📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 ঋতুবতীকে তালাক প্রদান

📄 ঋতুবতীকে তালাক প্রদান


মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈ শরীফে হযরত ইবনু ওমর [রা] হতে বর্ণিত আছে- তিনি নবী করীম [সা] এর জমানায় নিজের স্ত্রীকে মাসিকের সময় তালাক প্রদান করেছিলেন। তখন হযরত ওমর [রা] এ ব্যাপারে রাসূলে আকরাম [সা] এর নিকট জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, 'ওমর, তুমি তাকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দাও। একটি পবিত্রবস্থা পার হওয়ার পর মাসিক আসবে এবং তারপর যে পবিত্রতাবস্থা আসবে তা অতিবাহিত হওয়ার পর ইচ্ছে হয় সে রাখবে অন্যথায় সে তালাক দেবে। তবে শর্ত হচ্ছে, যখন তালাক দেবে তার আগে তার সাথে সহবাস করতে পারবে না। উল্লেখিত গ্রন্থসমূহে ইবনু ওমরের অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে তিনি বলেছেন, আমি চিন্তা করে দেখলাম এক তালাক অবশিষ্ট রয়ে গেছে।
আরো বর্ণিত হয়েছে- যখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে মাসিকের সময় তালাক দিলেন, তখন নবী করীম [সা] তাকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন- 'যখন সে পবিত্র হয়ে যাবে তখন তার সাথে সহবাস করবে তারপর [মাসিক শেষে পুনরায়] যে পবিত্রাবস্থা আসবে তখন তুমি চাইলে তাকে রাখতে পারো অন্যথায় বিদায় করে দেবে। এ হাদীসে সহবাসের কথা অতিরিক্ত বলা হয়েছে। একথা রাবী আবুল কাশেম ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেননি।
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে ইবনু জারীহ্ হযরত আবু জুবাইর [রা] থেকে এবং তিনি ইবনু ওমর [রা] থেকে বর্ণনা করেছেন- নবী করীম [সা] স্ত্রীলোকটিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং তালাক কার্যকরী করেননি। এর থেকে আহলে জাহেরগণ ঋতু অবস্থায় তালাক দিলে, তালাক কার্যকরী মনে করেন না। প্রকৃতপক্ষে সমস্ত উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে একমত এবং সত্যি কথা তাই, যা বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে নবী করীম [সা] আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর [রা] কর্তৃক এক তালাক প্রদানের ধারণা করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন তা রিজাঈ তালাক। এ কারণেই তিনি ঋতু অবস্থায় ফিরিয়ে নেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ রিজাঈ তালাকে ফেরত নেবার অবকাশ আছে।
নবী করীম [সা] সুষ্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'যে ব্যক্তি বিদ'আতে জড়িত হয়ে তালাক প্রদান করবে আমরা তার বিদ'আত তার ওপর কার্যকরী করে দেবো।' অর্থাৎ তালাক কার্যকরী বিবেচিত হবে। এ হাদীস থেকে তাদের কথা বাতিল প্রমাণিত হয় যারা বলে, মাসিকের সময় তালাক দিলে তালাক কার্যকরী হয় না।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 কুক্ক এর অর্থ : ঋতু অবস্থা না পবিত্রাবস্থা?

📄 কুক্ক এর অর্থ : ঋতু অবস্থা না পবিত্রাবস্থা?


ইমাম শাফেঈ [রহ] বলেন, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন স্ত্রীলোকদের তালাকের পর যে ইদ্দত নির্ধারণ করেছেন তাকে কুরু [قُرُوء] বলে। আর কুরু অর্থ পবিত্রাবস্থা। ইমাম মালিক [রহ] এর বক্তব্যও অনুরূপ। হযরত ইবনু ওমর [রা] তাঁর স্ত্রীকে মাসিকের সময় তালাক দেন এবং নিয়ত করেন যে, পরবর্তী দু'পবিত্রাবস্থায় বাকী দু'তালাক দিয়ে দেবেন। খবর নবী করীম (সা) এর নিকট পৌঁছলো। তখন তিনি বললেন- 'হে ওমরের পুত্র! আল্লাহ তোমাদেরকে এ নির্দেশ দেননি এবং এটি বিধি সম্মত কাজ নয়। সুন্নাত পদ্ধতি হচ্ছে- তুমি পবিত্রতাবস্থা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। তারপর তালাক দেবে। ইবনু ওমর [রা] বলেন, 'তখন আমি নবী করীম [সা] এর কথামত আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেই' তিনি বললেন, 'যখন সে পবিত্র হবে তখন তাকে তালাক দেবে। ভালো করে শুনে রাখো।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি তাকে তিন তালাক দিয়ে দিতাম তবু কি আমি তাকে ফিরিয়ে নিতে পারতাম? তিনি বললেন, 'না। সে তোমার থেকে পৃথক হয়ে যেতো এবং তুমি গুনাহগার হতে।'
আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে- রুকানা নামক এক ব্যক্তি তার স্ত্রী সুহাইমাকে বাত্তা' তালাক দিয়ে দেয়। নবী করীম (সা) কে এ ঘটনা জানানো হলে, তিনি রুকানাকে জিজ্ঞেস করেন, 'আল্লাহর কসম! তোমার কি এক তালাক দেয়ার ইচ্ছে ছিলো?' তখন রুকানা বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তাকে এক তালাক দেয়ার ইচ্ছে করেছিলাম।' শুনে রাসূল [সা] তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবার অনুমতি দিলেন।
আবদুল্লাহ্ ইবনু ওয়ালিদ যথাক্রমে ইব্রাহীম, দাউদ ও উবাদা ইবনু সামিত [রা] থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমার দাদা তাঁর এক স্ত্রীকে এক হাজার তালাক দেন। তখন আমি তাকে রাসূলে আকরাম [সা] এর দরবারে নিয়ে গেলাম এবং বিস্তারিত বললাম। রাসূল [সা] বললেন, 'তোমার দাদা আল্লাহকে ভয় করেনা। কেননা তার অধিকার মাত্র তিন তালাক প্রদানের। আর সে ৯শ ৯৭টি তালাক যুলুমের সাথে অতিরিক্ত দিয়েছে। যদি আল্লাহ্ চান তবে শাস্তি দেবেন অথবা মাফ করে দেবেন।'

