📄 মহিমান্বিত সেই নেতার গুরুত্বপূর্ণ একটি রহস্য
আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন মদিনার মানুষের মধ্যে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, মুহাম্মাদ -কে হত্যা করা হয়েছে। তাতে সমগ্র মদিনাতে হট্টগোল ও আর্তনাদে ভরে গেল। একজন আনসার মহিলা তার কোমরে রশি পেচিয়ে আমাদের নিকট আসলেন। তার সাথে তার ছেলে, পিতা, স্বামী এবং ভাইয়ের সাক্ষাত হলো। রাবী বলেন, আমি জানি না এদের মধ্যে কার সাথে তার প্রথমে সাক্ষাত হয়েছিল।
এদের সর্বশেষ জনের সাথে যখন তার সাক্ষাত হয়, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কে এটা?” তারা বলল, এটা তোমার বাবা, ভাই, স্বামী অথবা পুত্র। সে বলল, রসূলুল্লাহ -এর অবস্থা কি? তারা বলল, তিনি তোমার সামনেই। তিনি রসূলুল্লাহ -এর নিকট এগিয়ে গেলেন এবং তাঁর জামার কিছু অংশ ধরে বললেন, "ইয়া রসূলুল্লাহ! আপনার জন্য আমার বাবা মা কুরবান হোক। যতক্ষণ আপনি ঠিক আছেন, অন্য কারো মৃত্যুতে আমি পরোয়া করি না"।
ইসমাইল ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস বলেন, বনু যাবরান গোত্রের এক মহিলাকে খবর দেয়া হলো উহুদ যুদ্ধে তার স্বামী এবং ভাই উভয়কে হত্যা করা হয়েছে। তাকে যখন এই কথা বলা হলো, তিনি প্রশ্ন করলেন, "রসূলুল্লাহ -এর অবস্থা কি?” তারা বলল, "তিনি ঠিক আছেন।” তিনি বললেন, "আমি তাঁকে দেখতে চাই” যখন তারা রসূলুল্লাহ দেখিয়ে দিলেন এবং তিনি তাঁকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি বললেন, "আপনি সুস্থ থাকলে অন্য সকল বিপদ আমাদের কাছে মামুলি ব্যাপার মাত্র।
“ইকরমা হতে বর্ণিত। যিনি বলেন, মদিনার মহিলাগণ যখন বুঝতে পারলেন (উহুদ যুদ্ধের ব্যাপারে প্রকাশিত) খবরগুলি সত্য নয়, তারা (যুদ্ধফেরত) যোদ্ধাদের বরণ করার জন্য এগিয়ে গেলেন।
তারা দেখল উটের ওপর দুইটি মৃতদেহ বহন করে আনা হচ্ছে। আনসারদের মধ্যে একজন মহিলা প্রশ্ন করলেন, “তারা (দুইজন) কে?” তারা বললেন, অমুক এবং অমুক, অর্থাৎ তার ভাই এবং স্বামী অথবা বললেন তার স্বামী এবং পুত্র। তিনি (আনসার মহিলা) বললেন, “রসুলুল্লাহ -এর অবস্থা কি?” তারা তাঁকে বললেন, “তিনি জীবিত আছেন” মহিলাটি বলল, “আমি কোনোই পরোয়া করি না। কেননা, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের থেকে যাকে খুশী পছন্দ করেন”। রাবী বলেন, এই কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহর বাণী -
وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ.
অর্থ: “আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান” অবতীর্ণ হয়।
হাদীসের পাঠ
নারী হলো কোমল। তার অনুভূতি প্রবল এবং তার ভালবাসা চাঞ্চল্যকর। আল্লাহ তার হৃদয়কে ভালবাসায় পূর্ণ করে দিয়েছেন। তার ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন গর্ভধারনের গুরুদায়িত্ব, দুধের শিশুকে দেখাশুনা করা এবং তাকে বড় করে তোলার দায়িত্ব।
وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَرِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْ لَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ .
অর্থ: “সকালে মূসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসা জনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। দৃঢ় করলাম, যাতে তিনি থাকেন বিশ্ব বাসীগণের মধ্যে।"
ভালবাসার অবস্থান হচ্ছে তার হৃদয়ে। এমন ভালবাসা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, এমন দুর্বলতা অন্য কোথাও খুজে পাওয়া যায় না। আল্লাহ তার হৃদয় সহনশীলতা দিয়ে এমনভাবে পূর্ণ করে দিয়েছেন যদি তা এক গ্রামের মধ্যেও বিতরণ করা হয় তবু তা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তার বুকে খুজে পাওয়া যায় এক রাশ স্নেহের গুঞ্জন আর হিমশীতল সহানুভূতিশীলতা।
সে তার স্বামীর প্রতি অনুরক্ত। কারণ তার স্বামী তার বেদনার সময়, দুঃখের সময় তাকে আশার আলো দেখায়। সে যখন বাইরে যায় তখন সে তার অনুপস্থিতিতে কষ্ট পায়, সে যখন ফিরে আসে তখন সে আনন্দে উত্তেজিত হয়। সে তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য সব কিছু বিলিয়ে দিতে পারে এবং তার সেবায় সব কিছু খরচ করতে দ্বিধা বোধ করে না।
তার ভাই, তারা উভয়ে একই মাতা পিতার সন্তান। তারা উভয়ে তাদের মার ঔরস এবং বাবার শৌর্যকে ভাগাভাগি করেছে। ভাইয়ের জন্য তার হৃদয়ে সবসময়েই একটা বিশেষ অবস্থান থাকে, তার ভাই ছিল তার মার ঔরসে তার প্রতিবেশী, সেই শুরু থেকে। বিয়ে, সন্তানাদি হওয়ার পরও ভাইয়ের প্রতি ভালবাসা কমে না। এই ভালবাসা হচ্ছে খাটি এবং উজ্জ্বল অলংকার যার উজ্জ্বলতাকে জীবনের ব্যস্ততা আর সময়ের ঘূর্ণন স্নান করে দিতে পারে না।
তার বাবা। বাবা হচ্ছে তার জীবনের প্রথম পুরুষ। পৃথিবীর বুকে সেই তার চোখ খুলে দিয়েছে, তার দুর্বল সময়ে বাবাকেই সে সবার আগে তার কাছে পেয়েছে। সে তার ক্ষমতার আর দয়ার প্রতি আস্থা রাখে, তার সহানুভূতি আর নিরাপত্তার মধ্যে সে আশ্রয় খুঁজে। তার হাসিতে সে সুখ খুজে পায়, তার আলিঙ্গনে সে প্রশান্তি খুঁজে পায়। সে হলো তার তত্ত্বাবধানকারী অভিভাবক। সে তার পুরোটা জীবন ব্যয় করে তার জীবনকে সুখী করার জন্য এবং দুশ্চরিত্র ব্যক্তির হামলা থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনটাও বিলিয়ে দিতে পারেন।
তার পুত্র। সে বাস করত তার গর্ভে। ভূমিষ্টের পর তার হৃদপিন্ডের ঠিক পাশেই সে ত্রিশ মাসের বেশি সময় ব্যয় করেছে। হৃদপিন্ডের প্রতিটি স্পন্দন এবং তার আত্মার সুশীতল পরশে নয় মাসের অধিক সময় সে গর্ভে অবস্থান করেছে। সে যখন তার পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে এবং প্রায় দুই বছর তাকে বুকের দুধ খাইয়েছে। তার দুই বাহু সবসময় তার পাশেই ছিল।
সে তার মুখকে তার বুকের খুব কাছে নিয়ে উভয় স্তন থেকেই তাকে পান করিয়েছে। সে পান করেছে ভালবাসা। বুকের দুধের মাধ্যমে তাকে পান করানো হয়েছে গভীর ভালবাসার অমৃত সুধা। সে সময় তাকে চোখে চোখে রেখেছে, আলিঙ্গন করেছে, যেন সে বলছে, "তুমি আমার গর্ভেই থাকতে, তুমি আমার কাছে ছিলে, ও আমার কলিজার টুকরা। আশার আলো! প্রিয়! আমার সব চেষ্টা যাকে নিয়ে! আমার এই জীবন তোমার জন্য, আমার আত্মার আত্মা, আমার জীবনের অবলম্বন!!"
ইতিহাসের যে সময়টিতে ওপরে উল্লিখিত আনসার মহিলা জীবিত ছিলেন, মৃত্যু শোক প্রকাশের জন্য মহিলারা কাঁদত এবং গাল চাপড়াত। সেটা সে সময়ের সংস্কৃতি ছিল। এরকম অনৈসলামিক প্রথা আজো সমাজে চলতে দেখা যায়।
এখানে আনসার মহিলাটি তার সর্বস্ব উপেক্ষা করলেন, তার যন্ত্রণাকে পিছনে ফেলে দিলেন। তাকে তাঁর স্বামীর মৃত্যু সংবাদ দেয়া হলো। কিন্তু তিনি টু শব্দ করলেন না, তার পিতার মৃত্যু সংবাদ দেয়া হলো। কিন্তু এখানেও কোনো যন্ত্রণা প্রকাশ পেল না। তিনি যখন বুঝতে পারলেন তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, তারপরও তার হৃদয় দুঃখে ভেঙ্গে পড়ল না, তার ঠোট দিয়ে কোনো শোকবাক্য প্রকাশ পেল না।
তিনি সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে ভাগ্য বিড়ম্বনার সংবাদ শুনতে পেলেন যে তার সন্তান উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। এই সংবাদ শোনার পরও তার চোখ থেকে পানি পড়ে নি, তিনি শোকে গাল চাপড়ানো শুরু করেন নি; বরং তিনি বললেন, "আল্লাহর রসূলের কি হয়েছে? আল্লাহর রসূলের কি হয়েছে?"
অবশ্যই তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়, সকল আত্মীয়দের চেয়ে আপন, সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে ভাল বন্ধু। যখন আনসার সাহাবী নিশ্চিত হলেন যে, রসূলুল্লাহ সব ক্ষতি থেকে নিরাপদ আছেন, তিনি ভাল অবস্থায় আছেন এবং তার স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভাল, এরপর আনসার মহিলাটি অন্যান্য নিহতের খোঁজ করলেন। তাঁর স্বামী, বাবা, ভাই, এবং তাঁর সন্তান। প্রিয় রসূলের নিরাপত্তার পরেই সবকিছুর চিন্তা। তিনি বললেন, "আপনি সুস্থ থাকলে অন্য সকল বিপদ আমাদের কাছে মামুলি ব্যাপার মাত্র, হে রসূলাল্লাহ!"
তিনি আরো বললেন, "যতক্ষণ আপনি ঠিক আছেন, অন্য কারো মৃত্যুতে আমি পরোয়া করি না"। তিনি এও বললেন, "আমি কোনোই পরোয়া করি না কেননা আল্লাহ তার বান্দাদের থেকে যাকে খুশী পছন্দ করেন"।
এই কিছু সরল অভিব্যক্তি থেকে আর কতটুকুই বা আসল অবস্থা পরিস্কারভাবে প্রকাশ করতে পারলাম? শব্দগুলি হারিয়ে যায়, তার অর্থ মুছে যায়।
ইয়া আল্লাহ! আপনি নবীন-এর সাথিদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। তাদের অবস্থান উঁচু করে দিন, তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিন, এবং জান্নাতে আমাদেরকে তাদের নিকট পৌঁছে দিন।
টিকাঃ
৮০. আল-মুজাম আল-আওসাত লিত তাবারানী, হাদীস নং ৭৬৬৭
৮১. দালাইলুন নুবুওয়াতে লিল বাইহাকী হাদীস নং ১১৮৯, সিরাত ইবনে হিশাম ৩/১০৫
৮২. আল-ইমরান ৩:১৪০
৮৩. তাফসীর ইবনু আবি হাতিম, হাদীস নং ৪২৯১
৮৪. আল কসাস ২৮:১০
📄 একজন সফল নেতার নবম রহস্যঃ অন্তরঙ্গ ভালবাসা এবং মর্যাদাবান প্রেমিক
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 এই রহস্যের ভিত্তি
অতীতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে যাওয়া যাক। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিস্তব্ধ একটি রাত-
