📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 ইমামের প্রকাশ্য কেরাআতে মুক্তাদি কেরাআত পড়বে না

📄 ইমামের প্রকাশ্য কেরাআতে মুক্তাদি কেরাআত পড়বে না


রসূলুল্লাহ (স) মুক্তাদীদেরকে প্রথম দিকে প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পেছনে কোরআন পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। একদিন ফজরের সময় তিনি কেরাআত পড়েন এবং তা তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেন : “তোমরা সম্ভবত ইমামের পেছনে কেরাআত পড়! আমরা বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা দ্রুত কেরাআত পড়ি। তিনি বললেন, তোমরা এরূপ কর না। তবে কেউ ইচ্ছা করলে শুধু সূরা ফাতেহা পড়তে পারে। কারণ যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতেহা না পড়ে, তার নামায নেই। ১১১
এরপর তিনি 'সকল প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পেছনে মুক্তাদীর পড়া নিষিদ্ধ করেন। কেননা একবার তিনি প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামায শেষে (এক বর্ণনায় তা ছিল ফজরের নামায) জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি আমার সাথে নামাযে কেরাআত পড়েছিলে? এক ব্যক্তি বলল, হাঁ, 'আমি, হে রসূলুল্লাহ! তিনি বললেন, অন্যরা যখন কেরাআত পড়ে, তখন আমি কেন আর কেরাআত পড়বো? রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ কথা শুনে লোকেরা প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে কেরাআত পড়া সম্পূর্ণ ত্যাগ করেন এবং শুধুমাত্র ইমামের অপ্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে মনে মনে কেরাআত পড়েন। ১১২
ইমামের কেরাআতের সময় চুপ করে থাকাকে ইমামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন 'অনুকরণের উদ্দেশ্যে ইমাম নিয়োগ করা হয়েছে। ইমাম তাকবীর বললে তোমরাও তাকবীর বলবে এবং ইমাম কেরাআত পড়লে তোমরা চুপ করে থাকবে। ১১৩.
ইমামের পেছনে কেরাআত পড়ার পরিবর্তে কেরাআত শুনাকে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যার ইমাম আছে, ইমামের কেরাআতই তার কেরাআত। ১১৪.
এটা হচ্ছে, প্রকাশ্য কেরআত বিশিষ্ট নামাযের বিধান।

টিকাঃ
১১১. বোখারী, আবু দাউদ, আহমদ। তিরমিযী ও দারু কুতনী এটাকে উত্তম হাদীস বলেছেন।
১১২. মালেক, হোমায়দী, বোখারী, আবু দাউদ, মাহালেমী। তিরমিযী এটাকে উত্তম এবং আবু হাতেম রাযী, ইবনু হিব্বান ও ইবনুল কাইয়্যেম এটাকে সহীহ বলেছেন। হযরত উমর (রাঃ) থেকে অনুরূপ আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে বলা হয়েছে, 'আমি কেন কোরআন পড়া নিয়ে বিবাদ করবো? ইমামের কেরাআত কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? ইমামকে অনুকরণীয় বানানো হয়েছে। ইমাম যখন কেরাআত পড়বে, তখন তোমরা চুপ করে থাকবে। বায়হাকী, জামে আল-কবীর।
১১৩. ইবনু আবী শায়বা, আবু দাউদ, মুসলিম, আবু আওয়ানা, আর-রুইয়ানী।
১১৪. ইবনু আবী শায়বা, দারু কুতনী, ইবনু মাজাহ, আহমদ।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 ইমামের অপ্রকাশ্য কেরাআতে মুক্তাদী কেরাআত পড়বে

📄 ইমামের অপ্রকাশ্য কেরাআতে মুক্তাদী কেরাআত পড়বে


সাহবায়ে কেরাম অপ্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে কেরাআত পড়ার বিষয়টি অনুমোদন করেছেন। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমরা যোহর ও আসরের নামাযের প্রথম দুই রাকআতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা ও একটি সূরা এবং শেষ দুই রাকআতে শুধুমাত্র সূরা ফাতেহা পড়তাম। ১১৫.
তবে রসূলুল্লাহ (সঃ) কেবলমাত্র আওয়াজকে অপছন্দ করেছেন। (কেরাআত পড়াকে নয়)। একবার যোহরের নামায পড়ার সময় তিনি সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে কে سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأعلى পড়েছে? একজন জওয়াবে বলেন, 'আমি'। তবে 'আমি ভাল ছাড়া অন্য কারণে তা করিনি।' তিনি বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি একজন নামাযে আমার, সাথে কেরাআত নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছিল। ১১৬
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তারা নবী করীম (সঃ)-এর পেছনে জোরে কেরাআত পড়তেন। তখন তিনি বলেন, তোমরা আমার কোরআন পড়ায় বাধা সৃষ্টি করেছ। ১১৭
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: নামাযী ব্যক্তি আল্লাহর সাথে গোপনে কথা বলে। সে কার সাথে গোপনে কথা বলে তা খেয়াল করা উচিত। তোমরা একে অন্যের কেরাআতের সময় জোরে কERAআত পড়বে না। ১১৮
তিনি আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করে তার জন্য রয়েছে ১টি কল্যাণ বা সওয়াব। প্রতিটি নেক কাজের ১০ গুণ বিনিময় দেয়া হয়। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর। ১১৯
নিম্নের হাদীসটি মিথ্যা: যে ব্যক্তি ইমামের পেছনে কেরাত পড়ে আগুন দ্বারা তার মুখ ভর্তি করে দেয়া হবে।' এটি সিলসিলাতুল আহাদীস আছ দাইফা গ্রন্থের ৫৬৯ নং হাদীস।

টিকাঃ
১১৫. ইবনু মাজাহ-সনদ বিশুদ্ধ。
১১৬. মুসলিম, আবু আওয়ানা এবং আস-সেরাজ。
১১৭. বোখারী, আহমদ এবং আস-সেরাজ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে。
১১৮. মালেক, বোখারী বিশুদ্ধ সনদ সহকারে আফআলুল ইবাদ গ্রন্থে。
নোট: অপ্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে মুকতাদীর কেরাআত পড়ার পক্ষে ইমাম শাফেঈ, ইমাম আবু হানীফার ছাত্র ইমাম মোহাম্মদ (এক রেওয়ায়াতে) ইমাম যুহরী, মালেক, ইবনুল মোবারক, আহমদ বিন হাম্বল এবং ইবনে তায়মিয়া মত দিয়েছেন。
১১৯. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে。

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 আমীন বলা এবং ইমামের প্রকাশ্যে আমীন বলা

📄 আমীন বলা এবং ইমামের প্রকাশ্যে আমীন বলা


সূরা ফাতেহা শেষ কবে রসূলুল্লাহ (সঃ) জোরে 'আমীন' বলতেন এবং আওয়াজ দীর্ঘ করতেন। ১২০ 'আমীন' শব্দের অর্থ হল, 'কবুল কর'।
রসূলুল্লাহ (সঃ) মুকতাদীদের 'আমীন' বলার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যখন ইমাম বলবে : - غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِيْنَ তখন তোমরা বলবে, 'আমীন'। ফেরেশতারাও আমীন বলে এবং ইমামও আমীন বলবে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যখন ইমাম 'আমীন' বলে, তোমরাও আমীন বলবে। তোমাদের আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে একত্রিত হয়। আরেক বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের কেউ নামাযে 'আমীন' বললে, আসমানের ফেরেশতারাও 'আমীন' বলে। ফলে একের আমীন অন্যের আমীনের সাথে একত্রিত হয় ও মিশে যায়। তখন আল্লাহ ঐ মুসল্লীর অতীতের গুনাহ মাফ করে দেন। ১২১
এক হাদীসে এসেছে, তোমরা আমীন বল আল্লাহ তা কবুল করবেন। ১২২
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইহুদীরা তোমাদের ইমামের পিছনে সালাম ও আমীনের ব্যাপরে যতো বেশী হিংসা করে অন্য কোনো বিষয়ে এতো বেশি হিংসা করেনা। ১২৩ক

টিকাঃ
১২০. বোখারী-কেরাআত অধ্যায়, আবু দাউদ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে।
১২১. বোখারী মুসলিম, নাসাঈ।
১২২. মুসলিম, আবু আওয়ানা।
১২৩-ক বোখারী-আলআদাব আল-মুফরাদ গ্রন্থে এবং ইবনু মাজাহ, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ এবং আস্-সেরাজ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে।
নোট: মুকতাদীরা ইমামের পেছনে জোরে ইমামের সাথে আমীন বলবে। ইমামের আগে কিংবা পরে আমীন না বলে একই সাথে বলতে হবে। বিষয়টি আমি আমার বিভিন্ন কিতাবে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্যে সিলসিলাতিল আহাদীস আযযাঈফা এবং সহীহ আত্তারগীব ওয়াত তারহীব অন্যতম।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 সূরা ফাতেহার পর রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কেরাআত

