📄 আমীন বলা এবং ইমামের প্রকাশ্যে আমীন বলা
সূরা ফাতেহা শেষ কবে রসূলুল্লাহ (সঃ) জোরে 'আমীন' বলতেন এবং আওয়াজ দীর্ঘ করতেন। ১২০ 'আমীন' শব্দের অর্থ হল, 'কবুল কর'।
রসূলুল্লাহ (সঃ) মুকতাদীদের 'আমীন' বলার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যখন ইমাম বলবে : - غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِيْنَ তখন তোমরা বলবে, 'আমীন'। ফেরেশতারাও আমীন বলে এবং ইমামও আমীন বলবে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যখন ইমাম 'আমীন' বলে, তোমরাও আমীন বলবে। তোমাদের আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে একত্রিত হয়। আরেক বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের কেউ নামাযে 'আমীন' বললে, আসমানের ফেরেশতারাও 'আমীন' বলে। ফলে একের আমীন অন্যের আমীনের সাথে একত্রিত হয় ও মিশে যায়। তখন আল্লাহ ঐ মুসল্লীর অতীতের গুনাহ মাফ করে দেন। ১২১
এক হাদীসে এসেছে, তোমরা আমীন বল আল্লাহ তা কবুল করবেন। ১২২
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইহুদীরা তোমাদের ইমামের পিছনে সালাম ও আমীনের ব্যাপরে যতো বেশী হিংসা করে অন্য কোনো বিষয়ে এতো বেশি হিংসা করেনা। ১২৩ক
টিকাঃ
১২০. বোখারী-কেরাআত অধ্যায়, আবু দাউদ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে।
১২১. বোখারী মুসলিম, নাসাঈ।
১২২. মুসলিম, আবু আওয়ানা।
১২৩-ক বোখারী-আলআদাব আল-মুফরাদ গ্রন্থে এবং ইবনু মাজাহ, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ এবং আস্-সেরাজ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে।
নোট: মুকতাদীরা ইমামের পেছনে জোরে ইমামের সাথে আমীন বলবে। ইমামের আগে কিংবা পরে আমীন না বলে একই সাথে বলতে হবে। বিষয়টি আমি আমার বিভিন্ন কিতাবে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্যে সিলসিলাতিল আহাদীস আযযাঈফা এবং সহীহ আত্তারগীব ওয়াত তারহীব অন্যতম।
📄 সূরা ফাতেহার পর রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কেরাআত
রসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা ফাতেহার পর অন্য সূরা পড়তেন। কখনও সূরাটি দীর্ঘ করতেন এবং কখনও বিভিন্ন কারণে সংক্ষিপ্ত করতেন। যেমন, সফর, সর্দি-কাশি, অন্যান্য রোগ-শোক ও শিশুর কান্না ইত্যাদি সময় সংক্ষেপ করতেন।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) একদিন ফজরের নামায সংক্ষিপ্ত কেরাআত সহকারে পড়েন। অন্য আরেক হাদীসে আছে, একদিন রসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামায পড়েন এবং তাতে কোরআনের সবচাইতে ছোট ২টা সূরা পড়েন। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কেন এতো সংক্ষেপ করেছেন? তিনি বলেন, আমি শিশুর কান্না শুনতে পেয়েছি। ১২৩খ
তখন আমি ভাবলাম যে, তার মা আমাদের সাথে নামায পড়ছে। আমি তার মাকে তার জন্য তাড়াতাড়ি অবসর করে দিলাম। ১২৪
তিনি আরো বলেন, আমি নামায শুরু করার পর যখন দীর্ঘ কেরাআতের ইচ্ছা করি, তখন শিশুর কান্না শুনতে পাই। ফলে আমি কেরআত সংক্ষিপ্ত করি। কেননা, আমি শিশুর কান্নায় মায়ের গভীর উদ্বিগ্নতার কথা অনুভব করি। ১২৫
তিনি কখনও সূরার প্রথম থেকে শুরু করে অধিকাংশ সময় তা শেষ করতেন। ১২৬
তিনি বলতেন, প্রত্যেক সূরাকে তার রুকু ও সাজদার অংশ দাও। ১২৭
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, প্রত্যেক সূরার জন্য এক রাকআত। অর্থাৎ প্রত্যেক রাকআতে একটি করে সূরা পড়া উত্তম। ১২৮
কোন সময় তিনি এক সূরাকে দুই রাকআতে ভাগ করে পড়তেন। ১২৯
আবার কোন সময় একই সূরাকে দ্বিতীয় রাকআতেও পুনরাবৃতিও করতেন। ১৩০
কখনও তিনি একই রাকআতে দুই বা ততোধিক সূরা পড়তেন। ১৩১
