📄 সেই দায়িত্ব এবং কর্তব্যের প্রকৃতি কিরূপ ছিল?
নবী-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর দায়িত্ব পালন করার জন্য এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে তা মানুষের নিকট পৌঁছানোর জন্য কত বছর ছিল তার কাছে? বিশ কিংবা ত্রিশ। একটি জাতির জীবন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে প্রকৃত বিপ্লব ঘটানোর জন্য বিশ কিংবা ত্রিশ বছর অত্যন্ত অল্প সময়।
প্রিয় পাঠক, আমি আপনাদের এর একটু সামনে এগিয়ে নিতে চাই। এই বাণী অবতীর্ণ হওয়ার মাত্র তেইশ বছর পর, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, মক্কা থেকে মদিনা হিযরতের মাত্র এগারো বছর পর এবং রবিউল আওয়ালের বারতম দিন। নবী যার ওপর মহান দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, পর্দা সরিয়ে লক্ষ করলেন তাঁর অনুসারী এবং ছাত্রবৃন্দ কাধে কাধ মিলিয়ে কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে বিনয় নম্রতা আর একনিষ্ঠতার সাথে তাঁর শিখানো নিয়মানুসারে নামাজে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা এবং তাওবা পাঠ করছেন।
প্রশান্তির হাসিতে তাঁর ঠোট মৃদু আলোড়িত হলো আর তাঁর দাঁতগুলি দিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার ঝিলিক বেরিয়ে এল। তাঁর দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে, আল্লাহর বাণী পরিপূর্ণতা লাভ করেছে আর বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে গ্রথিত হয়েছে। এখন সময় হয়েছে, সম্মানিত রসূল এবং মহান নেতার অবসর যাপনের। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট নিজকে সমর্পন করে প্রশান্তির চাদরে আচ্ছাদিত হবার।
কি ঘটেছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা নবী-এর জীবনের শেষ দুই যুগে? কিভাবে পূর্ণতা পেল এই বাণী? এই বাণীর বাহক অবশেষে কেমন ফলাফল লাভ করেছিলেন? তাও এই অতি স্বল্প সময়ে!!
সত্যিকারের ফলাফল পরিপূর্ণভাবে উদ্ভাসিত হবে বিচার দিবসের দিন ...
"আমার সামনে সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছিল। (তখন আমি দেখেছি) দুএকজন নবী পথ অতিক্রম করতে লাগলেন এমতাবস্থায় যে, তাঁদের সংগে রয়েছে লোকজনের ছোট ছোট দল। কোনো কোনো নবী এমনও রয়েছেন যাঁর সংগে একজনও নেই।
অবশেষে আমার সামনে তুলে ধরা হলো বিশাল সমাবেশ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম- এটা কি? এ কি আমার উম্মত? উত্তর দেয়া হলো- না, ইনি মুসা (আঃ)-এর সাথে তাঁর কওম। আমাকে বলা হলো: আপনি উর্ধ্বাকাশের দিকে তাকান। তখন দেখলাম- বিশাল একটি দল যা দিগন্তকে ঢেকে রেখেছে। তারপর আমাকে বলা হলো: আকাশের দিগন্তের এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করুন। তখন দেখলাম, বিশাল একটি দল, যা আকাশের দিগন্ত সমূহ ঢেকে দিয়েছে। তখন বলা হলো- এরা হলো আপনার উম্মত। আর তাদের মধ্য থেকে সত্তর হাজার ব্যক্তি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
টিকাঃ
৮৬. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৫৪৪০
📄 এটাই হচ্ছে সত্যিকারের ভালবাসা
তিনি তাঁর অনুসারীদের হৃদয়ের গভীরে পৌছেছিলেন এবং তাঁর ভালবাসা তাঁর সঙ্গীদের অন্তরের ঠিক মাঝখানে গ্রথিত হয়েছিল। কেন সেই পরিবর্তন তিনি তাঁর অতিপ্রিয় এই মানুষদের মাঝে এনেছিলেন এবং কোনো প্রেরণায় তিনি তাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী একটি বিপ্লব অতি ক্ষুদ্র সময়ে সংঘঠিত হয়েছিল?
