📄 ক্রয় বিক্রয়ে ধোঁকা দেয়া
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, একলোক নবী করীম [সা] কে বললো, আমি বেচাকেনা করতে গেলে প্রতারণার শিকার হই। তখন নবী করীম [সা] বললেন, 'তুমি যখন কারো সাথে বেচাকেনা করবে, তখন বলে দেবে এতে যেন কোনো প্রতারণা না হয়।' এরপর সে কোনো কিছু বেচাকেনা করতে গেলেই বলতো- এতে যেন কোনো ধোঁকা না থাকে। উক্ত ব্যক্তির নাম ছিলো হিব্বান ইবনু মুনকাজ [রা]। মদুওনায় হযরত ওমর ইবনু খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, তোমাদের বেচাকেনার বেলায় ঐ শর্তই প্রযোজ্য যা নবী করীম [সা] হিব্বান ইবনু মুনকাজকে বলেছিলেন। শর্তটি হচ্ছে বিক্রিত মাল ফেরত দেবার অবকাশ তিন দিন। এ কথার উপর ভিত্তি করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়ের ফায়সালা করেছেন। আবু দাউদে উতবা ইবনু আহমার হতেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তবে সেখানে আরো আছে, 'গোলাম খরিদের ব্যাপারেও অবকাশ তিন দিন।'
বুখারীতে হযরত ইবনু খালিদ [রা] বর্ণনা করেছেন, আমার জন্য নবী করীম [সা] এই লিখে দিয়েছিলেন, সে ঐ ব্যক্তি যার জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ স্বয়ং খরচ করেছেন। বেচাকেনার সময় কোনো মুসলমান কোনো মুসলমানের কাছে কিছু গোপন করবে না। তাছাড়া কোনো গোপনীয়তা বা গায়েলাও নেই। কাতাদা [রহ] বলেছেন, গায়লা বলা হয় যিনা, চুরি এবং কোনো কথাকে পৃথক করা।
কিতাবুল ফাওয়ায়েদে বর্ণিত আছে- ইবনু খালিদ নবী করীম [সা] এর কাছে থেকে এক গোলাম ক্রয় করেছিলেন। তখন নবী করীম [সা] তাকে লিখে দিয়েছিলেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর নিকট থেকে সে গোলাম খরিদ করেছে।
বুখারী শরীফে আছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] এক ইহুদীর কাছ থেকে লৌহবর্ম বন্ধক রেখে কিছু খাদ্য কিনেছিলেন। ইমাম বুখারী এ হাদীসটি তিনটি অধ্যায়ের শিরোনাম বানিয়েছেন। তার একটি হচ্ছে- 'নবী করীম (সা) কর্তৃক ধারে জিনিস কেনা প্রসঙ্গে।' অন্যটি 'জামানত সম্পর্কে' এবং সর্বশেষ শিরোনাম হচ্ছে- 'রেহেন বা বন্ধক প্রসঙ্গে।' বুখারীর অন্য বর্ণনায় হযরত আয়িশা [রা] থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- নবী করীম (সা) এমন (নিঃস্ব) অবস্থায় ইস্তিকাল করেছেন, যখন তার লৌহবর্মটি মাত্র তিন সা' যবের বিনিময়ে এক ইহুদীর কাছে বন্ধক ছিলো।
মদুওনায় হযরত যায়িদ ইবনু আসলাম [রা] হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি নবী করীম [সা] এর কাছে এসে পাওনার জন্য তাগাদা করলো। এমনকি কিছু তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হলো। যারা এ ঘটনা দেখলেন, তারা তাকে শাসাতে লাগলেন। তখন নবী করীম (সা) বললেন, 'তাকে কিছু বলো না, কেননা সে তার অধিকারের ব্যপারে বলবেই।' তারপর তাকে বললেন, 'অমুক ইহুদীর নিকট যাও, সে আমার হয়ে তোমাকে কিছু দিয়ে দেবে, পরে আমার কাছে কোনো মাল এলে আমি তা পরিশোধ করে দেবো।' কিন্তু সেই ইহুদী তা অস্বীকার করে বললো- 'আমি তাকে কোনো সওদা দেবো না। তবে কোনো কিছু বন্ধক পেলে দেবো। শুনে রাসূলাল্লাহ্ [সা] বললেন, 'আমার এ বর্মটি তার কাছে নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! আসমানের নিচে এবং জমিনের ওপর আমি আমানতদার।'
📄 দাসী বিক্রির সময় মা ও সন্তানকে পৃথক না করা
প্রামাণ্য হাদীস সমূহে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম [সা] বলেছেন- 'মাকে তার সন্তানের ব্যাপারে হয়রান করা যাবে না। যে ব্যক্তি মা ও তার সন্তানের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাবে, আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন তার ও তার প্রিয়জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবেন।' মদুওনায় জাফর ইবনু মুহাম্মদ হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর কাছে যখন বন্দীদের আনা হতো, তিনি তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। যখন কোনো মহিলা বন্দীকে কাঁদতে দেখতেন, জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমার কান্নার কারণ কি?' কেউ বলতো, আমার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। আবার কেউ বলতো, আমার কন্যাকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তখন তিনি তাদের সন্তানকে মায়ের নিকট ফেরত দিতে নির্দেশ দিতেন।
জাফর ইবনু মুহাম্মদের অন্য বর্ণনায় আছে- হযরত আবু উসাইদ আনসারী বাহরাইন থেকে কিছু বন্দী এনে নবী করীম [সা] এর নিকট হাজির করলেন। তিনি বন্দীদেরকে গভীর মনোযোগের সাথে দেখতে লাগলেন। হঠাৎ এক সারি থেকে এক স্ত্রীলোক কেঁদে উঠলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কাঁদছো কেন?' সে বললো, আমার ছেলেকে বনী আয়েস গোত্রে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। রাসূল [সা] আবু উসাইদ [রা] কে বললেন, 'তুমি জলদি সওয়ার হয়ে যাও। ঐ ছেলের দাম যাই হোক না কেন তুমি তাকে কিনে আনবে।' তখন তিনি গিয়ে ঐ ছেলেকে কিনে এনে স্ত্রীলোকটির কাছে দিলেন।
ইউনুস ইবনু আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত- নবী করীম [সা] হযরত আলী [রা] এর নেতৃত্বে একদল সৈন্যবাহিনী কোনো এক অভিযানে পাঠান। সে অভিযানে বেশ কিছু মালামাল مسلمانوں হস্তগত হয়। তার মধ্যে কিছু বাঁদী ছিলো। হযরত আলী [রা] এক বাঁদীর বিনিময়ে কিছু উট কিনে নেন। সেখানে বিক্রিত বাঁদীর মা ও উপস্থিত ছিলো। সে নবী করীম [সা] এর নিকট অভিযোগ দায়ের করলো। রাসূল [সা] আলী [রা] কে বললেন- 'তুমি কি মা ও মেয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলে?' হযরত আলী [রা] গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত হয়ে গেলেন। রাসূল [সা] বার বার তাঁকে এ কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। অগত্যা হযরত আলী [রা] বললেন, 'আমি যাবো। গিয়ে তাকে ফেরত নিয়ে আসবো।'
হুসাইন ইবনু আবদুর রহমান বিনতে জমীরা তার দাদী জমীরা হতে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] জমীরার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পেলেন সে কাঁদছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- 'তোমার কান্নার কারণ কি? তোমার কি খাদ্য অথবা কাপড় কিংবা থাকার জায়গার প্রয়োজন?' সে বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমার ও আমার মেয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়া হয়েছে।'
রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন- 'মা ও মেয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যাবে না।' পরে তার কাছে লোক পাঠানো হলো যার কাছে জমীরা [রা] ছিলো। তাকে ডেকে এনে এক পূর্ণাঙ্গ বয়সের হৃষ্টপুষ্ট উটের বিনিময়ে জমীরা [রা] কে খরিদ করে আনা হলো।
হযরত উরওয়া ইবনু যুবাইর [রা] থেকে বর্ণিত, যখন নবী করীম [সা] ও হযরত আবু বকর [রা] হিজরত করে মদীনায় যান, তখন রাস্তায় এক গরীব লোকের কাছ থেকে ছাগল কিনেন। তা সে দোহন করবে এই শর্তে বেচাকেনা হয়।
বর্ণিত আছে- নবী করীম [সা] ও হযরত আবু বকর [ra] উভয়ে বনী হুজাইলের এক ব্যক্তিকে পথ দেখিয়ে দেবে এই শর্তে মজদুর ঠিক করেন। সে ছিলো মুশরিক কুরাইশ। উভয়ে তাঁদের উটনী দুটো তার কাছে রেখেছিলেন এবং তিনদিন পর ছুর পাহাড়ের গুহায় পৌঁছে দেয়ার ওয়াদা নিয়েছিলেন। কথামতো সে তৃতীয়দিন প্রভাতকালে উভয়ের উটনীসহ ছুর পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হয়। ইমাম বুখারী- এ হাদীসটিকে উল্লেখ করে প্রমাণ করেছেন, পারিশ্রমিক চুক্তি অনুযায়ী তিন দিন, একমাস বা এক বৎসর কাজ করানোর পর আদায় করা বৈধ।
ইমাম মালিক থেকে বর্ণিত - নবী করীম [সা] মদীনার নিকটবর্তী কোনো এক সফরে হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ [রা] থেকে একটি উট কিনেছিলেন। শর্ত ছিলো, মদীনা পর্যন্ত হযরত জাবির [রা] তার ওপর আরোহণ করতে পারবেন। অন্য বর্ণনায় আছে- নবী করীম (সা) তাঁকে বললেন 'এর ওপর সওয়ার হয়ে মদীনা পর্যন্ত পৌঁছার অধিকার তোমার আছে।'