📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 এই রহস্যের ভিত্তি

📄 এই রহস্যের ভিত্তি


অতীতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে যাওয়া যাক। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিস্তব্ধ একটি রাত-
নবী মানসিক শান্তি এবং আধ্যাত্মিক দ্যুতি লাভের প্রত্যাশায় হেরা গুহায় বহুদিন নির্জনে ধ্যানে মগ্ন। মক্কার কোলাহল, প্রবৃত্তির অনুসারী মক্কার নাগরিক এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা পাপের পুজারী নগর থেকে অনেক দূরে। নিস্তব্ধতা গুহাটিকে ঘিরে রেখেছিল এবং একত্ববাদী মুহাম্মাদ সেখানে ছিলেন সম্পূর্ণ একা। তার সাথে ছিল শুধু তার প্রশান্ত আত্মা আর সুস্থির মনন।
গুহার নিস্তদ্ধতা এবং নির্জনতা জিবরাইল (আঃ)-এর ধ্বনিতে কম্পিত হলো। জিবরাইল (আঃ)-এর আলোর দীপ্তিতে অন্ধকার গুহা আলোকিত হলো। আল্লাহ নবীর আত্মাকে শক্ত করে দিলেন যেন আতঙ্কে তার হৃদপিন্ড থেমে না যায় এবং তিনি যা দেখেছেন তার আকস্মিকতায় তার মন যেন বিচলিত না হয়। জিবরাইল (আঃ) নবী-এর নিকট এলেন এবং তাঁকে চেপে ধরে বললেন, “পড়” ধীর স্থির কণ্ঠে নবী-এর নিকট জবাব দিলেন, "আমি পাঠকারিদের মত নই।
তিনি কিন্তু ফেরেশতার অনুরোধকে অস্বীকার করেন নি। তিনি শুধুমাত্র তাঁর অবস্থা ব্যক্ত করলেন। তিনি ছিলেন নিরক্ষর, যেমনটি আল্লাহ তাঁকে বানাতে চেয়েছেন, যাতে তার মনের কুঠিতে শুধুমাত্র আলোকজ্জ্বল অবতীর্ণ জ্ঞান আল-কুরআনই ঠাই পায়। তা যেন সকল প্রকার পদ্যের স্তবক, গদ্যের গাথুনী এবং মানবরচিত সকল প্রকার জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। আল্লাহর কিছু জরুরি অধ্যাদেশ জারী করা এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে তার নবী -এর ব্যাপারে এটিই চেয়েছিলেন- "আমি পাঠক নই”, আক্ষরিক অর্থে, পড়ার কৌশল আমার আয়ত্বে নেই।
ফেরেশতা তাঁর অনুরোধ পুনরায় ব্যক্ত করলেন এবং নবী ধীর এবং নির্ভয়ে পুনরায় উত্তর দিলেন, "আমি পাঠক নই"। ফেরেশতা অধিপতি আদম (আঃ) এর বংশধরদের অধিপতির উদ্দেশ্যে তৃতীয়বারের মত বিবৃত করলেন, প্রথম আলোকজ্জ্বল সেই অক্ষরসমূহ যা আসমান এবং জমীনের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করল। বহু দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো রূপ ওহী অবতরণ বন্ধ থাকার পর, একত্ববাদের আলোকজ্জ্বল আভা যখন ক্ষীণ হয়ে এসেছিল তখন এটাই ছিল নতুন করে ওহী অবতরণের প্রারম্ভিকা ... অবতীর্ণ হলো ...
اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اِقْرَأْ وَ رَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ . عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ .
১. পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।
২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।
৩. পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু,
৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন,
৫. শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।
এই পবিত্র আভা মনোযোগী শ্রোতার হৃদয় ছুয়ে গেল, বিরহের সকল যন্ত্রনা আর সকল ক্লেশ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। ইয়া আল্লাহ! কত মহান আর সুন্দর ছিল সেই মুহূর্তখানি ...
ফেরেশতা মহান বাণী উচ্চারণ করলেন এবং এর সৌন্দর্যে গৃহার প্রতিটি কোনো এবং নবী -এর প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলোকিত হয়ে উঠল। এটাই ছিল নবুয়তের ঘোষণা, সবচেয়ে যশোধর এবং সবচেয়ে সুন্দর আঙ্গিকে। মানব জাতিকে যত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে মহিমান্বিত এই দায়িত্ব।
নবীন নবী -কে আদেশ করা হলো পরিবার, গোত্র, মক্কা-মদিনা সমগ্র আরব পেরিয়ে পৃথিবীর সকল জ্বীন এবং মানব জাতির নিকট এই বাণীকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। তাকে বলা হলো বহুবাদের সকল মিথ্যাচার এবং ইসলামপূর্ব সকল নষ্ট সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করার জন্য, এমন একটি সময়ে যখন অধিকাংশ মানুষের পথভ্রষ্টতার কারণে মহান প্রতিপালক ছিলেন পৃথিবীবাসীর ওপর ক্রোধান্বিত।

টিকাঃ
৮৫. আল-আলাকু: ৯৬ : ১-৪

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 সেই দায়িত্ব এবং কর্তব্যের প্রকৃতি কিরূপ ছিল?

