📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 প্রথম তাশাহ্‌হুদ

📄 প্রথম তাশাহ্‌হুদ


দ্বিতীয় রাকআত শেষে নবী (সঃ) তাশাহ্হুদ পড়ার জন্য বসতেন। তিনি ফজরের মত দুই রাকআত বিশিষ্ট নামাযের শেষ বৈঠক৩৭৬ কিংবা তিন ও চার রাকআত বিশিষ্ট নামাযের প্রথম বৈঠকে পা বিছিয়ে বসতেন৩৭৭ যেমন করে দুই সাজদার মাঝে বসতেন। তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে অনুরূপ আদেশ দিয়ে বলছিলেন, তুমি যখন নামাযের মাঝামাঝি বসবে, তখন প্রশান্তি সহকারে বসবে এবং বাম উরু বিছিয়ে দেবে ও পরে তাশাহ্হুদ পড়বে। ৩৭৮
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আমার বন্ধু রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে কুকুরের মত বসতে নিষেধ করেছেন। ৩৭৯
অন্য এক হাদীসে এসেছে, তিনি শয়তানের মত পায়ের গোড়ালির উপর বসতে নিষেধ করেছেন। ৩৮০
তিনি তাশাহহুদের জন্য বসলে উরুর উপর ডান হাতের তালু রাখতেন। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ডান হাঁটুর উপর রাখতেন এবং বাম হাতের তালু নিজ উরুর উপর রাখতেন। অন্য আরেক বর্ণনায় এসেছে, বাম হাঁটুর উপর রাখতেন। ৩৮১
নবী (সঃ) ডান কনুইর নীচ অংশ ডান উরুর উপর রাখতেন। ৩৮২
এক ব্যক্তি বাম হাতের উপর ভর করে নামাযে বসা ছিল। রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে অনুরূপ করতে নিষেধ করে বলেছেন, এটা ইহুদীদের নামায (পদ্ধতি)। ৩৮৩
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, 'এরকম বস না, এটা হচ্ছে শাস্তিযোগ্য লোকদের নামায। ৩৮৪
অন্য আরেক হাদীসে এসেছে, এটা অভিশপ্তদের নামায। ৩৮৫

টিকাঃ
৩৭৬. নাসাঈ- সনদ সহীহ。
৩৭৭. বোখারী, আবু দাউদ。
৩৭৮. আবু দাউদ, বায়হাকী- সনদ ভাল。
৩৭৯. আহমদ, ইবনু আবী শায়বাহ, আত-তায়ালিসী। আবু ওবায়দাহসহ অন্যরা বলেছেন, কুকুরের মত বসার অর্থ হল, মাটিতে দুই পাছা বিছিয়ে হাঁটু দাঁড় করিয়ে দুই হাত মাটিতে রাখা। দুই সাজদার মাঝে উল্লিখিত বসা বর্তমান বসা থেকে ভিন্ন。
৩৮০, ৩৮১. মুসলিম, আবু আওয়ানা, ইত্যাদি。
৩৮২. আবু দাউদ, নাসাঈ সনদ সহীহ। এ কথার অর্থ হল, তিনি নিজ কনুই দুই পাঁজর থেকে দূরে রাখতেন না。
৩৮৩. বায়হাকী, হাকেম একে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী একে সমর্থন করেছেন。
৩৮৪. আহমদ, আবু দাউদ- সনদ ভাল。
৩৮৫. আবদুর রাযযাক। আবদুল হক একে সহীহ বলেছেন。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 তাশাহ্‌হুদের মধ্যে আঙ্গুল নাড়ানো

📄 তাশাহ্‌হুদের মধ্যে আঙ্গুল নাড়ানো


রসূলুল্লাহ (সঃ) বাম হাতের তালু বাম হাঁটুর উপর বিছিয়ে দিতেন, ডান হাতের সকল আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ করে রেখে কেবল তর্জনী বা শাহাদত অঙ্গুলির দ্বারা কেবলার দিকে ইঙ্গিত দিতেন এবং এর দিকে চোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন। ৩৮৬
তিনি যখন আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতেন, তখন বৃদ্ধাঙ্গুলিকে মধ্যমার উপর রাখতেন৩৮৭ এবং কখনও তাকে গোলাকার কুন্ডলীর মত করতেন। ৩৮৮
তিনি যখন আঙ্গুল (তর্জনী) উঠাতেন, তখন তা নাড়তে থাকতেন ও দোআ করতেন। ৩৮৯
তিনি আরও বলেন, এই আঙ্গুল অর্থাৎ তর্জনী শয়তানের জন্য লোহার চেয়েও কঠিন। ৩৯০
রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ দোআয় ইশারা করার সময় এক আঙ্গুল দিয়ে অন্য আঙ্গুল ধরতেন। ৩৯১
রসূলুল্লাহ (সঃ) দুই তাশাহ্হুদেই অনুরূপ করতেন। ৩৯২
রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে দুই আঙ্গুল দিয়ে দোআ করতে দেখে নিজ তর্জনী দিয়ে ইশারা করে বলেন, এভাবে এক প্রকাশ কর, এক প্রকাশ কর। ৩৯৩

