📄 ক্রেতা মাল ক্রয়ের পর মূল্য পরিশোধের আগেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে অথবা মৃত্যুবরণ করলে
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- রাসূলাল্লাহ্ [সা] বলেছেন- 'যদি কেউ নিঃস্ব হয়ে যায় এবং কেউ তার নিকট (বাকীতে) বিক্রিত মাল অক্ষত অবস্থায় পায়। তাহলে সেই ব্যক্তি উক্ত মালের বেশী হকদার। মুয়াত্তায় ইমাম মালিক ইবনু শিহাব হতে এবং তিনি আবু বাকরা ইবনু আবদুর রহমান থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম [সা] বলেছেন, 'কেউ কোনো বস্তু (বাকীতে) বিক্রি করলো তারপর ক্রেতা অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লো অথচ বিক্রেতা তার মূল্য বাবদ কিছুই পায়নি। যদি ঐ বিক্রিত মাল [ক্রেতার নিকট] অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তবে বিক্রেতাই ঐ মালের বেশী হকদার। আর যদি ক্রেতা মরে গিয়ে থাকে তবে বিক্রেতা অন্যান্য পাওনাদারের সমপর্যায়ভুক্ত হবে।' হযরত আবু হুরাইরা [রা] থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- নবী করীম [সা] বলেছেন - 'যে ব্যক্তি [বাকীতে মাল কেনার পর] নিঃস্ব হয়ে যায় অথবা মরে যায় আর যদি সেই মাল তার নিকট অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তা বিক্রেতা ফিরিয়ে নেয়ার অধিক হকদার।'
📄 চোরাই মাল
দালায়েলে ওসীলীতে ইকরামা ইবনু খালিদ হযরত উমাইদ ইবনু হুযাইর থেকে বর্ণনা করেছেন, আমীর মুয়াবিয়া মারওয়ানের নিকট লিখে পাঠিয়েছিলেন- যদি কোনো ব্যক্তির মাল চুরি হয় এবং সে তা অবিকৃত অবস্থায় পায় তবে ঐ ব্যক্তি তার অধিকতর হকদার। তা যেখানেই পাওয়া যাক না কেন। তখন মারওয়ান আমার কাছে লিখলো। আমি সে সময় ইয়ামামার প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। আমি তাকে লিখে জানালাম, নবী করীম [সা] নির্দেশ দিয়েছেন- 'যখন চুরির মাল সেই ব্যক্তির কাছে পাওয়া যাবে যে অন্য কোনো উপায়ে তার মালিক হয়েছে, তখন মালিক সেই জিনিসের মূল্য দিয়ে তার থেকে মাল ফেরত নেবে অথবা তার মালের চোরকে সন্ধান করবে।' হযরত আবু বকর [রা], ওমর [রা] এবং হযরত ওসমান [রা]ও এ রায়কেই কার্যকর করেছেন। মারওয়ান আমার পত্রটি মুয়াবিয়া (রা) এর কাছে পাঠিয়ে দেন, পত্র পেয়ে তিনি মারওয়ানকে লিখে পাঠান, তুমি এবং ইবনু হুযাইর আমার পাঠানো নির্দেশের বাইরে কোনো ফায়সালা করতে পারবে না বরং আমি তোমাদের [পাঠানো মতের] বিপরীতে ফায়সালা করবো। কাজেই আমি যে নির্দেশ পাঠিয়েছি তার ওপর আমল করবে। তখন মারওয়ান তা আমার নিকট পাঠিয়ে দিলে আমি বললাম, যতোক্ষণ আমার ইচ্ছে শক্তি আছে ততোক্ষণ আমি ঐ নির্দেশ মানবো না।
নিশাপুরী বলেছেন, ফকীহদের মধ্যে কেউ এ হাদীসের প্রবক্তা বলে আমার জানা নেই। একমাত্র ইসহাক ছাড়া। ইমাম আহম্মদ ইবনু হাম্বলকে এ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, আমি তা মানিনা। এ ব্যাপারে ফিকাহবিদদের মধ্যে ইখাতিলাফ আছে। আমি ঐ হাদীসের অনুসরণ করি যা হাশিম যথাক্রমে মুসা ইবনু সায়িব, কাতাদা, হাসান, সামুরা, নবী করীম [সা] থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলাল্লাহ্ [সা] বলেছেন- 'যে নিজের মাল অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট পাবে সে ঐ মালের অধিকতর হকদার।'
📄 আমদানী বা উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে
বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম [সা] বলেছেন, 'ভালো কথা বলো, যদি আল্লাহ্ ফলন বন্ধ করে দেন তবে তোমরা আরেক ভাইয়ের মাল কিভাবে নেবে?' অন্য হাদীসে আছে- 'কেউ তার ভাইয়ের মাল কিসের বিনিময়ে বৈধ করবে?' এ হাদীসটি ইমাম মালিক মুয়াত্তায় মারফু সনদে রিওয়ায়াত করেছেন। তাছাড়া দালায়েলেও এটা বর্ণিত আছে।
মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রা) হতে বর্ণিত- নবী করীম [সা] প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতি হলে তা পূরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইমাম মালিক বলেছেন, যদি তা এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পৌছে তবে ক্ষতিপূরণ করতে হবে। তিনি এ হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। ইমাম শাফিঈর এক বর্ণনায় এবং ইমাম আবু হানিফা [রহ], লাইছ ও সুফিয়ান সাওরী [রহ] বলেছেন, যে ফল ক্রয় করবে, যদি তা পরিপক্ক হওয়ার পর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। যদি সে ক্ষতি কৃত্রিমভাবে হয় তবু।
তাদের দলিল হচ্ছে নিম্নোক্ত হাদীসটি। নবী করীম [সা] এর যুগে মুয়ায ইবনু জাবাল [রা] ফল কিনে ক্ষতিগ্রস্থ হন এবং তার ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন নবী করীম [সা] তাকে সাহায্য করার ব্যাপারে লোকদের আহবান জানান। লোকেরা তাকে সাহায্য করলো বটে কিন্তু তা ঋণ পরিশোধ করার মতো যথেষ্ট হলো না। তখন রাসূলুল্লাহ্ [সা] তাঁর পাওনাদারকে বললেন- 'যা পাচ্ছো তা নাও এর বেশী তোমাকে দেয়া যাবে না।'
মুয়ায [রা] এর এ ঘটনাটি ঘটেছিলো হিজরী নবম সনে। নবী করীম [সা] তাঁকে সাহায্যের জন্য আবেদন করায়, সাতভাগের পাঁচ ভাগ পরিমাণ পাওয়া গেলো। তখন তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে তা বিক্রি করে দেন। রাসূল [সা] বললেন- 'এ গুলো বাদ দাও।' অতঃপর তিনি তাঁকে ইয়েমেনে পাঠান এবং বলেন, 'সম্ভবত আল্লাহ্ তোমাকে ধনী বানিয়ে দেবেন।' তিনি নবী করীম [সা] এর সাথে তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। নবী করীম [সা] এর ইন্তিকালের পর হযরত আবু বকর [রা] এর খিলাফতকালে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাঁর সাথে বিরাট এক পাল ছাগল এবং অনেক দাস-দাসী ছিলো। হযরত ওমর [রা] তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, খবর কি? তিনি উত্তর দিলেন, এগুলো লোকজন আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। ওমর [রা] বললেন, কেন তোমাকে লোকজন এগুলো হাদিয়া দিয়েছে? তিনি বললেন, এগুলো লোকেরা আমাকে এমনিই হাদিয়া দিয়েছে। ওমর [রা] বললেন, তুমি এ কথাগুলো হযরত আবু বকর [রা] এর কাছে গিয়ে বলো। মুয়ায [রা] বললেন, আমি একথা আবুবকর [রা] এর কাছে বলবোনা। সেই রাতে মুয়ায [রা] স্বপ্ন দেখলেন, তিনি জাহান্নামের কিনারায় পৌঁছে গেছেন। হযরত ওমর [রা] তাঁকে পেছন থেকে কোমড় ধরে টানাটানি করছেন, যেন মুয়ায [রা] আগুনে না পড়ে যান। এ স্বপ্ন দেখে তিনি কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় বসে পড়লেন। তারপর তিনি আবু বকরের কাছে গিয়ে হযরত ওমর [রা] এর পরামর্শ অনুযায়ী সব কথা খুলে বললেন। তখন আবুবকর [রা] তাঁর সমস্ত সম্পদকে বৈধ সম্পদ বলে ঘোষণা দিলেন এবং বললেন, আমি নবী করীম [সা] কে বলতে শুনেছি, 'সম্ভবত আল্লাহ্ তোমাকে ধনী বানিয়ে দেবেন।' হযরত মুয়ায [রা] তাঁর আগের ঋণ দাতাদের অবশিষ্ট পাওনা মিটিয়ে দিলেন। [তাবারী]
বুখারীতে হযরত যায়িদ ইবনু সাবিত [রা] হতে বর্ণিত - লোকজন নবী করীম [সা] এর সময়ে গাছে থাকাবস্থায় অপরিপক্ক ফল বেচাকেনা করতো। যখন তা পরিপক্ক হতো তখন ক্রেতা বলতো, ফলে লোকসান হয়েছে, রোগের আক্রমণ হয়েছে, কাঁচা ফল ঝরে গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ইত্যাদি। এটিকে তারা বাহানা বানিয়ে নিলো। আর নবী করীম [সা] এর নিকট এ সংক্রান্ত অধিক সংখ্যক মামলা দায়ের হতে লাগলো। তখন তিনি ঘোষণা করলেন- 'ফল পরিপক্ক হওয়ার আগে তা বেচা কেনা করা যাবে না।'
📄 ক্রয় বিক্রয়ে ধোঁকা দেয়া
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, একলোক নবী করীম [সা] কে বললো, আমি বেচাকেনা করতে গেলে প্রতারণার শিকার হই। তখন নবী করীম [সা] বললেন, 'তুমি যখন কারো সাথে বেচাকেনা করবে, তখন বলে দেবে এতে যেন কোনো প্রতারণা না হয়।' এরপর সে কোনো কিছু বেচাকেনা করতে গেলেই বলতো- এতে যেন কোনো ধোঁকা না থাকে। উক্ত ব্যক্তির নাম ছিলো হিব্বান ইবনু মুনকাজ [রা]। মদুওনায় হযরত ওমর ইবনু খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, তোমাদের বেচাকেনার বেলায় ঐ শর্তই প্রযোজ্য যা নবী করীম [সা] হিব্বান ইবনু মুনকাজকে বলেছিলেন। শর্তটি হচ্ছে বিক্রিত মাল ফেরত দেবার অবকাশ তিন দিন। এ কথার উপর ভিত্তি করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়ের ফায়সালা করেছেন। আবু দাউদে উতবা ইবনু আহমার হতেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তবে সেখানে আরো আছে, 'গোলাম খরিদের ব্যাপারেও অবকাশ তিন দিন।'
বুখারীতে হযরত ইবনু খালিদ [রা] বর্ণনা করেছেন, আমার জন্য নবী করীম [সা] এই লিখে দিয়েছিলেন, সে ঐ ব্যক্তি যার জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ স্বয়ং খরচ করেছেন। বেচাকেনার সময় কোনো মুসলমান কোনো মুসলমানের কাছে কিছু গোপন করবে না। তাছাড়া কোনো গোপনীয়তা বা গায়েলাও নেই। কাতাদা [রহ] বলেছেন, গায়লা বলা হয় যিনা, চুরি এবং কোনো কথাকে পৃথক করা।
কিতাবুল ফাওয়ায়েদে বর্ণিত আছে- ইবনু খালিদ নবী করীম [সা] এর কাছে থেকে এক গোলাম ক্রয় করেছিলেন। তখন নবী করীম [সা] তাকে লিখে দিয়েছিলেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর নিকট থেকে সে গোলাম খরিদ করেছে।
বুখারী শরীফে আছে- রাসূলুল্লাহ্ [সা] এক ইহুদীর কাছ থেকে লৌহবর্ম বন্ধক রেখে কিছু খাদ্য কিনেছিলেন। ইমাম বুখারী এ হাদীসটি তিনটি অধ্যায়ের শিরোনাম বানিয়েছেন। তার একটি হচ্ছে- 'নবী করীম (সা) কর্তৃক ধারে জিনিস কেনা প্রসঙ্গে।' অন্যটি 'জামানত সম্পর্কে' এবং সর্বশেষ শিরোনাম হচ্ছে- 'রেহেন বা বন্ধক প্রসঙ্গে।' বুখারীর অন্য বর্ণনায় হযরত আয়িশা [রা] থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- নবী করীম (সা) এমন (নিঃস্ব) অবস্থায় ইস্তিকাল করেছেন, যখন তার লৌহবর্মটি মাত্র তিন সা' যবের বিনিময়ে এক ইহুদীর কাছে বন্ধক ছিলো।
মদুওনায় হযরত যায়িদ ইবনু আসলাম [রা] হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি নবী করীম [সা] এর কাছে এসে পাওনার জন্য তাগাদা করলো। এমনকি কিছু তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হলো। যারা এ ঘটনা দেখলেন, তারা তাকে শাসাতে লাগলেন। তখন নবী করীম (সা) বললেন, 'তাকে কিছু বলো না, কেননা সে তার অধিকারের ব্যপারে বলবেই।' তারপর তাকে বললেন, 'অমুক ইহুদীর নিকট যাও, সে আমার হয়ে তোমাকে কিছু দিয়ে দেবে, পরে আমার কাছে কোনো মাল এলে আমি তা পরিশোধ করে দেবো।' কিন্তু সেই ইহুদী তা অস্বীকার করে বললো- 'আমি তাকে কোনো সওদা দেবো না। তবে কোনো কিছু বন্ধক পেলে দেবো। শুনে রাসূলাল্লাহ্ [সা] বললেন, 'আমার এ বর্মটি তার কাছে নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! আসমানের নিচে এবং জমিনের ওপর আমি আমানতদার।'