📄 সাজদায় প্রশান্তি লাভ করা
রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি রুকু ও সাজদাহ অপূর্ণকারীকে ঐ ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মতো বলেছেন, যে ক্ষুধার সময় একটি বা দু'টো খেজুর খায়, কিন্তু তাতে তার ক্ষুধা দূর হয় না। তিনি আরো বলেছেন, এ জাতীয় লোক খুবই নিকৃষ্ট চোর।
তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না, তার নামায বাতিল। রুকু অধ্যায়ে এ সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও তিনি ভুল নামায আদায়কারী ব্যক্তিকে প্রশান্তির সাথে ধীরস্থিরভাবে নামায পড়ার আদেশ দিয়েছেন।
📄 সাজদার যিকর
রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের এই গুরুত্বপূর্ণ রোকনটিতে বিভিন্ন প্রকার দোআ ও যিকর করেছেন। অর্থাৎ একেক সময় একেকটা পাঠ করেছেন। তিনি সাজদায় যা পড়েছেন, তা হচ্ছে নিম্নরূপ:
১. سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى - তিনবার পড়তেন। ৩২৪
আবার কখনও আরও বেশী পড়তেন। ৩২৫
তিনি একবার রাতের নামাযে তা এত বেশী সময় পড়েছেন যা কেয়ামের সময়ের সমান ছিল। তিনি ঐ নামাযের কেয়ামে তিনটি লম্বা সূরা পড়েছেন এবং সেগুলোর মাঝে মাঝে দোআ এবং এস্তেগফার করেছেন। সূরাগুলো হল, সূরা বাকারা, সূরা নিসা এবং সূরা আলে-ইমরান। 'রাতের নামায' অধ্যায়ে তা আলোচনা করা হয়েছে।
২. سُبْحَانَ رَبِّي الأَعْلَى وَبِحَمْدِهِ - তিনবার পড়তেন। ৩২৬
৩. سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوْحِ - কখনও এরূপ পড়তেন। ৩২৭
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র মোবারক, সকল ফেরেশতা এবং জিবরীলের প্রতিপালক।
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي .
৪. অর্থ: হে আল্লাহ, হে আমাদের রব! তোমার পবিত্রতা ও প্রশংসা। হে আল্লাহ্! আমাকে মাফ কর।
তিনি এটি রুকু ও সাজদায় অনেক বেশী পড়তেন। ৩২৮
আগেও এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
اللهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ وَبِكَ أَمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَأَنْتَ رَبِّي سَجَدَ
৫. وَجْهِيَ لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصَوَّرَهُ فَأَحْسَنَ صُوَرَهُ وَشَقَ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
অর্থঃ হে আল্লাহ্! আমি তোমার জন্যই সাজদাহ করছি, তোমার প্রতিই ঈমান এনেছি, তোমার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছি। তুমি আমার রব। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, সুন্দর আকৃতি দান করেছেন এবং চোখ ও কান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আমার মুখমণ্ডল তাঁর কাছে সাজদা অবনত। আল্লাহ বরকতময় এবং সর্বোত্তম স্রষ্টা। ৩২৯
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ وَدِقَهُ وَجِلَّهُ وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ وَعَلَانِيَتَهُ .
৬. وسره
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমার সকল সূক্ষ্ম ও বাহ্যিক, প্রথম ও শেষ এবং প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহ মাফ কর। ৩৩০
سَجَدَ لَكَ سَوَادِي وَخِيَالِي وَآمَنَ بِكَ فَؤَادِي أَبُوءُ بِنِعْمَتِكَ .
৭. عَلَى هُذِهِ يَدِي وَمَا جَنَبْتٌ عَلَى نَفْسِي
অর্থ: আমার মন-মগয তোমার উদ্দেশ্যে সাজদাহ করছে, আমার অন্তর তোমার প্রতি ঈমান এনেছে, আমি আমার উপর তোমার নেয়ামত স্বীকার করি। এই আমার হাত, আমি যে সকল অপরাধ করেছি তাও স্বীকার করি। ৩৩১
سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمَلَكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ .
অর্থঃ সেই আল্লাহ্র পবিত্রতা, যিনি ক্ষমতা, বাদশাহী শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের অধিকারী। ৩৩২
নিম্নলিখিত দোআগুলো রাত্রের নামাযে পড়তেন-
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ ..
অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার পবিত্রতা ও প্রশংসা, তুমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। ৩৩৩
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ .
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমার গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ মাফ কর। ৩৩৪
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا وَفِي لِسَانِي نُورًا وَاجْعَلْ فِي . دد سَمْعِي نُورًا وَاجْعَلْ فِي بَصَرِى نُورًا وَاجْعَلْ مِنْ تَحْتِى نُورًا وَاجْعَلْ مِنْ فَوْقِي نُورًا وَعَنْ يَمِينِى نُورًا وَعَنْ يَسَارِي نُوْرًا وَاجْعَلْ أَمَا مِي نُورًا وَاجْعَلْ خَلْفِى نُورًا وَاجْعَلْ فِى نَفْسِي نُورًا وَاعْظِمْ لِي نُوْرًا -
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার অন্তর, জিহবা, কান, চোখ, নীচে, উপরে, ডানে-বাঁয়ে, সামনে- পিছে এবং দেহে নূর (আলো) দান কর এবং আমার নূরকে মহান করে দাও। ৩৩৫
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَأَعُوذُ بِمُعَافَاتِكَ مِنْ . عقُوبَتِكَ وَاعُوذُبِكَ مِنْكَ لَا أُحْصِى ثَنَاءٌ عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا اثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ -
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির বিনিময়ে তোমার অসন্তোষ থেকে পানাহ চাই, তোমার ক্ষমা দ্বারা তোমার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই এবং তোমার ওসীলায় তোমার কাছে পানাহ চাই। তুমি নিজে নিজের যে রকম প্রশংসা করেছ আমি তোমার সে রকম প্রশংসা করতে অপারগ। ৩৩৬
টিকাঃ
৩২৪. আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারু কুতনী, তাহাবী, বাযযার। তাবারানী ৭জন সাহবী থেকে তা বর্ণনা করেছেন。
৩২৫. ঐ。
৩২৬. আবু দাউদ, দারু কুতনী, আহমদ, তাবারানী, বায়হাকী। হাদিসটি সহীহ。
৩২৭. মুসলিম, আর আ'ওয়ানাহ。
৩২৮. বোখারী, মুসলিম。
৩২৯. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ, তাহাবী, দারু কুতনী。
৩৩০. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ。
৩৩১. ইবনু নসর, বায্যার। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন。
৩৩২. আবু দাউদ, নাসাঈ সনদ সহীহ
৩৩৩. মুসলিম, আবু আওয়ানা, নাসাঈ, ইবনু নসর。
৩৩৪. ইবনু আবী শায়বাহ, নাসাঈ। হাকেম এটাকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন。
৩৩৫. মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা, ইবনু আবী শায়বা。
📄 সাজদায় কোরআন পড়া নিষিদ্ধ
রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু ও সাজদায় কোরআন পড়তে নিষেধ করেছেন। বরং তিনি সাজদায় অধিকতর দোআ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমর্মে একটি হাদীস রুকু অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
তিনি বলেছেন, বান্দাহ সাজদাহ অবস্থায় আল্লাহর বেশী নিকটবর্তী হয়। তোমরা সাজদায় বেশী বেশী করে দোআ কর। ৩৩৭
টিকাঃ
৩৩৬. ঐ。
৩৩৭. মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা, বায়হাকী。
📄 সাজদাহ দীর্ঘায়িত করা
রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকুর মত দীর্ঘ সাজদাও করতেন। কখনো কখনো আকস্মিক কারণে সাজদাহ তিনি অতিমাত্রায় দীর্ঘায়িত করতেন।
এক সাহাবী বর্ণনা করেন, একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) বিকেলের (আসর কিংবা মাগরিব) নামাযের জন্য সাথে হাসান কিংবা হোসাইনকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। নবী (সঃ) ইমামতির জন্য অগ্রসর হন এবং তাকে ডান পায়ের কাছে রাখেন। তারপর তাকবীর বলে নামায শুরু করেন। তিনি সাজদাহ করেন এবং তা খুব দীর্ঘায়িত করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি মুসল্লীদের মাঝে মাথা তুলে দেখি, শিশুটি রসূলুল্লাহর পিঠের উপর এবং তিনি সাজদারত। আমি পুনরায় সাজদায় ফিরে যাই। রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায শেষে লোকেরা জিজ্ঞেস করে, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আপনার এই নামাযের মধ্যে একটি দীর্ঘ সাজদাহ দিয়েছেন যার ফলে আমাদের মনে দুর্ঘটনার আশংকা জেগেছে, কিংবা ধারণা করেছিলাম যে, আপনার উপর ওহী নাযিল হচ্ছিল। তিনি উত্তরে বলেন, এগুলো কিছুই ঘটেনি। আমার সন্তানটি আমার উপর আরোহণ করায় আমি তাকে তার সখ পূরণের আগে দ্রুত নামিয়ে দিতে পছন্দ করিনি। ৩৩৮
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সঃ) যখন নামায পড়েন, তখন হাসান ও হোসাইন তাঁর পিঠে আরোহন করে। লোকেরা যখন শিশু দু'টিকে আরোহণ করতে নিষেধ করেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইশারা দেন যে, তাদের বিষয়টা ছেড়ে দাও। নামায শেষে তিনি দুজনকে নিজের কোলে বসান এবং বলেন, যে আমাকে ভালবাসে, সে যেন এই দুজনকেও ভালবাসে। ৩৩৯
টিকাঃ
৩৩৮. নাসাঈ, ইবনু আসাকির। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী একে সমর্থন করেছেন。
৩৩৯. ইবনু খোযায়মাহ, বায়হাকী। বোখারী ও মুসলিম শরীফে এ বিষয়ে আরও হাদীস আছে。