📄 অবৈধ সন্তান সম্পর্কে
ইবনু নদরের কিতাবে আছে- ইরাক, হিজায ও মিশরবাসী এ কথার ওপর একমত যে, ব্যভিচারের দ্বারা বংশ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর যে ব্যক্তি তার সন্তান বলে অস্বীকার করবে এবং তার স্ত্রীর ব্যভিচারের ফসল বলে দাবী করবে, সে ঐ সন্তানের ওয়ারিশ হবে না। যদি ব্যভিচারী স্বীকার করে তবে ঐ সন্তান তার বংশোদ্ভূত বলে স্বীকৃতি লাভ করবে। এ মতের প্রবক্তাদের দলিল হচ্ছে নিম্নরূপ- রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর জমানায় এক মহিলা সন্তান প্রসব করার পর, যে সেই মহিলার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিলো সে ঐ সন্তানের দাবী করে। তখন নবী করীম [সা] সিদ্ধান্ত দিলেন- 'তাকে বেত্রাঘাত করা হবে এবং ঐ সন্তান তার নামে পরিচিত হবে।'
উরওয়া ও সুলাইমান ইবনু ইয়াসার থেকে বর্ণিত। উভয়ে বর্ণনা করেছেন- যে ব্যক্তি কোনো সন্তানের মায়ের সাথে যিনা করেছে সেই পিতৃত্বের দাবিদার যদি আর কেউ না হয়, তবে সে সন্তান তার বলে ধরে নেয়া হবে এবং সে ঐ সন্তানের ওয়ারিশ হবে। সুলাইমান এ দলিল পেশ করেন যে, হযরত ওমর [রা] ঐ সমস্ত সভ্রদেরকে তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যারা জাহেলী অবস্থায় তাদের মায়ের সাথে যিনা করেছে বলে দাবী করেছিলো।
📄 খালা ও ফুফুর অংশ
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে হযরত যায়িদ ইবনু আসলাম [রা] থেকে বর্ণিত আছে- এক ব্যক্তি নবী করীম [সা] এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, 'খালা এবং ফুফু সম্পর্কে মিরাসের বিধান কী?' তিনি এ সম্পর্কে ওহীর প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু অবতীর্ণ হলো না। তখন তিনি বললেন, এ ব্যাপারে কোনো বিধান অবতীর্ণ হয়নি। সাফওয়ান ইবনু সালিম [রা] থেকে অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসূলে আকরাম [সা] এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্ [সা] ! এক লোক খালা ও ফুফু রেখে ইন্তিকাল করলো। এখন তারা কে কত অংশ পাবে?' রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন- 'যদি কেউ খালা ফুফু রেখে ইন্তিকাল করে, তবে এ ব্যাপারে আল্লাহর কোনো বিধান অবতীর্ণ হয়নি।' তারপর তিনি বললেন, 'তাদের জন্য কিছুই নেই।' অন্য হাদীসে মুয়াম্মার ইবনু তাউস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি মদীনায় শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ [সা] বলেছেন, 'আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল ঐ ব্যক্তির ওয়ারিশ যার কোনো ওয়ারিশ নেই। আর যার কোনো ওয়ারিশ নেই কিন্তু মামা আছে, তাহলে মামা ঐ ব্যক্তির ওয়ারিশ।' এ হাদীসটি আমর ইবনু শুয়াইব তাঁর পিতা এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে আর তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ [সা] থেকে বর্ণনা করেছেন। দালায়েল নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে- একবার নবী করীম [সা] উটের উপর সওয়ার হয়ে বনি আমর ইবনু আওফের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন নবী করীম [সা] কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'এক ব্যক্তি তার ফুফু এবং খালাকে রেখে মৃত্যুবরণ করলো। তাদের সম্পর্কে মিরাসের বিধান কী?' তিনি উট থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'প্রশ্নকারী কোথায়?' তারপর তিনি বললেন, 'তাদের দু'জনের জন্য কোনো অংশ নেই।' অন্য হাদীসে আছে- তাঁকে প্রশ্ন করার পর তিনি কিছুদুর পথ চলতে থাকলেন। তারপর বললেন, 'আমাকে জিব্রাইল [আ] বললেন- তাদের কোনো অংশ নেই।'
📄 হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশ হয় না
