📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 ছোট বালক একজন ভাগ্যবান সেবক

📄 ছোট বালক একজন ভাগ্যবান সেবক


আনাস ইবনে মালিক নবী করীম ﷺ-এর একজন যোগ্য সাহাবী ছিলেন। মদিনা মুনাওরায় হিযরত করা পর্যন্ত তিনি নবীর সাথে ছিলেন। আনাস বদর যুদ্ধ এবং একাধিক যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বাইয়াতে রেদওয়ান (গাছের তলায়) অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আনাস কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, "আপনি কি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন? তিনি প্রশ্নকারিকে বলেছিলেন, "তোমার মা তোমাকে ভুলে থাকতে পারেন। আমি কিভাবে বদর যুদ্ধে থেকে নিজেকে বিরত রাখি?" প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আযযাহাবীর মতে, "যারা যুদ্ধাভিযানের প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন তারা বদরের যুদ্ধ অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে আনাসকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। কারণ আনাস এর বয়স তখন কম ছিল এবং তিনি বাস্তবিক পক্ষে যুদ্ধ করেননি। আনাস যোদ্ধাদের মালপত্র নিয়ে তাদের পিছনে ছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এ কারণেই আনাস (রা) সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী কথা শোনা যায়।
আনাসের ভাষ্য হলো, "আমি দশ বছর নবী করীম ﷺ-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। এ সময়ের মধ্যে তিনি কখনও আমাকে অপমান করেননি, আঘাত করেননি এমনকি আমার দিকে কখনও ভ্রূকুটি করেননি। তাঁর দেয়া আদেশ পালন না করার জন্য কখনও আমাকে দোষারোপ করেননি। এমনকি ঘরের কেউ যদি আমাকে দোষারূপ করতেন, তাহলে তিনি বলতেন, 'তাকে তার মতোই থাকতে দাও। কারণ যেটা পূর্ব নির্ধারিত সেটা ঘটবেই।
আরেকটি বর্ণনায় আছে, "তিনি কখনও উহ্ (রাগ প্রকাশের একটি অভিব্যক্তি) প্রকাশ করেন নি এবং আমি যা করতাম সেটার কারণ তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন না অথবা যে কাজটা আমি অসম্পূর্ণ রাখতাম সে ব্যাপারে নবী করীম কোনো কৈফিয়ত চাইতেন না।

উল্লিখিত সূত্রের পাঠ
একটি নাবালক শিশু যার বয়স ছিল মাত্র আট থেকে দশ, সে এমন এক মহামানব সেবাদানে নিযুক্ত ছিলেন, যিনি ছিলেন তাঁর সময়ের তার পরবর্তী সময়ের এমনকি তাঁর পূর্বের সময়েরও সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সন্তান।
উল্লেখযোগ্য যে, এ বালকটি দিবারাত্রি নবী ﷺ-কে সাহচার্য দিতেন সফরের অথবা ঘরে, শান্তি অথবা যুদ্ধের সময় এবং কোনোটিই নবীকে এ বালকের সাহচার্য থেকে বঞ্চিত করতে পারেনি। এ ধরনের সম্পর্ককে ঘিরে আমরা কি ধরনের চিত্র কল্পনা করতে পারি?
তাদের উভয়ের মধ্যে বয়স এবং অবস্থার ভিন্নতা থাকা স্বত্ত্বেও এ বালকের কাধে কি বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল সেটা কি চিন্তা করা যায়? আনাস -এর বয়সের অন্য কেউ যদি এ দায়িত্বটা পালন করত তাহলে কি পরিমাণ ভুল-ভ্রান্তি সে করত সেটা কি ভেবে দেখার বিষয় না?
ভেবে দেখুন, এ শিশুটিকে সে দায়িত্বগুলো অর্পন করা হয়েছিল যেগুলোর ব্যাপারে যদি সে অবহেলা করত তাহলে কতই খেসারত, নেতার [(নবী (সা)] সময়ের অপচয় এবং মুসলিম স্বার্থের কি পরিমাণ ক্ষতি হতো?
কোনো গালমন্দ ছাড়াই এ বালক তার কষ্ট সহিষ্ণুতার গুণে নবী করীমের সাথে দশ বছর কাটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। "একবারের জন্য হলেও তিনি আমাকে কখনও অপমান করেননি।
হে মাতা-পিতা এবং নেতরা! এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এ বালকের অনুভূতি কখনও আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি- এমনকি কুচকানো ভ্রূ অথবা ভ্রূকুটি করা মুখমণ্ডল দ্বারাও আনাস কখনও আক্রান্ত হয়নি; তিনি আমাকে কখনও গালমন্দ করেননি এমনকি এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে নবী করীম এ বালকের প্রতি কখনও ভ্রূ কুচকানো অথবা ভ্রূকুটি করেননি। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি আমাকে নিন্দনীয় কিছুই বলেননি যে কাজগুলো আমি দেরি করে করতাম সেগুলো করার জন্য তিনি আমাকে কখনও আদেশ করেননি এবং যে ব্যাপারে গালাগাল আমার প্রাপ্য ছিল সেগুলোর ব্যাপারেও আমাকে গালাগাল করতেন না।
সেগুলোর ব্যাপারেও মুহাম্মাদ-এর ওপর আপনার দয়া এবং শান্তি বর্ষণ করুন যার ডাকের মাধ্যমে আপনি বিশ্বাসীদেরকে আশির্বাদপুষ্ট করেছেন এবং যার বাণীর মাধ্যমে বিশ্বাসীদেরকে অন্যান্যদের ওপরে প্রাধান্য দিয়েছেন। "অভিযোগ হতে বিরত থাকা ও সমালোচনা থেকে দূরে থাকা," ভবিষ্যতদ্রষ্টা কৃতকার্য নেতা হওয়ার জন্য এ মহান গুণ হলো অন্যতম গোপন তত্ত্ব।

