই সূরা আগে-পরে পড়লে কোন অসুবিধে নেই। এর প্রমাণ হল, 'হযরত হোজাইফা (রাঃ) বলেন: আমি এক রাত নবী করীম (সঃ)-এর সাথে (তাহাজ্জুদ) নামায পড়ি। তিনি সূরা বাকারা দিয়ে নামায শুরু করেন। আমি ভাবলাম, ১শ' আয়াত শেষে তিনি রুকুতে যাবেন কিন্তু তিনি কেরাত পড়া অব্যহত রাখেন। আমি ভাবলাম, তিনি ১ম রাকাতে সূরা বাকারা শেষ করে রুকুতে যাবেন। কিন্তু তিনি পরে সূরা নেসা পড়লেন। তারপর সূরা আল-এমরান পড়া শুরু করেন এবং তা শেষ করেন.....।' (মুসলিম)
ইমাম নওয়ী কাযী আয়াযের বরাত দিয়ে বলেছেন, এটা প্রমাণ করে যে, কোরআনের বর্তমান সূরাসমূহের ক্রমধারা সাহাবায়ে কেরামের এজতেহাদ প্রসূত। কেননা, তাঁরা পরবর্তীতে এ কোরআন সংকলন করেছেন এবং এটা নবী করীম (সঃ)-এর প্রবর্তিত ক্রমধারা ছিল না। তিনি বিষয়টি উম্মতের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ইমাম মালেকসহ অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মত এটাই। কাযী আবু বকর বাকেলানীর মতে, কোরআনের সূরাসমূহের ক্রমধারা হয় রসূল নির্ধারিত কিংবা এজতেহাদ প্রসূত। তা সত্ত্বেও পরবর্তীটাই বেশি শুদ্ধ।
মোটকথা, নামাযে সূরাসমূহের ক্রমধারা রক্ষা করার ব্যাপারে নবী করীম (সঃ) থেকে সুনির্দিষ্ট কোন আদেশ বা প্রমাণ নেই। তাই তা ওয়াজিব নয়। তবে ক্রমধারা রক্ষা করা উত্তম বলে সৌদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি মত প্রকাশ করেছে। ৮
(৫৭) ইমামের সাথে একজন মোক্তাদী নামাযে দাঁড়ালে ইমামের একটু সামনে এগিয়ে দাঁড়ানো: নিয়ম হল, ইমাম ও মোক্তাদী সম্পূর্ণ বরাবর অর্থাৎ একই সমান রেখায় দাঁড়াবে। কেউ আগে-পিছে দাঁড়াবেনা। ইমাম বোখারী (রঃ) বোখারী শরীফে 'দু'জন হলে মোক্তাদী ইমামের ডানে বরাবর দাঁড়াবে' এ শিরোনামে এক অধ্যায়ে ইবনে আব্বাসের একটি হাদীস উল্লেখ করে বলেন, তিনি তাঁর খালা মায়মুনার কাছে রাত্রি যাপন করেন। তিনি বলেন, নবী করীম (সঃ) ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর তিনি উঠে (তাহাজ্জুদের) নামায পড়েন। ইবনে আব্বাসও তাঁর সাথে নামাযের উদ্দেশ্যে বামে দাঁড়ান। নবী করীম (সঃ) তাঁকে নিজের ডানে দাঁড় করান।' ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, এখানে ইমাম ও মোক্তাদী আগে-পিছে দাঁড়াননি। আতা বিন আবি রেবাহও মোক্তাদীকে ইমামের বরাবর দাঁড়ানোর পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আতাবাহ বিন মাসউদ বলেন: আমি 'হাজেরাহ' নামক জায়গায় হযরত ওমরের কাছে গেলাম। তখন তিনি নফল নামায পড়ছিলেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়াই। তিনি আমাকে তাঁর ডানে দাঁড় করান।' -(মোআত্তা মালেক)
আল্লামা নাসেরুদ্দীন আলবানী (রঃ) বলেছেন, এক ব্যক্ত ইমামের সাথে নামায পড়লে তাকে ইমামের ডানে বরাবর দাঁড়াতে হবে, ইমাম থেকে আগে ও পিছে দাঁড়াবে না। (সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সহীহাহ নং ৬০৬)
সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জিবরীন বলেন, ইমামের সাথে মোক্তাদী একজন হলে ইমাম মোক্তাদী থেকে প্রায় এক বিঘত এগিয়ে দাঁড়াবে মর্মে হানাফী মাজহাবের এ মতটি অগ্রাধিকারযোগ্য নয়। হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীস মোতাবেক মোক্তাদীকে ইমামের বরাবর দাঁড়াতে হবে।
(৫৮) ইমামের সালাম ফিরানোর পর অবশিষ্ট নামায পূর্ণ করার জন্য আংশিক নামায আদায়কারী তথা মাসবুকের তার সাথে কোন ব্যক্তি নতুনভাবে জামা'আতে শরীক হতে চাইলে বাধা দেয়া: জাম'আতে নামায পড়া জরুরী বিধায় যে কোন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মাসবুকের সাথে দাঁড়িয়ে একসাথে নামায আদায় করতে পারে। মাসবুকের একথা মনে করা উচিত নয় যে, সে অন্য এক ইমামের পেছনে আংশিক নামায আদায় করে এখন নিজে কি করে আরেকজনের ইমাম হতে পারে। শরীয়তে তাতে কোন বাধা নেই। সৌদী আরবের ওলামায়ে কেরামের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি এর স্বপক্ষে ফতোয়া দিয়েছে, এ মাসয়ালার সমর্থনে নিম্নোক্ত হাদীস উল্লেখযোগ্য। 'নবী করীম (সঃ) এক ব্যক্তিকে একা নামায পড়তে দেখে বলেন : 'এমন কেউ আছে যে, এ ব্যক্তিকে দান করবে অর্থাৎ তার সাথে নামায পড়বে ?' (যেন তার নামায জাম'আতে হয়) - আবু দাউদ, তিরমিজী, ইবনু খোজায়মা, ইবনু হিব্বান, হাকেম)
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) রমজানে নামায পড়ছিলেন। আমি এসে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম। এরপর আরেক ব্যক্তি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর আরেক ব্যক্তি আসায় আমরা এখন একটি দলে পরিণত হলাম। রসূলুল্লাহ (সঃ) যখন বুঝলেন যে, আমরা একদল লোক তাঁর পেছনে নামায পড়ছি এবং তাঁকে ছাড়াই আমাদের জাম'আত বৈধ হবে, তখন তিনি নিজ ঘরে চলে গেলেন এবং নামায পড়লেন। কিন্তু আমাদের সাথে পড়লেন না। সকালে আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি রাত্রে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন? তিনি বলেন, হাঁ, সেজন্যেই আমি ঐরূপ করেছি। (মুসলিম)
অর্থাৎ তাদের একজন তখন ইমামতি করেন।
'হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) নিজ হুজরায় নামায পড়ছিলেন। হুজরার দেয়াল ছিল খাট। লোকেরা রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নামায পড়তে দেখে তাঁর সাথে জামাতে শরীক হয়ে যান, সকালে সবাই এ নামায সম্পর্কে আলোচনা করল। তিনি ২য় রাতও নামায পড়েন এবং লোকেরা তাঁর পেছনে নামায শুরু করেন। - (বোখারী)
উপরোক্ত হাদীসগুলো একাকী নামায আদায়কারী ব্যক্তির ইমাম হওয়ার বৈধতা প্রমাণ করে। এক্ষেত্রে ফরজ ও নফল-সুন্নতের মধ্যে পার্থক্য না করাই মূলনীতি। কেননা, পার্থক্য সৃষ্টির পক্ষে কোন প্রমাণ নেই। -
(৫৯) মসজিদ থাকা সত্ত্বেও ঘর বা আঙ্গিনা কিংবা পার্কে নামায পড়া : সৌদী আরবের পরলোকগত জেনারেল মুফতী শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ বলেছেন, পার্ক ও অন্যত্র নামায পড়া ঠিক নয় বরং মসজিদে গিয়ে নামায পড়া জরুরী। আল্লাহ বলেছেন : "আল্লাহ যে সকল ঘরকে সম্মান দান এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণের আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যে দিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। (তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে) যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে বিনা হিসেবে রিজিক দান করেন।" - (সূরা নূর-৩৮)
এ আয়াত মসজিদে নামায পড়ার তাকিদ দিয়েছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি আজান শুনল কিন্তু সাড়া দিল না তার নামায হবে না, তবে ওজর থাকলে ভিন্ন কথা।' - (ইবনু মাজাহ, দারুকুতনী, ইবনু হিব্বান, হাকেম)
এক অন্ধ সাহাবী (আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে মসজিদে নেয়ার মত কোন লোক নেই। আমাকে ঘরে নামায পড়ার অনুমতি দিন। নবী করীম (সঃ) বলেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও? তিনি বলেন, হাঁ, নবী করীম (সঃ) বলেন, তাহলে, মসজিদে হাজির হও।' - (মুসলিম)
যেখানে অন্ধ ব্যক্তিকেও মসজিদে হাজির হতে বলা হয়েছে, সেখানে অন্যদের মসজিদে না গিয়ে কি কোন উপায় আছে?
