📄 সফল নেতার দ্বিতীয় গোপন তত্ত্ব অভিযোগ হতে বিরত থাকা ও সমালোচনা থেকে দূরে থাকা
নেতৃত্ব করার গোপন রহস্য হলো নিন্দা থেকে বিরত থাকা এবং ধ্বংসাত্মক সমালোচনা থেকে দূরে থাকা। প্রথম দিকের মুসলমানদের জীবনী পড়লে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, সুন্দর অভিব্যক্তি এবং অনুপ্রেরণার সাক্ষাত মিলে। দু'জনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির ইস্যুতে এক ব্যক্তি তার বন্ধুকে বলেছিলেন যে, সে এ ব্যাপারে বন্ধুর প্রতি সুবিচার করেছে “আগামীকাল আমরা আমাদের নিন্দা করব। উত্তরে বন্ধুটি বললেন, “আগামীকাল আমরা আমাদেরকে ক্ষমা করে দেব।
প্রিয় ভাইয়েরা! আমাকে বলুন আপনারা কি এই অভিব্যক্তির সৌন্দর্য অনুধাবন করেছেন এবং এই স্তরের মিষ্টতা পরীক্ষা করে দেখেছেন: “আগামীকাল আমরা আমাদেরকে ক্ষমা করে দেব। "এ ধরনের উচ্চাঙ্গের নেতৃত্বের ভিত্তি হলো সঠিক প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন। এ ধরনের নেতৃত্ব ভালটাকে গ্রহণ করে এবং প্রশংসা করে আর যা খারাপ সেটাকে ক্ষমা করে।
মানুষের প্রত্যেক আলাপচারিতার সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা হলো ভুল এবং অন্যায় কাজে নিজেকে ব্যস্ত না করে আত্মমর্যাদাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করা। ভাইয়েরা, নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, এ ধরনের আত্মমর্যাদা অর্জন করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হলো, সে ব্যক্তি ভুল করেছে তাকে দোষারোপ না করা এবং তার সমালোচনা না করা।
📄 দ্বিতীয় রহস্য
আত্মা দেহের কাছে মূল্যবান এবং মানুষের অহংকারবোধ হলো মূল্যবান জহরত। প্রত্যেক জীবিত মানুষের জন্য এটা দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন তার জহরতে আঁচড় লাগে এবং নিন্দার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যখন প্রশিক্ষক, প্রচারক অথবা নেতা অন্যান্যদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য নিন্দাকে বেছে নেন, তখন তার এটা মোটেই আশা করা উচিত হবে না যে, নিন্দিত ব্যক্তি তার নিন্দাকে গ্রহণ করবে অথবা তার সমালোচনা ঐ ব্যক্তিকে প্রভাবিত করবে। নিন্দা এবং ঘৃণার সাধারণ পরিণতি হলো- শত্রুতা, অসন্তুষ্টি এবং আত্মপ্রত্যাহার।
একজন সমালোচক তাকে কখনও অবহেলা এবং ভুলের পাল্টা দোষারোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। এ ধরনের বেদনাদায়ক সমালোচনা মাঝে-মধ্যে সন্তানের চাকুরিজীবী বা অন্য যে কাজের ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে একজন দুঃস্থ মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি, অব্যাহত উপকার অথবা দুর্বলতার কারণে এ পরিবর্তনটা অস্থায়ী হতে পারে। যখন অবস্থার পরিবর্তন হবে অথবা দুঃস্থ ব্যক্তিকে সাবধান করার জন্য কেউ থাকবে না তখন ঐ ব্যক্তি তার প্রাথমিক অবস্থাতে ফেরত যাবে।
📄 তথ্যসারও বন্ধু
আনহু আবু মূসা আল আশারী বর্ণনা করেছেন। "নবী করীম ﷺ-এর পত্নীদের ওপর উসমান ইবনে মায়ুনের পত্নী অধিকার অর্জন করেছিলেন। নবী করীম এর পত্নীরা অনুধাবন করলেন যে, মাযুন-পত্নী ভাল নেই। সেজন্য তারা জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সমস্যাটা কি? কুরাইশ গোত্রে তোমার স্বামীর চাইতে সম্পদশালী আর কেউ কি আছে?
