📄 হাদীসের পাঠ
আলোচ্য দৃশ্যপটে, নবী তাঁর মাদী খচ্চরে চড়ে পবিত্র হজ্জ্বের যাত্রায় রত ছিলেন। হজ্জব্রত পালনের এই সুমহান অভিষ্ঠ লক্ষ্য এবং পবিত্র উপাসনা তাকে যুবক মুসলিমদের সাহচর্য এবং বন্ধুত্ব থেকে বিরত রাখতে পারে নি। তিনি আব্বাস তনয় আবুল ফদলকে সফর সঙ্গী হিসেবে আপন খচ্চরের পিছনে নিজের সাথে বসিয়েছিলেন। আবুল ফদল ছিলেন সুদর্শন যুবক, তার ছিল সুন্দর চুল এবং নজরকাড়া গায়ের রঙ।
নবী তাঁর যুবক সফরসঙ্গীকে সাথে করে মুজদালিফা অতিক্রম করেছিলেন। এ সময় তাঁদের পাশ দিয়ে মহিলা হজ্জ্বযাত্রীদের একটি কাফেলা অতিক্রম করে। তাঁদের পরনে ছিল শুভ্র পবিত্র সেলাইবিহীন হজ্জ্বের নির্ধারিত পোশাক যা একদিকে তাদের মননকে একনিষ্ঠ করে রেখেছিল এবং অন্যদিকে তাদেরকে বিনম্রভাবে উপস্থাপন করছিল। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং হজ্জ্ব কবুল হওয়ার মনোবাসনায় তারা পূর্ববর্তিদের দেখানো পথ অনুসরণ করে মক্কার পথ অতিক্রম করছিলেন। "আর হে প্রভু! আমি তাড়াতাড়ি তোমার কাছে এসেছি, যেন তুমি সন্তুষ্ট হও।”
এটা হতে পারে যে, মহিলাগণ হয়ত জনমানুষের ভীড় এড়াতে অন্যান্য হজ্জ্বযাত্রীদের পূর্বে মিনায় পৌছানোর চেষ্টা করছিলেন। এটাও অসম্ভব নয় যে তাদের ব্যস্ততার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে তাদের কারো হাত অথবা পায়ের কিছু অংশ প্রতিভাত হয়েছিল।
আমাদের যুবক বন্ধুটি নিজের দৃষ্টিকে সংযত করতে পারলেন না। মহান নেতা এবং পথপ্রদর্শক তার স্নেহের হাত দিয়ে ফদলের মুখমণ্ডল ঢেকে দিলেন এবং তাকে মৃদু আঘাত করলেন। যাতে ফদলের দৃষ্টি অন্য দিকে সরে যায়। কারণ, প্রথম দৃষ্টির জন্য ক্ষমা রয়েছে কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টির জন্য নেই।
টিকাঃ
১১৩. ত্ব-হা (২০: ৮৪)
📄 সুদর্শন যুবকের হৃদয় বিগলিত হলো কিন্তু দৃষ্টি থেমে থাকল না
আদর্শ নেতা এবং শিক্ষক-এর হাতের নির্দেশনায় তার মুখ এবং ঘাড় ঘুরে গেল। যখন ফদল তার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, তার দৃষ্টি চলে গেল ধাবমান মহিলাগণের দিকে। মহান প্রশিক্ষক, পথপ্রদর্শক নবী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এবং নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার মন যুবক সঙ্গীটির চিন্তায় মগ্ন ছিল এবং তার হাত তার গাল পর্যন্ত চলে গেল। "রসুলুল্লাহ পুনরায় অন্য দিকে হাত দিয়ে ফদলের মুখমণ্ডল ঢেকে দিলেন।"
মহান নেতা ধর্মনেতাসুলভ উপদেশের পরিবর্তে মৃদু আঘাত করলেন এবং উপদেশ বাণীর পরিবর্তে সরাসরি হাত ব্যবহার করলেন। এভাবেই মহান নেতা এবং দয়ালু শিক্ষক শিক্ষা এবং সংস্কারের অভিনব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন। প্রত্যেক মানুষেরই পাঁচটা ইন্দ্রিয় আছে, "শোনার জন্য কান, ঘ্রাণের জন্য নাক, দেখার জন্য চোখ, স্বাদ বোঝার জন্য জিহবা এবং অনুভব করার জন্য চামড়া"।
তার সম্মোধন, ব্যাখ্যা, শিক্ষা এবং সততা দিয়ে মহান নেতা নবী (সা) ইসলাম প্রচারের, যারা নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করতে চায় তাদের পথ দেখিয়ে দেয়ার, অভাবী ব্যক্তিটির অভাব পূরণের এবং সুন্নতের অমীয় সুধা পানের তৃষ্ণা নিবারণের বিকল্প পথ উন্মোচন করলেন। সত্যিকারের মহান নেতাদের পথ এমনই হয়। আর নবী-এর চেয়ে মহান নেতা আর কে হতে পারে?