(৬০) নামায শেষে সালাম ফিরানোর পর সবাইকে নিয়ে একসাথে হাত তুলে ইমামের দো'আ করা: সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ মোহাম্মদ বিন ওসাইমিন বলেছেন, এটা হচ্ছে বেদআত, যা নবী করীম (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরام থেকে বর্ণিত নেই। মুসল্লীদের জন্য যে জিনিস সুন্নত সেটা হল, রসূলুল্লাহ (সঃ) ফরজ নামায শেষে যে সকল দো'আ পাঠ করেছেন সেগুলো নিজে একা একা পাঠ করা এবং শব্দ করে উচ্চারণ করা। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে ফরজ নামায শেষে লোকেরা শব্দ করে দোআগুলো পাঠ করত।' (বোখারী)
(৬১) ফরজ নামাযের সালাম ফিরানোর পর কপালে হাত রেখে মনগড়া দো'আ পড়া: কপালে হাত রেখে দো'আ পড়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসের সনদ দুর্বল বলে কেউ কেউ এরূপ দো'আ পড়াকে বেদআত বলেছেন। হাদীসগুলো হল:
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সঃ) সালাম ফিরানোর পর ডান হাত মাথায় রেখে এ দোআটি পড়তেন:
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ الأَهُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ - اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنِّي الْهَمَّ وَالْحُزْنَ
- (তাবরানী, নাইলুল আওতার, মুসনাদে বাজ্জার, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)
নাসেরুদ্দীন আলবানী তাবরানীর আওসাতে বর্ণিত সনদ এবং খতীবের সনদকে দুর্বল বলেছেন এবং ইবনে সুন্নী ও নোআইমের বর্ণনাকে, জাল বলেছেন।
ইবনু সুন্নীর 'আ'মালুল ইয়াওম ওয়াল লাইল' গ্রন্থে বর্ণিত দো'আটি হচ্ছেঃ
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ - الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي اذْهِبْ عَنِّي الْهَمَّ وَالْحُزْنَ
কিন্তু এও বলেছেন, আল্লামা সুয়ূতী হাদীসটি খতীব থেকে 'আল জামে'তে বর্ণনা করেছেন। হাদীসের একটি সনদও আপত্তিকর নয়। তাই মনগড়া কোন দোআ পড়ার চাইতে এ দোআটি পড়া যেতে পারে।
(৬২) আজান ও একামাতে মোহাম্মদ (সঃ)-এর নাম শুনে নখে ও মুখে চুমা খাওয়া : আজান ও একামতে 'মোহাম্মদার রসূলুল্লাহ শব্দটি শুনে নখে ও আঙ্গুলে চুমু খাওয়া সংক্রান্ত যে দু'টো হাদীস পাওয়া যায় সে দু'টো হাদীস সহীহ নয়। আল্লামা সাখাওয়ী বলেছেন, হাদীস দু'টোর সনদ মহানবী (সঃ) পর্যন্ত পৌঁছায় না। (রদ্দে মোহতার, ১ম খণ্ড, ৩৭০)
আল্লামা আবদুল হাই লখনবীও তাই বলেছেন। তাঁর মতে, যারা বলে এ মর্মে হাদীস কিংবা সাহাবীদের আছার আছে সে মিথ্যুক এবং একাজটি জঘন্য বেদআত। (সেআরাহ ২য় খণ্ড; যাহরাহতু রিয়াদিল আবরার- ৭৬ পৃঃ)
অশুদ্ধ হাদীস দু'টো হল (১) নবী (সঃ) বলেন: যে ব্যক্তি মোআজ্জিনের اَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدَّ رَّسُوْلُ اللَّهِ বাক্যটি শুনে তা বলে এবং দু' হাতের তর্জনী আঙ্গুলদ্বয়ের ভেতরের অংশে চুমু খেয়ে তা চোখে লাগায় তার জন্য আমার সুপারিশ হালাল হয়ে যায়।' (মোসনাদে ফেরদাউস- দাইলামী)
২য় হাদীসটি হল, খিজির (আঃ) থেকে বর্ণিতঃ যে ব্যক্তি মোআজ্জিনের মুখে উপরোক্ত বাক্যটি শুনে বলে:
مَرْحَبًا بِحَبِيبِي وَقُرَّةٍ عَيْنِي - مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ -
এবং তার বৃদ্ধাঙ্গুল দু'টোতে চুমু খেয়ে তা চোখে ঠেকায় সে অন্ধ হবে না এবং তার চোখও উঠবেনা। (মোজেবাতুর রহমান ওয়া আযায়েমুল মাগফেরাহ- আবুল আব্বাস মাদানী সুফী)
(৬৩) ফরয নামাযের সালাম ফিরানোর পর রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বর্ণিত দোআ-জিকর না পড়া :
১. তিন বার এস্তেগফার (গুণাহ মাফ চাওয়া) বা আস্তাগফেরুল্লাহ বলা।
২. একবার নিম্নের দোআ বলা:
اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ (মুসলিম)
৩. لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ - لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْ قَدِيرٌ - اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ - لَا حَولَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ - وَلَا نَعْبُدُ إِلَّا إِيَّاهُ - لَهُ النِّعْمَةُ وَلَهُ الْفَضْلُ وَلَهُ الثَّنَاءُ الْحَسَنُ - لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ -
৪. সোবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার এবং আল্লাহু আকবার ৩৪ বার। মোট হল ৯৯ বার। একশ' পুরণের জন্য নিম্নে দোয়াটি পড়তে হবে:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ - لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
ইচ্ছা করলে আল্লাহু আকবার ৩৪ বার পড়ে ১শ পূরণ করা যায়। আর কেউ ইচ্ছা করলে সোবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার ১০ বার করেও পড়তে পারে। আবার ইচ্ছা করলে নিম্নোক্ত দোআটি ২৫ বার পড়া যায়:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
ফলে, এর মধ্যে মওজুদ তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল ও তাকবীর এ চারটি জিনিস ১শতবার আদায় হয়ে যায়।
৫. রসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর এক সাহাবী-তামীমীকে বলেন: তুমি যখন মাগরেব ও ফজরের নামাযে সালাম ফিরাবে তখন কারো সাথে কথা বলার আগে
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِ
৭ বার বলবে। ঐ দিন বা রাতে মারা গেলে তোমার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তি সনদ লিখে দেয়া হবে। (আবু দাউদ, মেশকাত)
৬. আয়াতুল কুরসী
৭. সূরা এখলাস
৮. সূরা ফালাক
৯. সূরা নাস।
নবী করিম (সঃ) ফজর ও মাগরেবের নামাযের ফরজের পর সূরা তিনটি ৩ বার করে পাঠ করতেন। (আহমদ)
এসকল দোআ-জিকর এবং অজীফা হাদীসে বর্ণিত আছে। আমাদের উচিত, এগুলো আমল করা।
(৬৪) সূরা-কেরাত ও দোআ-দরুদ পড়ার সময় জিহ্বা না নাড়ানোঃ অধিকাংশ লোক দু'ঠোঁট বন্ধ রেখে এবং মুখ বা ঠোঁট না নেড়ে নামায শেষ করে। এটা ভুল। বরং সকল কিছু পড়ার সময় ঠোঁট নাড়ানো প্রয়োজন এবং তা সুন্নত। আবু মোআম্মার থেকে বর্ণিত। 'আমরা হযরত খাব্বাব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নবী করীম (সঃ) কি জোহর ও আসরের নামাযে কেরাত পড়তেন? তিনি জবাবে বলেন: 'হাঁ।' আমরা জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কিভাবে তা বুঝতেন? তিনি বলেন, তাঁর দাঁড়ি মোবারকের নড়া-চড়া দ্বারা আমরা তা বুঝতাম।' (বোখারী)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, নামাযের কেরাত ও অন্যান্য ওয়াজিব জিকরগুলোতে জিহ্বা নাড়ানো ওয়াজিব যদি জিহ্বা নাড়ানোর শক্তি থাকে। মোস্তাহাব ও সুন্নত দোআ-জিকরগুলো পড়ার সময় ঠোঁট নাড়ানো মোস্তাহাব।
হানাফী মাজহাব এবং শাফেঈ ও হাম্বলী মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত হল ঠোঁট . নেড়ে মনে মনে ততটুকু শব্দ করে পড়া যেন নিজের পড়া নিজে শুনতে পায়।
