📄 রাত্রের নামাযে দাঁড়ানো ও বসা
রসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন। তিনি দীর্ঘ সময় বসেও নামায পড়তেন। তিনি দাঁড়িয়ে নামায পড়লে দাঁড়িয়ে রুকু দিতেন এবং বসে নামায পড়লে বসে রুকু দিতেন। ২২
কখনও তিনি বসে বসে নামায পড়লে কেরাআতও বসে বসেই পড়তেন। কিন্তু যখন ৩০/৪০ আয়াত বাকী থাকত, তখন তিনি দাঁড়াতেন। তারপর রুকু ও সাজদা করতেন। দ্বিতীয় রাকআতেও তিনি অনুরূপ করতেন। ২৩
তিনি শেষ বয়সে বসে নফল নামায পড়েছেন। ইন্তিকালের এক বছর আগে তিনি বসে নফল নামায পড়েন। ২৪
রসূলুল্লাহ (সঃ) আসন-পিঁড়ি হয়ে এক পায়ের উপর অন্য পা আড়াআড়িভাবে স্থাপন করে বসতেন। ইংরেজিতে একে Cross-Legged বলে। ২৫
টিকাঃ
২২. মুসলি, আবু দাউদ।
২৩. বোখারী, মুসলিম।
২৪. মুসলিম, আহমদ।
২৫. নাসাঈ, ইবনে খোযাইমাহ, হাকেম।
📄 জুতা সহকারে নামায পড়া ও অনুরূপ করার আদেশ
রসূলুল্লাহ (সঃ) কখনও জুতা পায়ে এবং কখনও খালি পায়ে নামায পড়তেন। তিনি নিজ উম্মাহর জন্যও অনুরূপ করাকে বৈধ করে গেছেন। ২৬
তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ নামায পড়লে সে যেন জুতা পরে থাকে কিংবা দুই পায়ের মাঝখানে তা খুলে রাখে। জুতা দিয়ে কাউকে যেন কষ্ট না দেয়। ২৭
তিনি কখনও জুতা সহকারে নামায পড়ার বিষয়ে তাকীদ দিতেন। তিনি বলেছেন: তোমরা ইহুদীদের বিরোধিতা কর, তারা জুতা ও চামড়ার মোযায় নামায পড়ে না। ২৮
কখনও তিনি নামাযের মধ্যেই দুই পায়ের জুতা খুলে নামায অব্যাহত রাখতেন। এমর্মে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেনঃ একদিন রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নিয়ে নামায পড়েন। তিনি নামাযে জুতা খুলে বামদিকে রাখেন। তা দেখে লোকেরাও জুতা খুলে ফেলল। তিনি নামায শেষে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেন জুতা খুলে রেখেছ? তারা বলল, আপনাকে জুতা খুলতে দেখে আমরাও জুতা খুলে রেখেছি। তিনি বললেন, আমার কাছে জিবরীল (আঃ) আসেন এবং জুতায় অপবিত্রতার খবর দেন। তাই আমি তা খুলে রেখেছি। তোমরা মসজিদে আসলে নিজের জুতা দেখে নেবে। তাতে ময়লা থাকলে মুছে ফেলবে এবং জুতা সহকারেই নামায পড়বে। ২৯
তিনি জুতা খুলে তা বাম পার্শ্বে রাখতেন। ৩০
তিনি বলতেন, তোমরা নামায পড়লে নিজ জুতা খুলে ডানে ও বামে রাখবে না যা অন্যের ডানে পড়তে পারে। তবে বামদিকে কেউ না থাকলে বামে রাখা যেতে পারে। অন্যথায় নিজের দুই পায়ের মাঝখানে রাখবে। ৩১
টিকাঃ
২৬. আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। ইমাম তাহাবী বলেছেন, এটি মোতাওয়াতের হাদীস।
২৭. আবু দাউদ, বায্যার।
২৮. ঐ।
২৯. আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ, হাকেম। ইমাম আযযাহাবী ও ইমাম নববীও একে বিশুদ্ধ হাদীস বলেছেন।
৩০. আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনু খোযায়মাহ।
৩১. আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মা, হাকেম।
📄 মিম্বরের ওপর নামায আদায়
একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর নামায আদায় করেন। এক বর্ণনায় এসেছে, মিম্বরের ছিল তিনটি তাক বা সিঁড়ি। ৩২
তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়ান ও তাকবীর বলেন। লোকেরাও তাঁর পেছনে তাকবীর বলেন। তারপর তিনি মিম্বরের উপরই রুকুতে যান এবং রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ান। তারপর নীচে নেমে আসেন এবং মিম্বরের নীচের সিঁড়িতে সাজদা করেন। তারপর আবার মিম্বরের উপর উঠেন এবং প্রথম রাকআতের অনুরূপ নামায পড়েন। এইভাবে তিনি নামায শেষ করেন। তারপর লোকদের দিকে ফিরে বলেন, হে লোকেরা! আমি এরূপ করেছি যেন তোমরা আমাকে ভালভাবে অনুসরণ করতে পার এবং আমার নামায দেখে শিখতে পার। ৩৩
টিকাঃ
৩২. তিন সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরই সুন্নত। বেশি সিড়ি নামাযের কাতারের জন্য অসুবিধে। এটি উমাইয়া আমলের বেদআত।
৩৩. বোখারী, মুসলিম।
📄 সুতরাহ (আড়াল) ও এর অপরিহার্যতা
রসূলুল্লাহ (সঃ) সুতরার কাছে দাঁড়াতেন। দেয়াল থেকে তিনি তিন হাত দূরে দাঁড়াতেন। ৩৪
তাঁর সাজদা ও দেয়ালের মাঝে একটি ভেড়া পারাপারের জায়গা থাকত। ৩৫
রসূলুল্লাহ (স) বলতেন, সুতরার দিক ছাড়া অন্যদিকে ফিরে নামায পড়বে না এবং তোমার নামাযের সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দেবে না। কেউ অস্বীকার করলে তুমি তার সাথে লড়বে। তার সঙ্গে একজন সাথী রয়েছে। ৩৬
রসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন, কেউ যদি সুতরার দিকে মুখ করে নামায পড়ে, সে যেন সুতরার নিকটবর্তী হয় এবং শয়তানকে নিজ নামায অতিক্রম করার সুযোগ না দেয়। ৩৭
রসূলুল্লাহ (সঃ) কখনও কখনও মসজিদের খুঁটিকে সামনে রেখে নামাষ পড়েছেন। ৩৮
রসূলুল্লাহ (সঃ) 'আড়ালবিহীন খোলা মাঠে নামায পড়ার সময় সামনে যুদ্ধাস্ত্র দাঁড় করিয়ে সেই দিকে মুখ করে নামায পড়তেন এবং লোকেরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতেন। ৩৯
কোন কোন সময় তিনি সওয়ারীকে সামনে রেখে তার পেছনে নামায পড়েছেন। ৪০
তবে উটের আস্তাবলে নামায পড়ার অনুমতি নেই। বরং রসূলুল্লাহ (সঃ) তা করতে নিষেধ করেছেন। ৪১
কখনও কখনও তিনি সওয়ারীর আসনকে সুতরাহ বানিয়ে সেদিকে ফিরে নামায পড়েছেন। ৪২
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি নিজের সামনে সওয়ারীর আসনের পেছনের কাঠের অনুরূপ একটা কিছু রেখে নামায পড়ে, তাহলে তার সামনে দিয়ে কি অতিক্রম করল এ বিষয়ে তার কোনো পরোয়া নেই। ৪৩
তিনি কখনও কখনও গাছের দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। ৪৪
তিনি কখনও খাটের দিকে ফিরে নামায পড়েছেন এবং আয়েশা (রাঃ) নিজ চাদর মুড়ি দিয়ে খাটে শোয়া ছিলেন। ৪৫
রসূলুল্লাহ (সঃ) সুতরাহ ও নিজের মাঝখানে কোনো কিছুকে অতিক্রম করতে দিতেন না। কোন ভেড়া-বকরী তাঁর নামাযের সামনে দিয়ে পার হতে চাইলে তিনি ভেড়া-বকরীর আগেই দ্রুত দেয়ালের সাথে পেট লাগিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়াতেন এবং ভেড়া-বকরী তার পেছন দিয়ে পেরিয়ে যেত। ৪৬
একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) ফরয নামায পড়ার সময় নিজ হাত একসাথে মিলান। তাঁর নামায শেষে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! নামাযে কি কিছু ঘটেছে? তিনি বলেন, না। তবে শয়তান আমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাচ্ছিল। আমি তার গলা চেপে ধরি এবং আমার হাতে তার জিহ্বার শীতলতা অনুভব করি। আল্লাহর কসম, যদি এ ব্যাপারে আমার ভাই নবী সোলায়মান (আঃ) আমার অগ্রগামী না হতেন, তাহলে আমি তাকে মসজিদের একটি খুটির সাথে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তাকে দেখার জন্য চক্কর লাগাত। কেউ যদি চায় যে, কেবলা ও তার মাঝে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি না হোক, তাহলে সে যেন সক্ষম হলে অনুরূপ করে। ৪৭
রসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, কোনো ব্যক্তি লোকদেরকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে সুতরার দিকে ফিরে নামায পড়ার সময় অন্য কোন ব্যক্তি তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে তাকে বুক দিয়ে প্রতিরোধ করবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাকে সাধ্যমত প্রতিহত করবে। আরেক বর্ণনায় এসেছে, তাকে দুইবার নিষেধ করতে হবে। যদি সে না মানে, তাহলে তার সাথে লড়াই করতে হবে। কারণ সে ব্যক্তি শয়তান। ৪৮
তিনি আরো বলেছেন, নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তি যদি জানত যে, তার পরিণতি কি, তাহলে নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চাইতে তার জন্য ৪০ পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম। ৪৯
টিকাঃ
৩৪. বোখারী, আহমদ।
৩৫. রোখারী ও মুসলিম।
৩৬. ইবনু খোযায়মাহ।
৩৭. আবু দাউদ, বায্যার, পৃঃ ৪৫, হাকেম। ইমাম যাহাবী ও নববী একে সহীহ হাদীস বলেছেন।
৩৮. ছোট-বড়ো সকল মসজিদে সুত্রার পেছনে নামায পড়ার জন্য ইমাম আহমদ উৎসাহিত করেছেন। এটাই যথার্থ। (মাসায়েল আন ইমাম আহমদ: ইবনু হামি, ১ম খন্ডঃ ৬৬ পৃঃ)
৩৯. বোখারী, মুসলিম ও ইবনু মাজাহ।
৪০. বোখারী, আহমদ।
৪১. ঐ।
৪২. মুসলিম, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ।
৪৩. মুসলিম, আবু দাউদ
৪৪. নাসাঈ, আহমদ।
৪৫. বোখারী, মুসলিম, আবু ইয়ালী।
৪৬. ইবনু খোযায়মাহ, তাবারানী, হাকেম, আযযাহাবী।
৪৭. আহমদ, দার কোতনী এবং সহীহ সনদ সহকারে তাবারানীও বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি বোখারী মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে একদল সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আছে। এই হাদীস কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে একটি দলীল। তারা জিন স্বীকার করে না। তাদের মতে, জিন বলতে মানুষকে বুঝানো হয়েছে।
৪৮. বোখারী, মুসলিম, ইবনু খোযায়মাহ।
৪৯. ঐ।