📄 সেই দায়িত্ব এবং কর্তব্যের প্রকৃতি কিরূপ ছিল?


নবী-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর দায়িত্ব পালন করার জন্য এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে তা মানুষের নিকট পৌঁছানোর জন্য কত বছর ছিল তার কাছে? বিশ কিংবা ত্রিশ। একটি জাতির জীবন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে প্রকৃত বিপ্লব ঘটানোর জন্য বিশ কিংবা ত্রিশ বছর অত্যন্ত অল্প সময়।
প্রিয় পাঠক, আমি আপনাদের এর একটু সামনে এগিয়ে নিতে চাই। এই বাণী অবতীর্ণ হওয়ার মাত্র তেইশ বছর পর, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, মক্কা থেকে মদিনা হিযরতের মাত্র এগারো বছর পর এবং রবিউল আওয়ালের বারতম দিন। নবী যার ওপর মহান দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, পর্দা সরিয়ে লক্ষ করলেন তাঁর অনুসারী এবং ছাত্রবৃন্দ কাধে কাধ মিলিয়ে কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে বিনয় নম্রতা আর একনিষ্ঠতার সাথে তাঁর শিখানো নিয়মানুসারে নামাজে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা এবং তাওবা পাঠ করছেন।
প্রশান্তির হাসিতে তাঁর ঠোট মৃদু আলোড়িত হলো আর তাঁর দাঁতগুলি দিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার ঝিলিক বেরিয়ে এল। তাঁর দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে, আল্লাহর বাণী পরিপূর্ণতা লাভ করেছে আর বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে গ্রথিত হয়েছে। এখন সময় হয়েছে, সম্মানিত রসূল এবং মহান নেতার অবসর যাপনের। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট নিজকে সমর্পন করে প্রশান্তির চাদরে আচ্ছাদিত হবার।
কি ঘটেছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা নবী-এর জীবনের শেষ দুই যুগে? কিভাবে পূর্ণতা পেল এই বাণী? এই বাণীর বাহক অবশেষে কেমন ফলাফল লাভ করেছিলেন? তাও এই অতি স্বল্প সময়ে!!
সত্যিকারের ফলাফল পরিপূর্ণভাবে উদ্ভাসিত হবে বিচার দিবসের দিন ...
"আমার সামনে সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছিল। (তখন আমি দেখেছি) দুএকজন নবী পথ অতিক্রম করতে লাগলেন এমতাবস্থায় যে, তাঁদের সংগে রয়েছে লোকজনের ছোট ছোট দল। কোনো কোনো নবী এমনও রয়েছেন যাঁর সংগে একজনও নেই।
অবশেষে আমার সামনে তুলে ধরা হলো বিশাল সমাবেশ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম- এটা কি? এ কি আমার উম্মত? উত্তর দেয়া হলো- না, ইনি মুসা (আঃ)-এর সাথে তাঁর কওম। আমাকে বলা হলো: আপনি উর্ধ্বাকাশের দিকে তাকান। তখন দেখলাম- বিশাল একটি দল যা দিগন্তকে ঢেকে রেখেছে। তারপর আমাকে বলা হলো: আকাশের দিগন্তের এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করুন। তখন দেখলাম, বিশাল একটি দল, যা আকাশের দিগন্ত সমূহ ঢেকে দিয়েছে। তখন বলা হলো- এরা হলো আপনার উম্মত। আর তাদের মধ্য থেকে সত্তর হাজার ব্যক্তি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"

টিকাঃ
৮৬. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৫৪৪০

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 এটাই হচ্ছে সত্যিকারের ভালবাসা