(৬৫) রমজান মাসে তারাবীহর জামা'আত শুরু হলে এশার নামায আদায় করেনি এমন ব্যক্তিদের মসজিদের এক পার্শ্বে আলাদা এশার জামাত করাঃ এটা ভুল। তাদের ধারণা যে, তারাবীহর সুন্নত নামাযের জামা'আতে শরীক হলে এশার ফরজ আদায় হবে না। এ মর্মে সৌদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটিকে প্রশ্ন করা হলে কমিটি বলে: এশার ফরজ আদায়কারী ব্যক্তি তারাবীহর নামাযের জামা'আতে এশার নিয়তে শামিল হতে পারবে। অর্থাৎ সুন্নত কিংবা নফল নামায আদায়কারী ইমামের পেছনে ফরজ আদায়কারী ব্যক্তি নামায পড়তে পারে। 'এ মর্মে হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। হযরত মোআজ (রাঃ) নবী করীম (সঃ)-এর সাথে এশার নামায জামাতে পড়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের এশার নামাযের ইমামতি করেছেন।' (বোখারী ও মুসলিম)
তিনি নফল পড়েছেন আর অন্যরা ফরজ পড়েছে।
(৬৬) 'প্রকাশ্য কেরাতবিশিষ্ট নামাযে মহিলাদের গোপনে কেরাত পাঠ করা: এর ফলে মহিলারা নিজেদের কেরাত শোনা থেকে বঞ্চিত থাকে। অথচ, তারাও পুরুষদের মত নিজ নিজ কেরাত শুনে নামাযে মন বসাতে এবং কেরাতের অর্থের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। তারা সেটা না করে সুন্নতের খেলাপ করে। সুন্নত হল, প্রকাশ্য কেরাতবিশিষ্ট নামাযে কেরাত প্রকাশ্যে পড়া।
সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ সালেহ আল-ফাওজান বলেছেন: পুরুষ ও নারীর মধ্যে প্রকাশ্য ও গোপন কেরাতবিশিষ্ট নামাযে হুকুমের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ রাতের নামাযগুলোতে কেরাত প্রকাশ্যে এবং দিনের নামাযগুলোতে কেরাত গোপনে পড়ার যে বিধান তা নারী-পুরুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। মহিলারা ঘরে নামায পড়লে পুরুষদের মত কেরাত জোরে পড়বে। তবে যদি কোন অমহরম পুরুষের মহিলা কণ্ঠ শুনার আশঙ্কা থাকে, তখন তারা গোপনে কেরাত পড়বে। রাত্রে মহরম পুরুষের উপস্থিতিতে কেরাত প্রকাশ্যে পড়তে পারে এবং তাতে সুন্নতের সওয়াব লাভ করবে। ১০
(৬৭) একামত হয়ে যাওয়ার পর কোন কারণে ইমামের নামায শুরু করতে দেরী হলে ২য় বার একামত দেয়া: এটা ভুল। বরং একবার একামতই যথেষ্ট। ২য় বার একামত দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। ইমাম বোখারী (রঃ) বোখারী শরীফে "একামতের পর ইমামের কোন প্রয়োজন দেখা দিলে", এ শিরোনামে হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, নামাযের একামত হয়ে গেছে, কিন্তু নবী করীম (সঃ) মসজিদের এক পার্শ্বে এক ব্যক্তির সাথে গোপন কথাবার্তা বলছিলেন। সকল লোক দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত তিনি নামায শুরু করেননি। '১১
অর্থাৎ তিনি দেরীতে নামায শুরু করেছেন।
(৬৮) পায়ের আঙ্গুলের মাথা দিয়ে কাতার সোজা করা: হাদীস শরীফে পায়ের গোড়ালী এবং কাঁধ এক সমান রেখে কাতার সোজা করার নির্দেশ রয়েছে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন: আমরা আমাদের নামায়ের সাথীর সাথে কাঁধের সাথে কাঁধ এবং পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাঁড়াতাম। হযরত নোমান বিন বশীর (রাঃ) বলেন: আমি লোকদেরকে তার সাথীর কাঁধের সাথে কাঁধ এবং পায়ের গোড়ালীর সাথে গোড়ালী মিলিয়ে কাতার সোজা করার ব্যাপারে মহানবী (সঃ)-এর আদেশ পালন করতে দেখেছি।
সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ সালেহ ও সাইমীন বলেছেন, কাতার সোজা করার ব্যাপারে পায়ের গোড়ালীই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। গোটা শরীর গোড়ালীর উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন জনের আঙ্গুল বড় ছোট আছে। তাই আঙ্গুল কাতার সোজা করার ভিত্তি হতে পারে না।
সাহাবায়ে কেরাম একজন আরেকজনের সাথে গোড়ালী মিলিয়ে কাতার সোজা করতেন। ১২
(৬৯) মুসাফিরের জন্য নামাযের জামাত জরুরী নয় মনে করা : জামাতে নামায পড়া সর্বাবস্থায় ওয়াজিব। চাই কেউ মুসাফির হোক বা না হোক। মুসাফিরের জন্য ৪ রাকাতের মধ্যে দু'রাকাত জামাত সহকারে পড়তে হবে। ইমাম মুকীম হলে তার পেছনে ৪ রাকাতই পড়তে হবে।
মুসাফির কেবলমাত্র ফরজ নামায পড়বে। সুন্নত ও নফল নামায পড়া লাগবেনা। যেখানে ফরজের রেয়াতই দেয়া হয়েছে সেখানে সুন্নতের প্রয়োজন নেই।
(৭০) মোআজ্জিন আজানে حَى عَلَى الصَّلَاةِ এবং حَى عَلَى الْفَلَاحِ বললে এর উত্তরে مَا شَاءَ اللهُ لَا حَولَ وَلا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ না বললে এবং الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ বললে কَانَ وَمَا لَمْ يَشَاءُ لَمْ يَكُن বলা : হাদীস শরীফে মহানবী (সঃ) বলেছেন: 'মোআজ্জিনকে যা বলতে শুনবে তোমরাও তাই বলবে... শুধুমাত্র মোআজ্জিনকে حَى عَلَى الصَّلَاةِ এবং حَى عَلَى الْفَلَاحِ বললে তোমরা উত্তরে বলবে : لَاَحَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ। অন্য কিছু বলা ঠিক নয় বরং তা হাদীসের পরিপন্থী।
(৭১) স্বামী-স্ত্রীর দু'জনের মধ্যে একজনের বেনামাযী থাকা: ইচ্ছাকৃত নামায লঙ্ঘন বিরাট গুনাহ। নামায সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'নামায মৌলিক বিষয় হল ইসলাম, এর খুঁটি হচ্ছে নামায এবং সর্বোচ্চ চূড়া হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ।' (আহমদ, তিরমিজী)
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন : 'আমাদের ও তাদের মধ্যে পার্থক্য হল নামায। যে নামায ত্যাগ করল সে কুফরী করল।' (আহমদ, তিরমিজী, নাসাঈ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ।)
অন্য এক মত অনুযায়ী, বেনামাযী কাফের। কোন মুসলমানের সাথে তার বিয়ে হতে পারে না, আর হলেও বিয়ে বাতিল হবে। তার জানাযাও কাফন-দাফন দেয়া যাবে না, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, তার জবেহকৃত পশু হালাল নয়, তাওবা করতে বলা হবে, তাওবাহ না করলে তাকে হত্যা করতে হবে। কেননা, সে মোরতাদ এবং মৃত্যুর পর তাকে একটি গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দিতে হবে।
(৭২) নামাযের কেয়াম দীর্ঘায়িত করে রুকু সাজদাহ বেশি সংক্ষিপ্ত করা: এটা ঠিক নয়। কেননা নবী করীম (সঃ) সমান হারে কেয়াম, রুকু ও সাজদাহ করতেন। এ মর্মে হযরত বারা বিন আযেব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সঃ)-এর নামায লক্ষ্য করেছি। আমি তাঁর কেয়াম, রুকু, রুকু থেকে সোজা হওয়া, দু'সাজদার মাঝখানের বৈঠক, সাজদাহ এবং সালাম ফিরানোর আগে শেষ বৈঠক এগুলো সবই দেখেছি। এগুলো সময়ের দিক থেকে প্রায়ই সমপরিমাণের ছিল।' (বোখারী, মুসলিম)
হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবী করীম (সঃ) ছাড়া আর কারো পেছনে পরিপূর্ণ অথচ এত সংক্ষিপ্ত নামায পড়িনি। নবী করীম (সঃ) যখন 'সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলে দাঁড়াতেন, তখন এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, আমরা ভাবতাম, তিনি বোধহয় (সাজদার কথা) ভুলে গেছেন। তারপর তাকবীর বলে সাজদায় যেতেন এবং দু'সাজদার মাঝখানে এত দীর্ঘ সময় বসতেন যে, আমরা ভাবতাম, তিনি (পরবর্তী সাজদার কথা) ভুলে গেছেন।'
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন, এ দু'টো হাদীসের মূল কথা হল, কেয়াম এবং তাশাহহুদের বৈঠকের সময়ের পরিমাণ রুকু, সাজদা এবং এ দু'য়ের মধ্যে সোজা হওয়ার সময়ের পরিমাণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। অর্থাৎ এগুলো দীর্ঘ কিংবা সংক্ষিপ্ত ছিল, কোন পার্থক্য ছিল না। অথচ আমাদের মধ্যে অনেকে, বিশেষ করে তারাবীহর নামাযের মধ্যে, দীর্ঘ কেয়াম করে, কিন্তু রুকু-সাজদা করে সংক্ষিপ্ত।
পক্ষান্তরে, নবী করীম (সঃ) রাত্রের নফল নামাযে (কেয়ামুল লাইলে) যে পরিমাণ কেয়াম করতেন, কেয়াম থেকে উঠে সে পরিমাণ দাঁড়িয়ে থাকতেন, সে পরিমাণে সাজদা করতেন এবং দু' সাজদার মাঝখানেও অনুরূপ পরিমাণ বসতেন। পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনও অনুরূপ আমল করে গেছেন। হযরত আনাসের হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, নবী করীম (সঃ) কেয়ামের মতই রুকু, সাজদা এবং এতদুভয়ের মাঝখানে সোজা হওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘ সময় নিতেন। আনাস (রাঃ) শুধুমাত্র দীর্ঘ কেরাত এবং অন্যগুলোকে সংক্ষিপ্ত করার বিরোধীতা করেছেন।
(৭৩) ৩ রাকাত কিংবা ৪ রাকাত বিশিষ্ট নামাযের ১ম তাশাহহুদের পর সময় থাকা সত্বেও দোআ না পড়া: যদি তাশাহহুদ পড়ার পর সময় থাকে, তাহলে দোআ পড়া উত্তম। এ মর্মে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেক দু'রাকাত নামাযের পর বসলে আত্তাহিয়্যাতু .......... শেষ পর্যন্ত পড়বে। তারপর যে কোন পছন্দনীয় দোয়া করবে।' (নাসাঈ, আহমদ, তাবরানী)
আল্লামা নাসেরুদ্দীন আলবানী বলেছেন, এ হাদীস প্রথম তাশাহহুদের পর দোআ পড়ার বৈধতার প্রমাণ। ইবনু হাজমের মতও তাই। আর তাঁর মতটাই শুদ্ধ। অন্যরা হয়তো অন্য শর্তযুক্ত হাদীস দ্বারা তা খণ্ডন করতে চাইবে। কিন্তু এ হাদীস শর্তমুক্তভাবে দোআর বৈধতার প্রমাণ দিচ্ছে।
(৭৪) তাকবীরে তাহরীমার আগে জায়নামাযের দোআ পড়া : এটাও ঠিক নয়। কেননা নবী (সঃ) তাকবীরে তাহরীমার পরে ঐ দোআটি পড়েছেন। - (রসূলুল্লাহর নামায নাসেরুদ্দীন আলবানী- ৫১ পৃঃ)
(৭৫) নামাযে ইমামের ভুল হলে আল্লাহু আকবার বলে ইমামকে সতর্ক করা : এটা ভুল। সঠিক পদ্ধতি হল, সোবাহানাল্লাহ বলা এবং মহিলা মুসল্লীরা হাতে তালি লাগাবে। (বোখারী শরীফের ১ম খণ্ড, ৬৪৩ নং হাদীস এবং মুসলিম শরীফের ২য় খণ্ড, ৮৩২ নং হাদীস দ্রষ্টব্য)
(৭৬) ওমরী কাজা : যারা বালেগ হওয়ার পর অজ্ঞতা, অবহেলা, অবজ্ঞা বা অন্য কোন কারণে নামায পড়েনি, হেদায়েতের অনুভূতি লাভের পর তারা অতীতের ঐ সকল নামাযগুলোর ক্ষতিপূরণের জন্য পেরেশান হয়ে যায়। সেজন্য সাধারণভাবে ওমরী কাজার ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এ ধারণাটা কোরআন ও হাদীস সমর্থিত নয়। কাজা আদায় করতে হয় সুনির্দিষ্ট ওয়াক্তের হারানো নামাযের যা সুস্পষ্টভাবে জানা আছে। কিন্তু যে নামাযের সুনির্দিষ্ট নাম, ওয়াক্ত ও সংখ্যা জানা নেই, তার কাজা আন্দাজী করা যায় না। আন্দাজী কোন এবাদত হয় না। বরং বিনা ওজরে ছেড়ে দেয়া নামাযের জন্য তাকে যা করতে হবে তা হল, অতীতের গুণাহর জন্য তওবা-এস্তেগফার করা এবং কান্নাকাটি করা। আল্লাহ শিরক ছাড়া সকল গুনাহ মাফ করেন। তবে তওবা করলে শিরকও মাফ করেন। পক্ষান্তরে, বর্তমানে বেশী করে নফল ও সুন্নত নামায পড়লে অতীতের নফলগুলোসহ ছুটে যাওয়া ফরজসমূহের ক্ষতিপূরণ হবে, ইনশাআল্লাহ্। সহীহ হাদীসে আছে, কারো ফরজ নামায কম হলে নফল নামায তা পূরণ করে দেবে। (আবু দাউদ)

টিকাঃ
১. তাহজীব আত-তাহজীব।
** নবী (সঃ) আরো বলেন, 'তোমরা কাতার ঠিক কর, কাতার ঠিক করা নামায কায়েমেরই অংশ।' - (বোখারী)
২. যাদুল মাআদ-ইবনুল কাইয়েম。
৩. মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৩ খণ্ড, ২৩৯ পৃষ্ঠা。
৪. ফাতাওয়াহ ইয্য বিন আবদুস সালাম ৪৬-৪৭ পৃঃ。
৫. ফতোয়া ইমাম নওয়ী ৩৯ পৃঃ。
৬. মাজাল্লাতুল বুহুস আল-ইসলামিয়াহ, ১৯ শ খণ্ড, ১৪৩ পৃঃ。
৭. সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সহীহা নাসেরুদ্দীন আলবানী。
৮. মাজাল্লাতুল বুহুস আল-ইসলামিয়াহ-১৯/১৪৮。
৯. মাজাল্লাতুল বুহুস গাল-ইসলামিয়াহ-১৫/৭৯。
১০. ফাতাওয়া নূর আলা-আদ-দারব শেখ ফাওজান, ১ম খণ্ড, ২০ পৃঃ。
১১. ফাতহুল বারী, ২য় খণ্ড, ১২৪ পৃঃ
১২. দুরুস ও ফাতাওয়া ফিল হারাম-আল-মক্কী-সালেহ ও সাইমীন-পৃষ্ঠা নং-৭৫。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 জুম‘আর নামাযের প্রচলিত ৭টি ভুল সংশোধন

📄 জুম‘আর নামাযের প্রচলিত ৭টি ভুল সংশোধন


(১) গোসল না করা : আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌّ عَلَى كُلِّ مُحْتَلَمٍ
'জুমু'আর দিন প্রত্যেক বালেগের গোসল করা ওয়াজিব।' (মোআত্তাসহ হাদীসের ৬টি বিশুদ্ধ কিতাব)
আবদুল্লাহ বিন-ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: "জুমআর দিন আসলে সেদিন তোমরা গোসল করবে।” (হাদীসের একাধিক বিশুদ্ধ কিতাব)
নবী করীম (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ জুমআ পড়তে চাইলে সে যেন গোসল করে।' (মুসলিম)
(২) মুসল্লীদের ঘাড় টপকিয়ে সামনের কাতারে শরীক হওয়া: আবদুল্লাহ বিন বোসর থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) খোতবা প্রদানের সময় এক ব্যক্তি লোকদের ঘাড়ের উপর দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে আদেশ দেন, বস, তুমি লোকদেরকে কষ্ট দিয়েছ।'
ইমাম তিরমিজী ঘাড় টপকিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়াকে ওলামায়ে কেরামের মতে মাকরূহ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ীর মতে, এরূপ করা হারাম। ইমাম নওয়ী বলেছেন, সহীহ হাদীসের আলোকে তা হারাম। ইমাম আহমদের মতে, তা মাকরূহ।
আল্লামা এ'রাকী কা'ব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি লোকদের ঘাড় টপকানোর চাইতে জুম'আ ত্যাগ করাকে পছন্দ করি। ইবনুল মোসাইয়ের বলেন: মুসল্লীর ঘাড় টপকানো অপেক্ষা আমার কাছে নিজ ঘরে জুম'আর নামায পড়া উত্তম বলে বিবেচিত। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে, তা হারাম।
(৩) জুমু'আর সময় দু'পা পেটের সাথে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা কিংবা হাত দিয়ে ধরে রাখা: মোআজ বিন আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) জুম'আর সময় ইমামের খোতবা দানকালে পেটের সাথে দু'পা বেঁধে কিংবা হাত দিয়ে ধরে রাখতে নিষেধ করেছেন। - (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজী, হাকেম)
