📄 একই রাকাআতে একই ধরনের সূরা কিংবা ভিন্ন ধরনের সূরা পড়া
রসূলুল্লাহ (সঃ) একই ধরনের লম্বা সূরাগুলো এক সাথে পড়তেন। ১৩৩ তিনি একই রাকআতে সূরা আররাহমান (৫৫:৭৮) এবং সূরা আন-নাজম (৫৩:৬২) পড়তেন। অনুরূপভাবে তিনি একই রাকআতে নিম্নের সূরা একত্রে পড়তেন: সূরা ক্বামার (৫৪:৫৫) এবং সূরা আল্ হাক্কা (৬৯:৫২) সূরা তূর (৫২:৪৯) এবং সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৬০) সূরা সাআলা সায়েলুন (৭০:৪৪) এবং ওয়ান্নাযিআত (৭৯:৪৬) সূরা ওয়াকেআহ (৫৬:৯৬) এবং সূরা কূলম (৬৮:৫২) সূরা সাআলা সায়েলুন লিল-মোতাফফেফীন (৮৩:৩৬) এবং আবাসা (৮০:৪২) সূরা আল-মোদ্দাসসের (৭৪:৫৬) এবং সূরা আল-মোযযাম্মেল (৭৩:২০) সূরা দাহ্র (৭৬:৩১) এবং সূরা কেয়ামাহ (৭৫:৪০) সূরা নাবা (৭৮: ৪০) এবং সূরা আল-মোরসালাত (৭৭:৫০) সূরা আদ-দোখান (৪৪:৫৯) এবং সূরা তাকভীর (৮১:২৯)। ১৩৪
কোন সময় তিনি ৭টি লম্বা সূরা থেকে একাধিক সূরা এক সাথে পড়তেন। যেমন সালাতুল লাইলে তিনি এক রাকআতে সূরা বাকারা, সূরা নিসা এবং সূরা আলে-ইমরান পড়তেন। তিনি বলতেন, দীর্ঘ কেয়াম বিশিষ্ট নামায উত্তম। ১৩৫
তিনি যখন এই আয়াত পড়তেন:
أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتِي -
তখন বলতেন سُبْحَانَكَ فَبَلَى আর তিনি যখন পড়তেন سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى তখন বলতেন, سُبْحَانَ رَبِّي الْأَعْلَى ১৩৬
প্রথমোক্ত আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, 'মহান আল্লাহ কি মৃতদেহকে জীবিত করতে সক্ষম নন? রসূলুল্লাহ (সঃ) এর জওয়াবে বলতেন: তুমি পবিত্র এবং তুমি তা করতে সক্ষম। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা কর।' এর জওয়াবে তিনি বলতেন: 'আমার মহান রবের জন্যে পবিত্রতা।'
টিকাঃ
১৩৩. একই ধরনের সূরা মানে, অর্থের দিক থেকে সাদৃশপূর্ণ সূরা। যেমন, উপদেশ, বিধান, কিস্সা ইত্যাদি। (সূরা থেকে শেষ পর্যন্ত সূরা গুলোকে সর্বসম্মতভাবে লম্বা সূরা বলা হয়।
১৩৪. বোখারী মুসলিম।
১৩৫. মুসলিম, তাহাবী।
১৩৬. আবু দাউদ, বায়হাকী বিশুদ্ধ সনদ সহকারে। এটা নামাযের ভেতর ও বাইরে এবং ফরয ও নফলে করণীয়。
📄 শুধু সূরা ফাতেহা পড়াও জায়েয
মোআয (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ইশার নামায পড়ে ঘরে ফিরে যেতেন এবং নিজ গোত্রের সাথীদের নিয়ে পুনরায় নামাযের ইমামতি করতেন।
এক রাত তিনি ফিরে যান এবং তাদের নিয়ে নামায পড়েন। তাঁর নিজ গোত্র বনী সালামার এক যুবকও তার সাথে নামায পড়েন। যুবকটির নাম সালিম। নামায দীর্ঘ হওয়ায় যুবকটি নামায ছেড়ে দেয় এবং মসজিদের এক প্রান্তে পৃথকভাবে নামায আদায় করে। তারপর নিজ উটের লাগাম ধরে বেরিয়ে যায়। মোআযের নামায শেষ হলে তাকে ঘটনাটি জানানো হয়। মোআয বলেন, তার মধ্যে মুনাফেকী আছে। আমি তার এই ঘটনার বিষয়ে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অবহিত করবো। যুবকটিও বলল, আমিও মোআযের বিষয়টি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)- কে অবহিত করবো। পরের দিন সকালে তারা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যান। মোআয যুবকটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেন। যুবকটি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! মোআয আপনার কাছে রাতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। পরে ফিরে যায় এবং আমাদের নামায দীর্ঘ করে। তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে মোআয! তুমি কি ফেতনা সৃষ্টিকারী? রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে ভাতিজা! তুমি যখন নামায পড়, তখন তা কিভাবে আদায় কর? যুবকটি উত্তর দিল, আমি সূরা ফাতেহা পড়ি। তারপর আমি আল্লাহর কাছে বেহেশত প্রার্থনা করি এবং দোযখ থেকে আশ্রয় চাই। কিন্তু আমি আপনার ও মোআযের ঐ সকল সুরেলা কেরআত বুঝি না। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি ও মোআয এই দু'টো কিংবা একটার মধ্যেই থাকি। (অর্থাৎ সূরা ফতেহার সাথে একটি সূর্য কিংবা শুধু সূরা ফাতেহা পড়ি) যুবকটি বলল, শীঘ্রই মোআয নিজ গোত্রে ফিরে আসার পর যখন শত্রুর আগমনের খবর পাবে, তখন বিষয়টি বুঝতে পারবে। বর্ণনাকারী বলেন, শত্রু আসার পর যুবকটি যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) মোআযকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার ও আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী প্রতিপক্ষের কি খবর? মোআয বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আল্লাহকে সত্য জেনেছে। আমিই বরং তাকে মিথ্যা জ্ঞান করেছি। সে শহীদ হয়ে গেছে। ১৩৭
টিকাঃ
১৩৭. ইবনু খোযায়মাহ, বায়হাকী-বিশুদ্ধ সনদ, আবু দাউদ। মুল ঘটনা বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, 'রসূলুল্লাহ (সঃ) দুই রাকআত নামায পড়েছেন, কিন্তু তাতে সূরা ফাতেহা ছাড়া আর কিছু পড়েননি।' আহমদ, মোসনাদে হারেস বিন উসামা। বায়হাকী দুর্বল সনদ সহকারে তা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মোআয ও ইবনু আব্বাসের হাদীস দ্বারা নামাযে শুধু সূরা ফাতেহা পড়ার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে।
📄 প্রকাশ্যে ও গোপনে কেরাআত পড়া
রসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের ফরয নামায এবং মাগরিব ও ইশার ফরয নামাযের ১ম দুই রাকআতে প্রকাশ্যে কেরাআত পড়তেন। তিনি যোহর ও আসরের ফরয নামায, মাগরেবের ফরযের তৃতীয় রাকআত এবং ইশার ফরযের শেষ দুই রাকআতে কেরাআত অপ্রকাশ্যে পড়তেন। ১৩৮
সাহাবায়ে কেরাম তাঁর দাড়ির নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারতেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) অপ্রকাশ্যে কেরাআত পড়ছেন। ১৩৯
কোন সময় রসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে আয়াত শুনাতেন। অর্থাৎ এতোটুকু অপ্রকাশ্য আওয়াযে পড়তেন যে, নিকটবর্তী লোকেরা তা শুনতে পেত। ১৪০
টিকাঃ
১৩৮. ইমাম নববী বলেছেন, আমাদের পূর্বসূরীরা তাদের পূর্বসূরীদের কাছ থেকে সর্বসম্মতভাবে বিশুদ্ধ হাদীসের ভিত্তিতে এরূপ করে আসছেন。
১৩৯. বোখারী, আবু দাউদ。
১৪০. বোখারী ও মুসলিম。
