📄 মোহর সংক্রান্ত বিধান
নাসাঈ, মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক এবং আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে- হযরত আলী ইবনু আবী তালিব [রা] হযরত ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর মোহর বাবদ জেরা (যুদ্ধপোষাক) দান করেছিলেন। যা পরবর্তীতে ৫০০শ' দিরহাম বিক্রি করা হয়েছিলো এবং রাসূলুল্লাহ্ [সা] তা থেকে কিছু দিরহাম নিয়ে সুগন্ধি ক্রয় করেন। মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে আছে- হযরত আলী ইবনু আবু তালিব [রা] হযরত ফাতিমা [রা] কে মোহর বাবদ ১২ আউকিয়া আদায় করেছিলেন। রাসূল [সা] হযরত ফাতিমা [রা] এর বিয়েতে একটি চাদর, একটি মশক ও একটি খাট দান করেছিলেন।
এ বিয়ে হয়েছিলো হিজরী প্রথম সনে। আবার কেউ বলেছেন, তা ছিলো হিজরী দ্বিতীয় সনে।
মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত আছে- একবার নবী করীম [সা] এর কাছে এক মহিলা এসে আরজ করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে আপনি আপনার বেগমেদের অন্তর্ভূক্ত করে নিন। একথা বলে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি আপনি গ্রহণ না করেন তবে তাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ্ [সা] বললেন, তার মোহর দেয়ার জন্য তোমার কাছে কী আছে? সে জবাব দিলো, আমার কাছে এ পাজামাটা ছাড়া আর কিছু নেই। রাসূল [সা] [উপহাস করে] বললেন, 'তুমি যদি পাজামাটা তাকে দিয়ে ন্যাংটা হয়ে বসে থাকো সে কেমন কথা? যাও অন্য কিছু খুঁজে দেখো। সে বললো, আমার কিছুই নেই। আল্লাহর রাসূল [সা] বললেন, 'তুমি আরো খুঁজে দেখো। যদি তা লোহার কোনো আংটিই হোক না কেন।
সে অনেক খুঁজাখুঁজি করলো কিন্তু কিছুই পেলো না। তখন রাসূল [সা] বললেন, তোমার কি কোনো সূরা বা আয়াত মুখস্ত আছে?' সে বললো, হ্যাঁ আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্ত আছে? রাসূল (সা) বললেন, 'তোমার যতোটুকু কুরআন মুখস্ত আছে তার বিনিময়ে একে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম।' সেই মহিলার নাম ছিলো খাওলা বিনতে হাকীম আবার কেউ কেউ বলেছেন, তার নাম ছিলো উম্মে শারীক।
এ থেকে কয়েকটি ফিকহী মাসায়ালা জানা যায়-
মাসয়ালা-১. যার কোনো অভিভাবক নেই বিচারক তার অভিভাবক হতে পারেন।
মাসয়ালা-২. কোনো বস্তুর বিনিময়ে বিয়ে মুবাহ। হযরত আলী [রা] ও হযরত ফাতিমা [রা] এর বিয়েতেও এরূপ হয়েছিলো।
মাসয়ালা-৩. কুরআন শিক্ষাপ্রদানকে বিনিময় হিসেবে ধার্য করা জায়েয। ইবনু হাবীব [রহ] এর দৃষ্টিতে এ হাদীস মানসুখ। অন্যেরা বলেন- এটি নবী করীম [সা] এর জন্য নির্দিষ্ট ছিলো। সাহাবায়ে কিরাম, তাবিঈন এবং ফকীহদের মধ্যে কেউ এরূপ আমল করেননি। শুধু ইমাম শাফিঈ [রহ] ছাড়া। [সম্ভবত সেই মহিলা উক্ত সূরাগুলো মুখস্ত করছিলো এবং নবী করীম (সা) এর বেগমদের অন্তর্ভূক্ত হওয়ারও খুব ইচ্ছে ছিলো তার। যে জন্য সে তাকে রাসূল [সা] এর নিকট বিয়ের জন্য উৎসর্গ করেছিলো।
সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে একমাত্র আবদুর রহমান ইবনু আওফ ছাড়া আর কেউ পাঁচ দিরহামের কম মোহর ধার্য করে বিয়ে করেননি। ইবনু মনজুর বলেছেন, নবী করীম (সা) ৫০০শ' দিরহামের কম মোহর দিয়ে কোনো বিয়ে করেননি। উম্মে হাবীবাহ বিনতে আবু সুফিয়ান [রা] কে বিয়ে করেছিলেন চার হাজার দিরহাম মোহরের বিনিময়ে।
📄 হযরত আলী (রা) এর প্রতি নির্দেশ