ইবনুল আসীর তাঁর 'আন-নেহায়া' গ্রন্থে লিখেছেন, এভাবে বসলে ঘুম আসে এবং অযূ ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এছাড়াও এর ফলে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
(৪) জুমু'আর দিন ২য় আজানের সময় মসজিদে প্রবেশ করে আজানের জবাব দানের জন্য অপেক্ষা করা এবং খোতবার প্রারম্ভে তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়া: এর ফলে প্রবেশকারী সুন্নতের সওয়াব লাভের জন্য ওয়াজিব লঙ্ঘন করে। আজানের জওয়াব দেয়া সুন্নত, আর খোতবা শুনা ওয়াজিব। আজানের সময় মসজিদে প্রবেশকারীকে খোতবা শোনার স্বার্থে দু'রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ সংক্ষেপে পড়তে হবে। এ মর্মে নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'ইমামের খোতবার সময় কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন দু'রাকাত নামায পড়ে এবং তাড়াতাড়ি করে।' (মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ) যারা এ দু'রাকাত নামায পড়েনা, তারা হাদীসের বিরোধীতা করে।
(৫) জুমু'আর ফরজের পর কথা বা কাজ ব্যতীত অবিচ্ছিন্নভাবে সুন্নত পড়া: নিয়ম হল, ফরজের পর কোন দরকারী মথা বলবে বা কোন কাজ করবে। তারপর সুন্নত নামায পড়বে। এ মর্মে নামেরের বোনের ছেলে সায়েব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাহাবী হযরত মোআওইয়ার সাথে মাকসুরায় নামায পড়েছি। ইমামের সালাম ফিরানোর পর একই স্থানে দাঁড়িয়ে আমি (সুন্নত) নামায পড়লাম। তিনি আমার কাছে লোক পাঠান এবং বলেন, তুমি যা করলে আর এরূপ করবে না, তুমি ফরজ পড়ার পর হয় কথা বলবে, আর না হয় বেরিয়ে যাবে। কেননা, রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন কথা বলা কিংবা বের হওয়া ছাড়া পূর্ববর্তী নামাযের সাথে পরবর্তী নামায মিলিয়ে না পড়ি।' (মুসলিম)
ইমাম নওয়ী (রঃ) বলেছেন: আমাদের সাথীদের মতে, ফরজ নামাযের স্থান থেকে সরে গিয়ে সুন্নত ও নফল নামায পড়া মোস্তাহাব। উত্তম হল, মসজিদ থেকে ঘরে গিয়ে নফল ও সুন্নত পড়া। তা না হলে, মসজিদের অন্য স্থানে সরে গিয়ে নামায পড়া। এর ফলে সাজদার স্থান বাড়বে এবং ফরজের স্থান থেকে সুন্নত ও নফলের স্থানের মধ্যে পরিবর্তন হবে। কথার মাধ্যমে ও সংযোগহীনতা সৃষ্টি হয় তবে, স্থান পরিবর্তন উত্তম। ১
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, জুম'আসহ অন্যান্য নামাযেও সুন্নত পদ্ধতি হল, ফরজ ও সুন্নতের মধ্যে সংযোগহীনতা সৃষ্টি করা। কেননা, 'নবী করীম (সঃ) দু'ধরনের নামাযকে এক সাথে মিলিয়ে পড়তে নিষেধ করেছেন, যে পর্যন্তনা দু'ধরনের নামাযের মধ্যে কেয়াম কিংবা কথা দ্বারা সংযোগহীনতা সৃষ্টি করা হয়।' অনেক লোক সালাম ফিরানোর পরপরই দু'রাকাত নামায পড়া শুরু করে। এটা ঠিক নয়। কেননা, এতে নবী করীম (সঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হয়। এর লক্ষ্য হল ফরজ ও সুন্নত-নফলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা।
(৬) জুমু'আর খোতবার সময় কথা বলা: জুম'আর খোতবার সময় কথা বলা নিষেধ। এ মর্মে নবী করীম (সঃ) বলেছেন:
إِذَا قُلْتُ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمْعَةِ انْصِتُ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ
'তুমি যদি জুম'আর সময় ইমামের খোতবা চলাকালে তোমার সঙ্গীকে চুপ করতে বল, তাহলে তুমি লগ্ও করলে।' (বোখারী)
এ শব্দের বিভিন্ন অর্থ আছে।
১. ভুল করা, ২. সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া, ৩. জুম'আর ফজীলত বাতিল হওয়া ইত্যাদি।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, খোতবার সময় কথা বললে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দেয়া সৎ কাজের আদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও যদি সওয়াব বাতিল হয়ে যায় তাহলে, অন্য কোন শব্দ উচ্চারণের প্রশ্নই উঠে না। অর্থাৎ খোতবার সময় নিরিবিলি খোতবা শুনতে হবে। তাতে কোন কথা বলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, খোতবার সময় সকল প্রকার কথাবার্তা নিষিদ্ধ। ২
এমনকি কংকর সরানোও নিষিদ্ধ।
এ মর্মে ইবনুল মোনজেরী আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আমি জুম'আর সময় মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন নবী করীম (সঃ) খোতবা দিচ্ছিলেন। আমি উবাই বিন কা'বের পাশে বসা ছিলাম। নবী করীম (সঃ) সূরা তাওবা পড়লেন। আমি উবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কবে এ সূরাটি নাজিল হয়েছে? তিনি আমার দিকে চেহারার চামড়া কুঁচকে অসন্তোষের দৃষ্টিতে তাকালেন এবং কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমি পুনরায় একই প্রশ্ন করলে তিনিও একই ভাবের পুনাবৃত্তি করলেন এবং কোন উত্তর দিলেন না। নবী করীম (সঃ) নামায শেষ করেন। আমি উবাইকে প্রশ্ন করলাম, আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কেন এবং চেহারার চামড়া কুঁচকালেন কেন? উবাই জবাব দেন, তুমি তো তোমার নামায বাতিল করেছ। আমি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনাটি খুলে বললে তিনি উত্তরে বলেন: উবাই সত্য বলেছে।' (ইবনু খোজাইমা)
উবাইর সাথে আবদুল্লাহ বিন মাসউদেরও অনুরূপ এক ঘটনা ঘটেছিল। তিনিও নবী করীম (সঃ)-এর কাছে গিয়ে উবাইর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে নবী করীম (সঃ) বলেন, উবাই ঠিক বলেছে, উবাইকে অনুসরণ কর।' -(আবু ইয়ালী, ইবনে হিব্বান)
জুম'আর খোতবা যে কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা শুনার প্রয়োজনীয়তা কতবেশি এটা উপরোক্ত হাদীসগুলো দ্বারা বুঝা যায়।
(৭) খোতবার আগে সুন্নত পড়ার সময় দেয়া: অনেক মসজিদে জুম'আর খোতবার আগে বক্তৃতা হয়। বক্তৃতা শুনার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এখন কেউ নামায পড়বেন না খোতবার আগে সুন্নাত পড়ার সময় দেয়া হবে। এর ফলে, মসজিদে ঢুকে প্রথমে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দু' রাকাত সুন্নত নামায পড়ার ব্যাপারে নবী করীম (সঃ)-এর আদেশের বিরোধীতা করা হয়। নবী (সঃ) বলেছেন:
إِذَا دَخَلَ أَحَدَكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَايَجْلِسُ حَتَّى يُصَلَّى رَكْعَتَيْنِ
'তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে সে যেন দু' রাকাত নামায পড়ার আগে না বসে।' (বোখারী)
অথচ, বক্তৃতা শোনার জন্য তাকে সে আদেশ পালন করা থেকে বারণ করা হয়। রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ লংঘনের মধ্যে কি কোন কল্যাণ আছে?