আবু মুহাম্মদ ইবনু আবু যায়িদ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] কে জিজ্ঞেস করা হলো- হত্যাকারী সম্পর্কে মিরাসের বিধান কী? তিনি বললেন, 'হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশ হয় না।' আমর ইবনু শুয়াইব তাঁর পিতা এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম [সা] বলেছেন, 'হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সম্পদ থেকে কিছুই পাবে না।' ইমাম মালিক সহ অন্যান্য ইমামদের মত হচ্ছে- যদি ভুলক্রমে হত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে তবে হত্যাকারী ওয়ারিশ হবে। আর যদি ইচ্ছাকৃত হত্যা করা হয়, তবে সে ওয়ারিশ হবে না। এ ব্যাপারে সমস্ত উলামাগণ একমত। শুধুমাত্র ভুলক্রমে হত্যা করলে ওয়ারিশ হবে কিনা? এ ব্যাপারে উলামাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়।
📄 মুসলমানের ওসিয়তে কোন খৃষ্টান সাক্ষ্য হওয়া
তাফসীরে ইবনু সালামে কালবী থেকে বর্ণিত হয়েছে- এক ব্যক্তি বনি সাহমের মুক্ত করা গোলাম ছিলো। একবার সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সাথে তামীমদারীসহ আরো একজন লোক ছিলো। তখন তারা ছিলো খৃষ্টান। যখন ঐ গোলামের মৃত্যু সময় উপস্থিত হলো তখন সে একটি ওসিয়ত নামা লিখলো। তারপর তা নিজের মালামালের সাথে রেখে দিলো এবং সাথীদ্বয়কে বললো- 'এগুলো আমার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিকট পৌঁছে দিয়ো।' অতঃপর তারা তাদের গন্তব্যের দিকে চলা শুরু করলো। পথিমধ্যে তার মৃত্যু হলো, তারা তার পরিত্যক্ত মালের মধ্যে যেগুলো পছন্দ হলো নিয়ে নিলো এবং অবশিষ্ট মাল তার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছে দিলো। তারা যখন তার মালামাল নড়াচড়া করছিলো তখন তার মধ্যে অনেক মালের ঘাটতি দেখতে পেলো। যা সে মৃত্যুর পূর্বে বাড়ী থেকে নিয়ে গিয়েছিল। ওসিয়ত নামা পড়ে দেখলো, সেখানেও পুরো মালের হিসাব লিখা আছে।
তামীমদারী ও তার সাথীদের জিজ্ঞেস করা হলো, 'আমাদের লোকটি কি তার কোনো মালামাল রাস্তায় বিক্রি করে দিয়েছে?' তারা বললো- 'না'। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, 'সে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য কিছু ব্যয় করেনি তো?' তারা জবাব দিলো, 'আমাদের জানা নেই।' তাছাড়া তার ওসিয়ত সম্পর্কেও আমরা কিছু জানি না। যাহোক রাসূল [সা] এর দরবারে এ মামলা দায়ের করা হলো। তখন নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا شَهَادَةُ بَيْنَكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ حِيْنَ الْوَصِيَّةِ اثْنُنِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ أَوْ أَخَرَانِ مَنْ غَيْرِكُمْ إِنْ أَنتُمْ ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَاصَابَتْكُمْ مُّصِيبَةٌ الْمَوْتِ (ط) تَحْبِسُونَهُـمَا مِنْ بَعْدِ الصَّلوةِ فَيُقْسِمْنِ بِاللَّهِ إِنَّ ارْتَبْتُمْ لَا تَشْتَرِي بِهِ ثَمَنًا وَلَوْ كَانَ ذَا قُربي (ط) وَلَا تَكْتُمُ الشَّهَادَةَ اللَّهِ إِنَّا إِذًا لَمِنَ الْأَثْمِينَ (المائد ٥)
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কারো মৃত্যু সময় উপস্থিত হলে এবং সে ওসিয়ত করতে চাইলে তোমাদের মধ্যে থেকে দু'জন সুবিচারপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষ্য বানাবে। আর যদি তোমরা সফরে থাকাবস্থায় মৃত্যুর কঠিন বিপদ উপস্থিত হয়, তবে অমুসলিমদের মধ্য থেকে [যদি কোনো মুসলিম না পাও] দু'জন সাক্ষ্য নিযুক্ত করবে। পরে যদি কোনো প্রকার সন্দেহের কারণ ঘটে তবে নামাযের পর উভয়ে সাক্ষীকে [মসজিদে) ধরে রাখবে। তারা আল্লাহর নামে কসম করে বলবে, 'আমরা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থের কারণে সাক্ষ্য বিক্রয় করতে প্রস্তুত নই। সে আমাদের কোনো আত্মীয়ই হোক না কেন এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষ্যকে গোপন করবো না। আমরা যদি তা করি, তবে গুনাহগারদের মধ্যে গণ্য হবো। (সূরা আল মায়িদা-১০৬]
