📄 সূরা-কেরআত পাঠ
দোয়া পাঠের পর রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রথমে আল্লাহর কাছে নিম্নরূপ বাক্যে আশ্রয় চাইতেন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْتِهِ
অর্থঃ "আমি আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তানের মাতলামি, গর্ব-অহংকার ও মন্দ কবিতা ১০০ থেকে আশ্রয় চাই।” ১০১
'ভাল কবিতায় জ্ঞান ও কৌশলের কথা আছে।' (বোখারী)
তিনি কখনও আরো একটু বাড়িয়ে দোআটি এরূপ পড়তেন: ১০২
أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعُ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ
তারপর তিনি 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পাঠ করতেন এবং এগুলো তিনি নিঃশব্দে পড়তেন। ১০৩
টিকাঃ
১০০. হাম্য়, নাফাখ ও নাফাছ শব্দ তিনটির উপরোক্ত অর্থ বিশুদ্ধ মোরসাল সনদ সহকারে রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। কবিতা বলতে মন্দ কবিতা বুঝাবে। কেননা, ভাল কবিতার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : إِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حكمة
১০১. আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, দারু কুতনী। হাকেম, ইবনু হিব্বান ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন।
১০২. আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমদ-সনদ বিশুদ্ধ।
১০৩. বোখারী, মুসলিম, আবু আওয়ানা তাহাবী, আহমদ।
📄 সূরা ফাতেহা নামাযের রোকন হওয়া এবং এর ফযীলত
রসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরার সম্মান ও মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন, যে ব্যক্তি সূরা ফাতেহা এবং আরও অতিরিক্ত কেরাআত পড়ে না, তার নামায ঠিক হয় না। (বোখারী, মুসলিম, বায়হাকী, আবু আওয়ানা)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি নামায পড়ল কিন্তু সূরা ফাতেহা পড়ল না, তার নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ। (মুসলিম, আবু আওয়ানা)
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আল্লাহ বলেছেন, আমি নামাযকে আমার ও বান্দার মাঝে দুই ভাগে ভাগ করেছি। অর্থাৎ সূরা ফাতেহাকে দুই ভাগে ভাগ করেছি। এক ভাগ আমার, অপর ভাগ বান্দার। বান্দা যা চাইবে তাই পাইবে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা (ফাতেহা) পড়। কারণ যখন বান্দাহ বলে, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
এর জওয়াবে আল্লাহ বলেন, 'বান্দাহ আমার প্রশংসা করেছে।' তারপর বান্দাহ যখন বলে, الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ আল্লাহ এর জওয়াবে বলেন, 'বান্দাহ আমার গুণ-গান করেছে।' বান্দাহ যখন বলে مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ আল্লাহ্ জওয়াবে বলেন, 'বান্দাহ আমাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেছে।' বান্দাহ যখন বলে إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ আল্লাহ বলেন, 'এটাই আমার ও আমার বান্দাহর মাঝের সম্পর্ক, বান্দাহ যা চাইবে, তা পাবে।' বান্দাহ যখন বলে
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
আল্লাহ বলেন, 'এগুলো সব আমার বান্দার জন্য (মন্যুর করা হল) আমার বান্দাহ যা চাইবে তাই পাবে।' ১০৬
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন: আল্লাহ তাওরাত ও ইনজীলে উম্মুল কোরআনের (ফাতেহা) মত কোনো সূরা নাযিল করেননি। এতে, বারবার পড়ার মতো ৭টি আয়াত আছে। ১০৭ এটি মহা কোরআন যা আমি আপনাকে দিয়েছি।' (আল-কোরআন)
রসূলুল্লাহ (সঃ) ভুল নামায আদায়কারীকে সংশোধন করার সময় নামাযে সূরা ফাতেহা পড়তে নির্দেশ দেন। ১০৮
তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি এ সূরা মুখস্থ করতে পারেনি, সে যেন পড়েঃ
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ -১০৯
রসূলুল্লাহ (সঃ) ভুল নামায আদায়কারীকে শোধরানোর সময় বলেছিলেন, যদি কোরআন তোমার জানা থাকে, তাহলে তাই পড়, অন্যথায় হামদ, তাকবীর ও তাহলীল বল। অর্থাৎ এরূপ পড়:
الْحَمْدُ لِلَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ-১১০
টিকাঃ
১০৬. মুসলিম, মালেক, আবু আওয়ানা। আস্সাহমী 'তারীখে জুরজানে' জাবের (রাঃ) থেকে অনুরূপ একটি হাদীস বর্ণিত আছে।
১০৭. নাসাঈ, হাকেম এবং আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন।
১০৮. বোখারী বিশুদ্ধ সনদ-ইমামের পেছনে কেরাআত পড়ার অধ্যায়।
১০৯. আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ, হাকেম, তাবারানী, ইবনু হিব্বান। হাকেম ও যাহাবী একে সহীহ বলেছেন।
১১০. আবু দাউদ, তিরমিযী।
📄 ইমামের প্রকাশ্য কেরাআতে মুক্তাদি কেরাআত পড়বে না
রসূলুল্লাহ (স) মুক্তাদীদেরকে প্রথম দিকে প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পেছনে কোরআন পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। একদিন ফজরের সময় তিনি কেরাআত পড়েন এবং তা তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেন : “তোমরা সম্ভবত ইমামের পেছনে কেরাআত পড়! আমরা বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা দ্রুত কেরাআত পড়ি। তিনি বললেন, তোমরা এরূপ কর না। তবে কেউ ইচ্ছা করলে শুধু সূরা ফাতেহা পড়তে পারে। কারণ যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতেহা না পড়ে, তার নামায নেই। ১১১
এরপর তিনি 'সকল প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পেছনে মুক্তাদীর পড়া নিষিদ্ধ করেন। কেননা একবার তিনি প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামায শেষে (এক বর্ণনায় তা ছিল ফজরের নামায) জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি আমার সাথে নামাযে কেরাআত পড়েছিলে? এক ব্যক্তি বলল, হাঁ, 'আমি, হে রসূলুল্লাহ! তিনি বললেন, অন্যরা যখন কেরাআত পড়ে, তখন আমি কেন আর কেরাআত পড়বো? রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ কথা শুনে লোকেরা প্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে কেরাআত পড়া সম্পূর্ণ ত্যাগ করেন এবং শুধুমাত্র ইমামের অপ্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে মনে মনে কেরাআত পড়েন। ১১২
ইমামের কেরাআতের সময় চুপ করে থাকাকে ইমামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন 'অনুকরণের উদ্দেশ্যে ইমাম নিয়োগ করা হয়েছে। ইমাম তাকবীর বললে তোমরাও তাকবীর বলবে এবং ইমাম কেরাআত পড়লে তোমরা চুপ করে থাকবে। ১১৩.
