📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 সাদকা, হিবা ও তার সত্ত্বাব

📄 সাদকা, হিবা ও তার সত্ত্বাব


মুয়াত্তা ইমাম মালিকে বর্ণিত আছে- আনসারদের এক গোত্র বনু হারিস ইবনু খাযরাজ এর এক ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে কিছু দান করেন। তারপর তারা উভয়ে মৃত্যুবরণ করায় সেই ব্যক্তি তাদের পরিত্যাক্ত সম্পদের ওয়ারিশ হয়। এ ব্যাপারে রাসূল [সা] এর নিকট জিজ্ঞেস করা হলো। [পিতা-মাতাকে দান করা সম্পদ পুনরায় গ্রহণ করা যাবে কিনা? তিনি বললেন, 'তুমি তাদেরকে যে দান করেছিলে তার বিনিময় পাবেই। এখন এগুলো তোমার মিরাসের অংশ বানিয়ে নাও।'
মাসান্নাফ ইবনু আবী শাইবা, 'আকদিয়াতুল রাসূল' শীর্ষক শিরোনামে হযরত জাবির [রা] থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] এক আনসার মহিলার ব্যাপারে ফায়সালা করেছেন, যাকে তার ছেলে একটি খেজুর বাগান দান করেছিলো। সে মরে যাবার পর তার ছেলে বললো, 'আমি তাকে সারা জীবন ভোগ করার জন্য দিয়েছিলাম।' তার এক ভাই ছিলো। রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, 'সেটা তোমার মা সারা জীবন মালিক ছিলো এবং মৃত্যুর পরও মালিক।' সে বললো 'আমি তো তা তাকে দান করেছিলাম।' তিনি বললেন, 'এটা তোমার (একার) হক নয়।
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিমে আছে- হযরত নু'মান ইবনু বশীর [রা] বর্ণনা করেছেন। তাঁর পিতা তাঁকে নিয়ে মহানবী [সা] এর কাছে গিয়ে বললেন, 'আমি আমার এই ছেলেকে আমার একটি গোলাম দান করেছি।' নবী করীম [সা] বললেন, 'তুমি কি তোমার প্রত্যেক ছেলেকে একটি করে গোলাম দান করেছো? 'বশীর [রা] উত্তরে দিলেন, 'না।' তিনি বললেন, 'তুমি এ দান ফেরত নাও। আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।'
নু'মানের মা আমরা বিনতে রাওয়াহা বশীর [রা] কে বলেছিলেন, তুমি তোমার এ দানে রাসূলুল্লাহ্ [সা] কে সাক্ষী রাখো। তিনি সারা বৎসর তাকে পটাচ্ছিলেন। অবশেষে বশীর [রা] রাজী হলেন। তখন তার স্ত্রী বললেন, এ ব্যাপারে রাসূল [সা] কে সাক্ষী বানাতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, 'আমি জুলুমের কাজে সাক্ষী হতে পারি না। এতো ছোট সন্তানের দোহাই দিয়ে পিতার সম্পদ জমা করার ব্যবস্থা মাত্র। কিন্তু যদি তোমার বড়ো কোনো সন্তান অথবা কাউকে হিবা করো অথবা সাদকা দাও বা দান করে দাও, তবে তা তার আয়ত্বে দিয়ে দিতে হবে।'
যখন সূরা তাকাছুর অবতীর্ণ হলো, তখন নবী করীম [সা] বললেন, 'বান্দাহ্ বলে এ আমার সম্পদ, এ আমার সম্পদ। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সম্পদে তার মাত্র তিনটি অংশ আছে। যা সে খেয়েছে শেষ হয়ে গেছে। যা সে পরছে তাও লুপ্ত হয়ে গেছে। যা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেছে, শুধুমাত্র সেটুকু-ই আল্লাহর নিকট জমা রয়েছে।'
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে তাউস হতে বর্ণিত হয়েছে- এক ব্যক্তি নবী করীম [সা] কে কিছু জিনিস হিবা করে দেয়। তিনি তার বিনিময়ে দাতাকে কিছু দিলেন কিন্তু সে খুশী হলো না, তারপর আরো কিছু দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন- আমার মনে হয় তিনি তিনবার এরূপ করলেন। কিন্তু সে এতে সন্তুষ্ট হলো না। তখন নবী করীম (সা) বললেন, 'আমি আর কারো কাছ থেকে কোনো দান গ্রহণ করবো না।'
দালায়েলে ওসীলীতে আছে- এক ব্যক্তি রাসূল [সা] কে একটি দুধেল উটনী হাদিয়া দিলো। তিনি তার বিনিময়ে ছ'টি জওয়ান উট দিলেন কিন্তু সে রাজী হলো না।
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে - যখন মুহাজিরগণ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে আসেন তখন তারা ছিলেন একেবারে নিঃস্ব। পক্ষান্তরে আনসারগণ অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় ছিলেন এবং তাদের কিছু জমি জমাও ছিলো। আনসারগণ সেই জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক মুহাজিরদের দিতেন।
উম্মে সুলাইম ছিলেন হযরত আনাস ইবনু মালিক [রা] ও আব্দুল্লাহ্ ইবনু আবু তালহার মা। উম্মে সুলাইম [রা] রাসূলূল্লাহ্ [সা] কে খেজুরসহ একটি গাছ হাদিয়া দিয়েছিলেন। রাসূলূল্লাহ্ তাঁর মুক্ত করা বাঁদী উম্মে আয়মানকে 'তা দিয়ে দিয়েছিলেন।
ইবনু শিহাব বলেন, আমাকে হযরত আনাস ইবনু মালিক [রা] বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] যখন খায়বার বিজয় করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন, তখন মুহাজিরগণ আনসারদের দেয়া ফলের অংশ ফেরত দিয়েছিলেন। যা তারা তাদেরকে দিয়েছিলেন। রাসূলূল্লাহ্ [সা] তার পরিবর্তে তাদেরকে বাগান দান করেছিলেন। হাদীসটি মুসলিম শরীফেও আছে। তবে সেখানে অতিরিক্ত আছে- তা ছিলো ঐ ফলের দশগুণ বা প্রায় দশগুণ।

টিকাঃ
১. উম্মে আয়মান ছিলেন আবদুল্লাহ্ ইবনু আবদুল মুত্তালিবের বাঁদী। তিনি ছিলেন হাবশী। নবী করীম [সা] জন্ম গ্রহণের পর যখন তাঁর আম্মা আমিনা ইন্তিকাল করেন তখন উম্মে আয়মান তাঁকে প্রতিপালন করেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে আযাদ করে হযরত যায়িদ ইবনু হারেসা [রা] এর সাথে বিয়ে দেন। সেই ঘরে হযরত ওসামা ইবনু যায়িদ জন্ম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর ইস্তিকালের পাঁচ মাস পর উম্মে আয়মান ইন্তিকাল করেন। ওয়াকেদী বলেছেন, তার প্রকৃত নাম ছিলো 'বারাকাহ।' -লেখক।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 ওমরা [আমৃত্যু মালিকানা]

📄 ওমরা [আমৃত্যু মালিকানা]


হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে মুয়াত্তায় বর্ণিত হয়েছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] বলেছেন, 'যদি কোনো ব্যক্তি অথবা তার কোনো সন্তানের জন্য কেউ কিছু তার জীবনকাল পর্যন্ত ভোগ করার জন্য দান করে, তবে আর তা কখনো ঐ ব্যক্তি ফেরত নিতে পারবে না। যাকে দান করা হলো এ বস্তুর মালিক সে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানগণ ওয়ারিশ হবে।' মুসলিম শরীফে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে সেখানে [!] [কখনো শব্দটি নেই। সহীহ্ সূত্রে লাইস, ইবনু সাহল, আবু সালমা ও জাবির ইবনু আব্দুল্লা [রা] পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করেছেন। জাবির [রা] বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ্ [সা] কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তি বা তার সন্তানকে আজীবন ব্যবহারের জন্য কিছু দান করলো সে ঐ বস্তুর ওপর থেকে নিজের কর্তৃত্বকে কর্তন করে ফেললো। তা [দানকৃত বস্তু] ঐ ব্যক্তি ও তার সন্তানের জন্য হয়ে গেলো।'
ইমাম আবু হানিফা [রহ], শাফিঈ [রহ], সুফিয়ান সাওরী [রহ] ও ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল প্রমূখের মতও তাই। তাদের বক্তব্য হচ্ছে ওমরা [জীবন ব্যাপী ভোগের অনুমতি) হিবার মতো। কিন্তু ইমাম মালিক কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তার মতে কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে যদি দান গ্রহণকারী ব্যক্তির বংশধারা শেষ হয়ে যায়, তবে ঐ দানকৃত বস্তু দাতার বংশধরের নিকট ফেরত আসবে।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 সন্ধান এড়াতে অদৃশ্য অবয়ব সম্পর্কে

📄 সন্ধান এড়াতে অদৃশ্য অবয়ব সম্পর্কে


মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিমে হযরত আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। উতবা ইবনু আবু ওয়াক্কাস তার ভাই সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাসকে ওসিয়ত করেছিলো, জামাআ'র দাসীর পুত্র আমার ঔরশজাত। কাজেই তুমি তাকে এনে তোমার কাছে রাখবে। যখন মক্কা বিজয় হলো' তখন সা'দ তাকে ধরে আনলেন এবং বললেন, 'তুমি আমার ভাতিজা।' এদিকে আবদ ইবনে জামআ' বলতে লাগলেন, 'সে তো আমার ভাই। কেননা সে আমার পিতার দাসীর গর্ভজাত সন্তান।' উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর কাছে মোকদ্দমা দায়ের করলো। রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, 'বিছানা যার সন্তান তার। ব্যভিচারীর জন্য পাথর।' তারপর উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা বিনতে জামাআ' কে বলে দিলেন, 'তুমি তার থেকে পর্দা করবে। কেননা আমি তাকে উতবা ইবনু আবু ওয়াক্কাসের সাথে সাদৃশ্য দেখতে পাচ্ছি।' এরপর থেকে হযরত সাওদা [রা] আমরন তার সাথে দেখা দেননি।
এ হাদীস থেকে একটি মাসয়ালা জানা যায়, কাফিরদের ওসিয়তের ওপর আমল করা যাবে। কেননা উতবা ওসিয়ত করে কাফির অবস্থায় মারা যায়। আর সে উহুদের যুদ্ধে নবী করীম [সা] এর দান্দান মুবারক শহীদ করে। পরে রাসূল [সা] এর বদ দু'আয় ঐ বৎসরের শেষ দিকেই সে মৃত্যু বরণ করে। দ্বিতীয় আরেকটি মাসায়ালা জানা যায়, ভাই দাবী করায় বিতর্কের অবকাশ আছে কিন্তু সন্তান দাবী করায় বিতর্কের অবকাশ নেই।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 কিতাবী যারায়ি'

📄 কিতাবী যারায়ি'


নবী করীম [সা] হযরত সাওদা [রা] কে যে নিষেধ করেছিলেন তা ছিলো 'কিতঈ যারায়ি।' কিতঈ যারাঈ' বলা হয় কোনো মুবাহ কাজ বা বস্তু থেকে নিজেকে হিফাজত করা। অথবা কোনো মুবাহ জিনিস থেকে বিরত থাকার নির্দেশ। যেমন, আল কুরআনে মহিলাদেরকে নরমভাবে চলাচলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আবার راعنا ]আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন। না বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
শুধু সন্দেহের কারণে নবী করীম [সা] সাওদা [রা] কে ইবনু জামআ' এর সাথে দেখা না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর এ নির্দেশ ছিলো মূলত, দুটো পর্যায়ের একটি জাহেরী [প্রকাশ্য] অন্যটি বাতেনী [অপ্রকাশ্য]।
ইমাম শাফিঈ [রহ] এ ঘটনা থেকে একটি মাসয়ালা বের করেছেন। মাসয়ালাটি হচ্ছে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে নিষেধ করতে পারেন।
নবী করীম [সা] সাওদা [রা] কে তার বৈমাত্রেয় ভাইদের সাথে দেখা দিতে নিষেধ করেছিলেন। আবার তিনি ইবনুল মুকাইয়িস এর ভাই আফলাহ্ এর ব্যাপারে আয়িশা [রা] কে বলেছিলেন- 'সে তোমার চাচা, তোমার সাথে দেখা করতে পারে।'
বুখারী শরীফে আছে- রাসূল [সা] বলেছেন, 'যে জিনিস তোমাকে সন্দেহে নিপতিত করে তা পরিহার করো এবং যা সন্দেহে ফেলে না তা করো।'
রাসূলের বাণী- 'ব্যভিচারীর জন্য পাথর' এর তাৎপর্য হচ্ছে- ব্যভিচারীর সাথে সন্তানকে সম্পর্কচ্ছেদ করা। সন্তানের ওপর তার কোনো অধিকার নেই। এমনকি তার সাথে সংশ্লিষ্ট করে সন্তানকে ডাকা ও যাবে না। যেমন আরবরা বলে থাকে- 'তোমার মুখে পাথর।' অর্থাৎ তোমার জন্য কিছুই নেই। বর্ণনাকারী বলেন- ব্যভিচারীর জন্য পাথর বলতে তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার কথা বলা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00