এরপর ঐ দু'জনকে আসর নামাযের পর নবী করীম [সা] এর মিম্বরের নিকট দাঁড়িয়ে শপথ করানো হলো এবং তারপর ছেড়ে দেয়া হলো। পরে তামীমদারীর নিকট রুপার কারুকাজ এবং সোনার প্রলেপ দেয়া একটি থালা পাওয়া গেলো। দালায়েলে বলা হয়েছে- তা মক্কায় পাওয়া গিয়েছিলো। অন্যান্যদের মতে সে এক হাজার দিরহামের বিনিময়ে তা বিক্রি করে দিয়েছিলো এবং উভয়ে পাঁচশ' দিরহাম করে ভাগ করে নিয়েছিলো। তখন লোকজন দাবী করলো, 'এটি আমাদের সেই লোকের থালা যা সে সফরে সাথে নিয়ে গিয়েছিলো। তোমরাইতো বলেছো, সে কোনো জিনিস বিক্রি করেনি।' তারা বললো, 'এ থালা আমাদের কাছে বিক্রি করেছে। কিন্তু তোমাদেরকে জানাতে ভুলে গেছি।' পুণরায় তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর নিকট হাজির করা হলো। তখন নিচের আয়াত দু'টো অবতীর্ণ হয়-
فَإِنْ عُثِرَ عَلَيْ أَنَّهُمَا اسْتَحَقَّا إِثْمًا فَأَخَرَانِ يَقُوْمَانِ مَقَامَهُمَا مِنَ الَّذِينَ اسْتَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْأَوَّلِينَ فَيُقْسِمْنِ بِاللَّهِ لَشَهَادَتُنَا احَقٌّ مِنْ شَهَادَتِهِمَا وَمَا اعْتَدَيْنَا إِنَّا إِذًا لَمِنَ الظَّلِمِينَ (٥) ذَالِكَ ادْنُي أَنْ يَاتُوا بِالشَّهَادَةِ عَلَي وَجْهِهَا أَوْ يَخَافُوا أَنْ تُرَدَّ أَيْمَانُ بَعْدَ أَيْمَانِهِمْ (٥) وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاسْمَعُوا - وَاللهُ لا يَهْدِي الْقَوْمَ الفَاسِقِينَ (0)
“আর যদি জানা যায়, ঐ দু'জন নিজেরাই নিজেদেরকে গুনাহে লিপ্ত করেছে তবে তাদের পরিবর্তে এমন দু'জন লোক তাদের মধ্য হতে দাঁড়াবে ইতোপূর্বে যাদের স্বার্থ পূর্ববর্তী সাক্ষীদ্বয় নষ্ট করতে চেয়েছিলো। তারা আল্লাহর নামে কসম করে বলবে, আমাদের দু'জনের সাক্ষ্য তাদের দু'জনের সাক্ষ্য থেকে অধিকতর সঠিক। আর আমরা সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে সীমালংঘন করিনি। আমরা যদি এরূপ করি তবে আমরা জালিমদের অন্তর্ভূক্ত হবো। আশা করা যায়, এভাবে লোকেরা সঠিক সাক্ষ্য দেবে। অথবা তারা অবশ্যই এ ভয় করবে যে, তাদের কসম করার পর আর কোনো কসম দ্বারা তাদের প্রতিবাদ করা না হয়। আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো আল্লাহ্ ফাসিকদের হিদায়াত থেকে বঞ্চিত করে দেন।”- [সূরা আল মায়িদা-১০৭-১০৮]
অতঃপর মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের মধ্য থেকে দু'ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলো। তারা সাক্ষ্য দিলো, ওসিয়ত নামায় যা কিছু লিখা আছে তা সঠিক, কিন্তু তামীম ও তার সাথী তার মধ্যে খিয়ানত করেছে। অতঃপর তাদের দু'জনের নিকট যা বর্তমান পাওয়া গেলো, তা নিয়ে নেয়া হলো। মৃতের ওয়ারিশদের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলো আবদুল্লাহ ইবনু আমর ও মুতালিব ইবনু আবু দাওয়া।
মা'আনিল কুরআনে বর্ণিত আছে, আবু তামাআ' নামে আনসারদের এক ব্যক্তি ছিলো, সে একটি জেরা [যুদ্ধের পোশাক] চুরি করে আটার থলের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। আটার থলের তলা ফুটো ছিলো তাই চুরির জায়গা থেকে ঘর পর্যন্ত আটা পড়ে একটি রেখার মতো হয়ে গিয়েছিলো। তাকে চোর বলে সন্দেহ করা হলো। এর মধ্যে সে জেরাটি এক ইহুদীর নিকট গিয়ে গচ্ছিত রেখে এলো। তারপর সে নিজের ভাইদের নিকট গিয়ে বললো, 'আমাকে অপবাদ দেয়া হচ্ছে, আমি নাকি জেরা চুরি করেছি।' যখন তাকে খুব চাপ দেয়া হলো তখন জানা গেল জেরাটি এক ইহুদীর কাছে। সেই আনসারীর ভাইয়েরা রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর খেদমতে হাজির হলো। তার আশা ছিলো, নবী করীম [সা] এর কাছে নিজের ভাইয়ের নির্দোষিতা প্রমাণ করা এবং ইহুদীকে চোর সাব্যস্ত করা। আল্লাহর রাসূল [সা] ও তাদের কথার ওপর প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন, এমতাবস্থায় আল্লাহ্ ওহীর মাধ্যমে আনসারীর কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করালেন। কাজেই তার পক্ষ নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়তে স্বয়ং আল্লাহ্ নিষেধ করে দিলেন। তবে যদি সে তার অপরাধ স্বীকার করে তওবা করে, তবে তা কবুল করা হবে একথাও বলে দেয়া হলো। কিন্তু আবু তামাআ' পালিয়ে মক্কায় গিয়ে মুরতাদ হয়ে গেলো। কিছুদিন পর মক্কায় এক দেয়াল ধ্বসে সে মারা যায়।