ইমামের পেছনে কেরাআত পড়ার পরিবর্তে কেরাআত শুনাকে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যার ইমাম আছে, ইমামের কেরাআতই তার কেরাআত। ১১৪.
এটা হচ্ছে, প্রকাশ্য কেরআত বিশিষ্ট নামাযের বিধান।
টিকাঃ
১১১. বোখারী, আবু দাউদ, আহমদ। তিরমিযী ও দারু কুতনী এটাকে উত্তম হাদীস বলেছেন।
১১২. মালেক, হোমায়দী, বোখারী, আবু দাউদ, মাহালেমী। তিরমিযী এটাকে উত্তম এবং আবু হাতেম রাযী, ইবনু হিব্বান ও ইবনুল কাইয়্যেম এটাকে সহীহ বলেছেন। হযরত উমর (রাঃ) থেকে অনুরূপ আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে বলা হয়েছে, 'আমি কেন কোরআন পড়া নিয়ে বিবাদ করবো? ইমামের কেরাআত কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? ইমামকে অনুকরণীয় বানানো হয়েছে। ইমাম যখন কেরাআত পড়বে, তখন তোমরা চুপ করে থাকবে। বায়হাকী, জামে আল-কবীর।
১১৩. ইবনু আবী শায়বা, আবু দাউদ, মুসলিম, আবু আওয়ানা, আর-রুইয়ানী।
১১৪. ইবনু আবী শায়বা, দারু কুতনী, ইবনু মাজাহ, আহমদ।
📄 ইমামের অপ্রকাশ্য কেরাআতে মুক্তাদী কেরাআত পড়বে
সাহবায়ে কেরাম অপ্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে কেরাআত পড়ার বিষয়টি অনুমোদন করেছেন। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমরা যোহর ও আসরের নামাযের প্রথম দুই রাকআতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা ও একটি সূরা এবং শেষ দুই রাকআতে শুধুমাত্র সূরা ফাতেহা পড়তাম। ১১৫.
তবে রসূলুল্লাহ (সঃ) কেবলমাত্র আওয়াজকে অপছন্দ করেছেন। (কেরাআত পড়াকে নয়)। একবার যোহরের নামায পড়ার সময় তিনি সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে কে سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأعلى পড়েছে? একজন জওয়াবে বলেন, 'আমি'। তবে 'আমি ভাল ছাড়া অন্য কারণে তা করিনি।' তিনি বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি একজন নামাযে আমার, সাথে কেরাআত নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছিল। ১১৬
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তারা নবী করীম (সঃ)-এর পেছনে জোরে কেরাআত পড়তেন। তখন তিনি বলেন, তোমরা আমার কোরআন পড়ায় বাধা সৃষ্টি করেছ। ১১৭
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: নামাযী ব্যক্তি আল্লাহর সাথে গোপনে কথা বলে। সে কার সাথে গোপনে কথা বলে তা খেয়াল করা উচিত। তোমরা একে অন্যের কেরাআতের সময় জোরে কERAআত পড়বে না। ১১৮
তিনি আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করে তার জন্য রয়েছে ১টি কল্যাণ বা সওয়াব। প্রতিটি নেক কাজের ১০ গুণ বিনিময় দেয়া হয়। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর। ১১৯
নিম্নের হাদীসটি মিথ্যা: যে ব্যক্তি ইমামের পেছনে কেরাত পড়ে আগুন দ্বারা তার মুখ ভর্তি করে দেয়া হবে।' এটি সিলসিলাতুল আহাদীস আছ দাইফা গ্রন্থের ৫৬৯ নং হাদীস।
টিকাঃ
১১৫. ইবনু মাজাহ-সনদ বিশুদ্ধ。
১১৬. মুসলিম, আবু আওয়ানা এবং আস-সেরাজ。
১১৭. বোখারী, আহমদ এবং আস-সেরাজ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে。
১১৮. মালেক, বোখারী বিশুদ্ধ সনদ সহকারে আফআলুল ইবাদ গ্রন্থে。
নোট: অপ্রকাশ্য কেরাআত বিশিষ্ট নামাযে মুকতাদীর কেরাআত পড়ার পক্ষে ইমাম শাফেঈ, ইমাম আবু হানীফার ছাত্র ইমাম মোহাম্মদ (এক রেওয়ায়াতে) ইমাম যুহরী, মালেক, ইবনুল মোবারক, আহমদ বিন হাম্বল এবং ইবনে তায়মিয়া মত দিয়েছেন。
১১৯. তিরমিযী, ইবনে মাজাহ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে。