📄 আমানতদারকে শপথ করানো
যদি আমানতদারের কাছে গচ্ছিত মাল নষ্ট হয়ে যায়, তবে তাকে এ ব্যাপারে শপথ করানো যাবে কিনা, তা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিয়ী [রহ] বলেন, আমানতদারের কাছ থেকে শপথ নিতে হবে। ইমাম মালিক [রহ] বলেন, তার থেকে শপথ নেয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা এমনিইতো তার দুর্নাম হয়ে যায়। ইবনু মানযার 'আশরাফ' নামক গ্রন্থে বলেছেন, শপথ গ্রহণের কথাটিই সঠিক ও উত্তম।
ইবনু নাফি' ইমাম মালিক থেকে আল মাবসুতে বর্ণনা করেছেন, যদি ঋণগ্রস্থ দাবী করে, সম্পূর্ণ মাল কিংবা আংশিক বিনষ্ট হয়ে গেছে তবে তার থেকে শপথ নিতে হবে। এতে দুর্নাম হোক বা না হোক। ইবনু মুযাযের মতও তাই। ওয়াজিহায় বর্ণিত হয়েছে- তার থেকে শপথ নেয়া যাবে না। মদুওনায় ইমাম মালিক থেকে ইবনু কাশেম বর্ণনা করেছেন- এমতাবস্থায় তার থেকে শপথ নিতে হবে।
📄 দাবীকৃত আমানতের বস্তু যা হস্তচ্যুত হয়ে গেছে
মুয়াত্তা ইমাম মালিক [রহ] ইবনু শিহাব [রহ] হতে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর জমানায় কতিপয় মহিলা তাদের জনপদে ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু তাদের স্বামীরা কাফির থাকার কারণে তারা হিজরত করতে পারেনি। ঐ মহিলাদের মধ্যে ওয়ালিদ ইবনু মুগিরার কন্যাও ছিলো। তখন সে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার স্ত্রী। মক্কা বিজয়ের দিন তার স্বামী সাফওয়ান পালিয়ে গিয়েছিলো। রাসূলুল্লাহ্ [সা] তাকে ধরার জন্য তার চাচাতো ভাই ওয়াহাব ইবনু উমাইরকে পাঠান। সাথে নিরাপত্তার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর চাদর দিয়ে দেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত পাঠান। আর এ শর্ত দিয়ে দেন যে, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে নিরাপদ, নইলে তাকে দু'মাসের অবকাশ দেয়া হবে। সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ্ [সা] প্রদত্ত চাদর সহ তাঁর নিকট উপস্থিত হয় এবং সবার সামনে বলতে থাকে, 'হে মুহাম্মদ [সা]। ওয়াহাব ইবনু উমাইর আমার নিকট আপনার চাদর নিয়ে হাজির হয়ে বলছে, আমাকে আপনার নিকট উপস্থিত হতে।' রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, 'হে আবু ওয়াহাব। ওকে এদিকে নিয়ে এসো।' সে বললো, 'আমাকে সুষ্পষ্ট করে না বলা পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক কদমও অগ্রসর হবো না।' তখন রাসূল [সা] তাকে বললেন, 'তোমাকে চার মাস অবকাশ দেয়া হলো।' অতঃপর তিনি হুনাইনে হাওয়াজিন গোত্রের মুকাবেলার জন্য রওয়ানা দেন। যাত্রাকালে তার কাছে রক্ষিত যুদ্ধ সরঞ্জাম ধার চেয়ে পাঠান। সে জিজ্ঞেস করলো, 'এটা কি স্বেচ্ছায় দেবো না জোর করে নেয়া হবে?' বলা হলো- 'এটা তোমার খুশী, ইচ্ছে হয় দিতে পারো আবার নাও দিতে পারো।' তখন সে ধার স্বরূপ তা দিয়ে দিলো।
অন্য বর্ণনায় আছে, সে কাফির অবস্থায়ই রাসূল [সা] এর সাথে তায়েফ ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। তখন সে ছিলো কাফির এবং তার স্ত্রী ছিলো মুসলমান। তবু তাকে স্ত্রী থেকে পৃথক করে দেয়া হয়নি। অবশ্য পরে ইসলাম গ্রহণ করে। স্ত্রী ও তার ইসলাম গ্রহণের সময়ের ব্যবধান ছিলো এক মাস।
মুয়াত্তা ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে আছে, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া নবী করীম [সা] কে বললেন, 'হে মুহাম্মদ [সা]! আমার অস্ত্র কি আপনি জোর করে নেবেন?' রাসূল [সা] বলেন, 'না, ধার হিসােেনবো।' আবু দাউদে আছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] জিজ্ঞেস করলেন, সাফওয়ান! তোমার কাছে কি কোন অস্ত্র আছে?' সে বললো, ' তা কি জোর করে নেবেন, না ধার হিসেবে?' তিনি বললেন, 'ধার হিসেবে।' যখন হুনাইন যুদ্ধে কাফিররা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করলো, তখন তিনি সাফওয়ানের অস্ত্রশস্ত্র তাকে ফেরত দিলেন। তার মধ্যে কিছু সংখ্যক হারিয়ে গিয়েছিলো। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি এর ক্ষতিপূরণ নেবে?' সে উত্তর দিলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্ [সা]! না, আমি কোনো ক্ষতিপূরণ চাইনা। কেননা আজ আমার যে দিল আছে, সেদিন সে দিল ছিলো না।' ইমাম আবু দাউদ বলেছেন, এটা ছিলো ইসলামে প্রথম ধার দেয়া বস্তু।
📄 ওয়ারিশদের সম্পদ
মায়ানিল কুরআনে হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ [রা] থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- সা'দ ইবনু রবীর স্ত্রী নবী করীম [সা] এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার স্বামী আপনার অন্যান্য সাথীদের মতো শহীদ হয়ে গেছে। সে কয়েকটি মেয়ে এবং পিতা রেখে গেছে, কিন্তু তার পিতা সমস্ত সম্পদ ভোগ করছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ [সা] তাকে ডেকে এনে বললেন, 'সা'দের স্ত্রীকে [৮-এর ১ অংশ) এবং তার মেয়েদেরকে [৩-এর ১ অংশ] দিয়ে দাও এবং অবশিষ্ট সম্পদ তামার।
মুহাম্মদ ইবনু সাহনুন তাঁর কিতাবুল ফারায়েযে বর্ণনা করেছেন, একবার সে [হযরত সা'দ [রা] এর স্ত্রী] নবী করীম [সা] এর খেদমতে আরজ করলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনিতো জানেন সম্পদের জন্য মহিলাদের বিবাহ করা হয়।' রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, 'দেখা যাক এ অবস্থায় আল্লাহ্ কি সিদ্ধান্ত অবতীর্ণ করেন।' এরপর তিনি কদিন অপেক্ষা করলেন। অতঃপর সা'দ এর স্ত্রীকে খবর পাঠালেন, আল্লাহ্ তোমার এবং তোমার মেয়েদের ব্যাপারে ফায়সালা দিয়েছেন। তখন তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন
يُوصِيكُمُ اللهُ فِي أَوْلَادِكُمْ (ق) لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَنِ (ج) فَإِنْ كُنَّ نِسَاء فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ (ج) وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَاةً فَلَهَا النِّصْفُ (ط) وَلِأَبْوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدْ (ج) فَإِنْ لَّمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ آيَاهُ فَلَا مِّهِ الثَّلث (ج) فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلَا مِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُومِي بها أودين (ط) أباؤكم وابناءكم لا تدرون أيهم اقرب لكم نفعا (ط) فَرِيضَةً مِّنَ الله (ط) إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا (1)
"তোমাদের সন্তান সম্পর্কে আল্লাহর বিধান হচ্ছে- একজন পুরুষ দু'জন মহিলার সমান। যদি [মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী] দু'জনের অধিক কন্যা হয়, তবে তাদেরকে পরিত্যক্ত সম্পদের [৩-এর ২ অংশ] দেয়া হবে। আর যদি কন্যা একজন হয়, তবে সে সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক [২-এর ১ অংশ] পাবে। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতামাতা প্রত্যেকেই [৬-এর ১ অংশ] পাবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি নিঃসন্তান হয় এবং পিতামাতাই একমাত্র উত্তরাধিকারী হয়, তবে মাকে দেয়া হবে [৩-এর১ অংশ]। মৃত ব্যক্তির যদি ভাইবোন থাকে তবে মা পাবে [৬-এর ১ অংশ]। এসব বন্টন করে দিতে হবে তখন, যখন মৃতের ওসিয়ত [যা সে মরার পূর্বে করেছে] পূর্ণ করা হবে এবং তার যে সমস্ত ঋণ আছে, তা আদায় করা হবে। তোমরা জানো না তোমাদের পিতা মাতা ও সন্তান সন্ততিদের মধ্যে উপকারের দিক দিয়ে কে অধিক নিকটবর্তী। এসব আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ্ নিশ্চিত রূপেই সমস্ত তত্ত ও নিগূঢ় সত্য সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত মহাবিজ্ঞ।” [সূরা আন নিসা-১১]
উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণের পর নবী করীম [সা] মহিলাকে [৮-এর ১ অংশ] এবং দু'মেয়েকে [৩-এর ২ অংশ] এবং বাকী সম্পদ তার পিতাকে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এটাই ইসলামে প্রথম ওয়ারিশী সম্পদ বন্টনের ঘটনা। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ [রা] থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, সা'দ [রা] এর স্ত্রী জিজ্ঞেস করেছিলেন। আর বুখারীতে বলা হয়েছে- হুজাইল ইবনু সুরাহবিল হযরত আবু মূসা [রা] কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে যে মারা গেছে, এক কন্যা এক নাতনী এবং এক বোন রেখে। তখন তিনি বললেন, 'কন্যা পাবে অর্ধেক, বোন পাবে অর্ধেক। আর তুমি ইবনু মাসউদের কাছে যাও। আমার মনে হয় তিনিও আমার এ বক্তব্যের সাথে একমত হবেন। তখন ইবনু মাসউদ [রা] এর কাছে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলা হলো এবং আবু মূসা আশয়ারী [রা] এর রায় প্রসঙ্গেও বলা হলো। তখন তিনি বললেন, 'আমি যদি তার মতো ফায়সালা করে দেই, তবে আমার ভয় হয়, আমি গুমরাহ হয়ে যাবো এবং সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবো। আমি বরং সে ফায়সালাই করে দেবো যা নবী করীম [সা] বলেছেন।' তিনি বলেছেন, 'কন্যার জন্য অর্ধেক সম্পদ এবং নাতনীর জন্য [৬-এর ১ অংশ]। যাতে উভয়ে মোট [৩-এর ২ অংশ] পায়। অবশিষ্টাংশ বোন পাবে। তখন ঐ ব্যক্তি পুনারায় আবু মূসা [রা] এর কাছে এসে সব ঘটনা জানালো। তখন তিনি বললেন, যতোদিন পর্যন্ত এ মহাবিজ্ঞ লোকটি তোমাদের মাঝে থাকবে, ততোদিন তোমরা আমার কাছে কোনো মাসয়ালা জানতে এসো না।
📄 আসাবা
বুখারী ও মুসলিমে হযরত ইবনু আব্বাস [রা] হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ [সা] বলেছেন, নির্দিষ্ট অংশ তার হকদারদের মধ্যে বন্টন করার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা অধিকতর নিকটাত্মীয়ের জন্য, যে পুরুষ হবে। অধিকাংশ উলামার দৃষ্টিতে এ ইঙ্গিতের তাৎপর্য হচ্ছে- আসাবা। আসাবা হচ্ছে কোনো ব্যক্তি তার পিতার কারণে আত্মীয় হওয়া। যেমন, ফুফা, চাচাতো ভাই, চাচাতো ভাইয়ের ছেলে, নাতি ইত্যাদি।