📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 ইমামদের হাদীস বিরোধী বক্তব্যে ছাত্রদের ভূমিকা

📄 ইমামদের হাদীস বিরোধী বক্তব্যে ছাত্রদের ভূমিকা


বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণের উদ্দেশ্যে অনেক ছাত্র নিজ ইমামদের সকল কথা গ্রহণ করেননি। তারা ইমামদের সহীহ হাদীস পরিপন্থী বহু বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন কি হানাফী মাযহাবের দুই ইমাম মোহাম্মদ ও আবু ইউসুফ নিজ ওস্তাদ আবু হানীফা (রঃ)-এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মতের ক্ষেত্রে ভিন্ন মত প্রদান করেছেন।
তারা তা বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে বহু শাখা-প্রশাখা মাসআলা আলোচনা করেছেন। ৩৩ খ
শাফেঈ মাযহাবের ইমাম মোযানীসহ অন্যান্য অনুসারীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ৩৪
আমরা এই বিষয়ে আরো উদাহরণ দিলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে এবং বিষয়বস্তুকে সংক্ষিপ্ত করার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটবে। এজন্য আমরা মাত্র দু'টি উদাহরণ দিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শেষ করবো।
১. ইমাম মোহাম্মদ তাঁর মোআত্তা গ্রন্থের ১৫৮ পৃষ্ঠায় বলেছেন: আবু হানীফা (রঃ) এস্তেস্কার (বৃষ্টি প্রার্থনায়) নামায পড়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেননি। কিন্তু আমাদের মত হল, ইমাম লোকদের নিয়ে জামাতে দুই রাক'আত নামায পড়বেন, তারপর দোআ করবেন ও নিজ চাদর উল্টিয়ে পরবেন। ৩৫
২. ইমাম মোহাম্মদের সাথী এবং ইমাম আবু ইউসুফের ছাত্র ইসাম বিন ইউসুফ আল-বালখী বহু বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর বিপরীত ফতোয়া দিয়েছেন। ৩৬ প্রথমে ইসামের দলীল জানা ছিল না। পরবর্তীতে দলীল জেনে তিনি বিপরীত ফতোয়া দিয়েছেন। ৩৭ তাই তিনি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় দুই হাত উপরে উঠাতেন। ৩৮ এমনটি করার কথা রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বহুসংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা বিভিন্ন যুগে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ এটি হাদীসে মোতাওয়াতের। ঐ হাদীসের উপর আমল করতে তার কোনো অসুবিধে হয়নি। যদিও তাঁর তিনজন ইমামই এর বিপরীত মত পোষণ করেছেন। সকল মুসলমানের উচিত হল চার ইমামসহ অন্যদের ব্যাপারে ঐ রকম সাক্ষ্য দান করা।
সারকথা: আমি আশা করবো মাযহাবের কোনো অন্ধ অনুসারী যেন এই বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সমালোচনা না করেন এবং তার নিজ মাযহাবের বিরোধী বলে এ বইতে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা ত্যাগ না করেন। আমি আশা করবো তারা হাদীসের উপর আমলের জরুরত স্মরণ রাখবেন। মত-পার্থক্যের সময় আমাদেরকে হাদীসের দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

টিকাঃ
৩৩. ক. আল-ফোলানী, পৃঃ ৯৯।
৩৩. খ. তিনি ইমাম শাফেয়ী'র আল-উন্মু কিতাবের টীকায় মুদ্রিত শাফেয়ী' ফেকহের প্রথম সংক্ষিপ্ত কিতাবে বলেছেন, আমি মোহাম্মদ বিন ইদরিস শাফেয়ী'র অবগতি সাপেক্ষে এই সংক্ষিপ্ত ফেকাহ রচনা করেছি। তাঁর এই কথার অর্থ হল শাফেয়ী (রঃ) তাঁর ইচ্ছাকে অনুমোদন করেছেন এবং তিনি অন্যের অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন যাতে করে প্রত্যেকেই নিজের দীনের প্রতি লক্ষ্য রাখে এবং নিজের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে।
৩৪. আল-হাশিয়া-ইবনু আবেদীন, ১ম খন্ড, ৬২ পৃঃ। লক্ষ্মবী আন-নাফে' আল কবীর গ্রন্থের ৯৩ পৃঃ এটাকে ইমাম গাযযালীর বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন।
৩৫. তিনি এ গ্রন্থে ২০টি মাসআলায় ইমাম আবু হানীফার সাথে দ্বিমতের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো তাঁর গ্রন্থের নিম্নোক্ত পৃষ্ঠায় রয়েছে: ৪২, ৪৪, ১০৩, ১২০, ১৫৮, ১৬৯, ১৭২, ১৭৩, ২২৮, ২৩০, ২৪০, ২৪৪, ২৭৪, ২৭৫, ২৮৪, ৩১৪, ৩৩১, ৩৩৮, ৩৫৫, ৩৫৬।
৩৬. আল ফাওয়ায়েদ আল বাহিয়‍্যাহ ফী তারাজিমিল হানাফিয়্যা: পৃঃ ১১৬।
৩৭. আল-বাহরুর রায়েক, ষষ্ঠ খন্ড, ৯৩ পৃঃ। রাসমুল মুফতী, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৮।
৩৮. আল ফাওয়ায়েদ, পৃঃ ১১৬। এরপর তিনি মন্তব্য করেন, মযবুত দলীলের ভিত্তিতে ইমামের তাকলীদ ত্যাগ করলেও জাহেল লোকেরা সমালোচন করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আল্লাহর কাছে রইল।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায > 📄 একটি সন্দেহের জওয়াব

📄 একটি সন্দেহের জওয়াব


দশ বছর পূর্বে লেখা আমার বই-এর এ ভূমিকা দ্বারা যুবক মোমেনদের মনে সাড়া জেগেছে। তাতে তাদেরকে ইসলামের নির্ভুল উৎস কোরআন ও হাদীসের দিকে ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। আল হামদু-লিল্লাহ্ এর ফলে হাদীসের উপর আমলকারী লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা এমর্মে অন্যদের কাছে পরিচিতিও হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি কিছু লোকের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে স্থবিরতা লক্ষ্য করেছি। এতে আর কি সন্দেহ থাকতে পারে, যেখানে আমি কোরআন, হাদীস ও ইমামদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রমাণ করেছি যে, সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু কিছু সংখ্যক অনুসারী তাদের অনুসৃত মোকাল্লাদ শেখদের বিভিন্ন কথা দ্বারা সংশয়ের আবর্তে দিন কাটাচ্ছেন। তাই আমি ঐ সকল সন্দেহ-সংশয়ের জওয়াব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। আশা করি এর ফলে তারা হাদীসের অনুসরণ করতে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবেন। এখন আমরা নিম্নোক্ত সন্দেহগুলোর জওয়াব দেবো:
১. কেউ কেউ বলেন, দীনী ব্যাপারে রসূলুল্লাহর জীবন ও চরিত্রের দিকে প্রত্যাবর্তন করা খুবই জরুরী। বিশেষ করে নামাযের মত বাধ্যতামূলক নিরেট ইবাদতসমূহে যেখানে ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগত মতের কোনো স্থান নেই, সেক্ষেত্রে তা আরো বেশি প্রযোজ্য। কিন্তু আমরা কোনো মোকাল্লেদ (অনুসারী) আলেম ও শেখকে এ বিষয়ে আদেশ দিতে দেখি না বরং তারা মতভেদকে মেনে নেন। তাদের ধারণা এটা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি কনসেশন বা রেয়াত। তারা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন:
اخْتِلَافُ أُمَّتِي رَحْمَةً অর্থ : 'আমার উম্মতের মধ্যকার মতভেদ রহমত স্বরূপ।' এই হাদীস আপনি যে পদ্ধতির দিকে আহ্বান জানান তার বিপরীত। এ ব্যাপারে আপনার জওয়াব কি?
এই প্রশ্নের দু'টি উত্তর আছে।
প্রথমত হাদীসটি সহীহ নয় বরং তা বাতিল এবং এর কোন ভিত্তি নেই। আল্লামা সাবকী বলেছেন: আমি এই হাদীসের কোনো সহীহ সনদ খুঁজে পাইনি। এমনকি এর কোনো দুর্বল ও মাওযু (মিথ্যা) সনদও নেই। অর্থাৎ এটি আদৌ হাদীস নয়।
এক্ষেত্রে আরো দু'টো হাদীস উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলঃ . اخْتِلَافُ أَصْحَابِي لَكُمْ رَحْمَةٌ - أَصْحَابِي كَالنُّجُومِ فَبِأَيِّهِمْ اِقْتِدَيْتُمْ اهْتَدَيْتُمْ .
