📄 আসবাব ছাড়া বাড়ি
যখন ছোট্ট মেয়েটি তাঁর উষ্ণ অভ্যর্থনা পেল, মেজবানের মুগ্ধ প্রশংসায়, ভয়ের যে দেয়াল ছিল তা ভেঙ্গে গেল এবং সংশয়ের বেড়া উপড়ে পড়ল, তখন মেয়েটি তার নিজের স্বভাবজাত স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশ করার জন্য অনুপ্রাণিত হলো। এভাবেই মেয়েটি কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বাসায় প্রবেশ করল এবং বাড়ির প্রত্যেকটা কোনায় ঘুরে বেড়াল।
যখন সে তার শিশুসুলভ চোখে আকৃষ্ট হওয়ার মত কিছুই খুঁজে পেল না, সে পথপ্রদর্শক এবং শিক্ষক নবী -এর নিকট আসল। সে দেখল। সাধারণ মানুষের মত তিনিও একজন মানুষ, শুধু অন্যান্যদের থেকে তাঁর কিছু উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। তিনি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল এবং সরল মনের মানুষ। তাঁর সরলতা এবং কোমলতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। নবী -এর দুই ঘাড়ের, সঠিকভাবে বললে বাম ঘাড়ের কিছু নিকটে, কবুতরের ডিমের মত আকৃতির নবুয়তের মোহরের দিকে বালিকাটির দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। সে মোহরটির কাছে আসল এবং তা তাকে আকৃষ্ট করে ফেলল। তার মনের মধ্যে কিছু সংশয়েরও আবির্ভাব হলো, রসূলুল্লাহ আবার রাগ করেন কিনা, কিন্তু ইতোপূর্বে তাঁর সম্মন্ধে যে ধারণা তার মনে জন্মেছিল, তা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বালিকাটি নবী (সা)-এর পবিত্র পিঠে খেলা করা শুরু করল। সে খেলছিল এবং খেলছিল, এবং তার মনের মধ্যে এই ভয় কাজ করেনি যে, তিনি রাগ করবেন অথবা অস্বস্থি বোধ করবেন। অথচ মেয়েটিই বাবার অভিযোগ করলেন, “আমার বাবা আমাকে তিরস্কার করেছিলেন”
মহান নেতা নবী আকাশের দিকে তাঁর হাত উত্তোলনের মাধ্যমে সভা শেষ করলেন, ছোট্ট মেয়েটির ভবিষ্যতের জন্য দুয়া করলেন, তার আগামী দিনগুলি এবং আগামী বয়সের জন্য; তার হলুদ পোশাকের দিকে তাকিয়ে তিনি আল্লাহর নিকট তার দীর্ঘ জীবন চেয়ে দোয়া করলেন যাতে আল্লাহর দাসত্ব এবং আনুগত্যে তার জীবন অলংকৃত হতে পারে।
ইয়া আল্লাহ, রসুলুল্লাহ -এর প্রতি দুরুদ ও সালাম। যিনি ছিলেন দয়াশীল নবী, সদয় রসুল, সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ এবং দয়াশীল মানুষদের নেতা।
📄 একজন সফল নেতার অষ্টম রহস্যঃ এই রহস্যের নেপথ্যে একটি মহান শিশু
আজ মুসলমানদের একান্ত প্রয়োজন বাড়ন্ত শিশুদের প্রতি তাদের আচরণ এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি তাদের মনোযোগের ব্যাপারে বিস্তারিত চিন্তা করা। নবী ﷺ, তার কথা এবং কাজের মাধ্যমে, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করার দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবসত, আমরা আমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে দেখতে পাই যারা শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন সব রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন যা জন-এডওয়ার্ড-জেমস-স্মীথদের দ্বারা পরিকল্পিত। তারা সর্বোচ্চ মর্যাদাবান নবী এবং সর্বপ্রধান নির্দেশক নবী (সা)-এর জীবনী পড়ে দেখেন নি, তাঁর শেখানো পদ্ধতির ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েন নি, এমনকি নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে তাঁর দিক নির্দেশনা এবং দৃষ্টিভঙ্গিগুলি বিবেচনা করে দেখেন নি। এর চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় আর কি হতে পারে?