📄 রাতের নামাযে কেরাআত প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে পড়া
রসূলুল্লাহ (সঃ) রাতের নামাযে কখনও কেরাআত প্রকাশ্যে এবং কখনও অপ্রকাশ্যে পড়তেন। (মুসলিম, বোখারী আফআলুল ইবাদ গ্রন্থে)। তিনি যখন ঘরে কেরাআত পড়তেন, তখন হুজরায় যিনি থাকতেন তিনি তাঁর কেরাআত শুনতেন।-(আবু দাউদ, তিরমিযী-শামায়েল গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদ সহকারে) এ কথার অর্থ হল, তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যের মাঝামাঝি আওয়াজে কেরাআত পড়তেন।
তিনি কখনও আরও একটু উঁচু আওয়াজে কেরাআত পড়তেন। হুজরার বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তি তা শুনতে পেতেন। (নাসাঈ, তিরমিযী-শামায়েল গ্রন্থে এবং বায়হাকী 'আদ্দালায়েল' গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদ সহকারে তা বর্ণনা করেছেন)।
আর এ ভাবেই কেরাআত পড়ার জন্য তিনি আবু বকর এবং উমর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক রাতে তিনি বের হন এবং আবু বকর (রাঃ)-কে ছোট আওয়াজে নামায পড়তে দেখেন। তিনি উমর (রাঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁকে উঁচু আওয়াজে নামায পড়তে দেখেন। তাঁরা উভয়ে যখন রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছ একত্রিত হন, তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে আবু বকর! আমি তোমার কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় তুমি ছোট আওয়াজে কেরাআত পড়ছিলে! আবু বকর বলেন, আমি যার কাছে দোয়া করেছি তাকে শুনিয়েছি ইয়া রসূলাল্লাহ! তিনি উমরকে বলেন, আমি তোমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তুমি উঁচু আওয়াজে নামায পড়ছিলে। উমর বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন লোককে জাগাই এবং শয়তানকে দূর করি। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে আবু বকর! তোমার আওয়াজ কিছুটা চড়া করো এবং উমরকে বলেন, তোমার আওয়াজ কিছুটা কমাও। ১৪৩.
তিনি জুমআ, দুই ঈদ এবং ইস্তিস্কার (বৃষ্টি প্রার্থনার) নামাযে কেরআত প্রকাশ্যে পড়তেন। ১৪১
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, প্রকাশ্যে কোরআন পাঠকারী প্রকাশ্যে দান-সদকারীর মত এবং গোপনে কোরআন পাঠকারী গোপনে দান-সদকাকারীর মত। ১৪৪
টিকাঃ
১৪১. বোখারী, আবু দাউদ。
১৪২. আবদুল হক 'তাহাজ্জুদ' গ্রন্থে লিখেছেন: দিনে নফল ও সুন্নতে রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে কিভাবে কেরাআত পড়তেন, তা সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় না। তবে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি অপ্রকাশ্যে কেরাআত পড়েছেন। রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বর্ণিত, একদিন তিনি আবদুল্লাহ বিন হোযাফার পাশ দিয়ে দিনে অতিক্রম করেন। আবদুল্লাহ দিনে প্রকাশ্যে কেরাআত পড়েন। তিনি আবদুল্লাহকে বলেন, হে আবদুল্লাহ! আল্লাহকে শুনাও, আমাদেরকে নয়। হাদীসটি দুর্বল。
১৪৩. আবু দাউদ, হাকেম। আল্লামা যাহাবী এটিকে সহীহ বলেছেন。
১৪৪. ঐ