নবী মানসিক শান্তি এবং আধ্যাত্মিক দ্যুতি লাভের প্রত্যাশায় হেরা গুহায় বহুদিন নির্জনে ধ্যানে মগ্ন। মক্কার কোলাহল, প্রবৃত্তির অনুসারী মক্কার নাগরিক এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা পাপের পুজারী নগর থেকে অনেক দূরে। নিস্তব্ধতা গুহাটিকে ঘিরে রেখেছিল এবং একত্ববাদী মুহাম্মাদ সেখানে ছিলেন সম্পূর্ণ একা। তার সাথে ছিল শুধু তার প্রশান্ত আত্মা আর সুস্থির মনন।
গুহার নিস্তদ্ধতা এবং নির্জনতা জিবরাইল (আঃ)-এর ধ্বনিতে কম্পিত হলো। জিবরাইল (আঃ)-এর আলোর দীপ্তিতে অন্ধকার গুহা আলোকিত হলো। আল্লাহ নবীর আত্মাকে শক্ত করে দিলেন যেন আতঙ্কে তার হৃদপিন্ড থেমে না যায় এবং তিনি যা দেখেছেন তার আকস্মিকতায় তার মন যেন বিচলিত না হয়। জিবরাইল (আঃ) নবী-এর নিকট এলেন এবং তাঁকে চেপে ধরে বললেন, “পড়” ধীর স্থির কণ্ঠে নবী-এর নিকট জবাব দিলেন, "আমি পাঠকারিদের মত নই।
তিনি কিন্তু ফেরেশতার অনুরোধকে অস্বীকার করেন নি। তিনি শুধুমাত্র তাঁর অবস্থা ব্যক্ত করলেন। তিনি ছিলেন নিরক্ষর, যেমনটি আল্লাহ তাঁকে বানাতে চেয়েছেন, যাতে তার মনের কুঠিতে শুধুমাত্র আলোকজ্জ্বল অবতীর্ণ জ্ঞান আল-কুরআনই ঠাই পায়। তা যেন সকল প্রকার পদ্যের স্তবক, গদ্যের গাথুনী এবং মানবরচিত সকল প্রকার জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। আল্লাহর কিছু জরুরি অধ্যাদেশ জারী করা এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে তার নবী -এর ব্যাপারে এটিই চেয়েছিলেন- "আমি পাঠক নই”, আক্ষরিক অর্থে, পড়ার কৌশল আমার আয়ত্বে নেই।
ফেরেশতা তাঁর অনুরোধ পুনরায় ব্যক্ত করলেন এবং নবী ধীর এবং নির্ভয়ে পুনরায় উত্তর দিলেন, "আমি পাঠক নই"। ফেরেশতা অধিপতি আদম (আঃ) এর বংশধরদের অধিপতির উদ্দেশ্যে তৃতীয়বারের মত বিবৃত করলেন, প্রথম আলোকজ্জ্বল সেই অক্ষরসমূহ যা আসমান এবং জমীনের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করল। বহু দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো রূপ ওহী অবতরণ বন্ধ থাকার পর, একত্ববাদের আলোকজ্জ্বল আভা যখন ক্ষীণ হয়ে এসেছিল তখন এটাই ছিল নতুন করে ওহী অবতরণের প্রারম্ভিকা ... অবতীর্ণ হলো ...
اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اِقْرَأْ وَ رَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ . عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ .
১. পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।
২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।
৩. পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু,
৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন,
৫. শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।
এই পবিত্র আভা মনোযোগী শ্রোতার হৃদয় ছুয়ে গেল, বিরহের সকল যন্ত্রনা আর সকল ক্লেশ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। ইয়া আল্লাহ! কত মহান আর সুন্দর ছিল সেই মুহূর্তখানি ...