বুখারী, আবু দাউদ ও ওয়াজিহায় বর্ণিত আছে- একবার আলী ইবনু আবী তালিব [রা] আবু জাহেল ইবনু হিশাম এর কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং বনু হিশাম ইবনু মুগীরাকে দিয়ে রাসূল [সা] এর নিকট অনুমতি চান। রাসূল [সা] অনুমতি দেননি বরং তিনি রাগান্বিত হয়ে মসজিদের মিম্বারে গিয়ে দাঁড়ালেন। লোকজন তাঁর কাছে জড়ো হয়ে গেলো। অতঃপর তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসার পর বললেন, বনী হিশাম ইবনু মুগীরার মাধ্যমে আবু জাহেলের কন্যাকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে পাঠিয়েছে কিন্তু আমি অনুমতি দেইনি এবং দেবো না। যদি আবু তালিবের বেটা আমার কন্যাকে তালাক দিতে চায়, তবে সে যেনো তালাক দেয় এবং আবু জাহেলের মেয়েকে বিয়ে করে নেয়। আমার কন্যা আমার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ন্যায়। যে তাকে কোনো কষ্ট দেয় সে যেন আমাকেই কষ্ট দেয়। আর আল্লাহর রাসূলের কন্যার সাথে আল্লাহর দুশমনের কন্যা কখনো একত্রে থাকতে পারে না। তোমরা মনে করেছো, ফাতিমার ওপর দূর্বলতার কারণে আমি এরূপ বলছি? না তা নয়। আমি হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম করছিনা। আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূলের মেয়ের সাথে আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একত্রিত হতে পারে না।
📄 অগ্নি পূজারীদের ইসলাম গ্রহণ
মদুওনাহ্ সহ অন্যান্য গ্রন্থে আছে- গায়লาน ইবনু সালমা সাকাফী যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন রাসূল [সা] তাকে বললেন, 'তোমার দশজন স্ত্রী আছে, তুমি যে কোনো চারজনকে রেখে অবশিষ্ট স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দেবে। ফিরুজ দায়লামী বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার নিকট দু'বোন স্ত্রী হিসেবে আছে? রাসূল [সা] বললেন, 'তুমি যাকে চাও তাকে রেখে আরেক জনকে তালাক দিয়ে দাও।'
আবু দাউদ শরীফে আছে- এক ব্যক্তি নবী করীম (সা) এর কাছে এসে বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং ঐ স্ত্রী আমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে অবহিত। তখন রাসূল [সা] অন্যজনকে স্বামী থেকে পৃথক করে দিলেন।
📄 বিয়ের পর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে যাওয়া ও মুতা বিয়ে
মুয়াত্তা, বুখারী ও নাসাঈতে বর্ণিত আছে- রাফা'আহ্ ইবনু সামওয়াল তার স্ত্রী তামীম বিনতে ওয়াহাবকে নবী করীম [সা] এর সময়ে তিন তালাক দেয়। আবদুর রহমান ইবনু জুবাইর তাকে বিয়ে করেন। কিন্তু তিনি নিজের অসুস্থতার কারণে পৃথক থাকেন। তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করেননি। অতঃপর তাকে তালাক দিয়ে দেন। এবার রাফাআহ্ তাকে পুনরায় বিয়ে করতে চায়। অবশ্য এর পূর্বে সে তাকে তালাক দিয়েছিলো। রাসূল [সা] শুনে রাফাআহ্ ইবনু সামওয়ালকে বাঁধা দেন এবং বলেন, যতোক্ষণ সে অন্য স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন না করবে ততোক্ষণ পর্যন্ত তোমার জন্য সে হালাল হবে না। অন্য বর্ণনায় আছে, 'যতোক্ষণ পর্যন্ত একজন আরেক জনের মধু পান না করবে।' রবী ইবনু মায়াসারা জাহমী বলেন, যখন আমরা মক্কা বিজয়ের বছর নবী করীম (সা) এর কাছে মক্কায় দেখা করি, তখন তিনি আমাদেরকে মুতা বিয়ের অনুমতি দেন। আমি এবং আমার এক বন্ধু বনী আমেরের এক মেয়ের নিকট [প্রস্তাব নিয়ে) গেলাম। মনে হলো সে মোটা গলার এক জোয়ান উটনী। আমরা উভয়ে আমাদের চাদরের বিনিময়ে তাকে চাইলাম। বর্ণনাকারী বলেন- সে আমার বন্ধুকে তাড়া করলো। আমার বন্ধু তাড়া খেয়ে বলতে লাগলো- 'আমার চাদর তার চাদর থেকে উত্তম।' সে বললো, আমার কাছে এটিই ভালো, যদি এটি তার চাদর হয় তবে আমি তার কাছে তিনদিন থাকবো। পরে নবী করীম [সা] তিন দিনের মু'তা বিয়েকে নিষিদ্ধ করেন এবং বলেন, 'আল্লাহ্ এটাকে হারাম করে দিয়েছেন।' অন্য বর্ণনায় আছে- 'আল্লাহ্ কি'য়ামত পর্যন্ত মুতা বিয়েকে হারাম করে দিয়েছেন। কাজেই যার নিকট মুতা বিয়েকৃত কোনো স্ত্রী আছে তাকে যেনো সে ছেড়ে দেয়, কিন্তু তাকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা ফেরৎ নেয়া যাবে না।'
বর্ণণাকারীগণ মুতা বিয়ে কবে হারাম করা হয়েছে এ ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন। একদল বলেন, খায়বার বিজয়ের সময় মুতা বিয়েকে হারাম করা হয়েছে। অপর দলের মতে হুদাইবিয়ার সন্ধির বছর অর্থাৎ ৭ম হিজরীতে মুতা বিয়ে হারাম করা হয়।
আবু উবাইদ বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর মুতা বিয়ে হারাম হয়েছে।