এ সমস্যার মূল কারণ হল, স্থানীয় ভাষায় খোতবা না দেয়া। আরবি খোতবা লোকেরা বুঝে না বলে আগে বাংলায় বক্তৃতা করে এর ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে তিনবার খোতবা হতে হয়। নবী (সঃ) মাত্র দু'টো খোতবা দিয়েছেন। স্থানীয় ভাষায় খোতবা দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয। এ মর্মে ওলামায়ে কেরামের ফতোয়া রয়েছে। দীনের মধ্যে কোন কিছু যোগ-বিয়োগ করা যায় না। ৩

টিকাঃ
১. শরহে মুসলিম-ইমাম নওয়ী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৭০-১৭১ পৃঃ。
২. ফাতহুল বারী-শরহে বোখারী-ইবনে হাজার আসকালানী-২য় খণ্ড, ৪১৫ পৃঃ。
৩. এ মর্মে লেখকের 'ইসলামে মসজিদের ভূমিকা' বই এর খোতবা অংশ দ্রষ্টব্য。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 অযু-গোসলের প্রচলিত ১৮টি ভুল সংশোধন

📄 অযু-গোসলের প্রচলিত ১৮টি ভুল সংশোধন


(১) অযু করার সময় প্রকাশ্যে নিয়ত উচ্চারণ করা : এটা সুন্নতের খেলাপ। সুন্নত পদ্ধতি হল, মনে মনে অযূর নিয়ত করা এবং মুখে উচ্চারণ না করা। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, মুখে নিয়তের উচ্চারণ বুদ্ধি ও দ্বীনদারীর ঘাটতি। দ্বীনদারীর ঘাটতি হল এটা বেদআত। আর বুদ্ধির ঘাটতির উদাহরণ হল কেউ খাওয়ার সময় যদি অনুরূপ নিয়ত করে যে, 'আমি খাবারের এ পাত্রটিতে হাত দেয়ার নিয়ত করলাম, আমি তা থেকে এক লোকমা মুখে দিয়ে চিবিয়ে গিলে তৃপ্ত হওয়ার নিয়ত করলাম।' মোটকথা, এগুলো ঠিক নয়।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, নবী করীম (সঃ) অযুর শুরুতে
نَوَيْتُ أَنْ أَتَوَضَّأَ لِرَفْعِ الْحَدَثِ وَاسْتِبَاحَةِ لِلصَّلَاةِ وَتَقَرُّبًا إِلَى اللَّهِ تَعَالَى
বলতেন না, কিংবা কোন সাহাবায়ে কেরাম থেকে অনুরূপ কিছু বর্ণিত নেই। এমনকি কোন দুর্বল হাদীসেও এরূপ কোন বর্ণনা আসেনি।
লোকেরা অযুর দোআ- এ নামেও একটি দোআ পড়ে। সেটি হল:
بِسْمِ اللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ - وَالْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى دِيْنِ الْإِسْلَامِ - الْإِسْلَامُ حَقٌّ وَالْكُفْرُ بَاطِلُ الْإِسْلَامُ نُورُ وَالْكُفْرُ ظُلُمَاتٌ
এরূপ দোআর সমর্থনেও কোন হাদীস বা সাহাবায়ে কেরামের সমর্থন নেই। তাই এগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, অযূর শুরুতে নবী করীম (সঃ) থেকে বিসমিল্লাহ এবং অযূ শেষে নিম্নোক্ত দোআ ছাড়া আর কিছু বর্ণিত নেই :
১ম
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ - اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ (মুসলিম-তাহারাত অধ্যায়) وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
২য়
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ (সুনানে নাসাঈ) اسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ
(২) অযু-গোসলে পানির অপচয় করা: যারা পুকুর-নদীনালা ও সাগরে অযু করে এবং যারা কলের পানি বা কূপের পানি দিয়ে অযূ করে তাদের উভয়ের বেলায় পানির অপচয়ের বিষয়টি প্রযোজ্য।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ) ৫ মোদ পানি দিয়ে গোসল এবং এক মোদ পানি দিয়ে অযু করতেন।' (বোখারী)
ইমাম বোখারী বলেছেন, ওলামায়ে কেরام পানির অপচয় এবং নবী করীম (সঃ)-এর ব্যবহৃত পানির পরিমাণ অতিক্রম করাকে মাকরূহ বলেছেন। (বোখারী কিতাবুল অযু)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, নবী করীম (সঃ) সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈগণ, কেউ বেশি পানি ব্যবহার করতেন না।
সা'দ বিন আবি আক্কাস বেশি পানি দিয়ে অযু করছিলেন। নবী (সঃ) তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। তিনি বলেন, হে সা'দ, তুমি পানির অপচয় করছ কেন? সা'দ জবাব দেন, অযুর মধ্যেও কি অপচয় আছে? নবী (সঃ) বলেন, 'হাঁ', যদি তুমি প্রবহমান নদীর মধ্যেও অযু কর। (ইবনু মাজাহ)
অপচয় সব ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, কম পানি ব্যবহার ব্যক্তির বুদ্ধি প্রতিপত্তির প্রমাণ। তাঁর ছাত্র মারওয়াজী বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহকে (ইমাম আহমদ) অযূর সময় লোক চক্ষুর আড়াল করে রাখতাম যেন তাঁর কম ব্যবহারের কারণে তারা না বলে যে তিনি ভাল করে অযু করেন না। তিনি অযু করলে মাটি প্রায় ভিজত না।
আবুল ওফা ইবনু আ'কীল বলেন, নবী করীম (সঃ)-এর চরিত্রে ও এবাদতে বেশি পানি ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না। - (জাইল তাবাকাতিল হানাবেলা, ১ম খণ্ড, ১৫০ পৃঃ)
আবদুল্লাহ বিন মোগাফ্ফাল থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে পবিত্রতা অর্জন ও দোআয় সীমালঙ্ঘনকারী একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে।' - (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
আ'ওনুল মা'বুদ কিতাবের লেখক বলেছেন, তিন কাজে সীমালঙ্ঘন হতে পারে। (ক) তিনবারের বেশি অঙ্গ ধোঁয়া, (খ) পানি বেশি খরচ করা এবং (গ) ওয়াসওয়াসার কারণে প্রয়োজনের চেয়ে অঙ্গের বেশি অংশ ধোঁয়া। তারপর তিনি বলেন, ওলামায়ে কেরাম পানির অপচয় নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যদিও সেটা সাগরের তীরের পানিই হোক না কেন।
(৩) ভালভাবে ও পরিপূর্ণ উপায়ে অযু না করা: মোহাম্মদ বিন যিয়াদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি তাঁকে বলতে শুনেছি : 'তোমরা ভাল করে অযু কর। আবুল কাসেম মোহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, পায়ের গোড়ালীর জন্য দোজখের আগুনের ধ্বংস।' (বোখারী) অর্থাৎ পায়ের গোড়ালী সাধারণত ভাল করে ধোঁয়া হয় না বলে তাতে পানি পৌঁছে না। তাই তা দোজখের কারণ হবে।
খালেদ বিন মা'দান নবী করীম (সঃ)-এর এক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেছেন, 'রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখেন, অথচ তার পায়ের উপরের অংশে এক সিকি পরিমাণ জায়গা শুকনো রয়েছে। তিনি তাকে পুনরায় অযূর নির্দেশ দেন।' (আহমদ)
আবু দাউদ আরো একটু বেশি বর্ণনা করে বলেছে, তিনি তাকে নামায পুনরায় পড়ারও নির্দেশ দেন।' ইমাম আহমদ বলেন, এ হাদীসের সনদ ভাল।
আল্লামা শাওকানী বলেছেন, যে ব্যক্তি এ পরিমাণ স্থান শুকনো রেখেছে, এ হাদীস তার পুনঃ অযূর ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ।
অযূর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা জরুরী। বহু লোক অযূর অঙ্গগুলোতে ঠিকমত পানি পৌঁছেছে কিনা তার প্রতি গুরুত্ব দেয় না। তাদের জন্য নিম্নের হাদীসগুলো খুবই উপকারী।