ফেরেশতা মহান বাণী উচ্চারণ করলেন এবং এর সৌন্দর্যে গৃহার প্রতিটি কোনো এবং নবী -এর প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলোকিত হয়ে উঠল। এটাই ছিল নবুয়তের ঘোষণা, সবচেয়ে যশোধর এবং সবচেয়ে সুন্দর আঙ্গিকে। মানব জাতিকে যত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে মহিমান্বিত এই দায়িত্ব।
নবীন নবী -কে আদেশ করা হলো পরিবার, গোত্র, মক্কা-মদিনা সমগ্র আরব পেরিয়ে পৃথিবীর সকল জ্বীন এবং মানব জাতির নিকট এই বাণীকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। তাকে বলা হলো বহুবাদের সকল মিথ্যাচার এবং ইসলামপূর্ব সকল নষ্ট সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করার জন্য, এমন একটি সময়ে যখন অধিকাংশ মানুষের পথভ্রষ্টতার কারণে মহান প্রতিপালক ছিলেন পৃথিবীবাসীর ওপর ক্রোধান্বিত।
টিকাঃ
৮৫. আল-আলাকু: ৯৬ : ১-৪
📄 সেই দায়িত্ব এবং কর্তব্যের প্রকৃতি কিরূপ ছিল?
নবী-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর দায়িত্ব পালন করার জন্য এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে তা মানুষের নিকট পৌঁছানোর জন্য কত বছর ছিল তার কাছে? বিশ কিংবা ত্রিশ। একটি জাতির জীবন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে প্রকৃত বিপ্লব ঘটানোর জন্য বিশ কিংবা ত্রিশ বছর অত্যন্ত অল্প সময়।
প্রিয় পাঠক, আমি আপনাদের এর একটু সামনে এগিয়ে নিতে চাই। এই বাণী অবতীর্ণ হওয়ার মাত্র তেইশ বছর পর, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, মক্কা থেকে মদিনা হিযরতের মাত্র এগারো বছর পর এবং রবিউল আওয়ালের বারতম দিন। নবী যার ওপর মহান দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, পর্দা সরিয়ে লক্ষ করলেন তাঁর অনুসারী এবং ছাত্রবৃন্দ কাধে কাধ মিলিয়ে কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে বিনয় নম্রতা আর একনিষ্ঠতার সাথে তাঁর শিখানো নিয়মানুসারে নামাজে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা এবং তাওবা পাঠ করছেন।
প্রশান্তির হাসিতে তাঁর ঠোট মৃদু আলোড়িত হলো আর তাঁর দাঁতগুলি দিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার ঝিলিক বেরিয়ে এল। তাঁর দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে, আল্লাহর বাণী পরিপূর্ণতা লাভ করেছে আর বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে গ্রথিত হয়েছে। এখন সময় হয়েছে, সম্মানিত রসূল এবং মহান নেতার অবসর যাপনের। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট নিজকে সমর্পন করে প্রশান্তির চাদরে আচ্ছাদিত হবার।
কি ঘটেছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা নবী-এর জীবনের শেষ দুই যুগে? কিভাবে পূর্ণতা পেল এই বাণী? এই বাণীর বাহক অবশেষে কেমন ফলাফল লাভ করেছিলেন? তাও এই অতি স্বল্প সময়ে!!
সত্যিকারের ফলাফল পরিপূর্ণভাবে উদ্ভাসিত হবে বিচার দিবসের দিন ...
"আমার সামনে সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছিল। (তখন আমি দেখেছি) দুএকজন নবী পথ অতিক্রম করতে লাগলেন এমতাবস্থায় যে, তাঁদের সংগে রয়েছে লোকজনের ছোট ছোট দল। কোনো কোনো নবী এমনও রয়েছেন যাঁর সংগে একজনও নেই।
অবশেষে আমার সামনে তুলে ধরা হলো বিশাল সমাবেশ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম- এটা কি? এ কি আমার উম্মত? উত্তর দেয়া হলো- না, ইনি মুসা (আঃ)-এর সাথে তাঁর কওম। আমাকে বলা হলো: আপনি উর্ধ্বাকাশের দিকে তাকান। তখন দেখলাম- বিশাল একটি দল যা দিগন্তকে ঢেকে রেখেছে। তারপর আমাকে বলা হলো: আকাশের দিগন্তের এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করুন। তখন দেখলাম, বিশাল একটি দল, যা আকাশের দিগন্ত সমূহ ঢেকে দিয়েছে। তখন বলা হলো- এরা হলো আপনার উম্মত। আর তাদের মধ্য থেকে সত্তর হাজার ব্যক্তি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
টিকাঃ
৮৬. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৫৪৪০