📄 এ গোপনীয়তার ভিত্তি
মানুষের যে আচরণটা তার ধীরস্থির আত্মসন্তুষ্টি থেকে উদ্ভূত হয় সেটা অবিরাম এবং স্থায়ী। সন্তুষ্টি, ভাল ব্যবহার এবং মূল্যবোধ কোনো ব্যক্তির মধ্যে রোপন করার কোনো অবকাশ নেই। দ্বিতীয়ত : শান্ত এবং ভদ্র কথপোকথনের মাধ্যম ব্যতীত কারো মধ্যে ভাল আচার-আচরণ খোদাই করে দেয়া সম্ভব নয়। অথবা শান্ত এবং ভদ্রোচিত কথোপকথন ছাড়া কোনো নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
নিশ্চিতভাবে কথোপকথনের সবচেয়ে সম্মানিত এবং সর্বোত্তম পন্থা হলো অপরপক্ষের বক্তব্য আন্তরিক এবং মনোযোগ সহকারে শোনা, যাতে করে অপর পক্ষ তার মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ পায় এবং যে বক্তব্যটা অপর পক্ষ একটি শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে সেটা ব্যক্ত করতে পারে। যে বক্তব্যটি একটি হৃদয় লুকিয়ে রাখে সেটা যদি আশ্চর্যজনক অথবা বেমানান হয় সে ক্ষেত্রে বক্তব্যটির বেমানান ক্ষেত্রটি খুঁজে বের করার পন্থা হলো ঐ বক্তব্যটিকে পুরোপুরিভাবে ব্যক্ত করা।
এভাবে কথোপকথন সমস্যার কেন্দ্র বিন্দু এবং বিচ্যুতির শিকড়কে স্পর্শ করবে ফলে কথোপকথন পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা এবং স্থায়ী নিরাময় দ্বারা পরিপূর্ণ হবে যা বয়ে নিয়ে আসবে শান্তি। এ ধরণের বক্তব্যের বদৌলতে সুস্থ এবং প্রাণবন্ত মতামত খারাপ এবং বেমানান মতামতকে দূরীভূত করবে। আত্ম পরিতৃপ্ত হবে এবং মানুষের ব্যবহার সুস্থ এবং পরিপক্ক হবে।
স্বভাবের কারণে একজন ব্যক্তি অন্যান্যদের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। কথোপকথনের ফলশ্রুতিতে হয় ঐক্যমত, ঐক্যমতের পার্থক্য এবং অনৈক্য এর মধ্যে যে কোনো একটি হবে-
إِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ .
“তবে উহারা নহে, যাহাদিগকে তোমার প্রতিপালক দয়া করেন এবং তিনি উহাদিগকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন।”
আলাপ-আলোচনা বা কথোপকথন হলো বুদ্ধিজীবীদের জন্য যুক্তিবিদ্যা এবং জ্ঞানী লোকদের জন্য একটি ঐতিহ্য। এটা হলো আলাপ-আলোচনার পক্ষে মানুষের স্মরণীয় দান এবং শিক্ষা ও সচেতনতার জন্য নিয়ম বিজ্ঞানের সবচাইতে উঁচু স্তর।
আলাপ-আলোচনা হলো হৃদয়ে খচিত একটি উৎকর্ণ লিপির মতো। মানুষের স্বভাবের ওপর এটা একটি স্থায়ী সুফল আনয়ন করে। একজন ব্যক্তিকে ভাল শ্রোতাতে রূপান্তরিত করে। যে বৈশাদৃশ্য গ্রহণে সমর্থ হয়। এ বৈসাদৃশ্য অবশ্য মানব স্বভাব থেকেই উদ্ভূত। যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাই এবং সমসাময়িকদের দ্বারা সমর্থিত হয়ে কোনো ইস্যুর সম্মুখীন হয় তখন আলাপ আলোচনাই ঐ ইস্যুকে প্রত্যেক কোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা যোগাবে এবং ঐ ব্যক্তিকে পূর্ণতা দান করবে।
মানব জাতির মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তি আছে কি? যে দাবি করতে পারে যে, অন্য কারোও মতামত তার দরকার নেই। মানব জাতির সেবা, আদম সন্তানদের মধ্যে সেবা, জ্ঞান এবং বুদ্ধির ক্ষেত্রে যিনি সব মানুষকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি তাঁকে যারা ভালবাসতেন তাদের বক্তব্য শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি বিভিন্ন মানুষের মধ্যে দুর্বল এবং যুবকদের মতের উত্তর দিতেন। বিশেষভাবে যদি তিনি এর মধ্যে উপকার দেখতে পেতেন তাহলে সে ক্ষেত্রে তিনি শক্তিশালী এবং বয়োবৃদ্ধদের মতামত আগে শুনতেন।
নেতার জীবনীতে আলাপচারিতার স্থান
আল্লাহ নবী করিমকে সম্বোধন করে বলেন-
ادْعُ إِلَى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ .
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়"। সুতরাং কোনো ডাকে সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।
একজন ভাল শ্রোতা
মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কর্তৃক বর্ণিত। "আমাকে বলা হয়েছিল যে যখন উৎবাহ ইবনে রাবীয়া, যিনি তাঁর গোত্রের লোকদের মধ্যে মহান এবং জ্ঞানী ছিলেন তিনি কুরাইশদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন এবং নবী করিম (সা) একাকী মসজিদে অবস্থান করছিলেন। উৎবাহ বললেন, “হে কুরাইশগণ! আমি কি তাঁর (অর্থাৎ নবী করিম) কাছে যাব এবং কথা বলব?” আমি তাঁর কাছে কিছু প্রস্তাব করব, যেগুলো তিনি গ্রহণ করতে পারেন। কুরাইশগণ এ প্রশ্নের হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন।
নবী করিম -এর সামনে বসার আগ পর্যন্ত উতবাহ উঠে দাঁড়ালেন। বর্ণনাকারী জানালেন উতবাহ তাকে কি বলেছিলেন এবং ধন, রাজত্ব ও অন্যান্য কি কি সামগ্রী তাকে দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।
যখন উতবাহ তার বক্তব্য শেষ করলেন নবী করিম বললেন, আবুল ওয়ালিদ! তুমি কি তোমার কথা শেষ করেছ?' তিনি বললেন, আমি শেষ করেছি।' নবী বললেন, 'তাহলে আমি কি বলি সেটা শুন।' সে বলল।, 'আমি শুনব...'
