📄 আমার সাহাবী কি ক্ষমার যোগ্য নয়?
আসহ আবু দারদা এর বর্ণনানুযায়ী, "আমি যখন নবী করীম-এর সাথে বসেছিলাম তখন আবু বকর হাঁটুর ওপর তার পোশাক তুলে আমাদের কাছে আসলেন। নবী করীম বললেন, তোমার সাহাবীদের মধ্যে একটা ঝগড়া হয়েছে। আবু বকর নবীজীকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রসূল! আল খাত্তাবের পুত্র এবং আমার মধ্যে কিছু একটা (অর্থাৎ ঝগড়া) হয়েছে। আমি তার সাথে কর্কশভাবে কথা বলেছিলাম এবং তারপর এ ব্যাপারে অনুশোচনা করেছিলাম। আমাকে মাফ করে দেয়ার জন্য আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম, তবে সে অস্বীকার করেছে। এ কারণে আমি আপনার কাছে এসেছি।' নবী করীম তিনবার বললেন, হে আবু বকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।'
এর মধ্যে উমর এ ব্যাপারে তাঁর দুঃখ প্রকাশ করে আবু বকর -এর বাড়িতে গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন তিনি আছেন কিনা। উত্তর পাওয়া গেল না সূচক। সেজন্য তিনি নবীর কাছে এসে তাকে অভিনন্দন জানালেন। তবে নবী -এর চেহারায় অসন্তুষ্টির লক্ষণ ফুটে উঠল। সে জন্য তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং দুবার বললেন, হে আল্লাহ নবী!, আমি আল্লাহর নামে বলছি, আমি তার প্রতি অধিক অবিবেচক ছিলাম। নবী করীম বললেন, "আল্লাহ তোমাদের জন্য আমাকে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তবে তোমরা আমাকে বলছ, "তুমি মিথ্যাচার করছ। "কিন্তু আবু বকর বললেন, "সে সত্যি কথাটাই বলেছে। তিনি আমাকে তার লোকবল এবং সম্পদ দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর তিনি দু'বার বললেন, 'তাহলে কি তুমি আমার সাহাবীদের ক্ষতি করা ছাড়বে না? এরপর থেকে আর কেউ আবু বকরের ক্ষতি করেনি।"
মন্তব্য
ওপরে উল্লিখিত ঘটনায় বলা হয়েছে যে, নবী করীম তাঁর প্রচণ্ড রাগের কারণে ভ্রূকুটি করেছিলেন। রাগ প্রশমনের পর তিনি বলেছিলেন, “তোমরা কি আমার কথা বিবেচনায় রেখে আমার সাহাবীকে ক্ষমা করে দেবে?" মুহাম্মাদ -এর এ ধরনের কথা থেকে কি কোনো ধরনের দোষারোপ বা সমালোচনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়? এটা বরং এমন ধরনের কথা যেটা আমাদেরকে আবু বকর -এর মহত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। আল্লাহই সবচাইতে ভাল জানেন।
টিকাঃ
৩২. সহীহ আল বুখারী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস নং ৩৪৮৯
📄 তাদের দিকে বালু নিক্ষেপ করা
আমর বিন শুয়ায়েব তাঁর বাবা এবং দাদা থেকে জেনে বলেছেন, "আমি আমার ভাইসহ এমন এক চেয়েও জায়গায় বসেছিলাম সেটা আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসের চেয়েও প্রিয়। আমি আমার ভাইয়ের সাথে এসে দেখলাম কয়েকজন সাহাবী নবী করীম -এর দরজার গোড়ায় বসে আছেন। আমরা তাদেরকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছিলাম না, সেজন্য আমরা আরোও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম।
হঠাৎ তারা কুরআন মাজিদের একটি আয়াত উল্লেখ করে সেটা নিয়ে বিতর্ক জুড়ে দিল এবং এ ব্যাপারে শোরগোল শুরু করে দিল। এ অবস্থায় রসূল রাগের কারণে লাল-মুখমণ্ডল নিয়ে বের হয়ে আসলেন। তিনি তাদের ওপর বালু নিক্ষেপ করে বললেন, হে মানুষ! ব্যাপারটাকে সহজভাবে নাও। তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর শাস্তি পাওয়ার কারণ ছিল, তারা তাদের নবীদের সাথে দ্বিমত পোষণ করত এবং কিতাবের একটি দিকের সাথে অন্য দিকের বিরোধ খুঁজে বের করত। একটি দিক দিয়ে অন্যদিকের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কুরআন নাযিল হয়নি। কুরআন থেকে তুমি জেনে সেটা অনুসরণ কর, কিন্তু তুমি যেটা জাননা সেটা এমন কারো কাছে নিয়ে যাও যে ব্যক্তির কুরআন সম্পর্কে জ্ঞান আছে।
মন্তব্য
তৎকালীন সময়ের মানুষের অভ্যাস এবং সমাজের রীতি-নীতির নিরীখে বিভিন্ন ব্যাপারকে বুঝতে হবে। ধুলা ছোড়ার ব্যাপারটাকে কি দোষ বলে গণ্য করা যাবে যখন মানুষ মৃত্যুর সন্নিকটে এবং এ প্রজন্মের পর যাদের আগমন হবে তাদেরও মৃত্যু হবে? তারা কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে তর্কে লিপ্ত হয়েছিল যেখানে নবী করীম নিজে উপস্থিত ছিলেন।
টিকাঃ
৩৩. আহমদ কর্তৃক তার মুসনাদ বাণী হাশীম, মুসনাদ আব্দুল্লাহ বিন আমার বিন আল আসে বর্ণিত হাদীস নং ৬৫১৯। আহমদ শফীরের মতে বর্ণনাকারীর সনদ সহীহ।
📄 তুমি কি তার হৃদয় চিরে দেখেছিলে?