জীবনের প্রয়োজন, প্রথাগত অভ্যাস অথবা আবেগ যা আমাদের আত্মা 'পূরণ করতে চায় অথবা আমাদের দেহ যেই পাপ করে ফেলে তার গ্লানি সুন্দর একটি বাক্যের সুষম উপস্থাপনের মাধ্যমে কিংবা কুরআনের একটি আয়াতের সঠিক তাৎপর্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে মুছে যেতে পারে। এটাই! এটাই হচ্ছে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় রহস্য এবং মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর। আপনি যদি হৃদয়ের গভীরে পৌছতে পারেন, দেহের অন্যান্য অঙ্গপ্রতঙ্গ আপনার নিকট এমনিই সমর্পিত হবে। আপনি যদি আত্মার বাধনে তাকে বন্দি করেন, দেহ এমনিতেই আপনার বাধনে নিমজ্জিত হবে।
মানুষ যদি আপনাকে ভালবাসে এবং আপনাকে তাদের অন্তরে ঠাই দেয় তবেই আপনি একজন সর্বজন মান্য নিয়ন্ত্রক এবং অনুসরণীয় নেতা হতে পারবেন। ভালবাসা যদি নাই থাকে আপনি কিছুই নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন না, নেতৃত্বও পরিচালিত করতে পারবেন না।
এবার এই বিষয়ের ওপর কিছু উদাহরণ এবং ভালবাসার কিছু গল্প আমি আপনাদেরকে শুনাতে আগ্রহী। এরূপ গল্পের সংখ্যা অগণিত যার একটি অংশ নিচে সংকলিত হলো।
📄 প্রথম প্রেমিক
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবু বকর (রাঃ) আল্লাহর জন্য যে সকল নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন, তিনি তার থেকে কিছু ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, অবিশ্বাসীগণ আবু বকর এবং অন্যান্য মুসলিমের ওপর চড়াও হলো এবং তাদেরকে মসজিদের কোণে আঘাত করা হলো। আবু বকরকে মেঝের ওপর ফেলা হলো এবং তাকে বেদম প্রহার করা হলো। পাপিষ্ঠ উতবাহ ইবনে রাবিয়াহ তার নিকট আসল এবং নতুন সেলাই করা জুতা দ্বারা আবু বকরের মুখে আঘাত করতে থাকল, যতক্ষণ পর্যন্ত না জুতা জোড়া সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হলো এবং সে লাফিয়ে আবু বকরের তলপেটে উঠল, পরিশেষে আবু বকরের চেহারা থেকে তার নাক আলাদা করা যাচ্ছিল না।
বনু তাইম গোত্রের লোকজন আসলেন এবং তারা আবু বকরকে অবিশ্বাসীদের নিকট থেকে মুক্ত করলেন। তারা একটা কাপড় দিয়ে তাঁকে বহন করলেন এবং তাঁকে বাসায় পৌছে দিলেন। তারা মনে করেছিলেন তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। দিনশেষে, তিনি কথা বলতে সক্ষম হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, "নবী (সাঃ)-এর কি হয়েছে?” তারা বলল, "তিনি সুস্থ এবং অক্ষত আছেন"। তিনি বললেন, "তিনি কোথায়?" তারা বললেন, "আল আরকামের বাসায়" তিনি বললেন, "শপথ করে বলছি, রসূলুল্লাহ (সা)-কে না দেখা পর্যন্ত আমি কোনো খাদ্য গ্রহণ করব না আর পানিও মুখে দেব না"।
যখন নবী (সাঃ)-এর নিকট তাঁকে আনা হলো, নবী (সাঃ) তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু খেলেন। সকল মুসলিমগণই একই কাজ করলেন এবং তারা আবু বকরের ব্যাপারে অত্যন্ত মর্মাহত হলেন।
আবু বকর বললেন, "আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আমার কিছুই হয় নি, শুধু মাত্র ঐ পাপিষ্ট আমার মুখে যা করার করেছে। এই হলো আমার মা, যিনি তার সন্তানের জন্য সর্বাত্মক করেছেন। আপনি সম্মানিত, আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি তাকে ইসলামের পথে পরিচালিত করেন। আপনার দোয়ার কল্যাণে সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত হতে পারে"। তিনি (আবু বকর ) তার (মায়ের নিকট) অনুনয় বিনয় করলেন এবং তাকে ইসলামের আহবান জানালেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমি তোমাকে ভালবাসি আর আমার মন যা চায় তার ব্যাপারে আমি কি ব্যাখ্যা দিতে পারি? মন যা চায় তা কি যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়?
টিকাঃ
৮৭. আস-সিরাতুন নববীয়াহ লিইবনে কাসির (১/৪৩৯-৪৪১)
📄 আনন্দের অশ্রুজল
আয়েশা হতে বর্ণিত। প্রত্যেহ খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় দিনের এই দুই প্রান্তের কোনো এক প্রান্তে নবী অবশ্যই আবু বকরের নিকট আসতেন। কিন্তু যেদিন নবী -কে হিজরত করার এবং মক্কা ত্যাগ করার অনুমতি দেয়া হলো, তিনি দিনের মধ্যভাগে আমাদের নিকট এলেন, এই সময়ে তিনি কখনোই আসতেন না। তিনি (আয়েশা ) বলেন, আবু বকর যখন তাকে দেখলেন, তিনি বললেন, নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটেছে। তা না হলে কিছুতেই নবী এ সময়ে আসতে পারেন না।
তিনি যখন প্রবেশ করলেন, তাঁকে আবু বকর তাঁর নিজ আসনে বসার অগ্রাধিকার দিলেন এবং তিনি নিজেও বসলেন। নবী -এর সাথে তখন আমার বোন আসমা এবং আমি ছাড়া কেউ ছিল না। তিনি আবু বকরম (রা)-কে বললেন, "সবাইকে এখান থেকে যেতে বল" আবু বকর বললেন, "এরা তো আমার দুই কন্যা! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, কি ঘটেছে?" নবী বললেন, "আল্লাহ আমাকে হিজরতের অনুমতি দিয়েছেন”। আবু বকর বললেন, "আমি কি আপনার সঙ্গী হতে পারি?” তিনি বললেন, "হ্যাঁ"
আয়েশা বলেন, আবু বকর ছাড়া আর কাউকে আমি আনন্দে কাঁদতে দেখি নি। সেদিন তিনি কেঁদেছিলেন। তারপর আবু বকর বললেন, "ইয়া রসূলাল্লাহ! এই হচ্ছে আমার দুইটি উট, এইগুলিকে আমি এই উদ্দ্যেশ্যে প্রস্তুত করেছি।" তারা আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামে এক অবিশ্বাসীকে পথ নির্দেশক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারা আগে থেকে ঠিক করা নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত আব্দুল্লাহ এর নিকট তাদের উট গচ্ছিত রেখে যান。