নবী করিম তখন সবচেয়ে দয়াময় আল্লাহর নামে বললেন-
حم تَنْزِيلٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿2﴾ كِتَبٌ فُصِّلَتْ أَيْتُهُ قُرْآنًا
عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴿٥﴾ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا
يَسْمَعُونَ ﴿8﴾ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي آكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي أَذَا نِنَا وَقُرْ
وَ مِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَاعْمِلُونَ ﴿﴾ قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ
مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا الْهُكُمْ إِلهُ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ وَ
وَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ
১. "হা মীম।
২. পরম করুণাময়, দয়ালু দাতার পক্ষ হতে অবতীর্ণ এক কিতাব।
৩. বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে সম্প্রদায়ের জন্য।
৪. সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক মুখ ফিরাইয়া নিয়েছে। সুতরাং উহারা শুনবে না।
৫. উহারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদিগকে আহ্বান করছ যে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবেদন-আচ্ছাদিত আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি।
৬. বল, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই। আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। অতএব তোমরা তারই পথ দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। দুর্ভোগ অংশীবাদীদের জন্য।
নবী করিম ঐ সূরা তেলাওয়াত করে থেমে থাকলেন এবং উতবাহ তার হাত পিছনের দিকে রেখে গভীর মনোযোগ সহকারে রসূলের তেলাওয়াত শুনতে তাকলেন। যখন আল্লাহর নবী সিজদার আয়াতে পৌঁছালেন তখন সিজদা দিলেন। তারপর তিনি বললেন, 'আবুল ওয়ালিদ যা তেলাওয়াত করেছি সেটা কি তুমি শুনেছ? উত্তরে সে বলল, 'হাঁ তখন নবী করিম তাকে বললেন, 'এখন এ ডাকে সাড়া দেবে কি দেবে না সেটা তোমার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
তারপর উতবাহ তার সঙ্গীদের কাছে গেল এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন বলল, 'আমরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে পারি যে, উতবাহ আমাদের সঙ্গ ছাড়ার আগে যে রকম ছিল সেটা থেকে তার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে।' যখন সে অন্যান্য সাথি সাথে বসল তখন তারা জিজ্ঞাসা করল, 'কি ব্যাপার?' তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি।
ব্যাপারটা হলো আমি এখন এমন কিছু শুনেছি যেটা আমি আগে কখনও শুনিনি। এটা হঠকারিতা, ম্যাজিক ও ভবিষ্যতবাণী এর কোনোটাই না। হে কুরাইশগণ! আমাকে অনুসরণ কর এবং এ ব্যাপার আমার হাতে ছেড়ে দাও। ঐ মানুষটিকে তার বাণী নিয়েই থাকতে দাও। আমি শপথ করে বলতে পারি যে, তাঁর কথা থেকে আমি যা পেয়েছি সেটার একটা বিরাট প্রভাব আছে।
টিকাঃ
২. হুদ (১১: ১১৯)
৩. নাহল (১৬: ১২৫)
৪. ফুসিলাত (৪১: ১-৬)
📄 পিছের উদাহরণকে নিয়ে ধ্যান ধারণা
এ উদাহরণটা এমন সংকেত বহন করে যেটা কথোপকথন এবং শিষ্টাচারের সাথে সম্পর্কিত...
দয়াশীল নেতা নবী উতবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। উতবা একটি দীর্ঘ সূচনার অবতারণা করেছিলেন। তবে এটা তাঁর প্রধান বক্তব্য হবে বলেই আশা করা হয়েছিল। এ দীর্ঘ সূচনার পর উতবা বললেন, "আমি আপনার কাছে কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করব।" নেতা নবী (সা) উতবার কথার শান্তভাবে এবং দয়ার সাথে শুনলেন। উতবা যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন তখন নবী করিম তাঁর বক্তব্য দেয়ার জন্য তাড়াহুড়া করলেন না; বরং তিনি উতবাকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন কিনা।
যখন রসূল করীম নিশ্চিত হলেন যে উতবা তাঁর কথা শেষ করেছেন তখন তিনি উতবার প্রস্তাবের উত্তরে কুরআন তেলাওয়াত শুরু করলেন। তিনি কুরআন তেলাওয়াতটা পছন্দ করলেন। কারণ এর বাণী হলো সবচাইতে অলঙ্কারপূর্ণ, সুন্দর এবং আনন্দ উপভোগ করার মতো। রসূল তাঁর চমৎকার কণ্ঠে তেলাওয়াত চালিয়ে যেতে থাকলেন যার ফলশ্রুতিতে হৃদয় সমর্পণ করে এবং আত্মা শান্তি পায়। তিনি শুধুমাত্র কুরআন তেলাওয়াত করলেন এবং এর সাথে একটি অক্ষরও যোগ করলেন না।