হযরত ওসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি নামাযের জন্য ভালভাবে অযু করল, ফরজ নামায পড়ার জন্য রওনা হল এবং লোকদের সাথে জাম'আতে নামায পড়ল, আল্লাহ তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন।' - (মুসলিম, আহমদ, নাসাঈ)
আবু আইউব এবং ওকবা বিন আমের থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : কোন ব্যক্তি যেভাবে হুকুম দেয়া হয়েছে সেভাবে অযু ও নামায পড়লে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।' - (আহমদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, ইবনু হিব্বান)
(৪) পেশাবের অপবিত্রতা থেকে না বাঁচা : নবী করীম (সঃ) এটাকে কবীরা গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কা কিংবা মদীনার একটি বাগানের পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় দু'ব্যক্তির কবর থেকে চিৎকার শুনে বলেন, তারা বড় কোন বিষয়ে আজাব ভোগ করছে না। তারপর বলেন, তাদের একজন পেশাবের অপবিত্রতা থেকে বাঁচার চেষ্টা করত না এবং অন্যজন চোগলখুরী করত। তারপর তিনি খেজুরের একটি ডাল আনার নির্দেশ দেন। তিনি এটাকে ভেঙ্গে দু'টুকরো করেন এবং দু'কবরের উপর দু'অংশ গেঁড়ে দেন। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি এটা' কেন করলেন? তিনি জবাব দেন, এগুলো শুকানোর আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের আজাব লাঘব করতে পারেন।' - (বোখারী)
পেশাব করার সময় পেশাব বা পেশাবের ছিঁটা গায়ে বা কাপড়ে পড়লে তা নাপাক হয়ে যায়। নাপাক শরীর ও কাপড় দিয়ে নামায পড়লে নামায হবে না।
(৫) পেশাব-পায়খানা করার সময় সতর ঢেকে না রাখা : উরু ঢাকা জরুরী এবং তা সতরের অন্তর্ভুক্ত। অনেকে উরু খোলা রেখে পেশাব-পায়খানা করে। 'একবার নবী করীম (সঃ) জোরহোদ নামক সাহাবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন, হে জোরহোদ, তোমার উরু ঢাক, কেননা, উরু হচ্ছে সতর।' - (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজী, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
'রসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন : নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর।' - (হাকেম)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : উরু সতর।' - (তিরমিজী)
তাই পেশাব-পায়খানা করার সময় উরু ঢেকে বসতে হবে।
(৬) পেশাব থেকে পবিত্রতার নামে বাড়াবাড়ি করা: কিছু লোক পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জনের নামে শয়তানের ওয়াসওয়াসার শিকার। তারা পবিত্রতার জন্য মাত্রাতিরিক্ত কষ্ট স্বীকার করে। এজন্য কৃত্রিমতা অবলম্বন করতে গিয়ে শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে। তারা পেশাবের সর্বশেষ ফোঁটা বের করার জন্য পুরুষাঙ্গ ধরে ৪০ কদম হাঁটে, এক পা, এক পা করে দু'পা দিয়ে চিপে, যেন সেনাবাহিনীর কসরত! তাঁদের যুক্তি হল, বদনার পানি ফেলে দেয়ার পর উপুড় করে রাখলে অল্প অল্প করে ফোঁটা তৈরি হয়ে নিচে পড়ে। তেমনি পেশাবও আস্তে আস্তে ঝরে পড়ে। এজন্য কাশি দেয় এবং গলা ঘক্ ঘক্ করে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেছেন, শয়তানের ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত লোকেরা পেশাবের পর ১০টি কাজ করে। সেগুলো হল: ১. পুরুষাঙ্গকে গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত হাত দিয়ে টেনে এবং চিপে পেশাবের সর্বশেষ ফোঁটা বের করে। ২. গলা ঘক্ ঘক্ করা যেন অবশিষ্ট পেশাব বের হয়। ৩. নিচ থেকে উপরে ওঠে তাড়াতাড়ি বসে পড়ে। ৪. রশি বেয়ে উপরের দিকে ওঠার পর নিচে নেমে বসে পড়ে। ৫. পুরুষাঙ্গের মাথায় পেশাবের ফোঁটা দেখে পুরুস্নাঙ্গের ছিদ্রকে ফাঁক করে ধরে পবিত্রতার জন্য পানি ঢালে। ৭. পুরুষাঙ্গের মাত্রায় তুলা দিয়ে রাখে। ৮. পুরুষাঙ্গের মাথায় ন্যাকড়া বেঁধে রাখে। ৯. সিঁড়ি বেয়ে উপরে একটু উঠার পর দ্রুত নেমে আসে। ১০. কিছুক্ষণ হাঁটার পর পুনরায় কুলুখ ব্যবহার করে।
ইবনুল কাইয়েম বলেন, আমাদের ওস্তাজ শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: এগুলো সবই শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং বেদআত। তিনি বলেন, প্রথম দু'টোর বিষয়ে হাদীস তালাশ করে সহীহ কোন হাদীস পাইনি বরং ২য়টির ব্যাপারে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে যার উপর আমল করা যায় না। তিনি বলেন, পেশাবের উদাহরণ হল স্তনের দুধের মত। দোহন করলে দুধ বের হবে, আর ছেড়ে দিলে দুধ স্থিতিশীল থাকবে, অর্থাৎ কিছুই বের হবে না। যারা এ কাজের বদ অভ্যাস করেছে তারা ওয়াসওয়াসার শিকার। আর যারা তা করেনি তারা তা থেকে মুক্ত। যদি এ সকল কাজ সুন্নত হত, তাহলে এগুলো সবার আগে রসূলুল্লাহ (সঃ) এবং সাহাবায়ে কেরামগণ করতেন। ১
শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুস সালাম বলেন: শয়তানের ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত লোকেরা উপরোক্ত যে ১০টি কাজ করে, মহানবী (সঃ) তা করেননি। এগুলো সবই শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং গোমরাহী। ২
পুরুষাঙ্গ ধরে হাটাহাটি করাই সতর লংঘন। পুরুষাঙ্গ ধরে হাটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়ও বটে। অনেকে বাড়িতে মেয়েলোকের সামনেও এ কাজ করে। মেয়েলোকেরা লজ্জা পায়। কোন মেয়ে লোক যদি পুরুষের সামনে নিজ লজ্জাস্থান ধরে এভাবে হাঁটত তখন সেটা কি রকম বেহায়াপনা হত। এটাও ঠিক তেমনি এক ভয়াবহ বেহায়াপনা।
পেশাব ধীরে সুস্থে করতে হবে। এরপর ঢিলা বা পানির যে কোন একটা ব্যবহার করলেই পাক হওয়া যায়। তাড়াহুড়া করে পেশাব করলে পেশাব ঝরার আশঙ্কা থাকতে পারে। কিন্তু ধীরে সুস্থে পেশাব করলে সে আশঙ্কা থাকে না। তাই নিজেদেরকে বিনা প্রয়োজনে ঐ সকল বদ অভ্যাসের রোগী বানানো ঠিক হবে না। আর যাদের পেশাব ঝরার রোগ আছে তারা প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য নতুন অযু করে নেবেন।
(৭) পেশাব-পায়খানার বেগ নিয়ে নামায পড়া: এটা ঠিক নয়। এর ফলে নিজের কষ্ট তো আছেই। এছাড়াও নবী করীম (সঃ)-এর আদেশের বিরোধীতা করা হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, খাওয়া উপস্থিত হলে এবং দু'টো নিকৃষ্ট জিনিসকে (পেশাব-পায়খানা) দমন করা অবস্থায় নামায হতে পারে না। - (মুসলিম)
(৮) ঘুম থেকে জেগে হাত না ধুয়ে পানির পাত্রে হাত ঢুকানো: হাদীসের মধ্যে এসেছে, পানির পাত্রে হাত ঢুকানোর আগে হাত ধুয়ে নিতে হবে। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জাগলে তিনবার হাত ধোয়ার আগে সে যেন পানির পাত্রে নিজ হাত না ঢুকায়। তোমরা জাননা, তোমাদের হাত রাত্রে কোথায় বাস করেছে।' - (মালেক, শাফেঈ, আহমদ, বোখারী, মুসলিম এবং অন্য ৪টি হাদীসের বিশুদ্ধ কিতাব)
শেখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, হাত ধোয়ার পেছনে তিনটি হেকমত থাকতে পারে। ১. পায়খানা-পেশাবের রাস্তায় হাত লাগলে নির্গত ঘাম বা নাপাকী হাতে লাগতে পারে। ২. হাতের মধ্যে শয়তানের স্পর্শ লাগতে পারে। যেমন, হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। নবী করীম (সঃ) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জাগলে সে যেন নিজের নাকের দুটো ছিদ্র ভাল করে ঝেড়ে নেয়। শয়তান তার নাকের ছিদ্রের ভেতর বাস করে।' (বোখারী, মুসলিম) এ হাদীস দ্বারা নাক পরিষ্কার করার যে কারণ জানা গেল, সেটা হল, সেখানে শয়তানের রাত্রি যাপন। তাই একই কারণ হাত ধোয়ার পেছনেও প্রযোজ্য হতে পারে। ৩. এটা এবাদতের বিষয় যার অর্থ আমাদের বোধগম্য নয়।
(৯) অযূর শুরুতে বিসমিল্লাহ না বলা: সাঈদ বিন যায়েদ এবং আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'অযূ ছাড়া নামায হয়না এবং বিসমিল্লাহ বলা ছাড়া অযূ হয়না।' (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, হাকেম)।
সৌদী আরবের সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জিবরীন বলেছেন, কোন কোন আলেমের মতে, পেশাব ও পায়খানায় বিসমিল্লাহ বলা মাকরূহ এবং অযূতে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব। (শরহু মানার আস-সাবীল)
(১০) গর্দান মাসেহ করা: গর্দান মাসেহ করার ব্যাপারে মহানবী (সঃ) থেকে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত নেই। তালহা বিন মাসরাফ তার বাপ থেকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘাড় মাসেহ সম্পর্কিত বর্ণিত হাদীস দুর্বল। তাই ইমাম নওয়ী, ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে হাজার আসকালানী এটাকে দুর্বল হাদীস বলেছেন।
(১১) হাতের কনুই না ধোয়া: মহানবী (সঃ) হাত ধোয়ার সময় কনুই পর্যন্ত ধুতেন। তাই আমাদেরও তা করা উচিত। অন্যথায় অযু হবে না।
(১২) গোসলের সময় মোটা মানুষের চামড়ার ভাঁজে পানি না পৌঁছানো: মোটা মানুষের শরীরে গোশতের প্রাচুর্যের কারণে চামড়ার নিচে ভাঁজ পড়ে যায়। ফরজ গোসলের সময় তাতে পানি না পৌঁছলে সে গোসল দ্বারা শরীর পাক হবে না এবং কোন এবাদতও কবুল হবে না। তাই ভালভাবে অযু-গোসল করতে হবে।
(১৩) হাতের আংটি ও ঘড়ির নিচে পানি না পৌঁছানো: এতে করে ঐ জায়গাটুকু শুকনো থাকবে এবং ঐ অযু-গোসল দিয়ে নামায জায়েয হবেনা। ইমাম বোখারী বলেছেন, সাহাবী ইবনে সিরীন (রাঃ) অযুর সময় আংটির নিচে পানি পৌঁছাতেন।
(১৪) হাতের মধ্যে রং লাগলে কিংবা নখ পলিশ ব্যবহার করলে তা দূর করার আগে অযু হবে না: রং লাগলে সে জায়গায় পানি পৌঁছে না। অনুরূপ নখ পলিশ ব্যবহারের কারণেও সেখানে পানি পৌঁছেনা। তাই অযু-গোসলের আগে কেরোসিন জাতীয় জিনিস ও রং এবং নখ পালিশ দূরকারী রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে তা দূর করতে হবে।
(১৫) যমযমের পানি দিয়ে অযূ না করা: যেকোন পানি দিয়েই অযু-গোসল সবই করা যায়। সেটা যমযমের পানি হলেও। আবদুল্লাহ বিন আহমদ থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর 'যাওয়ায়েদ আল-মোসনাদ' গ্রন্থে হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সঃ) হজ্জ থেকে ফিরে মসজিদে হারামে পৌঁছে এক বালতি পানি আমার আদেশ দেন। তিনি সে পানি পান করেন এবং তা দিয়ে অযু করেন।
আল্লামা সা'আতী বলেছেন, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যমযমের পানি পান করা ও তা দিয়ে অযু করা মোস্তাহাব।' (আল-ফাতহুর রাব্বানী-১১শ খণ্ড, ৮৬ পৃঃ)
ইমাম নওয়ী শরহে মুসলিমে লিখেছেন, হযরত আব্বাস (রাঃ) থেকে যমযমের পানি দ্বারা গোসল করা নিষিদ্ধ মর্মে বর্ণনা সহীহ নয়।
সৌদী আরবের পরলোকগত জেনারেল মুফতী শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ বলেছেন, যমযমের পানি দিয়ে অযু জায়েয। তেমনি প্রয়োজন দেখা দিলে এস্তেঞ্জা এবং ফরজ গোসলও জায়েয। তাঁর মতে, নবী করীম (সঃ)-এর হাতের আঙ্গুলীর ফাঁক দিয়ে উৎসারিত পানি অযু-গোসল ও পান করার জন্য যায়েজ ছিল। যমযম সে ধরনের পানি না হলেও দু'পানিই পবিত্র। তাই দু'টো পানির হুকুম একই হবে। (ফাতাওয়া বি আহকামিল হজ্জ ওয়াল ওমরাহ-শেখ আঃ আযীয বিন বাজ)
(১৬) মাসিক সম্পর্কিত অজ্ঞতার কারণে নামায না পড়া: মহিলারা মাসিক সম্পর্কিত মাসলা না জানার কারণে নামাযের ক্ষেত্রে অনেক ভুল করে। 'কেউ যদি শেষ ওয়াক্তে পবিত্র হয়, তার উপর ঐ ওয়াক্ত আদায় করা ফরজ হয়ে যায়। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'কেউ যদি সূর্যাস্তের পূর্বে ১ রাকাত আসরের নামায পায় সে পুরো আসর পেয়ে গেল।' (বোখারী, মুসলিম)
অর্থাৎ তাকে বাকি রাকাতগুলো পড়া অব্যহত রাখতে হবে। তখন সূর্যাস্ত হলেও অসুবিধে নেই। আর যদি সূর্যোদয়ের আগে ১ রাকাত নামায পরিমাণ সময় আগে পবিত্র হয়, তাকে ফজর পড়তে হবে। নামাযের শেষ সময়ে পাক হওয়া সত্ত্বেও গোসল করতে গড়িমসি করায় নামাযের সময় চলে গেলে কবীরা গুনাহ হবে। মাতা-পিতা ও স্বামীর কর্তব্য হল মেয়েলোকদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা ও তাকিদ দেয়া। নচেত তারাও নামায লঙ্ঘনের গুনাহর শরীক হবে।
ইমাম ইবনুন নাহ্হাস বলেছেন, নামাযের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর যদি মাসিক আসে এবং যদি ঐ সময়ে, নামায আদায় করা সম্ভবপর হয়, তাহলে পাক-পবিত্র হওয়ার পর সে ওয়াক্তের কাজা আদায় করতে হবে। ১
শেখ সালেহ বিন ওসাইমিন বলেছেন, নামাযের ওয়াক্ত শুরুর, যেমন সূর্য হেলার আধ ঘণ্টা পর মাসিক দেখা দিলে পরে ঐ নামায কাজা আদায় করতে হবে। কেননা, ওয়াক্ত শুরুর সময় সে পাক ছিল। - (ফাতাওয়াহ আল-মারআহ-২৫ পৃঃ)
(১৭) অযু করার পর শরীর ও কাপড়ে নাপাকী লাগলে অযু ভাঙ্গে না। অনুরূপভাবে, নখ কিংবা চুল কাটলেও অযু নষ্ট হয় না। যেসব কারণে অযু নষ্ট হয় এগুলো তার মধ্যে নেই।
(১৮) পাক হওয়া সত্ত্বেও ৪০ দিন পর্যন্ত নেফাসের মেয়াদ পূরণ করা: সন্তান প্রসবের পর যেদিন পাক হবে সেদিন থেকে নামায-রোযা শুরু করবে। ৪০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোন দরকার নেই। আরো আগে পাক হওয়া সত্ত্বেও নামায রোযা না করলে কবীরা গুনাহ হবে।

টিকাঃ
১. এগাছাতুল লাহফান-ইবনুল কাইয়েম, ১ম খণ্ড, ১৪৩, ১৪৪ পৃঃ।
২. আস-সুনান ওয়াল মোবতাদেআ'ত-পৃঃ ২৫।
১. তাম্বীহ আল-গাফেলীন-ইবনুন নাহহাস-পৃষ্ঠা: ৩১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00