📄 'শুফআ'
মুয়াত্তা ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে নবী করীম [সা] ঐ সমস্ত জমিতে শুফআ'র বিধান দিয়েছেন যা এখনো অংশীদারদের মধ্যে বন্টন করা হয়নি। কিন্তু যখন শরিকানা জমির সীমা নির্ধারিত হয় এবং পথের গতি [আপন আপন দিকে] ফিরিয়ে নেয়া হয়, তখন শুফআ' [এর অধিকার থাকে না। শুফআ'র জমি চাই আবাদী, অনাবাদি কিংবা খেজুর বাগান যাই হোক না কেন। সর্বাবস্থায় শুফআ'র বিধান প্রয়োগ করা যাবে।
আবু উবাইদ বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] ফায়সালা দিয়ে গিয়েছেন, ঘরের সামনের জায়গা, রাস্তা, দু'ঘরের মাঝের রাস্তা, ঘরের যে কোনো পাশের জায়গা এবং বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হওয়ার জায়গায় শুফআ' নেই।
শুফআ' সংক্রান্ত উপরোক্ত হাদীসের তাৎপর্য হচ্ছে উল্লেখিত পাঁচটি জায়গায় যদি কেউ অংশীদার থাকে এবং ঘরের কোনো অংশীদার না থাকে, তবু সেখানে শুফআ'র অবকাশ নেই। এটা হচ্ছে, মদীনাবাসী উলামাদের মত। পক্ষান্তরে ইরাকী উলামাগণের মতে- ঐ পাঁচ জায়গায় যদি কেউ অংশীদার না থাকে তবে তার নিকটতম প্রতিবেশীর হক আছে।
আবু উবায়েদের গ্রন্থে আছে- নবী করীম [সা] শুফ'আর ব্যাপারে প্রতিবেশীর হকের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং একথা নবী করীম [সা] দু'বার বলেছেন, 'নিকটত্বের কারণে প্রতিবেশী অধিকতর হকদার।' নাসাঈতে আছে- এক ব্যক্তি বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটা আমার জমি। যার মধ্যে কোনো শরীক বা কারো কোনো অংশ নেই। তবে পাশের জমি অন্য জনের।' তিনি বললেন, প্রতিবেশী নিকটত্বের কারণে অধিক হকদার।
মুসলিম শরীফে আছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] প্রত্যেক শরিকি জমি যা বন্টন করা হয়নি, এমন জমির ব্যাপারে শুফআ'র ফায়সালা দিয়েছেন। জায়গা, বাগান অথবা যাই হোক না কেন তা প্রতিবেশীকে না জানিয়ে বিক্রি করা বৈধ নয়। আগে প্রতিবেশীকে জানাতে হবে। যদি সে চায় রাখবে, না হয় অন্যত্র বিক্রির জন্য ছাড় দেবে।
টিকাঃ
১. শুফআ'র আভিধানিক অর্থ হচ্ছে মিলানো বা সংযোজন করা। পরিভাষিক অর্থে- অপরের ক্রীত সম্পত্তি নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধ করে নিজের সম্পত্তির সাথে মিলিয়ে নেয়া। অথবা পৃথক হতে না দেয়াকে শুফআ' বলা হয়। -অনুবাদক।
📄 বণ্টন ও অংশীদারিত্ব নিয়ে ঝগড়া
কাজী ইসমাঈলের কিতাবুল আহকামে বর্ণিত আছে- দু'ব্যক্তি ওয়ারিশী সম্পদ নিয়ে ঝগড়া করছিলো। নবী করীম [সা] বললেন- 'আদল [ন্যায় বিচার] এবং ইনসাফের সাথে তা বন্টন করো এবং [প্রয়োজনে] লটারী করো।'
বুখারী শরীফে আছে- নবী করীম [সা] বলেছেন, 'যদি তোমরা রাস্তা নিয়ে ঝগড়া করো তবে তা ৭ হাত (প্রশস্ত) করে দেয়া হবে। বুখারী, মুসলিমে আছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] খায়বারবাসীদের অর্ধেক ফসল দেয়ার শর্তে জমি ও বাগান বর্গা দিয়েছিলেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত ফসল প্রত্যেক স্ত্রীকে ১০০শ' ওয়াসাক করে বন্টন করে দিতেন। তার মধ্যে ৮০ ওয়াসাক খেজুর এবং ২০ ওয়াসাক যব থাকতো।
ওয়াজিহায় বর্ণিত আছে, রাসূল [সা] এর সময়ে চারজন এক জমিতে শরীক হলো। তাদের মধ্যে একজন বললো, 'আমি জমি দেবো।' একজন বললো, 'আমি বীজ দেবো।' তৃতীয়জন বললো, 'আমি নিড়ানি দেবো।' চতুর্থজন বললো, 'আমি এ জমিতে শ্রম দেবো।' যখন সে জমিতে ফসল কাটার সময় হলো, তখন তারা ঝগড়া শুরু করলো। এমন কি শেষ পর্যন্ত বিচার রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর দরবার পর্যন্ত গড়ালো। তিনি ঘটনা শুনে পুরো ফসলকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করলেন। সেখান থেকে তাদেরকে কোনো অংশ দিলেন না বরং নিড়ানির বিনিময় ধার্য করে পাওনা আদায় করে দিলেন। শ্রমিকের জন্য এক দিরহাম করে দৈনিক পারিশ্রমিক ধার্য করলেন। আর যে বীজ দিয়েছিলো তিনি তাকে বীজের মূল্য পরিশোধ করে দিলেন। ইবনু হাবীব বলেছেন, তিনি এ জন্য জমিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেছিলেন যে, তারা পূর্বে অংশ বন্টনের ব্যাপারে ফায়সালা করে নেয়নি।
ইবনু হাবীব আরো বলেন, ইমাম মালিক [রা] এর মত হচ্ছে, জমি যে আবাদ করবে তার এবং তার জিম্মায় বর্গা বা চাষাবাদ হবে। দলিল হচ্ছে, নবী করীম [সা] এর বর্ণিত হাদীস। সেখানে বলা হয়েছে- 'অনাবাদী জমি যে আবাদ করবে মালিকানা তার। তাতে অন্য কারো কোনো অধিকার নেই।'
মুসান্নাফ আবু দাউদে হযরত রাফে' ইবনু খাদীজ [রা] থেকে বর্ণিত, তিনি একটি জমি চাষ করছিলেন। এমতাবস্থায় নবী করীম [সা] সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে জমিতে পানি দিতে দেখে রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন, 'জমি কার এবং এর ফসল কার? তিনি বললেন, 'চাষ, বীজ এবং শ্রম আমার তাই আমার এক অংশ এবং উমুকে জমির মালিক হিসেবে তার এক অংশ।' শুনে তিনি বললেন- 'তুমি গুণাহর কাজ করেছো, জমি তার মালিককে ফেরত দাও এবং তুমি তোমার খরচ আদায় করে নাও।'
📄 মুসাকাত, চুক্তি ও বর্গাচাষ
মুয়াত্তা ইমাম মালিকে-ইবনু শিহাব, সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সা] খায়বারের ইহুদীদের বলেছিলেন, 'তোমরা ততোদিন পর্যন্ত বলবত থাকবে যতোদিন আল্লাহ্ তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। এ জায়গার উৎপাদিত ফল ও ফসলের অর্ধেক আমাদেরকে প্রদান করতে হবে। পরবর্তীতে আবদুল্লাহ্ ইবনু রাওয়াহা [রা] কে তিনি পাঠালেন খায়বারে। তাঁকে বলে দিলেন, তুমি তাদেরকে বলবে, 'আর যদি তোমরা চাও, সমস্ত ফল ও ফসল তোমরা রাখবে। তবে আমাদেরকে আমাদের অংশের মূল্য পরিশোধ করে দেবে। আর যদি চাও, সমস্ত ফল ও ফসল আমরা নেবো, তবে তোমাদেরকে তোমাদের অংশের মূল্য পরিশোধ করে দেবো।'
আবু দাউদে আছে- ইবনু রাওয়াহা তাদের ফসলের আনুমানিক পরিমাণ ৪০ হাজার ওয়াসাক নির্ধারণ করলেন। তারা তা স্বীকার করে নিয়ে ২০ হাজার ওয়াসাক পরিশোধ করলো।
মুসলিম শরীফে আছে- রাসূল [সা] খায়বারের ইহুদীদেরকে বললেন- 'আমি তোমাদেরকে ততোদিন পর্যন্ত এখানে বলবৎ রাখবো, যতোদিন আমরা চাবো।' ইবনু ওমর [রা] বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- 'তাদেরকে এই শর্ত দেয়া হলো যে, তারা সেগুলো তাদের টাকা খরচ করে আবাদ করবে এবং উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক নবী করীম [সা] কে প্রদান করবে।'
এ থেকে বুঝা যায় বর্গাচাষের বেলায় মালিক শুধু জমি প্রদান করবেন এবং শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কৃষকের।
ইমাম মালিক [রহ] বলেন- যে সব গাছে ফল হয় তা মুসাকাত দেয়া জায়েয আছে। যেমন- খেজুর, আঙ্গুর, যাইতুন, বেদানা, বাদাম প্রভৃতি। পারিশ্রমিক আলোচনা সাপেক্ষে নির্দিষ্ট হতে পারে।
ইমাম শাফিঈ [রহ] বলেন- খেজুর এবং আঙ্গুর ছাড়া অন্য কোনো ফলে মুসাকাত জায়েয নেই। বিশেষ করে অর্ধেক প্রদানের শর্তে। ইমাম শাফিঈ [রহ] এর অন্য বর্ণনা মতে যে সব গাছ সবল ও দৃঢ় সেগুলোতে মুসাকাত জায়েয।
ইমাম আবু হানিফা [রহ] বলেন- মুসাকাত প্রদান সম্পূর্ণ অবৈধ। কেননা তা এক অনির্দিষ্ট পারিশ্রমিক। এ ব্যাপারে নবী করীম [সা], হযরত আবু বকর [রা] ও হযরত ওমর [রা] খায়বারের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তার বিপক্ষে প্রমাণ পেশ করেন, যখন খায়বার বিজয় হয়েছিলো তখন খায়বারের অধিবাসীকে সম্ভবত ক্রীতদাস বানানো হয়েছিলো, তাই ক্রীতদাস ও মনিবের মধ্যে যে কোনো ধরনের কাজের চুক্তি হতে পারে। তা অন্য লোকদের জন্য দলিল হতে পারে না।
ইমাম আবু হানিফা [রহ] এর মতের বিপক্ষেও যুক্তি আছে যে, তারা ক্রীতদাস ছিলো না। কারণ নবী করীম [সা] হযরত আবু বকর [রা] এর সময় এবং ওমর [রা] এর শাসন কালের প্রথম দিকে তাদের সাথে মুসাকাত চুক্তি ছিলো কিন্তু পরবর্তীতে হযরত ওমর [রা] তাদেরকে সেখান থেকে বহিস্কার করেন। অথচ তাদেরকে বিক্রি করা হয়নি কিংবা মুক্তও করা হয়নি। তাছাড়া কোনো মুহাদ্দিসও এই মর্মে হাদীস বর্ণনা করেননি যে- তাদের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া হয়েছে কিনা। অবশ্য সূরা আত তাওবা অবতীর্ণ হয়েছে খায়বার বিজয়ের পর।
ইমাম শাফিঈ [রহ] খেজুর এবং আঙ্গুর ছাড়া অন্য কোনো ফল বা ফসলে মুসাকাত অবৈধ মনে করেছেন তার বিপক্ষে বক্তব্য হচ্ছে- রাসূল [সা] খায়বারে ফল ও ফসল উভয়টিই অর্ধেক প্রদানের শর্তে মুসাকাত দিয়েছিলেন। ইমাম শাফিঈ [রহ] জমি মুসাকাত প্রদানে নিষেধ করেছেন, কারণ তা ফসলের বিনিময়ে প্রদান করা হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে নস বিদ্যমান। আর আঙ্গুর বাগান মুসাকাত প্রদান করা খেজুর বাগানের ওপর কিয়াস করা হয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে নস নেই তাছাড়া অধিকাংশ উলামা এ মতের বিরোধিতা করেছেন।
মুসলিম শরীফে আছে- নবী করীম [সা] খায়বার থেকে প্রাপ্ত সম্পদের একশ' ওয়াসাক বেগমদেরকে প্রদান করতেন। তারমধ্যে আশি ওয়াসাক খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক যব।
বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, কা'ব ইবনু মালিক [রা] নবী করীম [সা] এর সময়ে আবদুল্লাহ্ ইবনু আবু হাদরাতের নিকট মসজিদে তার ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদা দেয়। এক পর্যায়ে উভয়ের কণ্ঠস্বর চড়ে যায়। ফলে নবী করীম [সা] তা শুনে ফেলেন। তখন তিনি তাঁর কামরায় অবস্থান করছিলেন। তিনি বেরিয়ে এসে কা'ব ইবনু মালিক [রা] কে ডাকলেন, 'হে কা'ব! কা'ব [রা] উত্তর দিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্। এই যে, আমি এখানে।' তখন তিনি তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে কাছে আসতে বললেন। [অন্য বর্ণনা মতে] তখন তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি কারো নিকট কিছু পাওনা থাকে তার উচিত তাকে ভদ্রভাবে এবং নরম স্বরে তাগাদা দেয়া। চাই সে পুরো গ্রহণ করুক বা অর্ধেক।'
হযরত সামুরা ইবনু জুনদুব [রা] হতে ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। এক আনসারের বাগানে তাঁর খেজুর ছিলো। সেই আনসার সেখানে স্বপরিবারে বসবাস করতেন। হযরত সামুরা ইবনু জুনদুব [রা] যখন তার খেজুরের নিকট আসতেন তখন তিনি অপছন্দ করতেন। তিনি সামুরা [রা] এর নিকট আবেদন করলেন, খেজুরগুলো আমার নিকট বিক্রি করে দাও। কিন্তু তিনি রাজী হলেন না। অতঃপর আনসার ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলো, তা আমার সাথে বদল করো। এবারও তিনি অস্বীকার করলেন। তখন আনসার ব্যক্তি নবী করীম [সা] এর কাছে এসে মোকদ্দমা দায়ের করলেন। তিনি সামুরা ইবনু জুনদুব [রা] কে বললেন, তুমি তোমার খেজুরগুলো বিক্রি করে দাও। তিনি বললেন, 'না।' বলা হলো, বদল করে নাও। তিনি অস্বীকার করলেন। তারপর নবী করীম [সা] বললেন, 'তুমি আমাকে তা দান করে দাও। তার চেয়ে উত্তম ফসল তোমাকে দেবো। এবারও তিনি অস্বীকার করলেন। তখন নবী করীম [সা] বললেন, 'তুমি তো ক্ষতিগ্রস্থ হলে।' তারপর তিনি আনসারকে বললেন, 'যাও, তুমি তার খেজুর ছিড়ে ফেলে দাও।'
টিকাঃ
২- ফলবান বৃক্ষ ও কৃষিজমির তত্ত্বাবধান, উৎপাদন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে ফলের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা পারিশ্রমিক আদান প্রদানের ব্যবস্থাকে মুসাকাত বলে। আমরা একে সাধারনত বর্গাচাষ বলে থাকি। -অনুবাদক