📄 সুন্দর আওয়াজ ও তারতীল সহকারে কেরাত পাঠ
আল্লাহ তারতীল (ধীরে ধীরে ও সুন্দর করে) সহকারে কোরআন পড়ার যে নির্দেশ দিয়েছেন সেই আলোকে রসূল (সঃ) আস্তে আস্তে সুন্দর আওয়াযে কোরআন পাঠ করতেন। তিনি না খুব বেশী ধীরগতিতে পড়তেন, না দ্রুতগতিতে পড়তেন। বরং তিনি প্রতিটি অক্ষর সুস্পষ্ট করে পাঠ করতেন। তিনি এমন ভাবে তারতীল করে পাঠ করতেন তাতে যেন দীর্ঘ সূরা আরও- অধিকতর দীর্ঘ হয়ে যেত। ২৩৩
তিনি বলেন, কোরআনের পাঠককে বলা হবে, তুমি দুনিয়ায় যে রকম তারতীল সহকারে কোরআন পাঠ করেছ ঠিক তেমনি ভাবে কোরআন পড় এবং উপরে উঠো। তোমার পঠিত শেষ আয়াতের উপর তোমার মর্যাদা নির্ধারিত হবে। ২৩৪.
তিনি যেখানে মাদের অক্ষর আছে, সেখানে লম্বা করে টেনে পড়তেন। بِسْمِ اللَّهِ - الرَّحْمَنِ - الرَّحِيمِ জাতীয় শব্দের মাদ আদায় করে পড়তেন। তিনি মাদের হরফে মাদ আদায় করে লম্বা করে পড়তেন। ২৩৫.
তিনি প্রতিটি আয়াতের শেষে ওয়াকফ করতেন বা থামতেন। সূরা ফাতেহায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি কখনও লম্বা ও গুনগুন সুরে কোরআনের আয়াত পাঠ করতেন। এটাকে 'তারজী' বলা হয় (যেমনটি আযানে দেখা যায়।) তিনি মক্কা বিজয়ের দিন উষ্ট্রীর পিঠে নরম সুরে তারজী' সহকারে সূরা ফাতহ পড়েছিলেন। ২৩৬
আবদুল্লাহ বিন মোগাফ্ফাল রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তারজী' নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন।
।।। (তিন আলিফ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন প্রথম হামজার উপর ফাতাহ্ এরপর আলিফ সাকিন এবং তারপর অন্য আরেকটি হামজাহ। মোল্লা আলী কারীও অন্য এক সূত্র থেকে একই কথা বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি বলেছেন, এটা পরিষ্কার যে, এখানে ৩টা লম্বা আলিফ রয়েছে।
রসূলুল্লাহ (সঃ)- সুন্দর আওয়াজে বা সুরে কোরআন পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
زَيَّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ فَإِنَّ الصوْتِ الْحَسَنَ يَزِيدُ الْقُرْآنَ حَسَنًا .
অর্থ: 'তোমরা কোরআনকে সুললিত কণ্ঠে পড়। সুন্দর সুর কোরআনের সৌন্দর্য বাড়ায় ২৩৭
তিনি আরো বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَحْسَنِ النَّاسِ صَوْتًا بِالْقُرْآنِ الَّذِي إِذَا سَمِعْتُمُوهُ يقْرَأُ حَسِبْتُمُوهُ يَخْشَى اللَّهَ -
অর্থ: সেই ব্যক্তির কোরআন পড়ার সুর সর্বোত্তম, যার কোরআন পড়া শুনলে তোমাদের ধারণা হবে যে, লোকটি আল্লাহকে ভয় করে। ২৩৮
রসূলুল্লাহ (সঃ) গুনগুন সুরে কোরআন পড়ার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর কিতাব শিখ, ভাল করে তা আঁকড়ে ধর ও অনুসরণ কর এবং ললিত-কোমল সুরে তা পড়। আল্লাহর শপথ, উটকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার চাইতেও কোরআন মনে রাখা আরও কঠিন। ২৩৯
তিনি বলেছেন - لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ “সে ব্যক্তি আমাদের নয়, যে সুন্দর সুরে কোরআন পড়ে না।" ২৪০
তিনি আরও বলেছেন, 'আল্লাহ কোন নবীর সুন্দর সুরে কিতাব পড়া অপেক্ষা অন্য কোন জিনিস বেশী শুনেন না। নবী শব্দ করে সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়বেন। ২৪১
রসূলুল্লাহ (সঃ) আবু মূসা আশআরীকে বলেছেন, আমি গত রাতে তোমার কেরাআত শুনেছি, তুমি যদি আমাকে দেখতে! তোমাকে দাউদ (আঃ)-এর মত সুন্দর কণ্ঠ বা সুর দেয়া হয়েছে। আবু মূসা বলেন, আমি আপনার উপস্থিতি টের পেলে আরও সুন্দর সুরে পাঠ করতাম। ২৪২
টিকাঃ
২৩৩. মুসলিম, মালেক。
২৩৪. আবু দাউদ। তিরমিযী এটিকে সহীহ বলেছেন。
২৩৫. বোখারী, 'আবু দাউদ。
২৩৬. বোখারী, মুসলিম。
২৩৭. বোখারী, আবু দাউদ, দারেমী, হাকেম, তাম্মام, আররাযী-সনদ সহীহ。