এরপর নবী করিম উতবাকে বললেন, "হে আবু আল-ওয়ালীদ! আমি কি বলেছি সেটা কি তুমি শুনেছ?” উতবা উত্তরে বললেন, "হ্যাঁ শুনেছি।" অতঃপর মহানবী উতবাকে বললেন, "এখন এ ধর্মকে গ্রহণ করা অথবা প্রত্যাখ্যান করার পূর্ণ স্বাধীনতা তোমার আছে। তুমি বলেছ আমি শুনেছি।
আমি বলেছি, যেহেতু শুনেছ এখন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ভার তোমার ওপর। সবকিছু তোমার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।”
কথোপকথনের এ উন্নত ধরণ উতবাকে একজন ভাল শ্রোতায় রূপান্তরিত করেছিল। সুতরাং এটা কোনো অবাক হওয়ার ব্যাপার নয় যখন উতবা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফেরত গিয়েছিলেন তখন তারা বলেছিলেন, “হে আবুল ওয়ালীদ তিনি (নবী) তোমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন।"
📄 নেতার জীবনীতে একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য
নবী -এর জীবনী পড়ার সময় তুমি দেখতে পাবে যে, তিনি খুব ভাল শ্রোতা ছিলেন। যিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্যে বিশেষ ব্যক্তিদের কথা যেভাবে শুনতেন ঠিক একইভাবে তিনি সাধারণ স্তরের জনগণের কথাও শুনতেন। তিনি তাঁর চরম শত্রুদের কথা যেভাবে শুনতেন একইভাবে তাঁর পত্নীদের মধ্যে সবচাইতে প্রিয় পত্নীর কথাও শুনতেন। এ দয়ালু শিক্ষক নবী -এর জীবনী পড়ার সময় তোমরা কখনই দেখতে পাবে না যে, কোনো ব্যক্তি সে অজ্ঞ, শত্রু অথবা এমন কোনো ব্যক্তি হোন না কেন যিনি ইসলামকে বিদ্রূপ করেন তার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নবী (সা) তাকে তার বক্তব্য প্রদানে বাধা দিয়েছেন।
📄 তার্কিক এবং শ্রোতা
ইউসুফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালামের সূত্রে বর্ণিত আছে। "খাওলাহ বিনতে আলাবাহ, আউস ইবনে আল-সামিতের পত্নী এবং প্রসিদ্ধ সাহাবী উবাদাহ ইবনে আল-সামিত বলেছিলেন, আমার স্বামী (অর্থাৎ আউস) ঘরে প্রবেশ করে রাগতস্বরে আমার সাথে কোনো ব্যাপারে কথা বললেন এবং আমি তার কথার উত্তর দিলাম। তিনি আমাকে বললেন, "তুমি আমার মায়ের পিছনের দিকের মত।" তারপর তিনি তার সঙ্গীদের সাথে দেখা করতে গেলেন। ফিরে আসার পর তিনি আমার সাথে যৌনমিলনে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তবে আমি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। আমাদের মধ্যে একটি তুমুল তর্কাতর্কি হলো এবং আমি তাকে তর্কে হারিয়ে দিলাম ঠিক যেমন একজন মহিলা একজন দুর্বল মানুষকে হারিয়ে দেয়। আমি বললাম, 'খাওলার আত্মা যাঁর হাতে আমার প্রাণ সে আল্লাহর নামে বললাম, যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাদের তর্কের নিরসণ না করেন সে পর্যন্ত তুমি আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।'
সুতরাং স্বামীর কারণে আমাকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল সেটা জানাতে আমি নবী করিম -এর শরণাপন্ন হলাম। তিনি বললেন, 'তিনি তোমার স্বামী এবং মামাতো ভাই। তার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চলো এবং তার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখ।
খাওলাহ বললেন, 'আল্লাহর বাণী নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি নাছোড়বান্দা ছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই সেই মহিলার আকুতি শুনেছিলেন এবং গ্রহণ করেছিলেন। সে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে (আল্লাহর সাথে) খেসারতের আয়াত নাযিল হওয়া পর্যন্ত তার স্বামীর ব্যাপারে কাকুতি মিনতি করেছিলেন।
নবী করিম বললেন, 'তাকে একটি ক্রীতদাস মুক্ত করার আদেশ দাও।' তাঁর স্ত্রী বললেন, 'আমি শপথ করে বলছি যে, মুক্তি দেয়ার মত তার কোনো ক্রীত দাস নেই'। তারপর তিনি বললেন, 'তার উচিত হবে দুই মাস উপুর্যপরি সাওম পালন করা, জবাবে তার স্ত্রী বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল, তিনি একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ যিনি সাওম পালন করতে পারবেন না।' তিনি বললেন, 'সে ষাটজন অভাবী মানুষকে খাবার দিক।' উত্তরে আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল, তার কাছে এমন কিছুই নেই যার দ্বারা সে ষাটজন অভাবী মানুষের খাওয়ার জোগাড় করতে পারবে।
তিনি (নবী) বললেন, "আমরা তাকে খেজুরের একটি কাধি দিয়ে সাহায্য করব। খাওলাহ বললেন, "হে আল্লাহর নবী আমি তাকে আরোও একটি খেজুরের কাধি দিয়ে সাহায্য করব।" তিনি বললেন, "ভালই হলো, তাহলে তাকে পরোপকারের উদ্দেশ্যে এটা করতে বল।
ভাইয়েরা তোমরা কি লক্ষ্য করেছ ঐ মহিলার নালিশ এবং তার স্বামী সম্পর্কে বর্ণনা নেতা নবী কত মনোযোগ সহকারে শুনেছেন? সে তার স্বামীর জন্য যেসব ভাল কাজ করেছে সেগুলো এবং তার স্বামী তার প্রতি কি কি ভুল আচরণ করেছে সেগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন।
তারপর তিনি (অর্থাৎ নবী) ঐ মহিলাকে শান্ত হতে নির্দেশ দিলেন এবং এরপর তার স্বামীকে যে খেসারত দিতে হবে সে প্রসঙ্গের দিকে শান্ত এবং দয়াপরবশ হয়ে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হলেন।
এরপর তিনি (নবী) খেজুর দিয়ে ঐ স্বামীকে তাঁর সাহায্যের কথা বললেন এবং তিনি ঐ মহিলার প্রশংসা করলেন যিনি তার গরিব স্বামীর সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছিলেন। এই কথপোকথনের জন্য কতটুকু সময়ই বা ব্যয়িত হয়েছিল। আলাপ-আলোচনাকে কার্যকরী করার জন্য এটাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।
প্রিয় পাঠক, আমি আশা করি আপনারা নৈতিক ব্যাপারে এ বর্ণনাটা ধৈর্য সহকারে শেষ পর্যন্ত পাঠ করবেন:
আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, "এগারোজন মহিলা এক জায়গায় একত্রিত হলেন এবং এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, তারা তাদের স্বামী সম্পর্কে কোনো খবর গোপন করবেন না।
১. প্রথম মহিলার ভাষ্য হলো, "আমার স্বামী হলো পাহাড়ের চূড়ায় রক্ষিত একটি শুকনা দুর্বল উটের গোস্তের মতো। এই পাহাড়ে আরোহণ করা না সহজ, না উটের গোস্ত চর্বিযুক্ত যাতে করে একজন ঐ গোস্ত সংগ্রহ করার কষ্ট করবে।"
২. দ্বিতীয়জনের ভাষ্য হলো, "আমি আমার স্বামীর খবর বলব না। আমার ভয় হয় যে, আমি তার বর্ণনা বলে শেষ করতে পারব না। কারণ আমি যদি তার বর্ণনা শুরু করি তাহলে আমাকে তার সমস্ত দোষ এবং খারাপ বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করতে হবে।
৩. তৃতীয় মহিলা বললেন, "আমার স্বামী, 'লাম্বু'! আমি যদি তার বর্ণনা দেই (এবং সে যদি এটা শুনতে পায়) তাহলে সে আমাকে তালাক দেবে। এবং আমি যদি চুপ থাকি তাহলে সে আমাকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখবে-অর্থাৎ আমাকে তালাকও দেবে না অথবা পত্নীর মর্যাদাও দেবে না।
৪. চতুর্থজন বললেন, আমার স্বামী হলেন মেজাজের দিক থেকে সহনীয়-তিহামার রাতের মত, যে রাত না ঠাণ্ডা না গরম; আমি তার ভয়ে ভীতও নই অথবা দাম্পত্যে অসুখীও নই'
৫. পঞ্চমজন বললেন, আমার স্বামী যখন ঘরে প্রবেশ করেন তখন তাকে চিতাবাঘের মত দেখায় যিনি প্রচুর ঘুমান। আবার যখন বাইরে যান তখন তাকে তার সাহসিকতায় সিংহের মতো দেখা যায় এবং তিনি যেটা একবার কাউকে দিয়ে ফেলেন তখন সেটা আর ফেরত চান না।
৬. ষষ্ঠজন বললেন, যদি আমার স্বামী খাওয়া শুরু করে তাহলে সে থালা শূন্য করে অতিরিক্ত খায় এবং যদি সে পানাহার করে তবে সে কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। যদি সে ঘুমায় তাহলে সে একলা আমাদের কম্বলের নিচে গড়াগড়ি দেয় এবং আমার অনুভূতি বোঝার জন্য করতল দিয়ে আমাকে স্পর্শ করেন।
৭. সপ্তমজন বললেন, আমার স্বামী একজন কু-কর্মকারী অথবা দুর্বল বা বোকা। সব দোষগুলিই তার মধ্যে বিদ্যমান। সে তোমার মাথা অথবা শরীর অথবা এ দুটোই জখম করতে পারে।
৮. অষ্টমজন বললেন, আমার স্বামীর শরীর খরগোশের মত নরম যেটার গন্ধ যারনাবের মতো (এক রকম গন্ধযুক্ত ঘাস)।
৯. নবমজন বললেন, আমার স্বামী একটি লম্বা পিলারের মতো সে তার তরবারী বহন করার জন্য চামড়ার সরু ফালি পরিধান করে থাকে, তার বাসা ছিল গোত্রের অন্যান্য মানুষের বাসার কাছে। যারা তার সাথে সহজেই পরামর্শ করতে পারত।
১০. দশমজন বললেন, আমার স্বামী মালিক এবং তিনি কি ধরনের লোক? আমি তার সম্পর্কে যাই বলিনা বা করিনা কেন মালিক হলো তার চাইতে মহান। তার সম্পর্কে আমার মনে যে প্রশংসাগুলো আসতে পারে সেগুলোর উর্দ্ধে। তার অধিকাংশ উটগুলোকেই বাড়িতে রাখা হয় (অতিথিদের জন্য জবাই করার উদ্দেশ্যে) এবং গুটি কয়েক উটকে চরণভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন উটগুলি বাঁশি অথবা চাকের শব্দ শুনে তখন তারা বুঝতে পারে যে অতিথিদের জন্য তাদেরকে জবেহ করা হবে।
১১. একাদশজন বললেন, আবু যার হলেন আমার স্বামী এবং আমি তার সম্পর্কে কিই বা বলব? তিনি আমাকে প্রচুর অলঙ্কার দিয়েছেন। অলঙ্কারের কারণে আমার কান পরিপূর্ণ এবং আমার বাহু মোটা হয়ে গিয়েছে অর্থাৎ আমি মুটিয়ে গিয়েছি। তিনি আমাকে সন্তুষ্ট করেছেন এবং আমি এত সুখী হয়েছি যে, আমি গর্ব অনুভব করি। আমার সে পরিবারে জন্ম হয়েছিল সেটা শুধুমাত্র ভেড়ার মালিক ছিল এবং দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন যাপন করছিল। বিবাহ সূত্রে তিনি আমাকে একটি সম্মানিত পরিবারে নিয়ে আসলেন যাদের ঘোড়া এবং উট ছিল। যারা শস্য মাড়াত এবং পরিষ্কার করত। আমি যাই বলিনা কেন সে আমাকে গালমন্দ অথবা অপমান করত না। আমি যখন ঘুমাই তখন সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাই এবং যখন আমি পানি অথবা দুধ পান করি তখন আমি পরিপূর্ণভাবেই পান করি।
আবু যারের মা সম্পর্কে এরূপ বলা যায়: তার ব্যাগগুলি সব সময়ই খাদ্য সামগ্রী দ্বারা পরিপূর্ণ থাকত এবং ঘর ছিল বড়। আবু যারের পুত্র সন্তানের বিছানা ছিল নাংগা তরবারী এবং চার মাসের শিশুর বাহুর মতো সঙ্কীর্ণ। আবু যারের কন্যা সন্তান সম্পর্কে বলতে হয়: তিনি তাঁর মা-বাবার প্রতি অনুগত ছিলেন। তার শরীরটা ছিল মোটা এবং সুঠাম যেটা তার স্বামীর অন্যান্য স্ত্রীর ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবু যারের ক্রীতদাসিনী সম্পর্কে কি বলা যায়? সে আমাদের গোপন কথা কারো কাছে ব্যক্ত না করে নিজের মধ্যে ধারণ করে। আমাদের খাদ্য সামগ্রী নষ্ট করে না এবং উচ্ছিষ্ট জিনিস ঘরে সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে না।
একাদশ মহিলা আরো বললেন, একদিন ঘটনা এমন ঘটল যে, যখন পশুদের দুধ দোয়ানো হয় তখন আবু যার বাইরে গিয়েছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, একজন মহিলার চিতাবাঘের মতো দুই ছেলে তার দুটি স্তন নিয়ে খেলা করছিল। (তাকে দেখে) তিনি আমাকে তালাক দিলেন এবং তাকে বিয়ে করলেন। এরপর আমি একজন সম্ভ্রান্ত লোককে বিয়ে করি যিনি দ্রুতগামী অক্লান্ত ঘোড়ায় চড়তেন এবং তার হাতে বর্শ রাখতেন। তিনি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল সবরকমের গবাদি পশুর একটি করে জোড়া এবং আমাকে বললেন হে উম্মে যার, এটা খাও এবং তোমার আত্মীয়দের খাদ্য সামগ্রী দাও।
তিনি আরোও বললেন, আমার দ্বিতীয় স্বামী আমাকে যা যা দিয়েছিলেন আবু যারের সবচাইতে ছোট বাসন কোসনও পূর্ণ করতে পারেনি। আয়েশা তখন বললেন, আল্লাহর রসূল আমাকে বলছিলেন। আবু যারের সাথে তার স্ত্রী উম্মে যারের যে রকম সম্পর্ক, আমার সাথে তোমার ঠিক ঐ রকম সম্পর্ক।
প্রিয় পাঠক, আপনারা কি এ দীর্ঘ আলোচনা এবং চমৎকার বক্তৃতা অথবা বাধা ছাড়া পুরো বক্তৃতাটা শুনেছেন। এ কথাগুলির বিপরীত তার প্রতিক্রিয়া ছিল ভাল মেজাজ ও খাটি হৃদয়বান মানুষের প্রতিক্রিয়ার মতো।
দৈনন্দিন জীবনে শ্রবণকে যদি শিল্প বলে বিবেচনা করা হয় তাহলে দাম্পত্য জীবনে এর গুরুত্ব হয়ে উঠে। তুমি সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবে যে, ঘর ও পরিবারগুলোর মধ্যে ধ্বংসের প্রবণতা আছে সেগুলোতে ভাল শ্রবণ ও মনোযোগের কলা-কৌশলের ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে।
এ হাদীসের ক্ষেত্রে হাফিজ ইবনে হাজারের ব্যাখ্যা
এগারোজন মহিলা এক জায়গায় একত্রিত হয়ে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, তারা তাদের মনের গভীর থেকে স্বামী সম্পর্কে সত্যটা বলবে।
তারা কোনো কিছু লুকাবে না। তারা একে অপরের সাথে সততা বজায় রাখবে এবং তাদের স্বামী সম্পর্কে কোনো কিছু গোপন করবে না। প্রথম মহিলা বললেন, আমার স্বামী হলো পাহাড়ের চূড়ায় রক্ষিত একটি শুকনা, দুর্বল উটের গোস্তের মতো। এ পাহাড়ে আরোহন করা না সহজ, না উটের গোস্ত চর্বিযুক্ত যাতে করে একজন ঐ গোস্ত সংগ্রহ করার চেষ্টা করবে।
আমার স্বামী খুবই শুকনা। তার শারীরিক দুর্বলতার কারণেই অন্যান্যরা স্বামীকে তাদের বাড়িতে নিতে পারে না। এ মহিলার কথার অর্থ হলো তার স্বামী অতিশয় শুকনা এবং তার মধ্যে সহৃদয়তার ঘাটতি আছে। অধিকন্তু সে উদ্ধত এবং চরিত্রের দিক থেকে বজ্জাত। এসবের মাধ্যমে এ মহিলা তার স্বামীর দুর্দশার ব্যাপ্তি এবং তার প্রতি ঘৃণার চিত্র তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয় মহিলা বললেন, আমি আমার স্বামীর চরিত্রের বর্ণনা দেব না। আমি তার অর্থহীন এবং বাজে কথা ফাস করে দেব না।
আমার ভয় হয় যে, আমি তার বর্ণনা বলে শেষ করতে পারব না। কারণ এটা দীর্ঘ এবং অঢেল।
কারণ হলো, যদি আমি তার বর্ণনা দেই তাহলে আমি তার সব দুর্বলতা এবং খারাপ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব। আল-বুযারা তার স্বামীর শরীরের স্নায়ু এবং শিকার একটি জটিল পাকের কথা উল্লেখ করেছেন যেটা একটি স্ফীতির সৃষ্টি করেছে। যাহোক বুঝায় তার স্বামীর চরিত্রের অসংখ্য দোষ এবং গোপনীয়তা সম্পর্কে বলেছেন।
তৃতীয় মহিলা বললেন, আমার স্বামী অতিরিক্ত লাম্বুটা: সে লম্বা তবে অপদার্থ। তিনি বললেন, আমি যদি তার দোষগুলি উল্লেখ করি এবং সে যদি জানতে পারে তাহলে সে আমাকে তালাক দেবে। আমি যদি চুপচাপ থাকি। তাহলে আমি পত্নী বা তালাকপ্রাপ্ত কোনোটাই থাকব না। আল-বুযারার সাথে স্বামীর দুর্ব্যবহার এবং সে যদি তার শোচনীয় অবস্থার কথা স্বামীকে বলত তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বামীর অসহিষ্ণুতার কথা তিনি ব্যক্ত করেন। আল-বুযারার এটা জানা ছিল যে, যদি সে একবারের জন্য হলেও স্বামীর কোনো দোষের কথা উল্লেখ করে তাহলে স্বামী তাকে তালাক দেবেন। এ মহিলা তালাক পছন্দ করেন না। কারণ তিনি তার স্বামীকে পছন্দ করেন। অতঃপর দ্বিতীয় বাক্যে তার নিপুনতা এবং এরকম শোচনীয় অবস্থায় তার ধৈর্যের কথা উল্লেখ করেন।
চতুর্থজন বললেন, আমার স্বামী হলেন মেজাজের দিক থেকে সহনীয় তিহামার রাতের মত : না গরম না ঠান্ডা। আমি তার ভয়ে ভীতও নই অথবা দাম্পত্য জীবনে অসুখীও নই। তার কথার অর্থ হলো, তার স্বামী আল-বুযারীর কোনো ক্ষতি করেন না। বিপরীতে এ মহিলা তার স্বামীর সাথে একটি আরামদায়ক এবং মধুর জীবন যাপন করছে। আমার স্বামী সংযত। তিনি অল্পতেই রাগন্বিত হন না এমনকি তিনি অস্থিরমতিও নন। আমি তার সাথে নিরাপদ এবং তার সৃষ্ট সমস্যায় ভীত নই। সে আমার সাথে জীবন যাপনে বিরক্ত বোধ করে না। আমি তার সাথে একটি আরামদায়ক জীবন যাপন করছি, যেটার সাথে তিহামার বাসিন্দাদের রাত্রি যাপনের তুলনা চলে।
পঞ্চমজন বললেন, আমার স্বামী যখন ঘরে প্রবেশ করেন তখন তাকে চিতাবাঘের মতো মনে হয় এবং যখন বাইরে যান তখন তাকে সিংহের মত মনে হয়। এ কথার দ্বারা তিনি বোঝাতে চান যে, তার স্বামী একটি চিতাবাঘের মত যেটা প্রচুর লাফায়। আল বুযারা বলতে চান যে, যখন তার স্বামী ঘরে ফিরেন তখন তিনি চিতা বাঘের মতো স্ত্রীর কাছে যান এবং যখন তিনি ঘরের বাইরে যান তখন তার সাহসিকতায় সিংহের মতো দেখা যায়।
পঞ্চমজন বলতে চান যে, তিনি তার স্বামীর কাছে খুবই প্রিয় এবং যখন তার স্বামী তাকে দেখে তখন সে স্থির থাকতে পারে না এবং তিনি যেটা একবার কাউকে দিয়ে ফেলেন তখন সেটা আর ফেরত চান না। এ মহিলার কথা অনুযায়ী তিনি খুবই দয়ালু এবং যদি কোনো জিনিস ঘর থেকে হারিয়ে যায় তাহলে তিনি সেটার আর কোনো খোঁজ করেন না। বাসায় অস্বস্তিকর কিছু দেখলে তিনি সেটা নিয়ে তর্কাতর্কি করেন না; বরং সেটাকে আমলে না নিয়ে মাফ করে দেন।
ষষ্ঠজন বললেন, যদি আমার স্বামী খাওয়া শুরু করে তাহলে সে থালা শূন্য করে অতিরিক্ত খায় এবং যদি সে পানাহার করে তবে সে কিছু অবশিষ্ট রাখে না। যদি সে ঘুমায় তাহলে সে একলা আমাদের কম্বলের নিচে গড়াগড়ি দেয় এবং আমার অনুভূতি বোঝার জন্য করতল দিয়ে আমাকে স্পর্শ করে না। এ মহিলা বলতে চান যে, তার স্বামী প্রচুর পরিমাণে খায়, বিভিন্ন জাতের খাবার একসাথে মিশিয়ে নেয় এবং একটুও অবিশিষ্ট রাখে না। যদি সে পানাহার করে তাহেল সে পাত্রে যা আছে সেটা সে নিঃশেষ করে ফেলে। যদি সে ঘুমায় তবে নিজে আমাদের কম্বলের নিচে গড়াগড়ি দেয়। যখন সে ঘুমায় তখন সে নিজেকে কাপড় দিয়ে মুড়ে নেয় এবং গুটি শুটি মেরে থাকে। সে তার পত্নীকে পরিহার করে চলে, যে কারণে এ মহিলা খুবই দুঃখিত।
এবং আমার অনুভূতি বোঝার জন্য করতল দিয়ে আমাকে স্পর্শ করেন না। তার পত্মী দুঃখিত অথবা অসুখী এটা বোঝার জন্য স্বামী হাত প্রসারিত করে না। সুতরাং এ মহিলা তার স্বামীকে স্নেহময়ী স্বামী হিসাবে আখ্যায়িত করেন নি এবং যদি এ মহিলাকে অসুস্থ দেখায় এই স্বামী অবস্থা বোঝার জন্য তার হাত প্রসারিত করে না যেটা সব স্ত্রী বা পত্নীর অভ্যাস।
অথবা এ মহিলা বলতে চেয়েছে যে, স্বামী তাকে আদর করে না অথবা তার কাছে আসে না। দুষ্টামী, নির্দয়তা, ক্ষুধা, অবজ্ঞা এবং স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার এ শব্দের মাধ্যমেই এ মহিলার স্বামীর বর্ণনা দিতে হয়।
সপ্তমজন বললেন, আমার স্বামী একজন কু-কর্মকারী অথবা দুর্বল বা বোকা যে সব সময়ই তার নিজস্ব ব্যাপার নিয়ে অভিভূত থাকে।
