📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 ভালবাসার উপাখ্যান

📄 ভালবাসার উপাখ্যান


যখন মৃত্যু আসে, তখন তা লোমকূপ পর্যন্ত পৌছে যায়। মৃত্যু প্রত্যেক প্রেমিককে দিগন্তের অপর প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়। মনের ইচ্ছাগুলি অপূর্ণই থেকে যায়। পুত্র যত প্রিয় হোক না কেন, ভাই যত মূল্যবান হোক না কেন, স্ত্রী যত প্রেয়সী হোক না কেন, বাড়ি যত প্রাসাদতুল্য বিলাসী হোক না কেন, মৃত্যু এর সব কিছু থেকে পৃথক করে দেয়। কিন্তু ভালবাসা হলো অকপট, স্পষ্ট এবং দাম্ভিক। এটা সব স্থানে উপস্থিত থাকে এবং সকল দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা হচ্ছেন সেই সব মানুষ যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, যে ভালবাসা তাদের সাথে এসেছিল তা এখনো রয়ে গেছে। আর তা থাকবে না কেন? ভালবাসা ছিল তাদের আত্মার চেয়ে বেশি প্রিয়, তারা ভালবাসাকেই আগলে রাখতে চাইতেন।

ভালবাসার উপাখ্যান: ১
হিব্বান ইবনে ওয়াসী তার গোত্রের কিছু বৃদ্ধ লোক হতে বর্ণনা করেন যে, বদর যুদ্ধের দিন আল্লাহর রসুল আনছ সাহাবা এদের কাতারকে সোজা করে দিচ্ছিলেন এবং তার একটি ছড়ি ছিল যা তিনি এই কাজে ব্যবহার করতেন। তিনি আদী ইবনে আন-নাজ্জার গোত্রের মিত্র সাওয়াদ ইবনে গাজিয়াহ এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সাওয়াদ সঠিক স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন না। নবী তাঁর ছড়ি দিয়ে তাঁকে মৃদু আঘাত করলেন। তিনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনি আমাকে আঘাত করলেন আর আল্লাহ আপনাকে সত্য এবং ন্যায় সহকারে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং আপনি আমাকে প্রতিশোধ নিতে দিন”
নবী বললেন, “প্রতিশোধ নাও”। তিনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনি যখন আমাকে আঘাত করেছেন তখন তো আমি জামা পরিহিত ছিলাম না”। নবী তাঁকে তাঁর পেট খুলে দেখিয়ে বললেন, “এখন তুমি প্রতিশোধ নিতে পার।” সাওয়াদ তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁর পেটে চুমু খেলেন। নবী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনো জিনিস তোমাকে এই কাজ করতে উৎসাহিত করল?” তিনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ! সার্বিক পরিস্থিতি তো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি না যে, আমি বেঁচে থাকব। এই জীবনের সবচেয়ে শেষ কাজ আমি করতে চেয়েছি যাতে আমার ত্বক আপনার ত্বকের স্পর্শ পায়”। নবী (সা) তার জন্য দুয়া করলেন এবং তার মাগফিরাত কামনা করলেন।

ভালবাসার উপাখ্যান: ২
আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ওহুদ যুদ্ধের এক পর্যায়ে সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তখন আবূ তালহা ঢাল হাতে নিয়ে নবী করিম-এর সম্মুখে প্রাচীরের ন্যায় অটল হয়ে দাঁড়ালেন। আবূ তালহা সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। অনবরত তীর ছুঁড়তে থাকায় তাঁর হাতে ঐদিন দু বা তিনটি ধনুক ভেঙ্গে যায়। ঐ সময় তীর ভর্তি শবাধার নিয়ে যে কেউ তাঁর নিকট দিয়ে যেতো নবী করিম (সা) তাঁকেই বলতেন, তোমরা তীরগুলি আবু তালহার জন্য রেখে দাও। এক সময় নবী করীম মাথা উচু করে শত্রুদের অবস্থা অবলোকন করতে চাইলে আবু তালহা বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমার মাতা পিতা আপনার জন্য কুরবান হউক, আপনি মাথা উচু করবেন না। হয়ত শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর এসে আপনার গায়ে লাগতে পারে। আমার বক্ষ আপনাকে রক্ষা করার জন্য ঢাল স্বরূপ।
কবির ভাষায়-
বাগানের কিনারায় আমাকে আমার চোখ মুছতে দাও
বেদনার অনল জ্বলে উঠেছে তোমার প্রেমে
আমি আমার পরিবার ভুলেছি, আমার ঘর ভুলেছি
তোমার প্রেমে আমি সব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি

ভালবাসার উপাখ্যান: ৩
রসুলুল্লাহ একটি সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করলেন। (তাদের মাঝে কিছু) মানুষকে হত্যা করা হলো এবং আবু খুবাইব আল-আনসারী এবং ইবনু- আদদাছানাহকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে বন্দি করা হলো।
যায়েদকে যখন হত্যা করা হবে তখন তাকে আবু সুফিয়ানের নিকট আনা হলো। সে তাকে জিজ্ঞেস করল, "আমি তোমার নিকট আল্লাহর দোহাই দিয়ে জানতে চাই, তুমি কি চাও যে তুমি মুক্তি পাও এবং তোমার স্থানে মুহাম্মাদের শিরচ্ছেদ করা হোক এবং তুমি তোমার পরিবারের সাথে নিরাপদে থাক"। যায়েদ বললেন, "আমি শপথ করে বলছি, মুহাম্মাদ এখানে থাকবে এটা আমি মানতে পারব না, এমনকি আমি এটাও মানতে পারি না যে, তার গায়ে ছোট্ট একটি কাঁটা বিদ্ধ হবে আর আমি পরিবার পরিজন সাথে করে নিরাপদে থাকব।" আবু সুফিয়ান বললেন, "আমি এমন কোনো মানুষ দেখিনি যে তার নেতাকে এরূপ ভালবাসে যতটুকু মুহাম্মাদের সঙ্গীরা তাকে ভালবাসে।"
বহু মানুষ আমার নিকট বিরহ ব্যথার অভিযোগ করেছে
ব্যথার প্রকটতায় তাদের বেঁচে থাকা এবং মৃত্যুবরণের পার্থক্য ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যা এই দুই পাজড়কে একত্রিত করার মত বিষয় এসে উপস্থিত হয় ...
আমি এমনটা দেখিওনি, শুনিওনি।

ভালবাসার উপাখ্যান: ৪
রাবিআল্লাহ আনহা আয়েশা বর্ণনা করেন। আবু বকর যখন মৃত্যুবরণ করছিলেন, তিনি প্রশ্ন করলেন, "এটা কোনো দিন?" তারা বললেন, "এটা সোমবার" তিনি বললেন, "এখন যদি আমি মৃত্যুবরণ করি তবে (কবরে সমাহিত করার জন্য) কাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর না। কারণ, আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় দিন এবং রাত হচ্ছে সেগুলোই যা আমাকে নবী -এর নিকটে নিয়ে আসে”

ভালবাসার উপাখ্যান: ৫
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবু সাসাহ বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ বললেন, "কেউ কি আমাকে বলতে পারবে সাদ ইবন রাবীর কি হয়েছে?" আনসারদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি বললেন, "ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি পারব।” সুতরাং যেখানে অন্যান্যরা নিহত হয়েছেন তাদের মাঝে তিনি তাঁকে খুঁজতে গেলেন এবং তাঁকে আহত এবং মৃতঃপ্রায় অবস্থায় খুঁজে পেলেন। তিনি তাঁকে বললেন, "ও সাদ! আল্লাহর রসূল আমাকে আদেশ করেছেন আমি যেন খুঁজে দেখি তুমি জীবিতদের মাঝে আছ না মৃতদের" তিনি বললেন, "আমি মৃতদের মাঝে আছি। সুতরাং রসূল -এর নিকট আমার সালাম পৌঁছে দিও এবং তাঁকে বল যে সাদ আপনাকে বলেছে, "আপনার অনুসারীদের ব্যাপারে আল্লাহ আপনাকে অন্যান্য নবীগণের তুলনায় সর্বত্তোম পুরস্কার দান করুন" মানুষজনের নিকট আমার সালাম পৌঁছে দিও এবং তাদেরকে বল যে, সাদ তোমাদের বলেছে তোমাদের নবী যদি আহত হন আর তোমরা জীবিত থাক তাহলে আল্লাহর নিকট তোমাদের কোনো ওযর পেশ করার সুযোগ নেই। "

ভালবাসার উপাখ্যান: ৬
কায়েস ইবনে হাযিম বর্ণনা করেন। "আমি তালহা -এর হাত অবশ (অবস্থায়) দেখেছি। উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি এ হাত নবী-এর প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করেছিলেন। "