১. 'আমার সাহাবীদের মতপার্থক্য রহমত স্বরূপ।' ২. আমার সাহাবীরা তারার মত। তাদের যে কাউকে অনুসরণ করবে হেদায়াত লাভ করবে।'
এই দু'টো হাদীসই সহীহ নয়। প্রথমটা খুবই দুর্বল এবং দ্বিতীয়টা মাওযু বা অসত্য হাদীস। আমি এ বিষয়ে আমার 'সিলসিলাতুল আহাদীস আযযাঈফা ওয়াল মাওযুআহ' গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। (নম্বর যথাক্রমে ৫৮,৫৯, ৬১)
প্রথম হাদীসটি একদিকে দুর্বল, অন্যদিকে তা কোরআনের বিপরীত। কোরআন বলেছে তোমরা দীনী বিষয়ে মতভেদ কর না, বরং তাতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কর। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا رِيحَكُمْ . (الانفال - ٤٦)
অর্থ: "তোমরা ঝগড়া ও মতবিরোধ কর না, তাহলে তোমাদের শক্তি চলে যাবে ও তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।" (সূরা আনফালঃ ৪৬)
وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ - (الروم - (۳۱ - ۳۲)
অর্থঃ "তোমরা ঐ সকল মোশরেকের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা নিজেদের দীনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়ে খুশী।' (সূরা রূম: ৩১-৩২)
আল্লাহ বলেন:
وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ إِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبِّكَ (هود - ۱۱۹۲۱۱۸)
অর্থঃ "আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্যরা মতভেদ অব্যাহত রেখেছে।” (সূরা হুদ: ১১৮-১১৯)
যাদের উপর আল্লাহর রহমত হয়েছে, তারা মতভেদ করে না, বরং বাতিল পন্থীরাই মতভেদ করে। তাহলে কি করে ধারণা করা যায় যে, মতভেদ ও মতপার্থক্য দ্বারা রহমত আসবে?
এটা প্রমাণিত হল যে, বর্ণিত হাদীসগুলো সহীহ নয়, সনদ বা মূল বাক্য কোনটাই বিশুদ্ধ নয়। ৩৯ এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, ইমামরা যে হাদীস ও কোরআন অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন, এতো দুর্বল শোবা-সন্দেহের কারণে তার উপর আমল করা থেকে বিরত থাকা জায়েয হবে না।
২. কেউ কেউ প্রশ্ন করেন দীনী বিষয়ে যদি মতপার্থক্য নিষিদ্ধ হয়, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তীতে ইমামদের মতপার্থক্য সম্পর্কে কি জওয়াব আছে? তাদের মতভেদের সঙ্গে কি পরবর্তী লোকদের মতপার্থক্যের কোন ব্যবধান আছে?
এর জওয়াব হচ্ছে, হাঁ, উভয় দলের মতভেদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। ঐ মত পার্থক্য দুই ভাবে বিবেচনা করতে হবে। একটি হচ্ছে, মতপার্থক্যের কারণ আর অন্যটি হচ্ছে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব।
সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্য ছিল জরুরত ভিত্তিক এবং তাঁদের বুঝ-শক্তির স্বাভাবিক পার্থক্য। ইচ্ছাকৃত ভাবে তাঁরা মতপার্থক্য করেননি। তাঁদের যুগে আরো কিছু বিষয়ও এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল। প্রথমে মতভেদ দেখা দিলেও পরে তা দূর হয়ে গেছে। ৪০ ঐ জাতীয় মতপার্থক্য থেকে পুরো মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তারা উপরে বর্ণিত আয়াতে নিন্দারযোগ্য নয় এবং তারা শাস্তিও পাবেন না। কেননা, শাস্তির জন্য যে ইচ্ছা ও পুনরাবৃত্তি দরকার তা তাদের বেলায় অনুপস্থিত।
পক্ষান্তরে, অনুসারী বা মোকাল্লেদদের মতভেদের ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কোনো ওযর নেই। তাদের কিছু সংখ্যকের জন্য কোরআন ও হাদীস থেকে এমন সুস্পষ্ট দলীল পেশ করা যায়, যা অন্য কোনো মাযহাবের মতকে সমর্থন করে। তা সত্ত্বেও যদি তা ভিন্ন মাযহাবের অজুহাতে ত্যাগ করে, তাহলে বুঝতে হবে তার কাছে মাযহাবটাই আসল কিংবা সেটাই একমাত্র দীন। যে দীন নবী করীম (সঃ) দুনিয়ায় নিয়ে এসেছেন এবং অন্যান্য মাযহাব ভিন্ন এবং বাতিল দীন। নাউযুবিল্লাহ।
মূলত এক মাযহাবের কোনো অনুসারী অন্য যে কোনো মাযহাব থেকে যা ইচ্ছা ও যতটুকু ইচ্ছা ততোটুকু গ্রহণ করতে পারে এবং নিজ মাযহাব থেকেও যতটুকু ইচ্ছা ততোটুকু ছাড়তে পারে। কেননা, সবটুকুই এবং সব মাযহাবই শরীআহ বা আল্লাহর আইন ভিত্তিক। তাতে কোনো অসুবিধে নেই। বাতিল হাদীসের উপর ভিত্তি করে মতভেদের উপর অর্থহীনভাবে অটল থাকার কোনো যুক্তি নেই। মতভেদের বিষয়ে অনেক ওলামায়ে কেরাম মন্তব্য করেছেন। তাদের মন্তব্যগুলো হচ্ছেঃ
ইবনুল কাসেম বলেছেন: আমি ইমাম মালেক এবং ইমাম লাইসকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্যের বিষয়ে আলোচনা করতে শুনেছি। তাঁরা বলেন, লোকেরা বলে, তাতে প্রশস্ততা ও উদারতা রয়েছে। আসলে সে রকম নয়। আসলে তা ছিল ভুল ও শুদ্ধ কাজ। ৪১
আশহাব বলেন: ইমাম মালেককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্ভরযোগ্য (ছেকা) সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাতে কি প্রশস্ততা ও উদারতা আছে?