উত্তরে মায়ুন-পত্নী বললেন, আমি এ বিবাহবন্ধন থেকে কিছুই পাই না। আমার স্বামী উসমান সাওম পালনের মধ্য দিয়ে দিনের বেলা কাটান এবং রাত কাটান নামাজ-কালামের মাধ্যমে। সে মুহূর্তে নবী করীম (সা) আলোচনা স্থলে প্রবেশ করলেন এবং নবী পত্নীরা তাঁকে ঘটনা অবহিত করেন।
রসূল করীম উসমান-এর সাথে দেখা করে বললেন। হে উসমান, আমি কি তোমাদের জন্য অনুকরণযোগ্য একটি দৃষ্টান্ত নই? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য জীবন উৎসর্গ করুক, তবে ব্যাপারটা কি? রসূল করীম বললেন, 'তুমি রাতে আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাক এবং দিনের বেলায় সাওম পালন কর। অবশ্যই পরিবারের সদস্যদের তোমার ওপর একটা অধিকার আছে এবং তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার আছে। সুতরাং আল্লাহর বন্দেগী কর এবং ঘুমাও, সাওম পালন কর এবং সাওম ভঙ্গ কর।"'
আবু মুসা বলেছিলেন যে, পরবর্তীতে উসমান পত্মী রসূল-এর পত্নীদের সামনে সুগন্ধি ব্যবহার করে উপস্থিত হন এবং তাকে বধূর মতো লাগছিল। এটাতে তাঁরা (রসূল পত্নী) আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং উসমান পত্মী বললেন, যে দয়াটা মানুষের ওপর ভর করে সেটা আমাদেরকেও আচ্ছন্ন করেছে। যার অর্থ হলো তার স্বামীর ওপরে রসূল ﷺ-এর উপদেশ বিরাট প্রভাব ফেলেছে。
টিকাঃ
৬. ইবনে হিব্বান কর্তৃক প্রণীত সাহীতে বর্ণিত। হাদীস নং ৩১৭
📄 আমরা এ বিষয়টার ওপর চিন্তা করি
উসমান ইবনে মায়ুন সত্যিকার অর্থে একজন বিশ্বাসী এবং আল্লাহর অকৃত্রিম অনুরাগী। তিনি তাঁর সালাতের স্থানে রাতভর সালাত আদায় করেন এবং দিনের সময়টা অতিবাহিত করেন সাওম পালন করে। তাঁর একজন সুন্দরী যুবতী পত্নী আছেন যিনি এ ধরনের খাপছাড়া দাম্পত্য জীবনে অসুখী। তিনি কোনো অভিযোগ ছাড়াই রসূল ﷺ-এর পত্নীদের শরণাপন্ন হলেন। রসূল পত্নীরা তার এ অবস্থা আঁচ করে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন এবং তিনি তার অবস্থাটা ব্যাখ্যা করলেন। এ খবরটা রসূল ﷺ-এর কানে গেল এবং তিনি এটা শুনে বিরক্ত হলেন। উসমান বিন মায়ুনের পক্ষে এটা কিভাবে সম্ভব।
শেষ বার্তাটা ছিল সুখের দিকের একটি নির্দেশনা, যেটা মানুষ অনুসরণ করবে এবং যে বার্তার মধ্যে হৃদয়ের জন্য আনন্দ এবং আত্মার জন্য আরাম খুঁজে পাবে, যার মাধ্যমে তারা সঙ্গতভাবে আবেগের প্রয়োজনীয়তাকে পরিপূর্ণ করতে পারবে।
সে ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইনে কোনো অস্পষ্টতা নেই এবং ধর্মের বৈশিষ্ট্যগুলো পরিষ্কার। সে ক্ষেত্রে উসমানের হৃদয়ে কিভাবে এ অন্যের মনোভাব স্থান পেল? এ ঘটনাটা পরবর্তী সময়ে ঘটেছিল অর্থাৎ রসূল করীম ﷺ যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, সেখানে বসতি স্থাপন এবং সেখানে তাঁর মসজিদ এবং ঘর তৈরি করেন।