টিকাঃ
১৭. মারিফাতুল সাহাবাহ লিআবি নু'মান আল-আসবাহানী হাদীস নং ৩১৩৫ ও সিলসিলাতিল আহাদিস আস-সহিহাহ লিল-আলবানী (৬/৮০৮)
১৮. আল-জামিউস সহীহ লিল বুখারী হাদীস নং ৩৬৩০
৯৯. মা'রিফাতুস সাহাবাহ আবু নুয়াইম আল-আসবাহানী হাদীস নং ২৬৩৭
১০০. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ৪৭
১০১. কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ৯৩
১০২. সহীহ আল-বুখারী- হাদীস নং ৩৮৬১

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 শত্রুর দৃষ্টিতে এই ভালবাসা

📄 শত্রুর দৃষ্টিতে এই ভালবাসা


একজন কাফের গোপন কথা ফাস করলেন ...
“হে আমার কওম! আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা বাদশাহর দরবারে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার (রোম) কিসরা (পারস্য) ও নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার) সম্রাটের দরবারে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আমি আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোনো রাজা বাদশাহকেই তার অনুসারীদের ন্যায় এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! রসূলুল্লাহ ﷺ যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোনো সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সংগে সংগে তারা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোনো আদেশ দিলে তারা তা সাথে সাথে পালন করেন; তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবীগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমন কি তাঁর সম্মানার্থে তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না।”

টিকাঃ
১০৩. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ২৬০৩

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 ভালবাসার কবিতা

📄 ভালবাসার কবিতা


আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “কাল তোমরা এমন কিছু মানুষের আতিথ্য করবে যাদের অন্তর তোমাদের চেয়ে বেশি ইসলামের প্রতি অনুরক্ত”। তিনি (রাবী) বলেন, “আশয়ারীগণ, তাদের সাথে আবু মুসা আশয়ারী, আসলেন। যখন তারা মদিনার নিকটবর্তী হলেন তখন তারা গান গাচ্ছিলেন বলছিলেন- কাল আমরা আমাদের কাঙ্খিত মানুষদের সাথে দেখা করব মুহাম্মাদ এবং তাঁর সঙ্গিসাথিগণ” তারা সর্বপ্রথম মানুষ যারা করমর্দনের প্রচলন করেছিলেন।
আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণনা করেন যে, “নবী যেদিন মদিনায় প্রবেশ করলেন, সবকিছু আলোকিত হলো। যেদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা যখন তাকে সমাহিত করা শেষ করলাম, আমরা আমাদের অন্তরকে প্রত্যাখ্যান করলাম (অর্থাৎ আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন)”

অহী অবতরণের সমাপ্তি
আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু বক্স রসূলুল্লাহ-এর ইন্তেকালের পর উমরকে বললেন, রসূলুল্লাহ যেভাবে উম্মু আইমানের সাথে সাক্ষাত করতে যেতেন- চলো আমরাও তদ্রুপ তার সাথে সাক্ষাত করে আসি। (রাবী বলেন,) আমরা যখন তার কাছে পৌঁছলাম- তিনি কাঁদতে লাগলেন। আবু বক্স ও উমর তাকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন। আল্লাহর কাছে তো তাঁর রসূল -এর জন্য কল্যাণকর জিনিসই রয়েছে। তিনি উত্তরে বললেন, আমি এজন্য কাঁদছি না যে, আল্লাহর কাছে তাঁর 'রসূলের জন্য কি রয়েছে তা আমি জানি না বরং আমি এজন্যই কাঁদছি, যে আসমান থেকে অহী আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। (রাবী বলেন,) তার একথায় তাদের দুজনেরও কান্না এসে গেল এবং তারাও তার সাথে কাঁদতে লাগলেন।

টিকাঃ
১০৪. মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং ১৩১০০. ও সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সহীহাহ লিল আলবানী হাদীস নং ২/৬২
১০৫. আস-সহীহ লি-ইবনে হিব্বান হাদীস নং ৬২৫২
১০৬. সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৪৬১৫

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 প্রিয় মানুষটির সাথে প্রত্যেক রাতে দেখা হয়

📄 প্রিয় মানুষটির সাথে প্রত্যেক রাতে দেখা হয়


আল-মুসান্না ইবনে সাঈদ বলেন, “আমি আনাস কে বলতে শুনেছি- এমন কোনো রাত নেই যেই রাতে আমি আমার প্রিয় আল্লাহর রসূল (সা)- কে স্বপ্নে দেখিনি”

টিকাঃ
১০৭. সিয়ার আলামীন নুবালাহ ২/৪০৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00