উসামা বিন যায়েদ -এর বরাতে বর্ণিত হয়েছে, "আল্লাহর রসূল (সা) আমাদেরকে একটি যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা সকালে আল-হুরকাত আক্রমণ করলাম। তাদের মধ্য থেকে আমি একজনকে পাকড়াও করলাম এবং সে বলল: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, তবে আমি তাকে ছুরিকাঘাত করেছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে এ ব্যাপারটা আমার চিন্তার উদ্রেক করল এবং আমি ব্যাপারটা রসূলের কাছে বললাম। আল্লাহর রসূল জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি কলেমা পড়ার পরে তাকে হত্যা করেছ? আমি বললাম, হে রসূল সে অস্ত্রের ভয়ে কলেমা পড়েছিল। রসূল বললেন তুমি তার হৃদয় চিরে কেন দেখলে না সে ব্যক্তিটি কি আসলেই ইসলামে বিশ্বাস স্থাপন করে কলেমা পড়ছে নাকি বিশ্বাস স্থাপন না করেই কলেমা পড়ছে।
মন্তব্য
যেহেতু অবিশ্বাসীদের হত্যাকারী উসামা যে ব্যাপারে নির্ভুল কোনো প্রমাণ ছিল না। সে জন্যই রসূল বলেছিলেন, তোমরা তার হৃদয় চিরে দেখলে না কেন? সে কি বাস্তবিক পক্ষেই ইসলামে বিশ্বাস এনেছে কিনা? তার অর্থ হলো ঐ ব্যক্তিটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তোমরা অজ্ঞাত ছিলে। সে ক্ষেত্রে তুমি অবিশ্বাসীকে হত্যা করলে কেন? সে জন্যই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা মানানসই। এরকম অবস্থায় সেটা আশা করা হয়েছিল তার চাইতে এটা সহিষ্ণু ছিল। অভিব্যক্তিটা তার লক্ষ্য অর্জন করেছিল।
টিকাঃ
৩৪. মুসলিম কর্তৃক তাঁর সহীহ হাদীসে বর্ণিত: ঈমান সম্পর্কিত গ্রন্থ। অবিশ্বাসী কলেমা পড়ার পরও তাকে হত্যার অভিযোগ্য সম্পর্কিত অধ্যায়।
📄 মসজিদের সামনে শ্রেুমা
আবু সায়িদ আল-খুদরী-এর বরাতে বলা হয়েছে। আল্লাহর রসূল খেজুর গাছের ছোট ডাল পছন্দ করতেন এবং কিছু ডাল তাঁর হাতে সবসময়ই থাকত। রসূল মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন যে, দেওয়ালে শ্লেষ্মা লাগানো। সেজন্য তিনি এটা উঠিয়ে ফেললেন। তারপর তিনি রাগান্বিত অবস্থায় মুসুল্লীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ কি খুশী হতো যদি তোমাদের মুখের ওপর কেউ থুথু ফেলত। কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর অর্থ হলো, যে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যিনি হলেন মহাপরাক্রমশালী এবং মহিমান্বিত। যাঁর ডানে এবং বায়ে উপস্থিত থাকে ফেরেশতারা। সুতরাং কারোই উচিত হবে না তার ডান দিকে অথবা কিবলার দিকে থুথু ফেলা। যদি কারোর তাড়া থাকে তাহলে তাকে থুথু ফেলার কাজটা এভাবে করতে হবে—ইবনে আযলান দেখিয়েছে কিভাবে তাড়ার সময় থুথু ফেলতে হবে, পরনের কাপড় মুখের ওপর নিতে হবে এবং থুথুটাকে মুছে ফেলতে হবে।
মন্তব্য
রসূলের জিজ্ঞাসা, "তোমাদের মধ্যে কেউ কি খুশী হতে পারতে যদি তোমাদের মুখের ওপর কেউ থুথু ফেলতো? -এটা হলো সর্বোচ্চ আল্লাহর অবমাননার একটি উদাহরণ। এ ধরনের অবমাননাকে অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে।
টিকাঃ
৩৫. সুনান আবু দাউদ হাদীস নং ৪২০ আল বুখারী কর্তৃক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হাদীস নং ৫৭৭।