টিকাঃ
৩৮৬. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ, ইবনু খোযায়মাহ্。
৩৮৭. মুসলিম, আওয়ানah。
৩৮৮. আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনু খোযায়মাহ, ইবনু হিব্বان。
৩৮৯. ইমাম তাহাবী বলেন, 'দোআ করেন' এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, এটা তিনি নামাযের শেষে করতেন। কিন্তু আমি বলবো, আঙ্গুল নাড়া ও ইশারা অব্যাহত রাখা সুন্নত। কেননা, দোআ হচ্ছে, এর আগে। এটা ইমাম মালেকসহ অন্যদের মত। ইমাম আহমদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নামাযী কি আঙ্গুল দ্বারা ইঙ্গিত করবে? তিনি বলেন, অবশ্যই। (মাসায়েল আনিল ইমাম আহমদ- ইবনু হানী)
আমি বলি, এর দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তাশাহহুদে আঙ্গুল নাড়ানো, রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছ থেকে প্রমাণিত সুন্নত। ইমাম আহমদসহ হাদীসের অন্যান্য ইমামরা তা আমল করেছেন। যারা এটাকে বেহুদা কাজ মনে করে, তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে। তারা বেহুদা মনে করে আঙ্গুল নাড়ে না। অথচ তারা জানে না যে, এটা প্রমাণিত এবং তারা এর বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দেয়, যা আরবী ভাষার নিয়ম বিরোধী এবং ইমামদের বুঝ-জ্ঞানের পরিপন্থী। যারা এই জিনিসকে ঠাট্টা করে, তারা মূলত সুন্নতকেই ঠাট্টা করে এবং যা শেষ পর্যায়ে রসূলুল্লাহকে ঠাট্টা করার নামান্তর। কেননা, তিনিই তো এই সুন্নতটি চালু করেছেন। তিনি আঙ্গুল নাড়াতেন না মর্মে বর্ণিত, হাদীসের সনদ ভিত্তিহীন。
৩৯০. আহমদ, বায্যার, বায়হাকী。
৩৯১. ইবনু আবী শায়বা- সনদ উত্তম。
৩৯২. নাসাঈ, বায়হাকী- সনদ সহীহ。
৩৯৩. ইবনু আবী শায়বা, নাসাঈ, হাকেম。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 প্রথম তাশাহ্‌হুদ ওয়াজিব ও তাতে দোআ পড়া

📄 প্রথম তাশাহ্‌হুদ ওয়াজিব ও তাতে দোআ পড়া


রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রতি দুই রাকআত শেষে আত্তাহিয়্যাহ্ পড়তেন। ৩৯৪
তিনি বসে প্রথম যা পড়তেন তা হচ্ছে, আত্তাহিয়্যাতু। ৩৯৫
তিনি প্রথম দুই রাকআতের পর তা পড়তে ভুলে গেলে সহু সাজদাহ (ভুলের সাজদাহ) করতেন। ৩৯৬
তিনি আত্তাহিয়্যাতু পড়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তোমরা যখন প্রতি দ্বিতীয় রাকআতে বসবে, তখন আত্তাহিয়্যাতু... বলবে এবং আকর্ষণীয় দোআ নির্ধারণ করে আল্লাহর কাছে 'সেই দোআ করবে। ৩৯৭
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, 'প্রত্যেক বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়বে। '৩৯৮
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবায়ে কেরামকে কোরআনের সূরার মত তাশাহ্হুদ শিক্ষা দিয়েছেন। ৩৯৯
তবে তা চুপে চুপে পড়া সুন্নত।৪০০

টিকাঃ
৩৯৪. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ。
৩৯৫. বায়হাকী আয়েশা (রাঃ) থেকে উত্তম সনদ সহকারে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন。
৩৯৬. বোখারী, মুসলিম。
৩৯৭. নাসাঈ, আহমদ, আল কাবীর- তাবারানী- সনদ সহীহ。
৩৯৮. নাসাঈ- সনদ সহীহ。
৩৯৯. বোখারী, মুসলিম。
৪০০. আবু দাউদ, হাকেম এটাকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দুরূদ পাঠ, দুরূদের স্থান ও শব্দাবলী

📄 রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দুরূদ পাঠ, দুরূদের স্থান ও শব্দাবলী


রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রথম তাশাহহুদে নিজের উপর এবং অন্যদের উপর দুরূদ পড়েছেন। ৪০৬ তিনি নিজ উম্মতকেও তাঁর উপর দুরূদ পড়তে বলে গেছেন। তিনি তাঁর উপর সালাম শেষে দুরূদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ৪০৭ তিনি তাঁদেরকে দুরূদের বিভিন্ন শব্দাবলী শিক্ষা দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছেঃ
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَتِهِ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ بَيْتِهِ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
অর্থঃ হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সঃ), তাঁর পরিবার, স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির উপর দুরূদ পাঠাও যেমন করে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরের উপর দুরূদ পাঠিয়েছ। ৪০৮ তুমি নিঃসন্দেহে প্রশংসিত ও সম্মানিত। মুহাম্মদ (সঃ), তাঁর পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের উপর বরকত নাযিল কর, যেমন করে তুমি ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশের উপর বরকত নাযিল করেছ। ৪০৯ নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত।'
রসূলুল্লাহ (সঃ) এই দুরূদ পড়ে নিজের জন্যে দোআ করতেন। ৪১০
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى ابْرُهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى دده ال ابْرَهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ - ৪১২
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَآلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَآلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ৪১৩
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مجيد ৪১৪
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى الِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ ৪১৫
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَتِهِ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى الِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ৪১৬
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَآلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ৪১৭
পবিত্র কোরআন মজীদে 'আল্ ইমরান', 'আল লুত' এবং হাদীসে 'আলে আবি আওফা' একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কোন কোন দুরূদে ইবরাহীম (আঃ)-কে পরিবার থেকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, তাঁর পরিবারে প্রধানতঃ তাঁর উপরই সালাম ও দুরূদ পাঠানো হয়। তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর অধীন হিসেবে সালাম-দুরূদ লাভ করেন।
ওলামায়ে কেরামের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, রসূলুল্লাহর উপর সালাম ও দুরূদকে ইবরাহীম কিংবা আলে ইবরাহীমের সাথে কেন তুলনা করা হয়েছে? সাধারণত: তুলনীয়ের চেয়ে তুল্য শ্রেষ্ঠ হয়। সেই নিয়মে মুহাম্মদ (সঃ) থেকে ইবরাহীম (আঃ)-কে শ্রেষ্ঠ বুঝানো হয়েছে। অথচ, এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, মুহাম্মদ (সঃ) ইবরাহীম (আঃ) থেকে শ্রেষ্ঠ। সুতরাং শ্রেষ্ঠ দুরূদ ও সালাম তাঁরই পাওয়ার কথা। এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের ১০টি জওয়াব আছে। আল জালা এবং আল্ফাতহ কিতাবে তা বিস্তারিত আছে। এর মধ্যে শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনুল কাইয়েম যে জওয়াবটি পছন্দ করেছেন। তা হচ্ছে-
ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশে নবীরা রয়েছেন যা মোহাম্মদ (সঃ)-এর বংশে নেই। যখন রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জন্য ইবরাহীমের বংশের অনুরূপ দুরূদ সালামের প্রার্থনা জানানো হয় তখন মোহাম্মদ (সঃ)-এর বংশধররা তাঁদের উপযোগী দোআ' লাভ করে। যদিও তারা নবীদের মর্যাদা লাভ করে না। কিন্তু নবীদের মর্যাদা পাবেন মুহাম্মাদ (সঃ)। তাই অন্যদের পক্ষে যে মর্যাদা লাভ করা সম্ভব নয় তিনি সে মর্যাদা পাবেন।
অন্য এক জওয়াবে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ (সঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশের লোক। আলী বিন তালহা ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ইবরাহীমের বংশের শ্রেষ্ঠ লোক। তিনি সূরা আল-ইমরানের ৩৩ নং আয়াতের তাফসীরে ঐ কথা বলেন। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ আদম, নূহ, আল-ইবরাহীম ও আল-ইমরানকে গোটা বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নির্বাচন করেছেন।' ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশের 'অন্যান্য নবীরা যদি 'আল-ইবরাহীম'-এর অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে, মোহাম্মদ (সঃ)-ও সেই বংশের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এটাই স্বাভাবিক। ফলে 'আল ইবরাহীমের উপর প্রেরিত দোআয় তিনিও শরীক। আল্লাহ আমাদেরকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই পরিমাণ দুরূদ ও সালাম পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন যেই পরিমাণ গোটা 'আল-ইবরাহীমের উপর পাঠানো হয়েছে এবং মোহাম্মদ (সঃ) নিজেও সেই বংশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাঁর বংশধররা সেখান থেকে প্রাপ্ত অংশ পাওয়ার পর অবশিষ্টাংশ পাবেন। রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মূল কথা হল, আল ইবরাহীম সহ মোহাম্মদ (সঃ)-এর উপর পঠিত দুরূদ ও সালাম একা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর পঠিত দোআ দুরূদের চেয়ে ব্যাপক। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইবরাহীম (আঃ) থেকে শ্রেষ্ঠ হওয়ার বিষয়ে কোন জটিলতা থাকেনা। এই জাওয়াবের চাইতে আগের জওয়াবটি উত্তম।
২য় বিষয়: পাঠকরা দেখছেন যে, দুরূদের বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা রসূলুল্লাহ (সঃ), তাঁর স্ত্রী ও বংশধরের উপর সালাম ও দুরূদ পাঠ করা উদ্দেশ্য। তাই শুধু 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ বললে দুরূদের ক্ষেত্রে সুন্নাহ পালন হয় না। বরং উপরে বর্ণিত যে কোন একটি পূর্ণ দুরূদ পড়া জরুরী। প্রথম তাশাহহুদ কিংবা দ্বিতীয় তাশাহহুদে এর কোন পার্থক্য হবে না। ইমাম শাফেঈ তার 'আল উম্ কিতাবে লিখেছেন, 'প্রথম ও দ্বিতীয় তাশাহহুদের শব্দের কোন পার্থক্য নেই। এখানে আমার কাছে তাশাহ্ুদের অর্থ হচ্ছে, তাশাহ্ুদ এবং নবীর উপর দুরূদ পাঠ। একটা পড়লে অন্যটা অনাদায় থাকবে। উভয়টিই পড়তে হবে।'
এই যুগের আশ্চর্য বিষয় এবং বিশৃঙ্খল বিদ্যার উদাহরণ হল, মোহাম্মদ এসতাফ নাশাশিবী তার 'আল ইসলাম আস সাহীহ' বইতে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিবার-পরিজনের উপর দুরূদ পড়াকে অস্বীকার করেছেন। অথচ বোখারী ও মুসলিম শরীফসহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে একদল সাহাবা থেকে তা বর্ণিত আছে। তাদের মধ্যে কা'ব বিন ওজরাহ, আবু হোমাইদ আস-সায়েদী, আবু সাঈদ আল-খুদ্রী, আবু মাসউদ আল-আনসারী, আবু হোরায়রা, তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আমরা আপনার উপর কিভাবে দুরূদ ও সালাম পড়বো? তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে উপরোক্ত দুরূদগুলো শিক্ষা দেন। নাশাশিবীর যুক্তি হল, আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াতে শুধু রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দুরূদ ও সালাম পাঠ করতে বলেছেন, তাঁর বংশধরের উপর নয়। আয়াতটি হচ্ছে:
صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
অর্থঃ "তোমরা তাঁর (নবীর) উপর দুরূদ ও সালাম পাঠ কর।" তারপর নাশাশিবী আরো বাড়াবাড়ি করে প্রশ্ন করেছেন, সাহাবারা রসূলুল্লাহকে ঐ প্রশ্ন করেননি। কেননা তাদের কাছে দুরূদের অর্থ যে দোআ' তা পরিস্কার। কিভাবে তাঁরা ঐ প্রশ্ন করে থাকবেন? এটা নাশাশিবীর প্রকাশ্য ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, তাঁরা তাঁকে দুরূদের (সালাতের) অর্থ জিজ্ঞেস করেননি বরং দুরূদের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আগে উল্লেখিত বর্ণনাগুলো তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। ফলে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পদ্ধতিগত বৈধতা জানার জন্য শরীয়তের বাহককে জিজ্ঞেস করাই স্বাভাবিক। যেমনভাবে 'তোমরা নামায কায়েম কর।' এই আয়াতের মর্মানুযায়ী নামাযের পদ্ধতি সম্পর্কে জানার জন্য প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। কেননা, তাদের কাছে সালাতের মূল অর্থ জানা থাকা সত্ত্বেও সালাত কায়েমের নির্দেশ নাজিলের পর এর পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশ্ন না করে উপায় ছিল না।
নাশিশিবীর উপরোল্লিখিত যুক্তির কোন মূল্য নেই। কেননা, মুসলমানরা জানে, নবী (সঃ) আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যাদাতা। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন: "আমি আপনার কাছে কোরআন নাজিল করেছি, আপনি লোকদের কাছে অবতীর্ণ বিষয়সমূহের ব্যাখ্যা করবেন।" (সূরা নাহল-৪৪) সুতরাং রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে দুরূদের মধ্যে 'আল-মোহাম্মদ' শিক্ষা দিয়েছেন। ফলে এটা গ্রহণ করা ওয়াজিব। কেননা, আল্লাহ বলেছেন: "রসূল তোমাদের কাছে যা নিয়ে আসে তা গ্রহণ কর" (সূরা হাশর-৭) হাদীসে মশহুরে আছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমাকে কোরআন এবং এর সমতুল্য আরেকটি জিনিসও দেয়া হয়েছে। (মেশকাত)
আমি জানিনা, নাশিশিবী সহ তার কথায় বিভ্রান্ত লোকেরা নামাযে তাশাহুদকে অস্বীকারকারী কিংবা ঋতুবর্তী মহিলার নামায-রোযা প্রয়োজন নেই এই কথা অস্বীকারকারীর কি জবাব দেবেন? কেননা, অস্বীকারকারীর যুক্তি হল, কোরআনে তাশাহহুদের কথা উল্লেখ নেই, শুধু কেয়াম, রুকু ও সাজদার উল্লেখ আছে। আল্লাহ কোরআনে ঋতুবতী রমনীর নামাজ-রোযা বাদ দেয়ার কথা উল্লেখ করেননি। তাই ঋতুবতী মহিলার উচিত, নামায-রোযা করা। তারা কি উপরোক্ত অস্বীকারকারীর সাথে একমত হবেন, নাকি দ্বিমত পোষণ করবেন? তারা যদি ১ম মত পোষণ করেন তাহলে তারা গোমরাহ ও মুসলমানের দল থেকে বেরিয়ে যাবেন। আর যদি ২য় মত পোষণ করেন তাহলে, তারা সত্যের উপর আছেন। তারা অস্বীকারকারীকে যে জওয়াব দেবেন, নাশিশিবীর জন্য আমাদেরও একই জওয়াব। আমরা এর কারণ, বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। হে মুসলমানগণ! হাদীসকে বাদ দিয়ে কোরআন বুঝার চেষ্টা ত্যাগ করুন। আপনাদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এমনকি আপনি আরবী ভাষায় যুগের সিবওয়াই হলেও তা সম্ভব নয়। আপনাদের সামনে এই উদাহরণটি যথেষ্ট। কেননা, নাশিশিবী বর্তমান শতাব্দীর বড় আলেমদের অন্যতম। তিনি আরবী ভাষায় পাণ্ডিত্যের কারণে গোমরাহ হয়ে গেছেন। তিনি কোরআন বুঝার জন্য হাদীসের সাহায্য নেননি। বরং তিনি হাদীসকে অস্বীকার করেছেন।