টিকাঃ
১. সীয়ারুল আলম আন নুবালা (২/৩৯৭) লিজ জাহাবী)
২. আল হাকীম কর্তৃক আল মুসতাদরাক গ্রন্থে বর্ণিত। হাদীস- ৬৪৯৯।
৩. আয-যাহারী কর্তৃক প্রণীত সীয়ারুল আলম আন-নুবালা (২/৩৯৭)।
৪. আবু নুয়াঈম কর্তৃক দালাইল আন-নবুয়াহতে বর্ণিত। দ্বাদশ অধ্যায়, হাদীস নং ১২০।
৫. আল তিরমিজীর হাদীস নং ২০০৮।

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 সফল নেতার দ্বিতীয় গোপন তত্ত্ব অভিযোগ হতে বিরত থাকা ও সমালোচনা থেকে দূরে থাকা

📄 সফল নেতার দ্বিতীয় গোপন তত্ত্ব অভিযোগ হতে বিরত থাকা ও সমালোচনা থেকে দূরে থাকা


নেতৃত্ব করার গোপন রহস্য হলো নিন্দা থেকে বিরত থাকা এবং ধ্বংসাত্মক সমালোচনা থেকে দূরে থাকা। প্রথম দিকের মুসলমানদের জীবনী পড়লে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, সুন্দর অভিব্যক্তি এবং অনুপ্রেরণার সাক্ষাত মিলে। দু'জনের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির ইস্যুতে এক ব্যক্তি তার বন্ধুকে বলেছিলেন যে, সে এ ব্যাপারে বন্ধুর প্রতি সুবিচার করেছে “আগামীকাল আমরা আমাদের নিন্দা করব। উত্তরে বন্ধুটি বললেন, “আগামীকাল আমরা আমাদেরকে ক্ষমা করে দেব।
প্রিয় ভাইয়েরা! আমাকে বলুন আপনারা কি এই অভিব্যক্তির সৌন্দর্য অনুধাবন করেছেন এবং এই স্তরের মিষ্টতা পরীক্ষা করে দেখেছেন: “আগামীকাল আমরা আমাদেরকে ক্ষমা করে দেব। "এ ধরনের উচ্চাঙ্গের নেতৃত্বের ভিত্তি হলো সঠিক প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন। এ ধরনের নেতৃত্ব ভালটাকে গ্রহণ করে এবং প্রশংসা করে আর যা খারাপ সেটাকে ক্ষমা করে।
মানুষের প্রত্যেক আলাপচারিতার সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা হলো ভুল এবং অন্যায় কাজে নিজেকে ব্যস্ত না করে আত্মমর্যাদাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করা। ভাইয়েরা, নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, এ ধরনের আত্মমর্যাদা অর্জন করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হলো, সে ব্যক্তি ভুল করেছে তাকে দোষারোপ না করা এবং তার সমালোচনা না করা।