একজন সফল নেতার দশম রহস্য : স্নেহময় হাত এবং কোমল স্পর্শ
এ গুপ্ত রহস্যের মূলে
মানুষের কিছু আবেগ এবং নিজস্ব কিছু উপলব্ধি রয়েছে। শুধু তার কাছ থেকে একদিকের অবস্থা বিবেচনা করলেই তার অনুমোদন অথবা তার মনকে পাওয়া যায় না। প্রকৃতিগতভাবেই একই স্বাদ এবং রঙ কোনো ব্যক্তির মনে একঘেয়েমী সৃষ্টি করে। সে কারণেই বিভিন্ন রঙ এর স্বাদ এবং ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
প্রত্যেক মানুষের তার স্বত্তাগত এবং অভ্যাসগত কিছু নিজস্ব চাহিদা রয়েছে। রাজনীতিবিদ এবং নেতাদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে উত্তম যারা ব্যক্তিবিশেষের প্রয়োজনকে সম্মান করতে পারেন এবং বুঝতে পারেন। মহান নেতা নবী এই ব্যাপারটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। সে কারণেই শুধুমাত্র বক্তব্য আর উপদেশ দিয়েই নয়, যারা তাঁর ওপর আস্থা রাখত এবং যারা তার ধর্মে বিশ্বাসী ছিল তিনি তাদের সকল অনুভূতিকেই পরিতৃপ্ত করেছিলেন। তাঁর প্রতি অবতীর্ণ বাণী থেকেই তিনি এটা বুঝতে পেরেছিলেন। নবী -এর মাধ্যমে এই যে মহান আদর্শ মানুষের কাছে এসে পৌছেছে তা বিভিন্ন আঙ্গিকে মানুষকে উপদেশ দেয়ার এবং চাহিদা মিটাবার সুযোগ দেয়।
যেমন কিছু কিছু উপদেশ রয়েছে শাব্দিক। যেমন- কুরআন তেলাওয়াত, জুময়ার খুতবা, আল্লাহর স্মরণে বিভিন্ন যিকির, দোয়া এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জ্ঞান। আবার কিছু কিছু উপদেশ এমন হতে পারে যা চোখে দেখা যায় না, যেমন আগের দিনের ধার্মিক মুসলমান এবং আলেমদের জীবনী।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যেও নিগুড় উপদেশ লুকিয়ে থাকে। যেমন- জামাতে নামাজের সময় কাতার সোজা রাখা, জিহাদের ময়দানের সোজা সারী, দুই মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাতে সালাম, করমর্দন এবং আলিঙ্গন, ইয়াতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া ইত্যাদি।
এমনকি সুস্বাদু রুচিকর খাবার, ঠান্ডা পানীয়, ভেড়ার গোশত, কুমড়া এবং আল্লাহ যেসব রুচিকর খাদ্য হালাল করেছেন তার মধ্যেও অনেক উপদেশ লুকিয়ে থাকে। নবী বিভিন্ন কথা এবং কাজ দ্বারা তা দেখিয়ে গিয়েছেন।
সুন্দর উপদেশের একটা প্রকার এটাও হতে পারে, যা ঘ্রাণের মাধ্যমে লাভ করা যায়। যেমন বিভিন্ন সুগন্ধী এবং আতর যা জুময়ার সালাতের সময়, ঈদের দিন এবং অন্যান্য জনসমাবেশে, দম্পত্তিদের কথোপকথোনের সময় ব্যবহৃত হয়।