৩য় বিষয় : পাঠকরা লক্ষ্য করে থাকবেন, উপরোল্লিখিত দুরূদের মধ্যে 'সাইয়েদ' শব্দের উল্লেখ নেই। সেজন্য পরবর্তী যুগের আলেমরা দুরূদে ইবরাহীমির মধ্যে এই শব্দের সংযোজনের ব্যাপারে মতভেদ পোষণ করেছেন। যারা এই শব্দ যোগ করাকে নাজায়েয বলেছেন, তাদের যুক্তি হল, রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশের পূর্ণ অনুসরণের স্বার্থেই ঐ শব্দটি যোগ করা যাবেনা। কেননা, তাঁকে যখন দুরূদ পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি ঐ শব্দটি ব্যতীত দুরূদ পড়ার নির্দেশ দেন।
কাদী আয়ায তাঁর 'আশ-শিফা' কিতাবে সাহাবা ও তাবেঈন থেকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দরুদ পাঠের কয়েকটা বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তাতে সাইয়েদ শব্দের উল্লেখ নেই।
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে নিম্নোক্ত দুরূদ পড়া শিক্ষা দিয়েছেন:
اللَّهُمَّ دَاحِيَ الْمَدْحُوَاتِ وَبَارِيَ الْمَسْمُو كَاتِ اجْعَلْ سَوَابِقَ صَلَوَاتِكَ وَنَوَامِيَ بَرَكَاتِكَ وَزَائِدَ تَحِيَّتِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ الْفَاتِحِ لِمَا أَغْلَقَ -
আলী (রাঃ) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত, আছে। তিনি পড়তেন:
صَلَوَاتُ اللهِ الْبِرِّ الرَّحِيمِ وَالْمَلَائِكَةِ الْمُقَرَّبِينَ وَالنَّبِيِّينَ الصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ الصَّلِحِينَ وَمَا سَبَحَ لَكَ مِنْ شَيْ يَارَبَّ الْعَالَمِينَ عَلَى مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ خَاتَمِ النَّبِيِّينَ وَإِمَامِ الْمُتَّقِينَ.
(হাদীসের শেষ পর্যন্ত)
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি পড়তেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلَواتِكَ وَبَرَكَاتِكَ وَرَحْمَتِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ اِمَامِ الْخَيْرِ وَرَسُولِ الرَّحْمَةِ . (হাদীসের শেষ পর্যন্ত)
হাসান বসরী থেকে বর্ণিত: তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি রসলুল্লাহ (সঃ)-এর হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করতে চায় সে যেন বলে:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَأَزْوَاجِهِ وَأَوْلَادِهِ وَذُرِّيَّتِهِ وَاهْلِ بَيْتِهِ وَأَصْهَارِهِ وَأَنْصَارِهِ وَأَشْيَاعِهِ وَمُحِبِّيْهِ .
তবে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে ইবনে মাজায় সাইয়েদ শব্দের উল্লেখসহ একটি দুরূদ বর্ণিত হয়েছে এর সনদ দুর্বল। দুরূদটি হচ্ছে:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فَضَائِلَ صَلَوَاتِكَ وَرَحْمَتِكَ وَبَرَكًا تِكَ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ -
উপরোক্ত আলোচনায় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, কোন দুরূদে সাইয়েদ শব্দের উল্লেখ নেই। যেমন,
اللَّهُمَّ صَلَّى عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وعلى آلِ سَيِّدِ الْخَلْقِ وعلى سيد ولد آدم
ইত্যাদি নেই। যদি 'সাইয়েদ' শব্দের উল্লেখ মোস্তাহাব বা পছন্দনীয় হত তাহলে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও ইমামদের কাছে তা গোপন থাকত না। সঠিক অনুসরণের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। অথচ সাহাবা ও তাবেঈ কিংবা অন্য কারোর কাছ থেকে ঐ জাতীয় কোন হাদীস বা বর্ণনা পাওয়া যায় না। যদিও দুরূদের ব্যাপারে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে।