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 দ্বিতীয় রহস্য

📄 দ্বিতীয় রহস্য


আত্মা দেহের কাছে মূল্যবান এবং মানুষের অহংকারবোধ হলো মূল্যবান জহরত। প্রত্যেক জীবিত মানুষের জন্য এটা দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন তার জহরতে আঁচড় লাগে এবং নিন্দার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যখন প্রশিক্ষক, প্রচারক অথবা নেতা অন্যান্যদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য নিন্দাকে বেছে নেন, তখন তার এটা মোটেই আশা করা উচিত হবে না যে, নিন্দিত ব্যক্তি তার নিন্দাকে গ্রহণ করবে অথবা তার সমালোচনা ঐ ব্যক্তিকে প্রভাবিত করবে। নিন্দা এবং ঘৃণার সাধারণ পরিণতি হলো- শত্রুতা, অসন্তুষ্টি এবং আত্মপ্রত্যাহার।
একজন সমালোচক তাকে কখনও অবহেলা এবং ভুলের পাল্টা দোষারোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। এ ধরনের বেদনাদায়ক সমালোচনা মাঝে-মধ্যে সন্তানের চাকুরিজীবী বা অন্য যে কাজের ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে একজন দুঃস্থ মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি, অব্যাহত উপকার অথবা দুর্বলতার কারণে এ পরিবর্তনটা অস্থায়ী হতে পারে। যখন অবস্থার পরিবর্তন হবে অথবা দুঃস্থ ব্যক্তিকে সাবধান করার জন্য কেউ থাকবে না তখন ঐ ব্যক্তি তার প্রাথমিক অবস্থাতে ফেরত যাবে।

📘 রাসূল (সঃ) এর জীবনী হতে নেতৃত্ব প্রদান ও প্রভাবিত করার গুপ্ত রহস্যাবলি > 📄 তথ্যসারও বন্ধু

📄 তথ্যসারও বন্ধু


আনহু আবু মূসা আল আশারী বর্ণনা করেছেন। "নবী করীম ﷺ-এর পত্নীদের ওপর উসমান ইবনে মায়ুনের পত্নী অধিকার অর্জন করেছিলেন। নবী করীম এর পত্নীরা অনুধাবন করলেন যে, মাযুন-পত্নী ভাল নেই। সেজন্য তারা জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সমস্যাটা কি? কুরাইশ গোত্রে তোমার স্বামীর চাইতে সম্পদশালী আর কেউ কি আছে?
উত্তরে মায়ুন-পত্নী বললেন, আমি এ বিবাহবন্ধন থেকে কিছুই পাই না। আমার স্বামী উসমান সাওম পালনের মধ্য দিয়ে দিনের বেলা কাটান এবং রাত কাটান নামাজ-কালামের মাধ্যমে। সে মুহূর্তে নবী করীম (সা) আলোচনা স্থলে প্রবেশ করলেন এবং নবী পত্নীরা তাঁকে ঘটনা অবহিত করেন।
রসূল করীম উসমান-এর সাথে দেখা করে বললেন। হে উসমান, আমি কি তোমাদের জন্য অনুকরণযোগ্য একটি দৃষ্টান্ত নই? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য জীবন উৎসর্গ করুক, তবে ব্যাপারটা কি? রসূল করীম বললেন, 'তুমি রাতে আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাক এবং দিনের বেলায় সাওম পালন কর। অবশ্যই পরিবারের সদস্যদের তোমার ওপর একটা অধিকার আছে এবং তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার আছে। সুতরাং আল্লাহর বন্দেগী কর এবং ঘুমাও, সাওম পালন কর এবং সাওম ভঙ্গ কর।"'
আবু মুসা বলেছিলেন যে, পরবর্তীতে উসমান পত্মী রসূল-এর পত্নীদের সামনে সুগন্ধি ব্যবহার করে উপস্থিত হন এবং তাকে বধূর মতো লাগছিল। এটাতে তাঁরা (রসূল পত্নী) আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং উসমান পত্মী বললেন, যে দয়াটা মানুষের ওপর ভর করে সেটা আমাদেরকেও আচ্ছন্ন করেছে। যার অর্থ হলো তার স্বামীর ওপরে রসূল ﷺ-এর উপদেশ বিরাট প্রভাব ফেলেছে。

টিকাঃ
৬. ইবনে হিব্বান কর্তৃক প্রণীত সাহীতে বর্ণিত। হাদীস নং ৩১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00