সব ধরনের দোষগুলিই তার মধ্যে বিদ্যমান। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে যে সকল অখাঁটি উপাদানগুলি থাকে তার সব কয়টাই তার মধ্যে উপস্থিত। সে তোমার মাথা অথবা শরীর অথবা এ দুটোই জখম করতে পারে। অর্থাৎ সে একজনকে প্রচন্ডভাবে মারধোর করে এবং যখন সে মারধোর করে তখন তোয়াক্কা করে না একজন ব্যক্তির শরীর সে কি ধরনের জখম করল।
অষ্টম মহিলা বললেন, আমার স্বামীর শরীর খরগোশের মতো নরম যেটার গন্ধ যায়নাবের মতো। আয যুবায়ের ইবনে বাক্কার তার বর্ণনায় এটা সংযোজন করেছেন: এবং আমি তাকে সবসময় পরাভূত করি। তবে সে অন্যান্যদের পরাভূত করে।
খরগোশের মত নরম: অর্থাৎ তার স্বামীর আচার ব্যবহার খুবই ভাল এবং পত্নীর প্রতি ব্যবহারে সে খুবই দয়ালু। যেটাকে খরগোশের শরীর স্পর্শ করার সাথে তুলনা করা যায়। তুমি যদি খরগোশের পিঠে হাত রাখ তাহলে তুমি দেখবে যে পিঠটা খুবই মসৃণ।
এবং তার শরীর থেকে যায়নাবের গন্ধ বের হয়। যায়নাব অর্থ হলো সুগন্ধীযুক্ত চারাগাছ। তার কথার অর্থ হলো অতিরিক্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সুগন্ধি ব্যবহারের কারণে তার শরীরে একটি সুগন্ধ আছে।
অষ্টমজন আরোও উক্তি করলেন: আমি তাকে সব সময় পরাভূত করি তবে তিনি অন্যান্যদেরকে পরাভূত করেন। তিনি উল্লেখ করলেন স্বামীর সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল, পত্নীর প্রতি তার ধৈর্যশীলতাও ছিল। মুওয়াবিয়াহ ব্যাপারটাকে এভাবে উল্লেখ করেছেন। মহিলারা সম্ভান্ত ব্যক্তিদেরকে চরিত্রের দিক থেকে পরাজিত করে তবে দুষ্ট লোকেরা তাদেরকে পরাজিত করে। এটা প্রমাণ করে যে, স্বামীর মহানুভতা সুন্দর গুণাবলির কারণেই স্ত্রী তাকে পরাভূত করতে সক্ষম হয়েছে। স্বামীর দুর্বলতার কারণে স্ত্রী তাকে পরাভূত করেছেন এ কথাটা ঠিক নয়।
নবম মহিলা বললেন, আমার স্বামী হলেন একটি লম্বা খাম্বা (Pillar) একটি ইমারত এবং এটা শক্তিশালী করার জন্য পিলারের প্রয়োজন হয়। সুতরাং সে তার গোত্রের জন্য একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।
দৈহিক উচ্চতা: তার লম্বা গঠনের কারণে একটি লম্বা তরবারীর বেল্ট বহন করতেন।
প্রচুর ছাই: তার দয়াশীলতা এবং অতিথি পরায়ণতার কারণে তার ঘরে প্রচুর রান্না-বান্না হতো। এ কারণে প্রচুর পরিমাণে ছাই জমা হতো।
তার বাসা ছিল গোত্রের লোকের কাছে: তার বাসা গোত্রের লোকের বাসার কাছে হওয়াতে তার সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছিল। একজন ব্যক্তি দয়ালু না হলে তার কাছাকাছি কেউ থাকে না।
দশম জন বললেন, আমার স্বামী মালিক এবং তিনি কি ধরনের লোক? আমি তার সম্পর্কে যাই বলি বা করি না কেন মালিক হলো তার চেয়ে মহান। এর অর্থ হলো তার এমন কিছু গুণাবলি আছে যেগুলো উল্লেখকৃত গুণাবলির চেয়েও শ্রেয়।
তার বেশির ভাগ উটগুলোই বাড়িতে রাখা থাকে দুধ দোয়ানোর এবং পানীয় তৈরির জন্য। গুটিকয়েক উটকে চারণভূমিতে নেয়া হয়। যদি কোনো অতিথির আগমন হয় সে কারণে অতিথি আপ্যায়নের জন্য উটগুলোকে বাসায় রাখা হয়। যখন উটগুলো বাশি অথবা ঢাকের শব্দ শুনে তখন তারা বুঝতে পারে যে, অতিথিদের জন্য তাদেরকে জবেহ করা হবে। যখন মাদা উটগুলি ঢাকের শব্দ শুনে অতিথি আগমনে বাঁচানো হয় তারা নিশ্চিত হয় যে, তাদেরকে জবাই করা হবে।
একাদশ মহিলা হলেন, উম্মে যার বিনতে উকামিল ইবনে সাইদাহ তার স্বামী হলেন আবু যার। তিনি আমাকে প্রচুর অলঙ্কার দিয়েছেন অলঙ্কারের কারণে আমার কান পরিপূর্ণ। স্বর্ণ এবং মুক্তা দ্বারা সে আমার কান দুটো পূর্ণ করেছে।
এবং তিনি আমাকে সন্তুষ্ট করেছেন এবং আমি এত সুখী হয়েছি যে, আমি গর্ব অনুভব করি। এ কথাটার অর্থ হলো তিনি আমাকে মহান করেছেন এবং আমি নিজেকে মহান ব্যক্তি হিসাবেই দেখি।
আমার যে পরিবারে জন্ম হয়েছিল সেটা শুধুমাত্র ভেড়ার মালিক ছিল এবং দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন যাপন করছিল। যার অর্থ হলো তারা কিছুটা কষ্টে জীবন যাপন করছিল।
বিবাহ সূত্রে তিনি আমাকে একটি সম্মানিত পরিবারে নিয়ে আসলেন যাদের ঘোড়া এবং উট ছিল। ঘোড়া এবং উটের উপস্থিতি প্রাচুর্য এবং সম্মানের প্রতীক।
শষ্য মাড়ানো এবং পরিষ্কার করা: এই পরিবারটি শস্য মাড়াত এবং পরিষ্কার করত। তিনি বোঝাতে চান যে, এ পরিবারটি চারা রোপন করত। শস্য পরিষ্কার করা: অর্থ হলো খড় থেকে শস্যকে আলাদা করা।