একটা শিশু কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই তার প্রকৃতিগত আচরণই প্রকাশ করে এবং তার নিজের একান্ত ব্যক্তিগত অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। সে হাসতে হাসতে তার বাবার কোলে প্রস্রাব করে দেয়, অথবা হাসতে হাসতে মানুষজনকে আঘাত করে। তারা তাদের বাবার অন্তরের প্রশান্তি এবং মায়ের অলংকার। তাদের কারণেই জীবন লাবণ্যময় হয়ে ওঠে, বেঁচে থাকাটা সুন্দর মনে হয়। তাদের আরামের জন্য পিতামাতা নির্ঘুম রাত কাটান, তাদের নিরাপত্তা দিতে দিন ব্যয় করে দেন।
একজন বাবা তার জীবনের স্বর্ণযুগে কঠোর পরিশ্রম করে, সংগ্রাম করে, নদী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, কখনো আকাশে উড়ে, পূর্ব-পশ্চিম অতিক্রম করে সন্তানের জন্য ভাল খাদ্য, সুন্দর জামা কাপড় এবং ভাল একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি এগুলো করেন, তারপরও তার হৃদয় প্রশান্তিতে পূর্ণ থাকে। যদিও তাকে ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, শয়তানের কু-প্ররোচনার বিরুদ্ধে সাহসী মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। তিনি সকালে ওঠেন, রাত্রে ঘুমাতে যান, কিন্তু দিন রাতের প্রত্যেকটা সময় তার মূল চিন্তা থাকে পৃথিবীতে হেটে বেড়ানো এই মনিমুক্তোগুলির দিকে।
বাচ্চারা বাড়ির যেদিকে যে প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়, একজন মাও বাচ্চার সাথে সাথে সেই প্রান্তে ঘুরে বেড়ান এবং ক্লান্তিকর দিনের শেষে, সারারাত নির্ঘুম নয়নে একবার এপাশ আবার ওপাশ এভাবে সারা রাত কাটিয়ে দেন; প্রত্যেক ছোট্ট শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়; বাচ্চাটা যখন নড়ে ওঠে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন, বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়ে তিনিও ঘুমাতে চেষ্টা করেন। বাচ্চার যন্ত্রনায় তিনি কাতর হন, বাচ্চার চিৎকারে তার চোখ অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। তারা যখন সুখে থাকে, হাসতে থাকে, পৃথিবী আনন্দে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু তারা যখন ব্যথা পায়, অসুস্থ হয়, তা যত অল্পই হোক না কেন, মায়ের মন অস্থির হয়ে ওঠে।
আর একারণেই সন্তান থেকে সদ্ব্যবহার পাবার অধিকারের প্রথম তিন-চতুর্থাংশ অধিকার তারই। বাকি এক-চতুর্থাংশ তার স্বামীর সম্মানে, যিনি সার্বক্ষণিক পাশে থেকে সন্তান বড় করতে তাকে সাহায্য করেছেন।
📄 আজ যে শিশু, কাল সে পূর্ণ মানুষ
একটা ছোট্ট শিশু ছোট থাকে কতদিন? আর কতদিনই বা তার পিতামাতা সামর্থবান এবং বড় থাকে?
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضُعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ ضُعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ ضُعْفًا وَشَيْبَةً يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْقَدِيرُ
অর্থ: "আল্লাহ তিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন। অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তিদান করেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।”
আজকের শিশু আগামী দিনের পরিপূর্ণ মানুষ এবং তারাই ভবিষ্যত। এই ছোট্ট দুর্বল আর নিষ্পাপ শিশুরাই নিকট ভবিষ্যতে, সমাজের নেতৃত্ব দেবে, মানুষের মাথা হবে, মানুষের তত্ত্বাবধান করবে।
টিকাঃ
৫২. আর রুম আয়াত-৫৪
📄 উর্বর জমি
তাদের অন্তর পরিচ্ছন্ন, তাদের প্রকৃতি স্নিগ্ধ এবং তাদের আত্মা ধার্মিক। "প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের (ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে, তারপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদী হিসেবে গড়ে তোলে অথবা খৃস্টান হিসেবে গড়ে তোলে অথবা অগ্নি উপাসক হিসেবে গড়ে তোলে।" তাদের মন- মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব আবাদি জমির মতন। আজ আমরা যদি তাদের মধ্যে উচ্চ নৈতিকতা, ভাল চরিত্র, সঠিক মূল্যবোধ এবং সম্মান শ্রদ্ধার বীজ বপন করতে পারি কাল তারা সে অনুযায়ী সঠিক বিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষ, আলেম, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, রাজনীতিবিদ, জাজ, নেতা এবং চিন্তাবিদ আমাদের উপহার দেবে।
নতুন প্রজন্মের জন্ম নেয়া সফলতার রাস্তা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা। কোনো জাতি কেবল তখনই ধ্বংস হয়, যখন তার শিশুরা ধ্বংস হয়ে যায়। আর শিশু-কিশোররা কোনোদিন পাপের পথে পরিচালিত হয় না যতক্ষণ না তারা অবহেলা, অযত্নের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। সম্মানিত নেতা এবং নির্দেশক তার অন্তদৃষ্টি দিয়ে শিশু কিশোর এবং তরুণদের অবস্থান অনুধাবন করেছিলেন। তাদেরকে সেই দিনের জন্য প্রস্তুত করা যেদিন তারা দায়িত্ব কাধে তুলে নেবে এবং সমাজের নেতৃত্ব দেবে সেদিনের জন্য দিক নির্দেশনা দেয়া এবং বড় করার সকল পদক্ষেপ নিতেন।
মহানতম নেতা এবং সম্মানিত শিক্ষক রসুলুল্লাহ -এর জীবনকে বিশ্লেষণ করে, আমি পর্যবেক্ষণ করলাম তিনি এই ব্যাপারে যেসব দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন সেগুলোকে চারটি প্রধান দিকে ভাগ করা যায়।
টিকাঃ
৫৩. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৪৫১০