কিন্তু শাফেঈ' মাযহাবের পরবর্তী আলেমদের মধ্যে দুরূদে সাইয়েদ শব্দের সংযোজন দেখতে পাওয়া যায়। অথচ, শাফেঈ' মাযহাবের বড় আলেম ইবনে হাজার আসকালানী তাকে নাজায়েয বলেছেন। হানাফী মাযহাবের মতও তাই। আর এটাকেই আঁকড়ে ধরা দরকার। কেননা, এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি সত্যিকার ভালবাসা। আল্লাহ বলেছেন: 'হে নবী! আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তাহলে, আমাকে অনুসরণ কর, ফলে, আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন। (আল-এমরান-৩১)
তাই ইমাম নওয়ী বলেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর উপর সর্বাধিক পরিপূর্ণ দুরূদ উপরে বর্ণিত ৩নং দুরূদ। তাতে 'সাইয়্যেদ' শব্দের উল্লেখ নেই।
(আররাওদাহ- ১ম খণ্ড, ২৬৫ পৃঃ)
৪র্থ বিষয়: উপরে বর্ণিত ১ম ও ৪র্থ দুরূদ রসূলুল্লাহ (সঃ) শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম যখন প্রশ্ন করেন, আমরা কিভাবে আপনার উপর দুরূদ পাঠ করবো। তখন তিনি তাদেরকে ঐ দুরূদ শিক্ষা দেন। এই কারণে এই দু'টো দুরূদকে সর্বোত্তম দুরূদ বলা হয়। কেননা, রসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের জন্য এবং নিজের জন্য সর্বোত্তম দুরূদটিই নির্বাচন-করবেন। তাই ইমাম নওয়ী তাঁর 'আর-রাওদাহ' কিতাবে বলেছেন। কেউ যদি রসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর সর্বোত্তম দুরূদ পড়ার কসম করে তাহলে, উপরোক্ত ২টি দুরূদের যে কোন একটা না পড়লে তার কসম পুরো হবে না। আল্লামা আস্সাবকী বলেছেন, যে উপরোল্লিখিত দুরূদ পাঠ করে, সে নিশ্চিতভাবেই রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দুরূদ পাঠ করেছে। আর যারা অন্য দুরূদ পাঠ করে তাদের দুরূদ আদায়ের ব্যপারে সন্দেহ আছে। কেননা, সাহাবায়ে কেরাম যখন জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কিভাবে দুরূদ পাঠ করবো, তখন তিনি তাদেরকে এই পদ্ধতি শিক্ষা দেন এবং বলেন, এভাবে ........ পাঠ করবে। তিনি তাঁর উপর কিভাবে দুরূদ পাঠ করতে হবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
আল্লামা আল-হায়সামী 'আদদোরুল মানদুদ' কিতাবের ২য় খণ্ডের ২৫ পৃষ্ঠায় এবং ১ম খণ্ডের ২৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে উপরে বর্ণিত, যে কোন দুরূদ পাঠ করলে তা আদায় হয়ে যাবে।
৫ম বিষয়: উপরে বর্ণিত, দুরূদগুলোর মধ্যে যে কোন একটাকে নির্দিষ্ট করে নেয়া বৈধ নয়। অনুরূপভাবে তাশাহহুদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। বরং তা হচ্ছে, বিদআহ। সুন্নাহ হচ্ছে, এটা একবার এবং অন্যাটা আরেকবার পড়া। শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া দুই ঈদের তাকবীর অধ্যায়ে অনুরূপ রায় দিয়েছেন। (মাজমুউল ফাতাওয়া-১ খণ্ড ২৫৩ পৃঃ)
৬ষ্ঠ বিষয়: আল্লামা সিদ্দিক হাসান খান তাঁর নুযুলুল আবরার বিল এলমিল মাসুর মিনাল আদইয়া ওয়াল আজকার' বইয়ের ১১৬ পৃষ্ঠায় রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর দুরূদ পড়ার ফযীলত এবং অধিক দুরূদ পড়া সংক্রান্ত অনেক হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন: মোহাদ্দেস এবং হাদীসের বর্ণনাকারীরাই রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর সর্বাধিক দুরূদ পাঠ করেন। তাঁরা প্রত্যেক হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর দুরূদ পাঠ করেন। তাদের জিহবা