তিনি জওয়াবে বলেন, না। আল্লাহর কসম, যে পর্যন্ত না সঠিক হাদীস বর্ণনা করে। হক ও সত্য এক। দুটো বিপরীত কথা একই সময়ে কি করে হক হয়? হক ও সত্য একটাই। ৪২
ইমাম শাফেঈ (রঃ)-এর সাথী মোযানী বলেন : সাহাবায়ে কেরাম মতভেদ করেছেন, একে অপরকে ভুল বলেছেন, একজন আরেকজনের কথায় সন্দেহ পোষণ করে পরে তা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। যদি তাঁদের সকলের সব কথা সঠিক হত, তাহলে তাঁরা অনুরূপ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করতেন না।
উমার ফারুক (রাঃ) এক কাপড়ে নামায আদায়ের ব্যাপারে উবাই বিন কা'ব ও আবদুল্লাহ বিন মাসউদের মতভেদের কারণে রাগ করেছিলেন। উবাই বলেছিলেন, এক কাপড়ে নামায আদায় করা সুন্দর ও উত্তম। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, তাতো করা যায় কিন্তু তাতে কাপড় খুব কম হয়ে যায়। তখন উমার (রাঃ) রাগ করে বেরিয়ে আসেন এবং বলেন, উবাই ঠিক কথাই বলেছে। তিনি ইবনে মাসউদের কথাকে এক্ষেত্রে বড়ো করে দেখেননি। তারপর তিনি বলেন, এখন থেকে আমি আর কাউকে মতভেদ করতে দেখলে তাকে এই এই করবো। ৪৩
এটা প্রমাণিত হয়ে গেলো যে, মতভেদ সকল মন্দের মূল, তা রহমত নয়। কিছু মতভেদের জন্য পাকড়াও করা হবে। যেমন চরমপন্থী মাযহাবের অনুসারী লোক। আর কিছু মতভেদ আছে যার জন্য পাকড়াও করা হবে না। যেমন, সাহাবায়ে কেরামের মতভেদ এবং ইমামদের মতপার্থক্য। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করুন। সাহাবাদের মতপার্থক্য অন্ধ অনুসারীদের মতপার্থক্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাহাবায়ে কেরাম বাধ্য হয়ে মতভেদ পোষণ করেছেন। কিন্তু তাঁরা মতভেদকে অপছন্দ করতেন ও অস্বীকার করতেন এবং মতভেদ থেকে বাঁচার উপায় পেলে বেঁচে থাকতেন। কিন্তু অন্ধ অনুসারীরা (মোকাল্লেদ) তা থেকে বাঁচার উপায় থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকেন না, ঐক্যবদ্ধ হন না, সেজন্য চেষ্টা করেন না। বরং মতভেদকে জিইয়ে রাখেন।
এই উভয়ের মধ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাবের পার্থক্য সুস্পষ্ট। শাখা-প্রশাখায় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম ঐক্য রক্ষার ব্যাপারে ছিলেন খুবই সতর্ক। তাঁরা অনৈক্য সৃষ্টিকারী কথা ও কাজ থেকে বহুদূরে অবস্থান করতেন।
তাঁদের কেউ প্রকাশ্যে বিসমিল্লাহ পড়ার পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কেউ দুই হাত উত্তোলনকে (রাফয়ে ইয়াদাইন) উত্তম মনে করতেন, কেউ তা মনে করতেন না। কেউ স্ত্রীকে স্পর্শ করলে উযু ভেঙ্গে যায় মনে করতেন, আবার কেউ তা মনে করতেন না। তা সত্ত্বেও তাঁরা সবাই একই ইমামের পেছনে নামায পড়েছেন এবং কেউ মাযহাবী মতভেদের কারণে অপরের পেছনে নামায পড়া থেকে বিরত থাকতেন না।
কিন্তু মোকাল্লেদদের (অনুসারীদের) অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মতপার্থক্যের কারণে তারা ইসলামের দ্বিতীয় মহান রোকন নামাযের ব্যাপারেও ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা একই ইমামের পেছনে সবাই এক সঙ্গে নামায পড়তে অনিচ্ছুক। কেননা, তাদের দৃষ্টিতে ভিন্ন মাযহাবের অনুসারী ইমামের নামায বাতিল কিংবা কমপক্ষে মাকরূহ। আমরা এরকম বহু শুনেছি ও দেখেছি। ৪৪ কেন তা শুনব না? কোনো কোনো প্রখ্যাত মাযহাবের কিতাবে উক্ত নামাযকে বাতিল কিংবা মাকরূহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে, একই জামে মসজিদে চার মাযহাবের চারটি মেহরাব দেখা যায় এবং তাতে চারজন ইমাম একের পর এক নামায পড়ান। প্রত্যেক মাযহাবের লোকেরা যে মুহূর্তে নিজ ইমামের অপেক্ষা করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য ইমাম দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছেন।