টিকাঃ
১. বাত্তা তালাক হচ্ছে, স্ত্রীকে এক সাথে সর্বোচ্চ তিন তালাক দেয়া। অনুবাদক।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 'খুলা' তালাকের বিধান

📄 'খুলা' তালাকের বিধান


মুয়াত্তা, বুখারী ও নাসাঈ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হাবিবা বিনতে সাহল সাবিত ইবনু কায়েসের স্ত্রী ছিলেন। নবী করীম [সা] একদিন ফজরের নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হয়েই অন্ধকারের মধ্যে হাবিবাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কে?' তিনি উত্তর দেন, 'আমি হাবিবা বিনতে সাহল।' তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'কি ব্যাপার?' 'আমি বা সাবিত ইবনু কায়েস কারো আর একত্রে থাকা সম্ভব নয়'- হাবিবা বিনতে সাহল বললো। যখন সাবিত ইবনু কায়েস এলো তখন তিনি বললেন, হাবিবা আল্লাহ্ যা কিছু মনজুর করেছেন তাই করতে থাকুক। হাবিবা বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আমাকে যা কিছু দিয়েছে তা সব আমার নিকট মওজুদ আছে।' তিনি তখন সাবিতকে বললেন, 'তুমি সেগুলো তার থেকে নিয়ে নাও।' অতঃপর তিনি সেগুলো নিয়ে তাকে তালাক দিয়ে দিলো। একথাগুলো মুয়াত্তা ও নাসাঈর। বুখারী ও মুসলিমে যেভাবে বলা হয়েছে, তা হচ্ছে- সাবিতের স্ত্রী বললেন, আমি তার [স্বামীর] চরিত্র বা দ্বীনদারীর ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছিনা বরং আমি কুফরীর ভয় করছি। রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন- 'তুমি কি তার দেয়া বাগানটি ফেরত দেবে?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, ফেরত দেবো। তিনি সাবিতকে বলে দিলেন, 'তোমার বাগান তুমি নিয়ে নাও এবং তাকে তালাক দিয়ে দাও।'
ইবনু মানযারের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে- সাবিত তার স্ত্রী জামিলা বিনতে উবাই ইবনু সলুলকে প্রহার করে তার একটি হাত ভেঙ্গে দিয়েছিলো। তার ভাই [অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই] নবী করীম [সা] এর দরবারে অভিযোগ দায়ের করলো। তিনি সাবিতকে ডেকে এনে বললেন, 'তোমার কাছে তার যে মোহর পাওনা আছে তার বিনিময়ে একে ছেড়ে দাও।' তিনি বললেন, ঠিক আছে। তখন রাসূল [সা] স্ত্রীলোকটিকে এক হায়িয [এক ঋতুবস্থা] ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিলেন।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 ঐ দাসী প্রসঙ্গে যাকে তার স্বামীর ব্যাপারে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে

📄 ঐ দাসী প্রসঙ্গে যাকে তার স্বামীর ব্যাপারে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে


উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়িশা [রা] থেকে মুয়াত্তা, বুখারী ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে, বারীরার কারণে তিনটি সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এক. যখন তাকে মুক্ত করে দেয়া হয় তখন তার স্বামীর সাথে বিয়ে ঠিক রাখা না রাখার ইখতিয়ার দেয়া হয়।
দুই. রাসূল [সা] বলেছেন, 'যে দাস মুক্ত করে দেবে সে ঐ গোলামের ওয়ারিশ।
তিন. নবী করীম (সা) যখন তার ঘরে প্রবেশ করেন তখন একটি পাত্রে গোশত রান্না করা হচ্ছিলো, কিন্তু যখন তাঁর সামনে খানা হাজির করা হলো তখন তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাকে হাড্ডি ওয়ালা গোস্ত রান্না করতে দেখিনি?' সে বললো, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ্! আপনি ঠিক দেখেছেন। কিন্তু সেগুলোতো বারীরার জন্য সদকার গোশত। আপনিতো সদকার কোনো জিনিস গ্রহণ করেন না।' হুজুর পাক [সা] বললেন, 'সে তো বারীরার জন্য সদকা কিন্তু আমার জন্য তা হাদীয়া' [লাকি সাদাকাতুন ওয়ালিয়া হাদিয়াহ্। ওয়াজিহায় বর্ণনা করা হয়েছে- বারীরার কারণে চারটি সুন্নাত জারী হয়েছে, তারপর উপরোক্ত তিনটি বর্ণনা করা হয়েছে এবং চতুর্থ সুন্নাত সম্পর্কে বলা হয়েছে- তাকে তিন হায়েয [তিনটি ঋতু অবস্থা] ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বলা হয়েছে- বারীরার স্বামী ছিলো এক হাবশী ক্রীতদাস যাকে মুগীস বলা হতো। উক্ত গ্রন্থের অন্য বর্ণনায় আছে- সে স্বাধীন ছিলো। উরওয়া বলেন, মুক্ত হওয়ার পরও তাকে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। বস্তুত, সঠিক কথা হচ্ছে বারীরার স্বামী ক্রীতদাস ছিলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00