📄 'খুলা' তালাকের বিধান
মুয়াত্তা, বুখারী ও নাসাঈ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হাবিবা বিনতে সাহল সাবিত ইবনু কায়েসের স্ত্রী ছিলেন। নবী করীম [সা] একদিন ফজরের নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হয়েই অন্ধকারের মধ্যে হাবিবাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কে?' তিনি উত্তর দেন, 'আমি হাবিবা বিনতে সাহল।' তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'কি ব্যাপার?' 'আমি বা সাবিত ইবনু কায়েস কারো আর একত্রে থাকা সম্ভব নয়'- হাবিবা বিনতে সাহল বললো। যখন সাবিত ইবনু কায়েস এলো তখন তিনি বললেন, হাবিবা আল্লাহ্ যা কিছু মনজুর করেছেন তাই করতে থাকুক। হাবিবা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আমাকে যা কিছু দিয়েছে তা সব আমার নিকট মওজুদ আছে।' তিনি তখন সাবিতকে বললেন, 'তুমি সেগুলো তার থেকে নিয়ে নাও।' অতঃপর তিনি সেগুলো নিয়ে তাকে তালাক দিয়ে দিলো। একথাগুলো মুয়াত্তা ও নাসাঈর। বুখারী ও মুসলিমে যেভাবে বলা হয়েছে, তা হচ্ছে- সাবিতের স্ত্রী বললেন, আমি তার [স্বামীর] চরিত্র বা দ্বীনদারীর ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছিনা বরং আমি কুফরীর ভয় করছি। রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন- 'তুমি কি তার দেয়া বাগানটি ফেরত দেবে?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, ফেরত দেবো। তিনি সাবিতকে বলে দিলেন, 'তোমার বাগান তুমি নিয়ে নাও এবং তাকে তালাক দিয়ে দাও।'
ইবনু মানযারের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে- সাবিত তার স্ত্রী জামিলা বিনতে উবাই ইবনু সলুলকে প্রহার করে তার একটি হাত ভেঙ্গে দিয়েছিলো। তার ভাই [অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই] নবী করীম [সা] এর দরবারে অভিযোগ দায়ের করলো। তিনি সাবিতকে ডেকে এনে বললেন, 'তোমার কাছে তার যে মোহর পাওনা আছে তার বিনিময়ে একে ছেড়ে দাও।' তিনি বললেন, ঠিক আছে। তখন রাসূল [সা] স্ত্রীলোকটিকে এক হায়িয [এক ঋতুবস্থা] ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিলেন।
📄 ঐ দাসী প্রসঙ্গে যাকে তার স্বামীর ব্যাপারে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে
উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়িশা [রা] থেকে মুয়াত্তা, বুখারী ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে, বারীরার কারণে তিনটি সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এক. যখন তাকে মুক্ত করে দেয়া হয় তখন তার স্বামীর সাথে বিয়ে ঠিক রাখা না রাখার ইখতিয়ার দেয়া হয়।
দুই. রাসূল [সা] বলেছেন, 'যে দাস মুক্ত করে দেবে সে ঐ গোলামের ওয়ারিশ।
তিন. নবী করীম (সা) যখন তার ঘরে প্রবেশ করেন তখন একটি পাত্রে গোশত রান্না করা হচ্ছিলো, কিন্তু যখন তাঁর সামনে খানা হাজির করা হলো তখন তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাকে হাড্ডি ওয়ালা গোস্ত রান্না করতে দেখিনি?' সে বললো, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ্! আপনি ঠিক দেখেছেন। কিন্তু সেগুলোতো বারীরার জন্য সদকার গোশত। আপনিতো সদকার কোনো জিনিস গ্রহণ করেন না।' হুজুর পাক [সা] বললেন, 'সে তো বারীরার জন্য সদকা কিন্তু আমার জন্য তা হাদীয়া' [লাকি সাদাকাতুন ওয়ালিয়া হাদিয়াহ্। ওয়াজিহায় বর্ণনা করা হয়েছে- বারীরার কারণে চারটি সুন্নাত জারী হয়েছে, তারপর উপরোক্ত তিনটি বর্ণনা করা হয়েছে এবং চতুর্থ সুন্নাত সম্পর্কে বলা হয়েছে- তাকে তিন হায়েয [তিনটি ঋতু অবস্থা] ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বলা হয়েছে- বারীরার স্বামী ছিলো এক হাবশী ক্রীতদাস যাকে মুগীস বলা হতো। উক্ত গ্রন্থের অন্য বর্ণনায় আছে- সে স্বাধীন ছিলো। উরওয়া বলেন, মুক্ত হওয়ার পরও তাকে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। বস্তুত, সঠিক কথা হচ্ছে বারীরার স্বামী ক্রীতদাস ছিলো।