আমি যাই বলিনা কেন সে আমাকে গালমন্দ অথবা অপমান করতো না। সে আমার মতামতকে প্রত্যাখ্যান অথবা এর খুঁত খুঁজতো না। বরং সে এটা গ্রহণ করত এবং এটাকে ভাল বলেই বিবেচনা করত।
আমি যখন ঘুমাই তখন সকালের অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাই: আমি দিনের আগমন পর্যন্ত ঘুমাই। সে বোঝাতে চায় যে, তার দাস-দাসী আছে যারা অসুবিধা এবং কর্তব্যের প্রতি নজর রাখে এবং যখন আমি পানি অথবা দুধ পান করি তখন পরিপূর্ণভাবেই পান করি। সে যে পর্যন্ত আরও পান করতে পছন্দ করবে না সে পর্যন্ত পান করে যায়।
আবু যারের মা এবং আবু যারের মায়ের প্রশংসার একজন কি বলতে পারে? তার নিজের ব্যাগ গুলি সব সময়ই খাদ্য সামগ্রী দ্বারা পরিপূর্ণ থাকত। উকুম অর্থ হলো বাসা-বাড়ির মালামাল বহনের জন্য যে পাত্র ব্যবহার করা হয়। রাদাহ অর্থ হলো : বড় এবং মহান। আর তারা ছিল সুবৃহৎ। এটা খুবই প্রশস্ত যেটার অর্থ হলো সম্পদ এবং বিলাস।
আবু যারের পুত্র: আবু যারের পুত্র সম্পর্কে একজন কি বলতে পারে। তার বিছানা ছিল নাংগা তরবারির মতো সঙ্কীর্ণ। তার ঘুমানের বিছানা ছিল ছোট। ধারালো তরবারির মতোই এটা হাল্কা।
আবু যারের কন্যা সন্তান সম্পর্কে বলতে হয়: তিনি তার মা-বাবা উভয়ের প্রতিই অনুগত ছিলেন এবং যেটা তার প্রতিবেশীদের ঈর্ষার উদ্রেক করে।
তার সৌন্দর্য। সুন্দর চাহনী, স্বভাব এসবের জন্য তার প্রতিবেশীরা ঈর্ষান্বিত।
আবু যারের ক্রীতদাসিনী সম্পর্কে কি বলা যায়? সে আমাদের গোপন কথা কারো কাছে ব্যক্ত না করে নিজের মধ্যে ধারণ করে। সে বাসার খবর বাইরে ছড়ায় না এবং বাসার কোনো গোপনীয়তা নষ্ট করে না এবং সে আমাদের খাদ্য সামগ্রী নষ্ট করে না এবং খাদ্য হিসাবে যেগুলো আছে সে সেগুলো নষ্ট করে না এবং উচ্ছিষ্ট জিনিস ঘরের সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে না। সে বাসাটার যত্ন নেয়। পরিষ্কার করে ময়লা-আবর্জনা ঝাড়ু দেয়। এবং অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। সে পাখীর বাসার আকারের মতো ময়লা-আবর্জনা আমাদের বাসায় জমা হতে দেয় না।
যে পাত্রতে মাখন তৈরি করা হয় সেটা আবু যার বাইরে যাওয়ার সময় নড়ছিল। মাখন তোলার জন্য যে দুধের পাত্র সেটা নড়ছিল এবং তার একজন মহিলার সাথে দেখা হলো, যার চিতা বাঘের মতো দুটি ছেলে ছিল, যারা তার স্তন নিয়ে খেলা করছিল। দুটো হাতল দিয়ে খেলে সে এটাই বোঝাতে চেয়েছিল যে সে বয়সে অতি কম।
তিনি আমাকে তালাক দিলেন এবং তাকে বিয়ে করলেন। এরপর আমি একজন সম্ভ্রান্ত প্রসিদ্ধ লোককে পুনর্বার বিয়ে করি। সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ লোককে সে পুনর্বার বিয়ে করে।
যিনি দ্রুতগামী অক্লান্ত ঘোড়ায় চড়তেন। তিনি ছিলেন অশ্বারোহণে চালিয়ে পরিশ্রান্ত হওয়া ছাড়া তিনি অশ্বারোহন চালিয়ে যেতে পারতেন এবং তিনি তার হাতে একটি বর্শা বহন করতেন। বাহরাইনে খাতেয়নামে একটি জায়গা আছে যেখানে বর্শা তৈরি হয়।
সে প্রচুর উপহার সামগ্রী নিয়ে ফেরত আসলো: তারপর সূর্যাস্তের পর আমার জন্য প্রচুর সুন্দর উপহার সামগ্রী নিয়ে ঘরে ফিরলো।
সবরকমের গবাদি পশুর একটি জোড়া: স্বামীরা স্ত্রীকে যেসব দিয়ে থাকেন সেরকমই তিনি আমাকে অনেক কিছু দিলেন এবং তিনি বললেন, হে উম্মে যার এটা খাও এবং তোমার আত্মীয়দের খাদ্য সামগ্রী দাও। তিনি বললেন সে আমাকে যা যা দিয়েছে সেগুলো যদি আমি সংগ্রহ করি তাহলে দেখা যাবে যে আবু যার আমাকে যা দিত সেগুলো তার সমান হবে না।
সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়, এ মহিলা তার স্বামীকে শক্তিশালী, সাহসী এবং দয়ালু বলে বর্ণনা করছেন। কারণ তিনি তার স্ত্রীকে সে যা খেতে চাইত সেটা দিত। এটা সত্ত্বেও, আবু যারের সাথে তুলনায় তার স্বামীকে খাটো করে দেখত। কারণটা হলো আবু যার ছিল তার প্রথম স্বামী এবং এ মহিলার হৃদয়ে তার প্রতি ভালবাসা একেবারে শিকড় গেড়ে ছিল। কথায় আছে প্রথম প্রেমিকের জন্যই প্রকৃত ভালবাসা থাকে।
আয়েশা বলেন, নবী করীম বলেন, আবু যার যেমন উম্মে যারের কাছে ছিলেন, আমিও তোমার কাছে সে রকম ভালবাসা এবং আনুগত্য নিয়ে থাকব।
শেষের দিকে আবু যুবায়ের যোগ করলেন, সে তোমাকে তালাক দিয়েছে তবে আমি তোমাকে তালাক দিচ্ছি না।
আরেকটি বর্ণনায় আল-নাসাই, তিনি আল-তাবরানী এ বলে যোগ করলেন, আয়েশা বললেন হে আল্লাহর রসূল, আপনি বরং আবু যারের চাইতে শ্রেয়।
টিকাঃ
৭. আল-মুজাদালাহ (৫৮: ১)
৮. সুনাল আল কুবরা লিল বায়হাকী হাদীস নং ১৪২৭১
৯. আল-বুখারী তার সাহীহতে (Sahih)-এর উল্লেখ করেছেন: হাদীস নং ৪৯০৭