শুধু তাই নয়, কোনো কোনো অন্ধ অনুসারী আরো কঠিন মতভেদও পোষণ করেন। তারা হানাফী মাযহাবের অনুসারীর সঙ্গে শাফেঈ মাযহাবের অনুসারীর বিয়ে-শাদী নিষেধ করেন। আবার কোনো কোনো মশহুর হানাফী শাফেঈ মাযহাবকে আহলে কিতাবের অনুরূপ মনে করে বিয়েকে জায়েয বলেছেন। ৪৫
এই ফতোয়া থেকে এরকম অর্থও বের করা হয় যে, শাফেঈ মাযহাবের কোনো পুরুষ হানাফী মাযহাবের কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না। যেমনটি আহলে কিতাবের সঙ্গে প্রযোজ্য।
বুদ্ধিমানের জন্যে পরবর্তী কালের আলেমদের মতভেদের কুফল বুঝার জন্য উপরোক্ত দুটি উদাহরণই যথেষ্ট। যদিও এরূপ আরো বহু উদাহরণ দেয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের পূর্বসূরী ওলামায়ে কেরামের মতভেদের কারণে উম্মাহর উপর কোনো খারাপ প্রভাব পড়েনি। তাদের সামনে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি না করার জন্য কোরআনের আয়াতগুলো পরিষ্কার ছিল। কিন্তু পরবর্তী যুগের ওলামায়ে কেরামের (মোতাআখিরীন) প্রেক্ষাপট তা নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহজ-সরল রাস্তার দিকে পথ প্রদর্শন করুন।
আফসোস! যদি তাদের মতভেদ শুধু প্রয়োজন ও বাধ্য হওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকত এবং অন্য যে সব জাতির কাছে দাওয়াত পৌঁছানো দরকার সে পর্যন্ত যদি তা বিস্তার লাভ না করত, তাহলে কতইনা ভাল হত! অথচ তা বিভিন্ন দেশের কাফেরদের পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। যে কারণে তারা আল্লাহর এই দীনে দলে দলে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মোহাম্মদ আল গাযালী তাঁর 'জলাম মিনাল গারব' বই-এর পৃষ্ঠা নং ২০০-তে লিখেছেনঃ আমেরিকার প্রিনস্টোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে একজন প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেন যে, প্রাচ্যবিদ ও ইসলামবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলে থাকেন, মুসলমানরা বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে কোন্ শিক্ষা তুলে ধরছে এবং তারা কোন্ ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছে? সেটা কি সুন্নীদের শিক্ষা, না শিয়াদের শিক্ষা? শিয়াদের মধ্যে তা ইমামিয়া সম্প্রদায়, না যায়েদিয়া সম্প্রদায়ের শিক্ষা? আবার তারা সবাই তাতেও শতধাবিভক্ত। তাদের মধ্যে একদল অগ্রসর চিন্তা-ভাবনা করে আর অন্যদল করে সেকেলে ও প্রাচীন চিন্তা-ভাবনা। মূল কথা, ইসলামের দাওয়াতদানকারীরা নিজেরা যেমন বিভ্রান্ত, তেমনি অন্যান্য লোকদেরকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বিভ্রান্ত করে তোলে।
আল্লামা সুলতান আল-মাসুমী তাঁর هَدِيَّةُ السُّلْطَانِ إِلَى مُسْلِمِي بِلَادِ جَابَانِ -
গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, টোকিও এবং ওসাকার জাপানী নাগরিকেরা প্রশ্ন করেছেন, দীন ইসলামের তাৎপর্য কি? মাযহাবের মানে কি? কোনো লোক মুসলমান হলে, তার জন্য কি চার মাযহাবের এক মাযহাব অনুসরণ করা জরুরী, না জরুরী নয়?