📄 যদি স্ত্রী তালাক দানের স্বীকৃতি স্বরূপ সাক্ষ্য প্রদান করে এবং স্বামী তা অস্বীকার করে
আমর ইবনু শুয়াইব দাদা থেকে এবং তিনি নবী করীম [সা] থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন কোনো মহিলা স্বামী তালাক দিয়েছে বলে দাবী করবে এবং একজন সাক্ষী উপস্থিত করবে তখন স্বামীর কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করতে হবে। যদি সে শপথ করে তবে সাক্ষীর সাক্ষ্য বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি সে শপথ করতে অস্বীকার করে, তবে তার অস্বীকার দ্বিতীয় সাক্ষীর স্থলাভিষিক্ত হবে এবং তালাক কার্যকরী হয়ে যাবে।
📄 স্ত্রীদেরকে অবকাশ দেয়া
মুদুওনাহ্ ও অন্যান্য গ্রন্থে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা [রা] থেকে বর্ণিত- যখন নবী করীম [সা] কে নিজের স্ত্রীদের ব্যাপারে অবকাশ প্রদানের নির্দেশ দেয়া হলো, তখন তিনি সর্বপ্রথম আমাকে ডেকে বললেন, 'আমি তোমাকে একটি কথা বলবো, হুট করে জবাব দেয়ার দরকার নেই, ভেবে চিন্তে বলবে। এমনকি তুমি তোমার মা বাপের পরামর্শও গ্রহণ করতে পারো।' আমি বললাম, 'আপনি অবশ্যই জানেন, আমার মা বাপ আপনার কাছ থেকে পৃথক হবার পরামর্শ কোনো দিনই দেবেন না। তখন তিনি এ আয়াত পড়ে শুনালেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُلْ لِّأَزْوَٰجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا (۲۸) وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ وَٱلدَّارَ ٱلْآخِرَةَ فَإِنَّ ٱللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَٰتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا (۲۹)
হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলে দিন, যদি তোমরা দুনিয়া এবং তার স্বাদ আহলাদ ভোগ করতে চাও তবে এসো আমি তোমাদেরকে কিছু দিয়ে ভালোভাবে বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা পরকালের ঘর পেতে চাও, তবে জেনে রেখো, তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য বিরাট পুরস্কার নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। [সূরা আল আহযাব-২৮-২৯]
আমি বললাম, এ ব্যাপারে আমি আমার মা বাপের সাথে কি আলাপ করবো। আমিতো আল্লাহ্, রাসূল ও পরকালের ঘরই চাই। আয়িশা [রা] আরো বলেন, সমস্ত স্ত্রী একই উত্তর প্রদান করলেন যা আমি বলেছিলাম। তবে এটা তালাক ছিলো না।
অধিকাংশ উলামাদের বক্তব্য হচ্ছে, যদি কোনো স্ত্রীকে অবকাশ দেয়া হয় এবং সে স্বামীর অধীনে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা তালাক হিসাবে গণ্য হবে না। যদি [স্ত্রী] বিচ্ছিন্নতাকে প্রাধান্য দেয় তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব [রা], হযরত যায়িদ ইবনু সাবিত [রা], হযরত ইবনু আব্বাস [রা] ও ইবনু মাসউদ [রা] প্রমুখ এর মতও তাই।
এ ব্যাপারে হযরত আলী ইবনু আবু তালিব [রা] ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ অবস্থায় যদি স্ত্রী স্বামীকে গ্রহণ করে তবে এক তালাক (রিজঈ) গণ্য হবে, আর যদি স্ত্রী পৃথক হয়ে যায়, তবে তিন তালাক (বায়িন) কার্যকরী হবে। তাঁর থেকে আবদুর রাজ্জাক বর্ণনা করেছেন, স্ত্রী যদি পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তবে এক তালাক বায়িন হবে। আর যদি স্ত্রী স্বামীর সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা এক তালাক রিজঈ হবে। ইবনু সালাম তাঁর তাফসীরে কাতাদা [রা] হতে এবং মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে হাসান (বসরী) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তাদেরকে দুনিয়া অথবা আখিরাতের যে কোনো একটিকে বেছে নেয়ার অধিকার দিয়েছিলেন, কিন্তু তালাকের অধিকার প্রদান করেননি।