📄 রুকু
রসূলুল্লাহ (সঃ) কেরাআত শেষ করার পর সামান্য একটু অপেক্ষা করতেন। ২৪৫
তারপর তিনি তাকবীরে তাহরীমার সময়ের মত উপরের দিকে দুই হাত তুলতেন এবং তাকবীর বলতেন ও রুকুতে যেতেন। ২৪৬
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: আল্লাহর আদেশ মোতাবেক ভাল করে উযু না করলে তোমাদের নামায পরিপূর্ণ হবে না। তারপর তাকবীর বলবে এবং আল্লাহর হামদ ও মর্যাদা প্রকাশ করবে। এরপর আল্লাহ যেভাবে আদেশ দিয়েছেন, সেভাবে কোরআন থেকে কেরাআত পাঠ করবে। পরে তাকবীর বলবে ও রুকুতে যাবে। দু'হাত হাঁটুর উপর এমনভাবে রাখবে যেন জোড়াগুলো ঢিলা-ঢালা থাকে। ২৪৭
টিকাঃ
২৪৫. আবু দাউদ। হাকেম একে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ অন্যরা ঐ অপেক্ষার পরিমাণ সম্পর্কে বলেছেন, তা শ্বাস নেয়ার পরিমাণ সমতুল্য。
২৪৬. বোখারী, মুসলিম,। রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে উঠার সময় দু'হাত তোলার ব্যাপারে মোতাওয়াতের বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ বহু সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা তা বর্ণিত হয়েছে। তিন ইমাম, অধিকাংশ মোহাদ্দেস ও ফকীহ এবং ইমাম আবু ইউসুফের ছাত্র ইসাম বিন ইউসুফ আবু ইসমাহ বলখী সহ কিছু হানাফীর মাযহাবও এটাই। ওকবাহ বিন আমের হাত তোলার ব্যাপারে বলেছেন, প্রতি বারের ইশারায় ১০ নেকী পাওয়া যায়。
২৪৭. আবু দাউদ, নাসাঈ। হাকেম একে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী সমর্থন করেছেন。
📄 রুকুর পদ্ধতি
রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকুতে দুই হাঁটুর উপর দুই হাতের তালু রাখতেন। ২৪৮ এবং লোকদেরকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ২৪৯
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরতেন। ২৫০
তিনি আঙ্গুল ফাঁক করে রাখতেন। ২৫১
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন: তুমি যখন রুকুতে যাবে, তখন তোমার দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখবে এবং আঙ্গুলগুলো ফাঁক রাখবে। তারপর একটু থামবে যে পর্যন্ত না প্রত্যেক অঙ্গ তার নিজ স্থান আঁকড়ে ধরে। ২৫২
তিনি দুই কনুই দুই পাঁজর থেকে দূরে রাখতেন। ২৫৩
তিনি রুকুতে গেলে পিঠ সমান ভাবে বাঁকাতেন। ২৫৪
এমন কি পিঠে পানি ঢেলে দিলে তা যেন সমান ভাবে স্থির হয়ে থাকবে। ২৫৫
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন, তুমি যখন রুকুতে যাবে, তখন তোমার দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখ, তোমার পিঠ সমানভাবে বাঁকাও এবং শক্তভাবে রুকু কর। ২৫৬
তিনি পিঠ থেকে মাথা উঁচু-নীচু করতেন না। ২৫৭
বরং মাথা পিঠ বরাবর সমান রাখতেন। ২৫৮
টিকাঃ
২৪৮. বোখারী, আবু দাউদ。
২৪৯. ঐ
২৫০. বোখারী, মুসলিম。
২৫১. হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。
২৫২. ইবনু খোযায়মাহ, ইবনু হিব্বান。
২৫৩. তিরমিযী। ইবনু খোযায়মাহ একে সহীহ বলেছেন。
২৫৪. বায়হাকী-সনদ সহীহ, বোখারী。
২৫৫. আল-কবীর ওয়াস্সাগীর-তাবারানী, যাওয়ায়েদ আল-মোসনাদ আবদুল্লাহ বিন আহমদ, ইবনু মাজাহ。
২৫৬. আহমদ, আবু দাউদ-সনদ সহীহ。
২৫৭. আবু দাউদ, বোখারী-কেরাআত অধ্যায়-সনদ সহীহ。
২৫৮. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ。
📄 ধীরস্থিরভাবে রুকু করা ওয়াজিব
রসূলুল্লাহ (সঃ) ধীরস্থিরভাবে রুকু করতেন এবং ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমরা রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ কর। আল্লাহর শপথ, আমি আমার পেছনে তোমাদের রুকু ও সাজদাহ দেখি। ২৫৯
তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে রুকু পরিপূর্ণ করছে না এবং সাজদাহ ঠিকমত না করে ঠোকর দিচ্ছে। তখন তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি ঐ অবস্থায় মারা গেলে উম্মতে মোহাম্মদ হিসেবে বিবেচিত হবে না। সে নামাযে কাকের মত ঠোকর দিচ্ছে। যে ব্যক্তি রুকু পরিপূর্ণ করে না এবং সাজদায় ঠোকর মারে, তার উদাহরণ হল সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মত, যে একটি বা দু'টি খেজুর খায়, কিন্তু তাতে তার কোন লাভ হয় না। ২৬০ (অর্থাৎ ক্ষুধা দূর হয় না)।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে নামাযে মোরগের মত ঠোকর দিতে, শিয়ালের মত এদিক-ওদিক তাকাতে এবং বানরের মত চার পায়ের উপর বসতে নিষেধ করেছেন। ২৬১.
রসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন, নামায-চোর হচ্ছে সর্ব নিকৃষ্ট চোর। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, কিভাবে নামায চুরি হয়? তিনি বলেন, রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ না করা। ২৬২.
একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়া অবস্থায় নিজ চোখের কোণ দ্বারা এমন এক ব্যক্তিকে ইশারা করলেন, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সমানভাবে সোজা করেনি। নামায শেষে তিনি বললেন, হে মুসলিম সমাজ! সে ব্যক্তির নামায হয় না, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না। ২৬৩
অন্য এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা ও সমান না করলে কোন ব্যক্তির নামায হয় না। ২৬৪
টিকাঃ
২৫৯. বোখারী, মুসলিম। নামাযের মধ্যে পেছনে দেখা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোজেযা ছিল। অন্যান্য সময় পেছনে দেখার কথা এখানে বলা হয়নি。
২৬০. মোসনাদ-আবু ইয়া'লী, বায়হাকী, তাবারানী, ইবনু আসাকির, ইবনু খোযায়মাহ। সনদ সহীহ。
২৬১. আহমদ, ইবনু আলী শায়বা, আত্মায়ালিসী। হাদীসটি উত্তম。
২৬২. ইবনু আবী শায়বা, তাবারানী। হাকেম এটিকে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。
২৬৩. ইবনু আবী শায়বা, ইবনু মাজাহ, আহমদ। সনদ সহীহ。
২৬৪. আবু আ'ওয়ানা, আবু দাউদ, আস্সাহমী। দারু কুতনী একে সহীহ বলেছেন。
📄 রুকুর যিকর
রসূলুল্লাহ (সঃ) এই রোকনটি আদায়ের সময় বিভিন্ন রকম যিকর ও দোআ পাঠ করতেন। কোন সময় একটা, কোন সময় অন্যটা। তিনি যা বলতেন, তা হচ্ছে নিম্নরূপ:
১. তিন বার সোবহানা রাব্বিয়াল আযীম। ২৬৫ অর্থ: 'আমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি।' তিনি কখনও এ বাক্য তিন বারেরও বেশী পড়তেন। ২৬৬ একবার রাতের নামাযে তিনি এই তাসবীহটি এত বেশী পড়লেন রুকুর সময় প্রায় দাঁড়ানোর সময়ের সমান হয়ে যায়। ঐ রাকআতে তিনি তিনটি লম্বা সূরা পড়েছিলেন। সেগুলো হচ্ছে, সূরা বাকারা, সূরা নিসা ও সূরা আলে-ইমরান। সেই রাকাতে তিনি মাঝে মাঝে দোআ ও গুনাহ মাফ চেয়েছেন। রাতের নামায অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
২. তিনবার সোবহানা রাব্বিয়াল আযীম ওয়া বিহামদিহী ২৬৭ অর্থ: আমার মহান রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি।
৩. কখনও নিচের বাক্যটি তিনবার পড়তেন: ২৬৮
سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ -
অর্থ: 'আল্লাহ পবিত্র ও মোবারক, তিনি সকল ফেরেশতা এবং জিবরাঈলের রব।'
৪. তিনি এই দোআটি রুকু ও সাজদায় বেশি বেশি পড়তেন। ২৬৯
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي -
অর্থ: 'মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা, হে আল্লাহ! আমাকে মাফ কর।'
৫. কখনও পড়তেন: ২৭০.
اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ أَنْتَ رَبِّى خَشَعَ لَكَ سَمْعِى وَبَصَرِى وَمُخِّى وَعَظَمِي وَعَصَبِي وَمَا اسْتَقَلَّتْ بِهِ قَدَمِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ -
অর্থঃ "হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য রুকু করেছি তোমার প্রতি ঈমান এনেছি, তোমার কাছে আত্মসর্মপণ করেছি, তোমার উপর নির্ভর করেছি, তুমি আমার রব! তোমার জন্য আমার কান, চোখ, মগয, হাড় ও শিরা বিনীত। আমার পা যতবার উপরের দিকে উঠে, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্যই উঠে।"
৬. তিনি এই দোয়াও পড়তেন: ২৭১
سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمَلَكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ -
অর্থঃ "সেই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, যিনি শাস্তি, বাদশাহী, শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী।" তিনি রাতের নামাজে এ দোআ পড়েছেন।
টিকাঃ
২৬৫. আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, দারু কুতনী, তাহাবী, বাযযার। তাবারানী ৭জন সাহাবী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ যারা তিন তাসবীহর সংখ্যা অস্বীকার করেন এই হাদীস তাদের জন্য উত্তম জওয়াব。
২৬৬. নবী করীম (সঃ) কর্তৃক কেয়াম, রুকু ও সাজদা সমানহারে দীর্ঘায়িত করার হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত। হাদীসটি এ অনুচ্ছেদের শেষে বর্ণিত হবে。
২৬৭. আবু দাউদ, দারু কুতনী, আহমদ, তাবারানী, বায়হাকী。
২৬৮. মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা。
২৬৯. তিনি সূরা নাসরের আদেশ অনুযায়ী এই দোআ পড়তেন। তাতে আদেশ করা হয়েছে, আপনি আপনার রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করুন এবং ক্ষমা চান。
২৭০. মুসলিম, আবু আওয়ানাহ, তাহাওয়ী দারু কুতনী。
২৭১. আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ সহীহ। একই রুকুতে উপরোল্লিখিত সকল দোআ' ও যিকর এক সাথে পড়া জায়েয কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইবনুল কাইয়েম যাদুল মাআদ গ্রন্থে এব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নববী বলিষ্ঠভাবে তাকে জায়েয বলেছেন। তিনি তাঁর 'আযকার' গ্রন্থে লিখেছেন, সম্ভব হলে সকল দোআ একই সাথে পড়া উত্তম। কিন্তু 'নায়লুল আবরার' গ্রন্থে আবুত্ তাইয়্যেব সিদ্দীক হাসান খান বলেছেন: 'রসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় একটা পড়েছেন। সবগুলো একত্রে পড়েননি। বেশ-কম না করে তাঁর হুবহু অনুসরণ করাই উত্তম। একথা বিশুদ্ধ বলে আমার মনে হয়। তবে দীর্ঘ রুকু সহ রসূলুল্লাহর দীর্ঘ নামাযের যে বর্ণনা হাদীসে এসেছে, সে অনুযায়ী কেউ দীর্ঘ নামায পড়লে রুকুতে সকল দোআ না পড়ে তা সম্ভব নয়। যেমনটি বলেছেন ইমাম নববী। তবে একই যিকরের পুনরাবৃত্তি করা সুন্নতের বেশি নিকটবর্তী。