সেখানে এনিয়ে বিরাট মতভেদ দেখা দিয়েছে এবং ঝগড়া-ঝাটিও হয়ে গেছে। যখন কিছু জাপানী লোক ইসলাম কবুল করতে প্রস্তুত হয়েছে, তখন তারা টোকিও ইসলামী সংস্থার কাছে যান। সেখানে কিছু সংখ্যক ভারতীয় মুসলমান তাদেরকে হানাফী মাযহাব অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার জাভার কিছু মুসলমান তাদেরকে শাফেঈ মাযহাব অনুসরণের কথা বলেন। ইসলাম গ্রহণে জাপানী লোকেরা এসকল কথা শুনে ইসলাম কবুলের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে যান এবং মাযহাব তাদের ইসলাম গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৩. কেউ কেউ মনে করে, আমি লোকদের হাদীস অনুসরণ এবং ইমামদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার আহ্বানের মাধ্যমে তাদের ইজতিহাদ ও বক্তব্য সম্পূর্ণ ত্যাগ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছি।
এই অভিযোগের উত্তরে আমি বলবো, এই অভিযোগ মোটেই সত্য নয়, বরং তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বাতিল। আমার আগের বক্তব্যই এ কথার উত্তম প্রমাণ। আমি যা ত্যাগ করার আহ্বান জানাই তা হচ্ছে মাযহাবকে দীন না বানানো এবং তাকে কোরআন ও সুন্নাহর স্থলাভিষিক্ত না করা। এমন যেন না করা হয় যে, বিরোধ দেখা দিলে, কিংবা নতুন মাসআলা তৈরি অথবা জরুরী মাসআলার প্রয়োজনে কোরআন ও হাদীসকে বাদ দিয়ে মাযহাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করা হয়। বর্তমান যুগের ফকীহরা এরূপ করছেন এবং ব্যক্তিগত বিষয়, তালাক ও বিয়ে সহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা নতুন নতুন মাসআলা তৈরি করছেন। এজন্য তারা ভুল-শুদ্ধ বুঝার জন্য কোরআন ও হাদীসের শরণাপন্ন হচ্ছেন না। তারা তথাকথিত 'মতভেদ রহমত' এই তত্ত্ব কিংবা অনুমতি (রোখসত), সহজ ও সুবিধার উপর ভিত্তি করে মাসআলা প্রণয়ন করেন। এ প্রসঙ্গে সোলাইমান আতাইমী কতই না সুন্দর বলেছেন:
'তুমি যদি সকল আলেমের রোখসত-অনুমতিকে গ্রহণ কর, তাহলে তোমার মধ্যে সকল মন্দের সমাহার ঘটবে।৪৬
তিনি আরো বলেন, 'এটা ইজমা এবং এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ আছে বলে আমার জানা নেই।'
ইমামদের কথার দিকে প্রত্যাবর্তন করা, সেগুলোর সাহায্য নেয়া এবং উপকৃত হওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। বিশেষ করে যে সব বিষয়ে কোরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই, সে সব ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য থেকে উপকৃত হওয়া যাবে। এমন কি অধিকতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য কোরআন-হাদীসের বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে হবে। এতোটুকুকে আমরা অস্বীকার করি না। বরং তা করার জন্য আমরাও বলি এবং উৎসাহিত করি। এইভাবে ফায়দা গ্রহণ করা কাম্যও বটে। বিশেষ করে যারা কোরআন ও হাদীস মোতাবেক চলতে চায়, তারা অবশ্যই তাদের থেকে ফায়দা গ্রহণ করবে।
