📄 যে বলে আমার বাগান আল্লাহকে দান করলাম
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিমে হযরত আনাস [রা] থেকে বর্ণিত - আবু তালহা মদীনার আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খেজুর বাগানের মালিক ছিলেন। তার মধ্যে ‘বীরহা’ নামক বাগানটি ছিলো সর্বোত্তম। এটি ছিলো মসজিদের সামনে। আবু তালহার কাছে এ বাগানটি ছিলো অত্যন্ত প্রিয়। রাসূল [সা] মাঝে মাঝে সেই বাগানে প্রবেশ করে তার সুস্বাদু পানি পান করতেন। যখন নিচের আয়াতটি অবতীর্ণ হলো-
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ (٥)
তোমরা ততোক্ষণ পূণ্য লাভ করতে পারবে না যতোক্ষণ তোমাদের প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে দান না করবে। [সূরা আল-ইমরান]
তখন আবু তালহা [রা] রাসূল [সা] এর নিকট দাঁড়িয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ প্রিয় বস্তু দান করার কথা বলেছেন। আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে ‘বিরহা’! আপনি যে ভাবে চান তা ব্যবহার করবেন।' রাসূল (সা) বললেন, 'বাহ্! বাহ্! তুমিতো অত্যন্ত লাভবান এক কাজ করলে। তবে আমার পরামর্শ হচ্ছে, এ বাগানটি তোমার নিকটাত্মীয় বিশেষ করে তোমার চাচাতো ভাইদের মাঝে বন্টন করে দাও।' বুখারীর অন্য বর্ণনায় আছে, 'তা তোমার দরিদ্র আত্মীয়দের দান করে দাও।' আনাস [রা] বলেন, 'এরপর তিনি হাসান ইবনু সাবিত ও উবাই ইবনু কা'ব কে তা দান করে দিলেন। তারা দু'জন আমার চেয়ে তাঁর বেশী নিকটতর ছিলো।'
এ আলোচনা থেকে নিচের মাসয়ালাগুলো পাওয়া যায়-
১. যে ব্যক্তি বলে আমার বাড়ী দান করে দিলাম, যদি নির্দিষ্ট কারো নাম উল্লেখ না করে, তবে সে তা তার নিকটাত্মীয়দের মাঝে বন্টন করে দিতে পারে। অবশ্য কিছু সংখ্যক উলামা বলেছেন তা বৈধ নয়।
[লেখক বলেন] যদি সে নির্দিষ্ট কারো নাম না বলে তবে প্রথম কথাই ঠিক।
২. যদি কেউ, জমি দান করতে চায়, আর যদি কারো নাম সে উচ্চারণ না করে তাহলে পরবর্তীতে আলাপ আলোচনা করে সে দানের পাত্র ঠিক করতে পারে।
📄 আমানতদারী
আহকাম ইবনু যিয়াদের বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ [সা] বলেছেন, 'আমানতদারের ওপর কোনো জরিমানা নেই। আহলে ইলমগণ বলেন, এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আহকাম ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে বলা হয়েছে, রাসূল [সা] বলেছেন, 'প্রত্যেক হাতের কর্তব্য ঐ বস্তু ফেরত দেয়া যা তার আয়ত্বে আছে।' কতিপয় উলামা এ কথার নিম্মোক্ত ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের দলিল হচ্ছে- আল্লাহর এ বাণী, 'তোমরা তোমাদের আমানত তার মালিকের নিকট ফিরিয়ে দাও।' ইবনু সালাম বলেন, এ আয়াত কা'বার মুতাওয়াল্লী প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। যখন হযরত আব্বাস [রা] নবী করীম [সা] এর নিকট কা'বা ঘরের চাবি চেয়েছিলেন তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন তিনি কা'বা ঘরের চাবি ওসমান ইবনু তালহাকে দিয়ে দিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূল [রা] বললেন, ওসমান কোথায়?' হযরত ওসমান ইবনু আফফান [রা] মাথা উঠিয়ে উপস্থিতি প্রমাণ করলেন। তারপর তিনি আবার বললেন, 'ওসমান ইবনু তালহা কোথায়?' বনী হাজরানীর এক ব্যক্তি তাকে দাঁড় করিয়ে দিলো। অতঃপর নবী করীম [সা] তাকে চাবিগুচ্ছ দিয়ে দিলেন। তিনি মুখ ঢেকে বসেছিলেন। নবী করীম [সা] তাকে চাবি দিয়ে বললেন- 'হে আবু তালহার বেটা! এটিকে সংরক্ষণ করো সব সময়ের জন্য। এজন্য তোমার সাথে জুলুম করা হবে না। তবে জালিম বা কাফিররা এরূপ করলে ভিন্ন কথা।' এ ঘটনা বিদায় হজ্জের সময়ের। ওসমান এর পিতা তালহা উহুদ যুদ্ধের সময় হযরত আলী [রা] এর বিপক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়। পরে চাবি তালহার উম্মে ওয়ালাদ (দাসী) সালাফা [অর্থাৎ ওসমানের মা] এর নিকট গচ্ছিত থাকে।
📄 আমানতদারকে শপথ করানো
যদি আমানতদারের কাছে গচ্ছিত মাল নষ্ট হয়ে যায়, তবে তাকে এ ব্যাপারে শপথ করানো যাবে কিনা, তা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিয়ী [রহ] বলেন, আমানতদারের কাছ থেকে শপথ নিতে হবে। ইমাম মালিক [রহ] বলেন, তার থেকে শপথ নেয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা এমনিইতো তার দুর্নাম হয়ে যায়। ইবনু মানযার 'আশরাফ' নামক গ্রন্থে বলেছেন, শপথ গ্রহণের কথাটিই সঠিক ও উত্তম।
ইবনু নাফি' ইমাম মালিক থেকে আল মাবসুতে বর্ণনা করেছেন, যদি ঋণগ্রস্থ দাবী করে, সম্পূর্ণ মাল কিংবা আংশিক বিনষ্ট হয়ে গেছে তবে তার থেকে শপথ নিতে হবে। এতে দুর্নাম হোক বা না হোক। ইবনু মুযাযের মতও তাই। ওয়াজিহায় বর্ণিত হয়েছে- তার থেকে শপথ নেয়া যাবে না। মদুওনায় ইমাম মালিক থেকে ইবনু কাশেম বর্ণনা করেছেন- এমতাবস্থায় তার থেকে শপথ নিতে হবে।
📄 দাবীকৃত আমানতের বস্তু যা হস্তচ্যুত হয়ে গেছে
মুয়াত্তা ইমাম মালিক [রহ] ইবনু শিহাব [রহ] হতে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর জমানায় কতিপয় মহিলা তাদের জনপদে ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু তাদের স্বামীরা কাফির থাকার কারণে তারা হিজরত করতে পারেনি। ঐ মহিলাদের মধ্যে ওয়ালিদ ইবনু মুগিরার কন্যাও ছিলো। তখন সে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার স্ত্রী। মক্কা বিজয়ের দিন তার স্বামী সাফওয়ান পালিয়ে গিয়েছিলো। রাসূলুল্লাহ্ [সা] তাকে ধরার জন্য তার চাচাতো ভাই ওয়াহাব ইবনু উমাইরকে পাঠান। সাথে নিরাপত্তার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর চাদর দিয়ে দেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত পাঠান। আর এ শর্ত দিয়ে দেন যে, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে নিরাপদ, নইলে তাকে দু'মাসের অবকাশ দেয়া হবে। সাফওয়ান রাসূলুল্লাহ্ [সা] প্রদত্ত চাদর সহ তাঁর নিকট উপস্থিত হয় এবং সবার সামনে বলতে থাকে, 'হে মুহাম্মদ [সা]। ওয়াহাব ইবনু উমাইর আমার নিকট আপনার চাদর নিয়ে হাজির হয়ে বলছে, আমাকে আপনার নিকট উপস্থিত হতে।' রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, 'হে আবু ওয়াহাব। ওকে এদিকে নিয়ে এসো।' সে বললো, 'আমাকে সুষ্পষ্ট করে না বলা পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক কদমও অগ্রসর হবো না।' তখন রাসূল [সা] তাকে বললেন, 'তোমাকে চার মাস অবকাশ দেয়া হলো।' অতঃপর তিনি হুনাইনে হাওয়াজিন গোত্রের মুকাবেলার জন্য রওয়ানা দেন। যাত্রাকালে তার কাছে রক্ষিত যুদ্ধ সরঞ্জাম ধার চেয়ে পাঠান। সে জিজ্ঞেস করলো, 'এটা কি স্বেচ্ছায় দেবো না জোর করে নেয়া হবে?' বলা হলো- 'এটা তোমার খুশী, ইচ্ছে হয় দিতে পারো আবার নাও দিতে পারো।' তখন সে ধার স্বরূপ তা দিয়ে দিলো।
অন্য বর্ণনায় আছে, সে কাফির অবস্থায়ই রাসূল [সা] এর সাথে তায়েফ ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। তখন সে ছিলো কাফির এবং তার স্ত্রী ছিলো মুসলমান। তবু তাকে স্ত্রী থেকে পৃথক করে দেয়া হয়নি। অবশ্য পরে ইসলাম গ্রহণ করে। স্ত্রী ও তার ইসলাম গ্রহণের সময়ের ব্যবধান ছিলো এক মাস।
মুয়াত্তা ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে আছে, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া নবী করীম [সা] কে বললেন, 'হে মুহাম্মদ [সা]! আমার অস্ত্র কি আপনি জোর করে নেবেন?' রাসূল [সা] বলেন, 'না, ধার হিসােেনবো।' আবু দাউদে আছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] জিজ্ঞেস করলেন, সাফওয়ান! তোমার কাছে কি কোন অস্ত্র আছে?' সে বললো, ' তা কি জোর করে নেবেন, না ধার হিসেবে?' তিনি বললেন, 'ধার হিসেবে।' যখন হুনাইন যুদ্ধে কাফিররা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করলো, তখন তিনি সাফওয়ানের অস্ত্রশস্ত্র তাকে ফেরত দিলেন। তার মধ্যে কিছু সংখ্যক হারিয়ে গিয়েছিলো। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি এর ক্ষতিপূরণ নেবে?' সে উত্তর দিলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্ [সা]! না, আমি কোনো ক্ষতিপূরণ চাইনা। কেননা আজ আমার যে দিল আছে, সেদিন সে দিল ছিলো না।' ইমাম আবু দাউদ বলেছেন, এটা ছিলো ইসলামে প্রথম ধার দেয়া বস্তু।