২৩৮. হাদীসটি সহীহ। ইবনু মোবারক, আয্যোহদ ১/১৬২, দারেমী, ইবনু নসর, তাবারানী, আবু নাঈম-আখবার ইসপাহান এবং আযযিয়া-আল্ মোখতারা গ্রন্থে তা বর্ণনা করেছেন。
২৩৯. দারেমী, আহমদ-সনদ সহীহ。
২৪০. আবু দাউদ। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন。
২৪১. বোখারী, মুসলিম, তাহাবী, ইবনে মান্দাহ-আত-তাওহীদ ১/৮১ পৃঃ。
২৪২. আবদুর রায্যাক-আল-আমালী, বোখারী, মুসলিম, ইবনু নসর, হাকেম。
📄 ইমামের প্রতি লোকমা দেয়া
ইমাম কেরাআত ভুলে গেলে বা আটকে গেলে তা সংশোধন করে দেয়া সুন্নত। একবার রসূল (সাঃ) নামাযে কেরাআত পড়েন এবং কেরাআতে আটকে যান। নামায শেষ করে তিনি উবাইকে বলেন, তুমি কি আমাদের সাথে নামায পড়েছ? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি আবার বলেন, কোন্ জিনিস তোমাকে লোকমা দিতে বাধা দিয়েছে? ২৪৩
টিকাঃ
২৪৩. আবু দাউদ, ইবনু হিব্বান, তাবারানী, ইবনু আসাকির, আযয্যিয়া আলমোখতারা-সনদ সহীহ।
📄 শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য নামাযে আউযু বিল্লাহ পড়া ও থুথু নিক্ষেপ করা
উসমান বিন আবুল আ'স (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! শয়তান আমার ও আমার নামাযের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে এবং আমার কেরাআতে ভুল-ভ্রান্তি ঘটায়। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ঐটা হচ্ছে শয়তান এবং তার নাম হচ্ছে খেনযাব। তুমি যখন শয়তানের ওয়াসওয়াসা অনুভব করবে, তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। অর্থাৎ আউযু বিল্লাহ পড়বে এবং তোমার বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে। উসমান বলেন, আমি ঐ রকম করি এবং আল্লাহ আমার কাছ থেকে শয়তানকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। ২৪৪
টিকাঃ
২৪৪. মুসলিম, আহমদ। ইমাম নববী (রঃ) বলেছেন, এই হাদীস প্রমাণ করছে ওয়াসওয়াসার সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং বাম দিকে ৩বার থুথু নিক্ষেপ করা মোস্তাহাব। আন-নেহায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, এখানে থুথু বলতে 'ফুঁ' বুঝানো হয়েছে, যাতে থুথুর বিন্দু থাকবে।
📄 রুকু
রসূলুল্লাহ (সঃ) কেরাআত শেষ করার পর সামান্য একটু অপেক্ষা করতেন। ২৪৫
তারপর তিনি তাকবীরে তাহরীমার সময়ের মত উপরের দিকে দুই হাত তুলতেন এবং তাকবীর বলতেন ও রুকুতে যেতেন। ২৪৬
তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: আল্লাহর আদেশ মোতাবেক ভাল করে উযু না করলে তোমাদের নামায পরিপূর্ণ হবে না। তারপর তাকবীর বলবে এবং আল্লাহর হামদ ও মর্যাদা প্রকাশ করবে। এরপর আল্লাহ যেভাবে আদেশ দিয়েছেন, সেভাবে কোরআন থেকে কেরাআত পাঠ করবে। পরে তাকবীর বলবে ও রুকুতে যাবে। দু'হাত হাঁটুর উপর এমনভাবে রাখবে যেন জোড়াগুলো ঢিলা-ঢালা থাকে। ২৪৭
টিকাঃ
২৪৫. আবু দাউদ। হাকেম একে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ অন্যরা ঐ অপেক্ষার পরিমাণ সম্পর্কে বলেছেন, তা শ্বাস নেয়ার পরিমাণ সমতুল্য。
২৪৬. বোখারী, মুসলিম,। রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে উঠার সময় দু'হাত তোলার ব্যাপারে মোতাওয়াতের বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ বহু সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা তা বর্ণিত হয়েছে। তিন ইমাম, অধিকাংশ মোহাদ্দেস ও ফকীহ এবং ইমাম আবু ইউসুফের ছাত্র ইসাম বিন ইউসুফ আবু ইসমাহ বলখী সহ কিছু হানাফীর মাযহাবও এটাই। ওকবাহ বিন আমের হাত তোলার ব্যাপারে বলেছেন, প্রতি বারের ইশারায় ১০ নেকী পাওয়া যায়。
২৪৭. আবু দাউদ, নাসাঈ। হাকেম একে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী সমর্থন করেছেন。