আল্লামা ইবনে আবদুল বার (রঃ) উক্ত গ্রন্থে বলেছেনঃ (২য় খন্ড, ১৭২ পৃঃ) 'প্রিয় ভাই, আপনার কর্তব্য হল মূলনীতির হেফাযত করা। জেনে রাখুন, যে ব্যক্তি হাদীস এবং কোরআনে বর্ণিত বিধানগলোর হেফাযত করে এবং ফকীহদের বক্তব্যের প্রতি নজর দেয়, সে এর মাধ্যমে নিজ ইজতিহাদকে সাহায্য করে। সে বিনা বিচার-বিশ্লেষণে কারোর আনুগত্য করে না এবং ইমামরা জ্ঞান-গবেষণা করে যা গ্রহণ করেছেন শুধু তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন না। সে বুঝ-বিবেচনার ব্যাপারে তাদেরকে অনুসরণ করে, তাদের প্রচেষ্টা ও প্রদত্ত তথ্যের জন্য তাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হলে সে জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানায়। অবশ্য তাদের অধিকাংশ বক্তব্যই সঠিক। সে তাদের দোষ-ত্রুটি গোপন করে না, যেমন তারাও নিজেদের দোষ-ত্রুটি গোপন করে যাননি। এজাতীয় ব্যক্তিই আমাদের পূর্বসূরীদের মতো সঠিক অনুসারী, যথার্থ সহযোগী এবং রসূলুল্লাহর (সঃ) হাদীস ও সহাবায়ে কেরামের চরিত্রের আনুগত্যকারী। যে ব্যক্তি বিচার-বিশ্লেষণ করে না, হাদীসকে নিজ রায়ের দ্বারা প্রতিরোধ করে এবং নিজের পান্ডিত্যের কাছে থেকে পরাভূত করে, সে ব্যক্তি গোমরাহ ও অন্যদেরকে গোমরাহকারী। আর যে ব্যক্তি জ্ঞান ব্যতীত ফতোয়া দেয়, সে কঠিনতম অন্ধ ও অধিকতর গোমরাহ।'
৪. কোনো কোনো অনুসারীর (মোকাল্লেদের) কাছে এমন এক ধারণা চালু আছে, যা তাদেরকে সেই হাদীস অনুসরণের বাধা দেয়, যে হাদীসের বিপরীতে তাদের মাযহাবের মাসআলা রয়েছে। তাদের ধারণা হল, ঐ ক্ষেত্রে হাদীসের অনুসরণ মাযহাবের ইমামের ত্রুটির প্রমাণ। তাদের কাছে ঐ ত্রুটি অর্থ ইমামের সমালোচনা ও দোষ ধরা। যা একজন সাধারণ মুসলমানের ক্ষেত্রেও জায়েয নেই, তা কিভাবে তাদের মাযহাবের ইমামদের ক্ষেত্রে জায়েয হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, এই ধারণা বাতিল। কেননা, এই ধারণার কারণে হাদীস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হয়। নচেত কি করে একজন বিবেকমান মুসলমান এ রকম বলতে পারে? স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) যেখানে বলেছেন:
إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ وَاحِدٌ (البخاري والمسلم)
অর্থ: 'বিচারক বিচারের পূর্বে ইজতিহাদ করে সঠিক রায়ে পৌছতে পারলে দু'টি বিনিময় পাবে। আর যদি ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তাহলেও একটি বিনিময় পাবে। '৪৭
এ হাদীস ঐ জাতীয় অর্থকে নাকচ করে দেয় এবং একথা পরিষ্কার করে বলে দেয় যে, 'অমুকে ভুল করেছে' শরীয়তে এই কথার অর্থ হল 'অমুক একটি মাত্র বিনিময় লাভ করেছে।' যদি তিনি ভুল করেও একটি 'পুরস্কার পান, তাহলে কি করে তাঁকে সমালোচনা করা হল ও তাঁর দোষ ধরা হল? এ জাতীয় ধারণা ভ্রান্ত। তাই এথেকে মুক্ত হওয়া দরকার। নচেত এটাই মুসলমানদের জন্য সমালোচনা ও দোষের কারণ হবে। আমরা জানি যে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ, তাবয়ে তাবেঈ' ও মোজতাহিদ ইমামগণ একে অপরের ভুল ধরতেন এবং একে অপরের প্রশ্নের জওয়াব দিতেন। ৪৮
এখন কি বুদ্ধিমান কোনো ব্যক্তি বলবেন যে, তারা একে অপরের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করেছেন? সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তির স্বপ্নের ব্যাখ্যার বিষয়ে হযরত আবু বকরের ভুল ধরেছিলেন। তিনি তাঁকে বলেন,
أَصْبَتَ بَعْضًا وَأَخْطَأْتَ بَعْضًا (بخاري ومسلم)
অর্থ: 'তুমি কিছু অংশের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছ আর কিছু অংশের ভুল ব্যাখ্যা করেছ।' তাই বলে কি রসূলুল্লাহ (সঃ) আবু বকরের সমালোচনা করেছেন বলতে হবে? কি আশ্চর্য ব্যাখ্যা তাদের? হাদীসের খেলাপ করলেও সম্মান দেখানোর নামে ভুলের উপর তাদের অনুসরণ করতে হবে?