এ নেতা এবং প্রশিক্ষক উসমানের সাথে কি করলেন? নবী করীম ﷺ উসমানকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে গালমন্দ করলেন না। এমনকি তার কাজের কোনো খুঁতও ধরলেন না অর্থাৎ তার ইবাদত-বন্দেগী, সালাত এবং সাওমের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করলেন না।
এবং রসূল করীম উসমানের সালাত ও সাওম আদায় করার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেননি।
অন্যপক্ষে রসূল এমন একটি পরিপূর্ণ চিত্র তাঁর সামনে হাজির করলেন যার মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাসীরা এ জীবনের প্রয়োজন এবং পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির মধ্যে একটি অনুকূল ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
রসূল তাকে সবচাইতে ন্যায়পরায়ণ পথের সন্ধান দিলেন এবং একট পরিপূর্ণ পন্থা বাতলে দিলেন। 'তুমি কি আমার মধ্যে অনুসরণযোগ্য একটি পরিপূর্ণ আদর্শের সন্ধান পাও না? অর্থাৎ তোমার এটা জানা আছে যে, আমি হলাম আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে একেবারে নিখাদ। যিনি হলেন আল্লাহ সম্পর্কে সবচাইতে বেশি সচেতন এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত। তবুও আমি সালাত আদায় করি এবং ঘুমাই, আমি সাওম পালন করি এবং সাওম ভঙ্গ করি।'
এভাবেই আমার পত্নীকে আদর সোহাগ করার জন্য, শিশুদের সাথে খেলার জন্য আবেগ পরিপূর্ণ করার জন্য এবং বসতবাড়ির প্রতিটি অংশে শান্তি ছড়িয়ে দিতে আমি কিছু সময় ব্যয় করি। ঘরের বাসিন্দারা যেভাবে আনন্দ পায় এবং সঠিক মনযোগের জন্য তাদের তৃষ্ণা নিবারণ হয় সেটার ব্যবস্থা করি। এগুলোর মাধ্যমে জীবনের সমস্যা এবং জীবন ধারণের কষ্টের মূলোৎপাটন করা সম্ভব।
এ সুন্দর শব্দগুলো ইবনে মায়ুনের হৃদয় জয় করে এবং তার মনকে বশীভূত করে...........
ইবনে মায়ুন রাতে কেন অতিরিক্ত সালাত আদায় করেন এবং দিনের বেলায় কেন সাওম পালন করেন? তার এ অতিরিক্ত সালাত আদায় এবং সাওম পালনের উদ্দেশ্য হলো বেহেশতে একটি উচু আসন লাভ করা এবং একমাত্র শেষ নবীই বেহেশতের সবচাইতে উঁচু আসনে উপবিষ্ট হবেন।
বেহেশতের সবচাইতে উচ্চাসনে যিনি স্থান পাবেন (অর্থাৎ নবী) তিনি রাতে ঘুমাবেন এবং ইবাদত-বন্দেগী করবেন, দিনের বেলায় সাওম পালন এবং ভঙ্গ করবেন। তিনি হলেন শরীয়তের প্রবর্তক এবং আল্লাহর বাণীর জিম্মাদার।
আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের জন্য রসূল ﷺ যে পথ অবলম্বন করেছিলেন তার চেয়ে ভাল পথ আর কি হতে পারে? অথবা তিনি যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন তার চেয়ে ভাল পদ্ধতি আর কি হতে পারে? রসূল ﷺ যে পথে নির্দেশ দিয়েছেন তার চেয়ে খাঁটি পথ আর কি হতে পারে?
উসমান ইবনে মায়ুন স্বগোক্তি উক্তি করেছেন: এ পথটা যদি সঠিক হয়। তাহলে আমি অবশ্যই এটা অনুসরণ করব, কারণ নবীর ﷺ প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করেই ইহজগত এবং পরজগতে দয়া অর্জন করা সম্ভব।