সর্বদা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর স্মরণে ভিজা থাকে। প্রত্যেক হাদীসের কিতাবে হাজার হাজার হাদীস উল্লেখিত আছে। সবচেয়ে ছোট হাদীসের কিতাব হচ্ছে, আল্লামা সুয়ূতীর 'আল-জামে' আস সাগীর'। তাতে ১০ হাজার হাদীস আছে। এর উপর অন্যান্য হাদীসের কিতাবের অনুমান করা যায়। কেয়ামতের দিন রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে হাদীসের সেবাকারী এই মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি সুপারিশ লাভ করে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান হবে। কোন লোক তাদের সমান ফযীলত লাভ করতে পারেন না। তবে তাদের চেয়ে উত্তম কাজের লোকেরাই শুধু তা লাভ করতে পারে। হে কল্যাণকামী ও মুক্তি অন্বেষণকারী! তুমি মোহাদ্দেসীনদের কাছে হাস্যকর হয়ো না। তা না হয় তোমার ....। এতে তোমার কল্যাণ নেই। আমি আল্লাহর কাছে দোআ করি তিনি যেন আমাকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে উত্তম মোহাদ্দেসদের অন্তর্ভূক্ত করেন। এই কিতাবটি এই বিষয়ের সুন্দর পথপ্রদর্শক।

টিকাঃ
৪০৬. আবু আওয়ানা, নাসাঈ。
৪০৭. সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার উপর সালাম পাঠের পদ্ধতি শিখেছি, কিন্তু দুরূদ কিভাবে পাঠ করবো? তখন তিনি তাঁদেরকে দুরূদ শিক্ষা দেন। এই হাদীসসহ অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রথম তাশাহহুদেও দুরূদ পড়া প্রমাণিত হয়। কেননা, তাতে বিশেষ কোন তাশাহ্হুদকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। এটা ইমাম শাফেঈসহ হাম্বলী মাযহাবের কিছু আলেমের মত। যারা প্রথম তাশাহহুদের পর দুরূদ পড়া মাকরূহ বলেন, তাদের সপক্ষে হাদীসের কোন দলীল প্রমাণ নেই। বরং তারা হাদীসের বিরোধী কথাই বলেন。
৪০৮. আবুল আলিয়া সালাত (দূরূদ) অর্থ প্রসঙ্গে বলেছেন, নবীর উপর আল্লাহর দুরূদ পড়ার অর্থ হল প্রশংসা ও সম্মান করা। নবীর উপর ফেরেশতাসহ অন্যদের দুরূদ পড়ার অর্থ হল, সম্মান ও প্রশংসা বাড়িয়ে দেয়ার দোআ করা। (আল-ফাতহ-হাফেয) তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দুরূদের প্রসিদ্ধ অর্থ রহমতকে অস্বীকার করে উপরোক্ত অর্থ গ্রহণ করেছেন। ইবনুল কাইয়েম বিষয়টি 'জালাউল ইফহাম' গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন。
৪০৯. বরকত অর্থ বৃদ্ধি ও প্রাচুর্য। বরকতের দোআর অর্থ হল, ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধরকে যত কল্যাণ দেয়া হয়েছে, মুহাম্মদ (সঃ)-কেও যেন সে রকম বহুগুণ কল্যাণ দান করা হয়。
৪১০. আহমদ, তাহাবী-সনদ সহীহ。
৪১১. বোখারী, তাহাবী, বায়হাকী, আহমদ, নাসাঈ। ইবনুল কাইয়েম ইবনে তাইমিয়ার অনুসরণে 'ইবরাহীম ওয়াআলা আলে ইবরাহীম' এক সাথে বর্ণিত নেই বলে যে দাবী করেছেন তা ঠিক নয়। বরং এটা ভুল। ৩ ও ৭ নং দুরূদেও তা আছে যা বিভিন্ন সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে。
৪১২. বোখারী, মুসলিম, হোমায়দী। ইবনু মান্দাহ এটাকে সহীহ হাদীস বলেছেন。
৪১৩. আহমদ, নাসাঈ, আবু ইয়ালী- সনদ সহীহ。
৪১৪. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ্, ইবনু আবী শায়বা, আবু দাউদ। হাকেম এটাকে সহীহ বলেছেন。
৪১৫. বোখারী, নাসাঈ, তাহাবী, আহমদ。
৪১৬. বোখারী, মুসলিম。
৪১৭. তাহাবী, আল মো'জাম- আবু সাঈদ বিন আল আরাবী- সনদ সহীহ। আল জালা- ইবনুল কাইয়েম। মুহাম্মদ বিন ইসহাক এটাকে সহীহ বলেছেন। আমি বলি, এই দুরূদে 'ইবরাহীম' ও গালে ইবরাহীম' এক সাথে বর্ণিত আছে। অথচ ইবনুল কাইয়েম ইবনে তাইমিয়ার অনুসরণে তা অস্বীকার করেছেন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00