ঐ ব্যক্তিরা ভুলে গেছে, তারা ঐ ধারণার কারণে যে মন্দ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল, সে মন্দের মধ্যেই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি তাদেরকে প্রশ্ন করে, অনুসরণ যদি অনুসৃত ব্যক্তির সম্মানের প্রতীক হয় এবং তার বিরোধিতা যদি তার অসম্মান হয়, তাহলে তোমরা কি করে নিজেদের জন্য রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের বিরোধিতাকে জায়েয এবং তাঁর অনুসরণ ত্যাগ করাকে বৈধ করলে? আনুগত্যের পরিবর্তনটা হল রসূল (সঃ) থেকে মাযহাবের ইমামের দিকে-যিনি মাসুম বা নিষ্পাপ নন। পক্ষান্তরে রসূল নিষ্পাপ। তাঁকে অসম্মান করা কি কুফরী নয়? ইমামের বিরোধিতা যদি অসম্মান হয়, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরোধিতা তো আরো বড়ো ধরনের অসম্মান হওয়ার কথা। শুধু তাই নয়, তা কুফরীও বটে। তারা এই প্রশ্নের কোনো জওয়াব দিতে পারবে না। তারা শুধু এইটুকু বলবে যে, আমরা ইসলামের প্রতি গভীর আস্থার কারণে সুন্নাহ ত্যাগ করেছি এবং তিনি হাদীস বা সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছেন।
আমি এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত একটি জবাব দিতে চাই। আমার কথা হল, অনেক ইমাম আছেন যারা তোমাদের চাইতে অধিকতর হাদীস জানেন। যদি তোমাদের মাযহাবের বিপরীত কোন হাদীস তারা বলেন এবং ঐ সকল ইমামদের মধ্য থেকে যে কোন একজন তা গ্রহণও করেছেন তখন তা গ্রহণ করা জরুরী। কেননা, তোমাদের কথা এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হাদীসের অনুসারী ইমামের আনুগত্য হাদীস পরিত্যগকারী ইমামের চাইতে শ্রেষ্ঠ। এটা খুবই পরিষ্কার বিষয়।
আমি এখন বলতে পারি, আমার এই পুস্তকটি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায সম্পর্কে সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীসের একটি সংকলন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তা ত্যাগ করার পক্ষে কোন ওযর চলে না। কেননা, তাতে এমন কিছু নেই যা ত্যাগ করার জন্য ওলামায়ে কেরামের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর আল্লাহ তাদেরকে এ জাতীয় ঐক্য থেকে রক্ষা করুন। এ বইতে এমন কোনো মাসআলা নেই, যা কোন না কোনো মাযহাব গ্রহণ করেননি। যে বা যারা ঐ বিষয়ে বলেননি, তারা নির্দোষ এবং একটা পুরস্কার দ্বারা পুরস্কৃত। তখন তাদের কাছে ঐ সম্পর্কে কোনো হাদীস পৌঁছেনি অথবা এমনভাবে পৌঁছেছে, যা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি কিংবা ওলামায়ে কেরামের কাছে স্বীকৃত কোনো ওযরের কারণে তারা তা গ্রহণ করতে পারেননি। তবে পরবর্তীতে যে সকল অনুসারীর কাছে তা পৌঁছেছে, তাদের কোনো ওযর গ্রহণযোগ্য নয়, বরং তাদের কর্তব্য হল হাদীস মেনে চলা। এ ভূমিকার এটাই উদ্দেশ্য।
আল্লাহ বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ أَمَنُوا اسْتَجِيبُو اللَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تحْشَرُونَ - (الانفال - (٢٤)
অর্থঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও। যখন রসূল তোমাদেরকে এমন জিনিসের দিকে ডাকে যা জীবন দান করবে। তোমরা জেনে রাখ, আল্লাহ বান্দাহ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করেন এবং তার দিকেই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে।” (সূরা আনফালঃ ২৪)
আল্লাহ সত্য বলেন এবং তিনি হেদায়াত দেন। তিনিই উত্তম পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী।

টিকাঃ
৩৯. কেউ ইচ্ছা করলে আমার উপরোক্ত গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পড়তে পারেন।
৪০. বিস্তারিত জানার জন্য ইবনু হাযমের 'ইহকাম ফী উসুলিল আহকাম' কিংবা শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবীর 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা' অথবা তাঁর বিশেষ পুস্তিকা 'আকদুল জাইয়েদ ফী আহকামিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলীদ' দ্রষ্টব্য।
৪১. জামে বায়ানিল ইল্ম: ইবনু আবদিল বার, ২য় খন্ড, পৃঃ ৮১'-৮২।
৪২. ঐ, ২য় খন্ড, ৮২, ৮৮ ও ৮৯ পৃঃ।
৪৩. ঐ, ২য় খন্ড, ৮৩-৮৪ পৃঃ।
৪৪. 'মা লা ইয়াজুযু ফীহিল খেলাফ' গ্রন্থের ৮ম অধ্যায়, পৃঃ ৬৫-৭২ দ্রষ্টব্য। তাতে এ জাতীয় কিছু উদাহরণ আছে, যা জামেয়া আযহারের ওলামায়ে কেরাম থেকে সংঘটিত হয়েছে।
৪৫. আল-বাহরুর রায়েক।
৪৬. ইবনে আবদুল বার, ২য় খন্ড, ৯১-৯২ পৃঃ।
৪৭. বোখারী ও মুসলিম।
৪৮. ইমাম মোযানী, পৃঃ ৩৬ এবং হাফেয ইবনে রজব, পৃঃ ২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00