এক আনসারী সাহাবী মসজিদে কুবায় ইমামতি করতেন। তিনি সূরা ফাতেহা পড়ার পর সূরা ইখলাস পড়তেন। তারপর অন্য আরেকটি সূরা পড়তেন। তিনি প্রত্যেক রাকআতে এরূপ করতেন। তাঁর সাথীরা তাকে এ বিষয়ে বলেন যে, তুমি এই সূরা দিয়ে নামায শুরু করার পর ভাব যে, তা যথেষ্ট নয়, তাই তুমি অন্য আরেকটি সূরা মিলাও। হয় তুমি এই সূরাই (ইখলাস) পড়বে, না হয় তা বাদ দিয়ে অন্য আরেকটি সূরা পড়বে। তিনি বললেন, আমি তা কখনও ছাড়বো না। তোমরা চাইলে আমি এই সূরা সহকারে তোমাদের ইমামতি করতে পারি। আর তোমরা অপছন্দ করলে আমি ইমামতি ছেড়ে দিতে পারি। অথচ তাদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি এবং তারা তাকে ব্যতীত অন্য কাউকে ইমাম বানাতে অপছন্দ করতেন। নবী করীম (সঃ) তাদের কাছে আসলে তারা তাঁকে বিষয়টি জানান। তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে অমুক! তোমার সাথীরা যা করার জন্য বলে তা করতে তোমার বাধা কি এবং কোন্ জিনিস তোমাকে ঐ সূরাটি প্রত্যেক রাকআতে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে? লোকটি জওয়াব দেয়, আমি সূরাটি (সূরা ইখলাস) ভালবাসি। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ঐ সূরাটির প্রতি ভালবাসা তোমাকে বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। ১৩২
টিকাঃ
১২৩-খ. এই হাদীসসহ এজাতীয় অন্যান্য হাদীস প্রমাণ করে যে, শিশুদেরকে মসজিদে আনা জায়েয আছে। শিশুদেরকে মসজিদে না আনার ব্যাপারে মুখে মুখে যে হাদীস প্রচলিত আছে, তা দুর্বল এবং তা দলীল হিসেবে পেশ করা যোগ্য নয়। হাদীসটি হচ্ছে, 'তোমাদের মসজিদ থেকে শিশুদেরকে দূরে রাখ।' ইবনুল জাওযী, আলমোনযেরী, আল হায়ছামী, ইবনে হাজার আসকালানী এবং আলবোসাইরী এটিকে দুর্বল হাদীস বলেছেন। আবদুল হক ইসবেলী একে ভিত্তিহীন বলেছেন।
১২৪. আহমদ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে এবং ইবনু আবী দাউদ আলমাসাহেফ গ্রন্থে তা বর্ণনা করেছেন।।
১২৫. বোখারী, মুসলিম।
১২৬. এ ব্যাপারে পরে অনেক হাদীস উল্লেখ করা হবে।
১২৭. ইবনু আবী শায়বা, আহমদ, আবদুল গনি আল-মাকদেসী।
১২৮. ইবনু নসর, তাহাবী-বিশুদ্ধ সনদসহ।
১২৯. আহমদ, আবু ইয়ালী।
১৩০. তিনি এমনটি ফজরের নামাযে করেছেন।
১৩১. সামনে বিস্তারিত দলীল আসবে।
১৩২. বোখারী, তিরমিযী।
📄 একই রাকাআতে একই ধরনের সূরা কিংবা ভিন্ন ধরনের সূরা পড়া
রসূলুল্লাহ (সঃ) একই ধরনের লম্বা সূরাগুলো এক সাথে পড়তেন। ১৩৩ তিনি একই রাকআতে সূরা আররাহমান (৫৫:৭৮) এবং সূরা আন-নাজম (৫৩:৬২) পড়তেন। অনুরূপভাবে তিনি একই রাকআতে নিম্নের সূরা একত্রে পড়তেন: সূরা ক্বামার (৫৪:৫৫) এবং সূরা আল্ হাক্কা (৬৯:৫২) সূরা তূর (৫২:৪৯) এবং সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৬০) সূরা সাআলা সায়েলুন (৭০:৪৪) এবং ওয়ান্নাযিআত (৭৯:৪৬) সূরা ওয়াকেআহ (৫৬:৯৬) এবং সূরা কূলম (৬৮:৫২) সূরা সাআলা সায়েলুন লিল-মোতাফফেফীন (৮৩:৩৬) এবং আবাসা (৮০:৪২) সূরা আল-মোদ্দাসসের (৭৪:৫৬) এবং সূরা আল-মোযযাম্মেল (৭৩:২০) সূরা দাহ্র (৭৬:৩১) এবং সূরা কেয়ামাহ (৭৫:৪০) সূরা নাবা (৭৮: ৪০) এবং সূরা আল-মোরসালাত (৭৭:৫০) সূরা আদ-দোখান (৪৪:৫৯) এবং সূরা তাকভীর (৮১:২৯)। ১৩৪
কোন সময় তিনি ৭টি লম্বা সূরা থেকে একাধিক সূরা এক সাথে পড়তেন। যেমন সালাতুল লাইলে তিনি এক রাকআতে সূরা বাকারা, সূরা নিসা এবং সূরা আলে-ইমরান পড়তেন। তিনি বলতেন, দীর্ঘ কেয়াম বিশিষ্ট নামায উত্তম। ১৩৫
তিনি যখন এই আয়াত পড়তেন:
أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتِي -
তখন বলতেন سُبْحَانَكَ فَبَلَى আর তিনি যখন পড়তেন سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى তখন বলতেন, سُبْحَانَ رَبِّي الْأَعْلَى ১৩৬