📄 এটাই হচ্ছে সত্যিকারের ভালবাসা


তিনি তাঁর অনুসারীদের হৃদয়ের গভীরে পৌছেছিলেন এবং তাঁর ভালবাসা তাঁর সঙ্গীদের অন্তরের ঠিক মাঝখানে গ্রথিত হয়েছিল। কেন সেই পরিবর্তন তিনি তাঁর অতিপ্রিয় এই মানুষদের মাঝে এনেছিলেন এবং কোনো প্রেরণায় তিনি তাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী একটি বিপ্লব অতি ক্ষুদ্র সময়ে সংঘঠিত হয়েছিল?
জীবনের প্রয়োজন, প্রথাগত অভ্যাস অথবা আবেগ যা আমাদের আত্মা 'পূরণ করতে চায় অথবা আমাদের দেহ যেই পাপ করে ফেলে তার গ্লানি সুন্দর একটি বাক্যের সুষম উপস্থাপনের মাধ্যমে কিংবা কুরআনের একটি আয়াতের সঠিক তাৎপর্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে মুছে যেতে পারে। এটাই! এটাই হচ্ছে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় রহস্য এবং মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর। আপনি যদি হৃদয়ের গভীরে পৌছতে পারেন, দেহের অন্যান্য অঙ্গপ্রতঙ্গ আপনার নিকট এমনিই সমর্পিত হবে। আপনি যদি আত্মার বাধনে তাকে বন্দি করেন, দেহ এমনিতেই আপনার বাধনে নিমজ্জিত হবে।
মানুষ যদি আপনাকে ভালবাসে এবং আপনাকে তাদের অন্তরে ঠাই দেয় তবেই আপনি একজন সর্বজন মান্য নিয়ন্ত্রক এবং অনুসরণীয় নেতা হতে পারবেন। ভালবাসা যদি নাই থাকে আপনি কিছুই নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন না, নেতৃত্বও পরিচালিত করতে পারবেন না।
এবার এই বিষয়ের ওপর কিছু উদাহরণ এবং ভালবাসার কিছু গল্প আমি আপনাদেরকে শুনাতে আগ্রহী। এরূপ গল্পের সংখ্যা অগণিত যার একটি অংশ নিচে সংকলিত হলো।

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 প্রথম প্রেমিক

📄 প্রথম প্রেমিক


আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবু বকর (রাঃ) আল্লাহর জন্য যে সকল নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন, তিনি তার থেকে কিছু ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, অবিশ্বাসীগণ আবু বকর এবং অন্যান্য মুসলিমের ওপর চড়াও হলো এবং তাদেরকে মসজিদের কোণে আঘাত করা হলো। আবু বকরকে মেঝের ওপর ফেলা হলো এবং তাকে বেদম প্রহার করা হলো। পাপিষ্ঠ উতবাহ ইবনে রাবিয়াহ তার নিকট আসল এবং নতুন সেলাই করা জুতা দ্বারা আবু বকরের মুখে আঘাত করতে থাকল, যতক্ষণ পর্যন্ত না জুতা জোড়া সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হলো এবং সে লাফিয়ে আবু বকরের তলপেটে উঠল, পরিশেষে আবু বকরের চেহারা থেকে তার নাক আলাদা করা যাচ্ছিল না।
বনু তাইম গোত্রের লোকজন আসলেন এবং তারা আবু বকরকে অবিশ্বাসীদের নিকট থেকে মুক্ত করলেন। তারা একটা কাপড় দিয়ে তাঁকে বহন করলেন এবং তাঁকে বাসায় পৌছে দিলেন। তারা মনে করেছিলেন তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। দিনশেষে, তিনি কথা বলতে সক্ষম হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, "নবী (সাঃ)-এর কি হয়েছে?” তারা বলল, "তিনি সুস্থ এবং অক্ষত আছেন"। তিনি বললেন, "তিনি কোথায়?" তারা বললেন, "আল আরকামের বাসায়" তিনি বললেন, "শপথ করে বলছি, রসূলুল্লাহ (সা)-কে না দেখা পর্যন্ত আমি কোনো খাদ্য গ্রহণ করব না আর পানিও মুখে দেব না"।
যখন নবী (সাঃ)-এর নিকট তাঁকে আনা হলো, নবী (সাঃ) তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু খেলেন। সকল মুসলিমগণই একই কাজ করলেন এবং তারা আবু বকরের ব্যাপারে অত্যন্ত মর্মাহত হলেন।
আবু বকর বললেন, "আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আমার কিছুই হয় নি, শুধু মাত্র ঐ পাপিষ্ট আমার মুখে যা করার করেছে। এই হলো আমার মা, যিনি তার সন্তানের জন্য সর্বাত্মক করেছেন। আপনি সম্মানিত, আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি তাকে ইসলামের পথে পরিচালিত করেন। আপনার দোয়ার কল্যাণে সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত হতে পারে"। তিনি (আবু বকর ) তার (মায়ের নিকট) অনুনয় বিনয় করলেন এবং তাকে ইসলামের আহবান জানালেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমি তোমাকে ভালবাসি আর আমার মন যা চায় তার ব্যাপারে আমি কি ব্যাখ্যা দিতে পারি? মন যা চায় তা কি যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়?

টিকাঃ
৮৭. আস-সিরাতুন নববীয়াহ লিইবনে কাসির (১/৪৩৯-৪৪১)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00