নবীজী-এর জীবনীতে উপদেশ প্রদানের এমন অনেক উদাহরণ আছে যেগুলো অনুভব করতে পারা যায়। যেমন- হাতের সাথে হাত মিলানো, বা আলিঙ্গন। রসুলুল্লাহ-এর অনেক সাহাবী, অনেক শিশু সাহাবীও বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং অবস্থায়, শান্তির সময় বা যুদ্ধক্ষেত্রে, কৌতুকচ্ছলে বা গাম্ভীর্যে এই সম্মান লাভ করেছেন।
ইয়া আল্লাহ! মুহাম্মাদ, তার পরিবারবর্গ এবং সাহাবীগণের নিকট সালাত ও সালাম পৌঁছে দিন।
উত্তম হাতের বিবরণ
মখমলের মত কোমল...
আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জীবনে কখনও এমন কোনো আম্বর অথবা মেশক অথবা কোনো আতরের সুগন্ধি গ্রহণ করিনি যা রসূলুল্লাহ দৈহিক সুগন্ধ থেকে উৎকৃষ্ট, আর আমি কখনও কোনো রেশম বা রেশমী বস্ত্র বা কোনো বস্তু এরূপ স্পর্শ করিনি যা রসূলুল্লাহ (সা) স্পর্শ থেকে অধিক কোমল ও তুলতুলে।
টিকাঃ
১১৪. সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৫৬২০
📄 মিষ্টি ঘ্রাণ ও সুশীতল
জাবির ইবনে সামুরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার রসূলুল্লাহ-এর সাথে দিনের প্রথম নামায (যোহর) আদায় করলাম। অতঃপর তিনি নিজ পরিবারবর্গের নিকট রওয়ানা হয়ে গেলেন, আমিও তাঁর সাথে রওয়ানা হলাম। তিনি রওয়ানা হলে কিছু সংখ্যক বালক তাঁর নিকট উপস্থিত হলো। তিনি বালকদের প্রত্যকের গালে এক এক করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। জাবির বলেন, রসূলুল্লাহ আমার গালেও হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি রসূলুল্লাহ এর হাতের কোমল স্পর্শ অথবা সুগন্ধি এরূপ অনুভব করলাম যেন তাঁর মোবারক হাতখানা কোনো আতর বিক্রেতার আতরদানী থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন।
এই কোমল, শীতল, সুন্দর এবং সুগন্ধি স্পর্শ বন্ধু-শত্রু নির্বেশেষে উভয়ের দেহকেই স্পর্শ করেছে। যে স্থান এ স্পর্শ পেয়েছে তা নিয়ে এসেছে এমন ভালবাসা যা সকল চিন্তাকে দূর করেছে, বিরহের বেদনাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। এই সচেতন আবেগ এবং স্পর্শের উষ্ণতা তাদেরকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট একজন অনুগত এবং অনুতপ্ত মুসলিম হিসেবে সোপর্দ করতে বাধ্য করেছে।
টিকাঃ
১১৫. সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৪৪১৮
📄 তারা পেয়েছিলেন এই বিরল সম্মান
অনেক মানুষই স্নেহময় এ হাতের স্পর্শ পাবার সম্মান এবং সুযোগ লাভ করেছিলেন। যেমন-
-সেই যুবক যে যিনার অনুমতি চেয়েছিল
-ফুদালাহ ইবনে আমির আল লাইছি
-সাইবাহ ইবনে ইশাক আল হুজবী