প্রথমোক্ত আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, 'মহান আল্লাহ কি মৃতদেহকে জীবিত করতে সক্ষম নন? রসূলুল্লাহ (সঃ) এর জওয়াবে বলতেন: তুমি পবিত্র এবং তুমি তা করতে সক্ষম। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা কর।' এর জওয়াবে তিনি বলতেন: 'আমার মহান রবের জন্যে পবিত্রতা।'
টিকাঃ
১৩৩. একই ধরনের সূরা মানে, অর্থের দিক থেকে সাদৃশপূর্ণ সূরা। যেমন, উপদেশ, বিধান, কিস্সা ইত্যাদি। (সূরা থেকে শেষ পর্যন্ত সূরা গুলোকে সর্বসম্মতভাবে লম্বা সূরা বলা হয়।
১৩৪. বোখারী মুসলিম।
১৩৫. মুসলিম, তাহাবী।
১৩৬. আবু দাউদ, বায়হাকী বিশুদ্ধ সনদ সহকারে। এটা নামাযের ভেতর ও বাইরে এবং ফরয ও নফলে করণীয়。
📄 শুধু সূরা ফাতেহা পড়াও জায়েয
মোআয (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ইশার নামায পড়ে ঘরে ফিরে যেতেন এবং নিজ গোত্রের সাথীদের নিয়ে পুনরায় নামাযের ইমামতি করতেন।
এক রাত তিনি ফিরে যান এবং তাদের নিয়ে নামায পড়েন। তাঁর নিজ গোত্র বনী সালামার এক যুবকও তার সাথে নামায পড়েন। যুবকটির নাম সালিম। নামায দীর্ঘ হওয়ায় যুবকটি নামায ছেড়ে দেয় এবং মসজিদের এক প্রান্তে পৃথকভাবে নামায আদায় করে। তারপর নিজ উটের লাগাম ধরে বেরিয়ে যায়। মোআযের নামায শেষ হলে তাকে ঘটনাটি জানানো হয়। মোআয বলেন, তার মধ্যে মুনাফেকী আছে। আমি তার এই ঘটনার বিষয়ে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অবহিত করবো। যুবকটিও বলল, আমিও মোআযের বিষয়টি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)- কে অবহিত করবো। পরের দিন সকালে তারা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যান। মোআয যুবকটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেন। যুবকটি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! মোআয আপনার কাছে রাতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। পরে ফিরে যায় এবং আমাদের নামায দীর্ঘ করে। তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে মোআয! তুমি কি ফেতনা সৃষ্টিকারী? রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে ভাতিজা! তুমি যখন নামায পড়, তখন তা কিভাবে আদায় কর? যুবকটি উত্তর দিল, আমি সূরা ফাতেহা পড়ি। তারপর আমি আল্লাহর কাছে বেহেশত প্রার্থনা করি এবং দোযখ থেকে আশ্রয় চাই। কিন্তু আমি আপনার ও মোআযের ঐ সকল সুরেলা কেরআত বুঝি না। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি ও মোআয এই দু'টো কিংবা একটার মধ্যেই থাকি। (অর্থাৎ সূরা ফতেহার সাথে একটি সূর্য কিংবা শুধু সূরা ফাতেহা পড়ি) যুবকটি বলল, শীঘ্রই মোআয নিজ গোত্রে ফিরে আসার পর যখন শত্রুর আগমনের খবর পাবে, তখন বিষয়টি বুঝতে পারবে। বর্ণনাকারী বলেন, শত্রু আসার পর যুবকটি যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) মোআযকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার ও আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী প্রতিপক্ষের কি খবর? মোআয বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আল্লাহকে সত্য জেনেছে। আমিই বরং তাকে মিথ্যা জ্ঞান করেছি। সে শহীদ হয়ে গেছে। ১৩৭
টিকাঃ
১৩৭. ইবনু খোযায়মাহ, বায়হাকী-বিশুদ্ধ সনদ, আবু দাউদ। মুল ঘটনা বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, 'রসূলুল্লাহ (সঃ) দুই রাকআত নামায পড়েছেন, কিন্তু তাতে সূরা ফাতেহা ছাড়া আর কিছু পড়েননি।' আহমদ, মোসনাদে হারেস বিন উসামা। বায়হাকী দুর্বল সনদ সহকারে তা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মোআয ও ইবনু আব্বাসের হাদীস দ্বারা নামাযে শুধু সূরা ফাতেহা পড়ার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে।