📄 বায়ে সালাম ও ক্রয় বিক্রয়ের অন্যান্য বিধানাবলী
বুখারী ও মুসলিমে হযরত ইবনু আব্বাস [রা] থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যখন নবী করীম [সা] হিজরত করে মদীনা আসেন, তখন মদীনাবাসী অপরিপক্ক খেজুর ২/৩ বৎসরের জন্য বিক্রি করে দিতো। দালায়েলে ওসীলী নামক গ্রন্থে আরো আছে- তিনি এ ধরনের ক্রয় বিক্রয়কে নিষেধ করলেন। আবু দাউদে আছে, এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির কাছে খেজুর বিক্রি করলেন। কিন্তু সে বছর তার গাছে কোনো খেজুর ধরলো না, তখন উভয়ে নবী করীম (সা) এর দরবারে এসে অভিযোগ করলেন। নবী করীম [সা] বিক্রেতাকে বললেন, 'তুমি কিভাবে তার সম্পদ ভোগ করবে? তুমি তার মাল তাকে ফেরত দাও।' তারপর বললেন, 'যতোক্ষণ খেজুর পাকা না ধরে ততোক্ষণ পর্যন্ত তার অগ্রিম বেচাকেনা করবে না। যদি তুমি চাও, নির্দিষ্ট পরিমাণ, নির্দিষ্ট ওজন ও মূল্য পরিশোধের দিনক্ষণ ঠিক করে বেচাকেনা করবে তা পারো।' হযরত ইবনু ওমর [রা] থেকে বর্ণিত- নবী করীম (সা) এর সময়ে যারা তরকারী ক্রয় করে সেখানে বসেই বিক্রি করতো তাদেরকে আমি শাস্তি দিতে দেখেছি। কিনে বাড়ীতে নেয়ার পর যদি চায় তবে বিক্রি করতে পারবে। নাসাঈ শরীফেও এ বিষয়ে হাদীস আছে।
মুয়াত্তা ও বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে- নবী করীম [সা] আনসারদের মধ্য থেকে বনী আদীর এক ব্যক্তিকে খায়বারে কালেক্টর হিসেবে পাঠান। তিনি এসে রাসূল [সা] এর নিকট কিছু উত্তম খেজুর রাখেন। রাসূল [সা] তাকে জিজ্ঞেস করলেন- 'খায়বারের সব খেজুরই কি এরকম?' তিনি বললেন- না, আমি দু'সা' এর বিনিময়ে এক সা' এবং তিন সা' এর বিনিময়ে দু'সা' করে উত্তম খেজুর সংগ্রহ করেছি। নবী করীম [সা] বললেন- 'কখনো এরূপ করবে না বরং আগে তোমার গুলো বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করবে তারপর সেই টাকা দিয়ে ভালো খেজুর কিনে নেবে।' বুখারী শরীফে আছে- 'ওজন এবং পরিমাপের ব্যাপারেও অনুরূপ করবে।' মুসলিম শরীফেও এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আরো অতিরিক্ত আছে, 'এরূপ করা সূদের অন্তর্ভুক্ত।' অন্য হাদীসে আছে- রাসূল [সা] বললেন- 'এগুলো ফেরত দিয়ে আমাদের পাওনা খেজুরগুলো এনে বিক্রি করে দাও। তারপর ঐ রকম খেজুর কিনে আন।'
মুয়াত্তা ইমাম মালিকে ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ [রহ] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- খায়বার বিজয়ের দিন রাসূলে আকরাম [সা] এর কাছে এমন একটি হার নেয়া হলো যাতে সোনা এবং হীরের কারুকাজ ছিলো। তা গনীমতের মালের অন্তর্ভূক্ত ছিলো বিধায় বিক্রির প্রয়োজন হয়ে পড়লো। তখন নবী করীম [সা] এর নির্দেশে হার থেকে সোনা পৃথক করা হলো। তিনি বললেন- 'এরূপ মিশ্র জিনিসের সোনা পৃথক না করে বিক্রি করো না।' বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে- 'খেজুরের গাছ তাবীর* করার পর বিক্রি করা হলে ফলের মালিক হবে বিক্রেতা। যদি বিক্রির সময় শর্ত থাকে তবে ভিন্ন কথা। আর গোলাম খরিদ করলে যদি তার কোনো মাল সম্পদ থাকে তা বিক্রেতার। তবে শর্ত থাকলে ভিন্ন কথা।'
ইবনু ওমর [রা] হতে বর্ণিত এক ব্যক্তি তাবীর করা খেজুর গাছ আরেক ব্যক্তির নিকট আছে করে দেন। ফল পাকার পর ফলের মালিকানা নিয়ে উভয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দেন। অবশেষে তারা নবী করীম [সা] এর নিকট এসে মামলা দায়ের করেন। তিনি রায় দিলেন, 'উক্ত ফলের মালিক সেই ব্যক্তি, যে গাছে তাবীর করেছে। তবে যদি ক্রেতা শর্তারোপ করে না থাকে।'
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে হযরত আনাস [রা] থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে- এক ব্যক্তি একটি উট কিনে এবং ক্রয় বিক্রয় বাতিলের জন্য চার দিনের শর্তারোপ করে। একথা শুনে নবী করীম [সা] তার বিক্রয় বাতিল করে দিলেন এবং বললেন, 'ক্রয়-বিক্রয় বাতিলের ক্ষমতা তিন দিন পর্যন্ত বলবত থাকে।' হিশাম ইবনু ইউসুফ ও ইমাম আবু হানিফা [রহ] এ মতের অনুসারী। ইমাম শাফিঈর মতও ইমাম আবু হানিফার অনুরূপ। তবে ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ ও মালিক বলেছেন, ক্রয় বিক্রয় বাতিলের ইখতিয়ার প্রকৃতি ও অবস্থাভেদে হওয়া উচিত। যেমন এক ব্যক্তি অনেক দূরে চারণ ভূমিতে গিয়ে এক হাজার উট অথবা গাভী কিনলেন। তার কথা এবং যে একটি মাত্র কাপড় অথবা একটি উট বা গাভী কিনলেন তার কথা এক নয়।
অন্য বর্ণনায় আছে- ক্রেতা এবং বিক্রেতা পৃথক হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ক্রয়-বিক্রয় বাতিলের ইখতিয়ার থাকে। ওয়াজিহায় ইবনু হাবীব বলেছেন, ক্রেতা বিক্রেতা পৃথক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের ক্রয় বিক্রয় বাতিলের ইখতিয়ার থাকে, একথা নবী করীম [সা] এর বক্তব্য দ্বারা মানসুখ হয়ে গেছে। বলা হয়েছে, যখন ক্রেতা বিক্রেতা মতবিরোধে লিপ্ত হবে তখন বিক্রেতার শপথ নেয়া হবে এবং ক্রেতা ইচ্ছে করলে তা রেখে দিতে পারেন আবার ফেরতও দিতে পারেন এমনকি শপথও করতে পারেন।
মুয়াত্তায় আছে- শুকনো খেজুর ভেজা খেজুর দিয়ে বিনিময় করা যাবে কিনা, এ ব্যাপারে নবী করীম [সা] এর নিকট জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'ভেজা খেজুর কি শুকিয়ে কম হয়ে যায় না?' তারা বললো, হ্যাঁ। তখন তিনি তা করতে নিষেধ করেন।
টিকাঃ
* তাবীর হচ্ছে কৃত্রিম উপায়ে পরাগায়ণ ঘটানো। তখন মদীনাবাসী পুরুষ খেজুর গাছের ফুলের রেনু স্ত্রী খেজুর গাছের ফুলের রেণুর সাথে পরাগায়ণ ঘটাতো, ফলে খেজুরের ফলন বেশী হতো।-অনুবাদক।
📄 বিভিন্ন আপে প্রদর্শনের জন্য গাভীর স্তনবদ্ধি করা
নবী করীম (সা) বলেছেন- তোমাদের কেউ যেন আরেক জনের দামের উপর দাম না বলে। অবশ্য গণিমত এবং ওয়ারিশের সম্পত্তির দাম বলতে পারো। (মুসনাদে ইবনু সাকান)। বুখারীতে আছে- 'ব্যবসায়ীদের সাথে পথে গিয়ে মিলবে না এবং জিনিসের দাম বেঁধে দেবে না। এ ধরনের কাজ পরিত্যাজ্য। যারা এভাবে (দালালীর মাধ্যমে) বেচা কেনা করে তারা গুনাহগার। কারণ তারা জানে, সে অপরকে ধোকা দিচ্ছে। আর ধোকা দেয়া অবৈধ।'
মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলূল্লাহ্ [সা] বলেছেন- 'বিক্রয় কেন্দ্রে পৌঁছার আগে তোমরা কোনো বাণিজ্য কাফেলার সাথে ক্রয় বিক্রয় করবে না, একজন দাম বলছে তোমরা তার ওপর দাম বলবে না তাছাড়া শহরে কোনো লোক গ্রাম্য কোনো লোককে (ঠকানোর উদ্দেশ্যে) বেচাকিনি করে দেবে না। আর উটনী ও ছাগলের দুধ বেশী দেখানোর জন্য তা দোহন না করে ফুলিয়ে রাখবে না। যদি কেউ দুধ আবদ্ধ অবস্থায় খরিদ করে, তবে ক্রেতা তা দোহনের পর ইচ্ছে হয় রাখবে নতুবা ফিরিয়ে দেবে। তবে ফেরতের সময় এক সা' খেজুর দিতে হবে দোহনকৃত দুধের বিনিময়ে।'
মুসলিম শরীফের এক হাদীসে আছে, 'যে ব্যক্তি তা খরিদ করবে, তিন দিন পর্যন্ত তার ইখতিয়ার থাকবে। মন চাইলে রাখবে অন্যথায় ফেরত দেবে। সাথে এক সা' খেজুর দিয়ে দেবে।' নাসাঈ শরীফে আছে, রাসূলে করীম [সা] বলেছেন- 'ব্যবসায়ীর সাথে প্রথমে গিয়ে মিলবে না। যদি কেউ মিলে এবং কোনো কিছু কেনে, বাজারে এসে মালিক তা ফেরত নিতে পারবে। 'নাসাঈতে হযরত আয়িশা [রা] থেকে বর্ণিত আরেক হাদীসে আছে- নবী করীম [সা] এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, 'লাভ জিম্মাদারের।' এ কথার ওপর ভিত্তি করে ইমাম আবু হানিফা [রহ] বলেন, প্রদর্শনীর জন্য স্তনবৃদ্ধি করা পশু ক্রয়ের পর তা ফেরত দেয়ার সময় দুধ দোহনের বিনিময়ে কিছু প্রদান করা জায়েয নয়। এমনকি দুধ বিক্রি করাও জায়েয নয়। শুধু পশু ফেরত দিতে হবে।
আবু দাউদে আছে- এক ব্যক্তি এক গোলাম খরিদ করলো। সে তার কাছে যতোদিন আল্লাহর মঞ্জুর ছিলো ততোদিন রইলো। অতঃপর সে তার মধ্যে দোষ পেয়ে নবী করীম [সা] এর কাছে এসে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। তিনি বললেন, 'তুমি তাকে ফিরিয়ে দাও।' তখন বিক্রেতা বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সে তো আমার গোলাম দিয়ে উপকৃত হয়েছে। নবী করীম (সা) বললেন- 'লাভ জিম্মাদারের।'
📄 ক্রেতা মাল ক্রয়ের পর মূল্য পরিশোধের আগেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে অথবা মৃত্যুবরণ করলে