📄 সূরা ফাতেহার পর রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কেরাআত


রসূলুল্লাহ (সঃ) সূরা ফাতেহার পর অন্য সূরা পড়তেন। কখনও সূরাটি দীর্ঘ করতেন এবং কখনও বিভিন্ন কারণে সংক্ষিপ্ত করতেন। যেমন, সফর, সর্দি-কাশি, অন্যান্য রোগ-শোক ও শিশুর কান্না ইত্যাদি সময় সংক্ষেপ করতেন।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) একদিন ফজরের নামায সংক্ষিপ্ত কেরাআত সহকারে পড়েন। অন্য আরেক হাদীসে আছে, একদিন রসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের নামায পড়েন এবং তাতে কোরআনের সবচাইতে ছোট ২টা সূরা পড়েন। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কেন এতো সংক্ষেপ করেছেন? তিনি বলেন, আমি শিশুর কান্না শুনতে পেয়েছি। ১২৩খ
তখন আমি ভাবলাম যে, তার মা আমাদের সাথে নামায পড়ছে। আমি তার মাকে তার জন্য তাড়াতাড়ি অবসর করে দিলাম। ১২৪
তিনি আরো বলেন, আমি নামায শুরু করার পর যখন দীর্ঘ কেরাআতের ইচ্ছা করি, তখন শিশুর কান্না শুনতে পাই। ফলে আমি কেরআত সংক্ষিপ্ত করি। কেননা, আমি শিশুর কান্নায় মায়ের গভীর উদ্বিগ্নতার কথা অনুভব করি। ১২৫
তিনি কখনও সূরার প্রথম থেকে শুরু করে অধিকাংশ সময় তা শেষ করতেন। ১২৬
তিনি বলতেন, প্রত্যেক সূরাকে তার রুকু ও সাজদার অংশ দাও। ১২৭
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, প্রত্যেক সূরার জন্য এক রাকআত। অর্থাৎ প্রত্যেক রাকআতে একটি করে সূরা পড়া উত্তম। ১২৮
কোন সময় তিনি এক সূরাকে দুই রাকআতে ভাগ করে পড়তেন। ১২৯
আবার কোন সময় একই সূরাকে দ্বিতীয় রাকআতেও পুনরাবৃতিও করতেন। ১৩০
কখনও তিনি একই রাকআতে দুই বা ততোধিক সূরা পড়তেন। ১৩১
এক আনসারী সাহাবী মসজিদে কুবায় ইমামতি করতেন। তিনি সূরা ফাতেহা পড়ার পর সূরা ইখলাস পড়তেন। তারপর অন্য আরেকটি সূরা পড়তেন। তিনি প্রত্যেক রাকআতে এরূপ করতেন। তাঁর সাথীরা তাকে এ বিষয়ে বলেন যে, তুমি এই সূরা দিয়ে নামায শুরু করার পর ভাব যে, তা যথেষ্ট নয়, তাই তুমি অন্য আরেকটি সূরা মিলাও। হয় তুমি এই সূরাই (ইখলাস) পড়বে, না হয় তা বাদ দিয়ে অন্য আরেকটি সূরা পড়বে। তিনি বললেন, আমি তা কখনও ছাড়বো না। তোমরা চাইলে আমি এই সূরা সহকারে তোমাদের ইমামতি করতে পারি। আর তোমরা অপছন্দ করলে আমি ইমামতি ছেড়ে দিতে পারি। অথচ তাদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি এবং তারা তাকে ব্যতীত অন্য কাউকে ইমাম বানাতে অপছন্দ করতেন। নবী করীম (সঃ) তাদের কাছে আসলে তারা তাঁকে বিষয়টি জানান। তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে অমুক! তোমার সাথীরা যা করার জন্য বলে তা করতে তোমার বাধা কি এবং কোন্ জিনিস তোমাকে ঐ সূরাটি প্রত্যেক রাকআতে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে? লোকটি জওয়াব দেয়, আমি সূরাটি (সূরা ইখলাস) ভালবাসি। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ঐ সূরাটির প্রতি ভালবাসা তোমাকে বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। ১৩২

টিকাঃ
১২৩-খ. এই হাদীসসহ এজাতীয় অন্যান্য হাদীস প্রমাণ করে যে, শিশুদেরকে মসজিদে আনা জায়েয আছে। শিশুদেরকে মসজিদে না আনার ব্যাপারে মুখে মুখে যে হাদীস প্রচলিত আছে, তা দুর্বল এবং তা দলীল হিসেবে পেশ করা যোগ্য নয়। হাদীসটি হচ্ছে, 'তোমাদের মসজিদ থেকে শিশুদেরকে দূরে রাখ।' ইবনুল জাওযী, আলমোনযেরী, আল হায়ছামী, ইবনে হাজার আসকালানী এবং আলবোসাইরী এটিকে দুর্বল হাদীস বলেছেন। আবদুল হক ইসবেলী একে ভিত্তিহীন বলেছেন।
১২৪. আহমদ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে এবং ইবনু আবী দাউদ আলমাসাহেফ গ্রন্থে তা বর্ণনা করেছেন।।
১২৫. বোখারী, মুসলিম।
১২৬. এ ব্যাপারে পরে অনেক হাদীস উল্লেখ করা হবে।
১২৭. ইবনু আবী শায়বা, আহমদ, আবদুল গনি আল-মাকদেসী।
১২৮. ইবনু নসর, তাহাবী-বিশুদ্ধ সনদসহ।
১২৯. আহমদ, আবু ইয়ালী।
১৩০. তিনি এমনটি ফজরের নামাযে করেছেন।
১৩১. সামনে বিস্তারিত দলীল আসবে।
১৩২. বোখারী, তিরমিযী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00