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- রাসূলাল্লাহ্ [সা] বলেছেন- 'যদি কেউ নিঃস্ব হয়ে যায় এবং কেউ তার নিকট (বাকীতে) বিক্রিত মাল অক্ষত অবস্থায় পায়। তাহলে সেই ব্যক্তি উক্ত মালের বেশী হকদার। মুয়াত্তায় ইমাম মালিক ইবনু শিহাব হতে এবং তিনি আবু বাকরা ইবনু আবদুর রহমান থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী করীম [সা] বলেছেন, 'কেউ কোনো বস্তু (বাকীতে) বিক্রি করলো তারপর ক্রেতা অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লো অথচ বিক্রেতা তার মূল্য বাবদ কিছুই পায়নি। যদি ঐ বিক্রিত মাল [ক্রেতার নিকট] অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তবে বিক্রেতাই ঐ মালের বেশী হকদার। আর যদি ক্রেতা মরে গিয়ে থাকে তবে বিক্রেতা অন্যান্য পাওনাদারের সমপর্যায়ভুক্ত হবে।' হযরত আবু হুরাইরা [রা] থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে- নবী করীম [সা] বলেছেন - 'যে ব্যক্তি [বাকীতে মাল কেনার পর] নিঃস্ব হয়ে যায় অথবা মরে যায় আর যদি সেই মাল তার নিকট অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তা বিক্রেতা ফিরিয়ে নেয়ার অধিক হকদার।'
📄 চোরাই মাল
দালায়েলে ওসীলীতে ইকরামা ইবনু খালিদ হযরত উমাইদ ইবনু হুযাইর থেকে বর্ণনা করেছেন, আমীর মুয়াবিয়া মারওয়ানের নিকট লিখে পাঠিয়েছিলেন- যদি কোনো ব্যক্তির মাল চুরি হয় এবং সে তা অবিকৃত অবস্থায় পায় তবে ঐ ব্যক্তি তার অধিকতর হকদার। তা যেখানেই পাওয়া যাক না কেন। তখন মারওয়ান আমার কাছে লিখলো। আমি সে সময় ইয়ামামার প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। আমি তাকে লিখে জানালাম, নবী করীম [সা] নির্দেশ দিয়েছেন- 'যখন চুরির মাল সেই ব্যক্তির কাছে পাওয়া যাবে যে অন্য কোনো উপায়ে তার মালিক হয়েছে, তখন মালিক সেই জিনিসের মূল্য দিয়ে তার থেকে মাল ফেরত নেবে অথবা তার মালের চোরকে সন্ধান করবে।' হযরত আবু বকর [রা], ওমর [রা] এবং হযরত ওসমান [রা]ও এ রায়কেই কার্যকর করেছেন। মারওয়ান আমার পত্রটি মুয়াবিয়া (রা) এর কাছে পাঠিয়ে দেন, পত্র পেয়ে তিনি মারওয়ানকে লিখে পাঠান, তুমি এবং ইবনু হুযাইর আমার পাঠানো নির্দেশের বাইরে কোনো ফায়সালা করতে পারবে না বরং আমি তোমাদের [পাঠানো মতের] বিপরীতে ফায়সালা করবো। কাজেই আমি যে নির্দেশ পাঠিয়েছি তার ওপর আমল করবে। তখন মারওয়ান তা আমার নিকট পাঠিয়ে দিলে আমি বললাম, যতোক্ষণ আমার ইচ্ছে শক্তি আছে ততোক্ষণ আমি ঐ নির্দেশ মানবো না।
নিশাপুরী বলেছেন, ফকীহদের মধ্যে কেউ এ হাদীসের প্রবক্তা বলে আমার জানা নেই। একমাত্র ইসহাক ছাড়া। ইমাম আহম্মদ ইবনু হাম্বলকে এ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, আমি তা মানিনা। এ ব্যাপারে ফিকাহবিদদের মধ্যে ইখাতিলাফ আছে। আমি ঐ হাদীসের অনুসরণ করি যা হাশিম যথাক্রমে মুসা ইবনু সায়িব, কাতাদা, হাসান, সামুরা, নবী করীম [সা] থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলাল্লাহ্ [সা] বলেছেন- 'যে নিজের মাল অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট পাবে সে ঐ মালের অধিকতর হকদার।'