📄 দাম্পত্য জীবন শুরুর স্বামী মারা গেলে
নাসাঈ ও মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে আবদুল্লাহ্ (রা) ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত- তাঁর নিকট এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো, যে এক মহিলাকে বিয়ে করলো কিন্তু তার মোহর নির্ধারণ করলোনা এবং তার সাথে দাম্পত্য জীবন শুরু করার আগেই মৃত্যু বরণ করলো। তিনি দীর্ঘ এক মাস এর উত্তর দান থেকে বিরত রইলেন। পরে বললেন, তোমাদের আমি উত্তর দিচ্ছি। যদি শুদ্ধ হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ হতে আর যদি ভুল হয় তবে তা আমার দূর্বলতা। নাসাঈ শরীফে আছে- তবে তা শয়তানের তরফ থেকে। আমার সিদ্ধান্ত হচ্ছে- ঐ মহিলার এমন মোহর নির্ধারণ করতে হবে যা তার বংশের অন্য মহিলাদের বিয়ের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে (অর্থাৎ মহরে মেছাল) এবং তার ইদ্দত চার মাস দশ দিন। এ কথা শুনে বনী আশযায়ী গোত্রের কিছু লোক দাঁড়িয়ে বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, নবী করীম [সা] কে বুরদা' বিন্তে ওয়াশিকের ব্যাপারে এরকম ফায়সালাই করতে দেখেছি যা আপনি বললেন। মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে আছে-বিনতে ওয়াশিক রাওয়াস গোত্রের মহিলা ছিলো। যারা রাসূল [সা] এর ফয়সালার দিন উপস্থিত ছিলেন তারা হচ্ছে- হযরত মাকাল ইবনু সিনান আশযায়ী ও তার গোত্রের কতিপয় লোক। আলী ইবনু আবী তালিব [রা] বলেছেন, ঐ মহিলার জন্য কোনো মোহর নেই। হযরত ইয়াজীদ [রা] এর বক্তব্য এরকম। ইমাম মালিক এ মতের অনুসারী। কিন্তু সুফিয়ান সাওরী, হাসান বসরী, কাতাদাহ্ ও ইবনু মাসউদ [রা] এ মতের অনুসারী। হযরত আলী [রা] আরো বলেছেন, রাসূল [সা] এর কোনো কথার ব্যাপারে গ্রাম্য কোনো লোকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখিত হাদীসদ্বয়ে আছে তারা ইবনু মাসউদ [রা] এর ফতোয়া শুনে এতো বেশী খুশী হয়েছিলো যে, আর কোনো ব্যাপারে তারা কখনো এতো খুশী হয়নি।
📄 বিয়ের পর স্ত্রীকে গর্ভবতী পাওয়া গেলে
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে হযরত সায়্যিদ ইবনু মুসায়্যিব [রহ] থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এক আনসার থেকে বর্ণনা করেছেন- যিনি বাসিরা নামে পরিচিত। তিনি বলেন, আমি এক কুমারী মেয়েকে না দেখে বিয়ে করি। পরে বাসরঘরে বুঝতে পারি, সে গর্ভবতী। নবী করীম [সা] কে অবহিত করলে তিনি বললেন, 'ঐ মহিলা তোমার কাছে মোহর পাবে। কারণ তুমি তার সাথে যৌনমিলন করেছো। আর সন্তান তুমি গোলাম হিসাবে পাবে এবং স্ত্রীলোকটিকে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বেত্রাঘাত করতে হবে এবং বিয়ে ভেঙ্গে দিতে হবে।
মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে ফাতিমা বিনতে কায়েস [রা] হতে বর্ণিত, আবু আমর ইবনু হাফছ [রা] তাকে তালাকই আলবাত্তা' প্রদান করলেন। মুসলিম ও নাসাঈতে অতিরিক্ত আছে, সে তাকে শেষ তালাক দিয়েছিলো, যা দেয়া বাকী ছিলো এবং সে তখন সিরিয়া ছিলো। অতঃপর তিনি তার উকিলের মাধ্যমে কিছু যব পাঠিয়ে দেন। পরিমাণে অল্প বলে সে দেখে অসন্তুষ্ট প্রকাশ করে। উকীল বললেন, আল্লাহর কসম! আমার উপর তোমার কোনো অধিকার নেই। নাসাঈতে আছে- হারিস ইবনু হিশাম ইবনু আবু রাবিয়া খরচের জন্য কিছু মুদ্রা পাঠায়, এতে সে অসন্তোষ প্রকাশ করে। তখন সে বলে, আল্লাহর কসম! আমার কাছে তোমার কোনো খরচ নেই। কারণ তুমি গর্ভবতী নও। তাছাড়া তুমি আমার অনুমতি নিয়েও আমার ঘর ছাড়োনি। মুসলিম শরীফে আছে- তার নিকট পাঁচ সা' যব এবং পাঁচ সা' খেজুর পাঠানো হয়েছিলো। সেই মহিলা রাসূল [সা] এর কাছে অভিযোগ দায়ের করে, জবাবে রাসূল [সা] বলেন- 'তোমার জন্য কোনো ভরন পোষণ (নাফকাহ্) নেই।'
[মুসলিমের অন্য হাদীসে আছে- ফাতিমা বিনতে কায়েস বলেন, আমি রাসূলের [সা] কাছে গিয়ে থাকার ঘর এবং খরচ দাবী করে স্বামীর সাথে ঝগড়া করি। কিন্তু তিনি আমাকে না ঘরের ফায়সালা দিলেন আর না খরচের ফায়সালা। নাসাঈতে আছে- তিনি আমাকে উম্মে শারীকের ঘরে ইদ্দত পালনের নির্দেশ দেন এবং বলেন- উম্মে শারীক এমন একজন মহিলা, যার ঘরে আমার সাহাবীরা সর্বদা যাতায়াত করে থাকে। এক কাজ করো, তুমি আবদুল্লাহ্ ইবনু উম্মে মাকতুমের ঘরে ইদ্দত পালন করো। কারণ তিনি একজন অন্ধ ব্যক্তি, তোমার কাপড় চোপড় নড়চড় হয়ে গেলেও তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তুমি যখন অন্যের জন্য হালাল হয়ে যাবে তখন আমাকে খবর দিও। ইদ্দত শেষ হবার পর তাকে সংবাদ দেয়া হলো। আমি নবী করীম [সা] এর কাছে আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! মুয়াবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ান ও আবু জাহম দু'জন আমার নিকট বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছে। রাসূল [সা] বললেন, আবু জাহমতো নিজের কাঁধ থেকে লাঠি নামায় না (অর্থাৎ সে স্ত্রীকে প্রহার করে) আর মুয়াবিয়া দরিদ্র। তার কাছে প্রচুর ধন সম্পদ নেই। তুমি বরং উসামা ইবনু যায়িদকে বিয়ে করো। আমি এ প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করলাম। তিনি আবার বললেন, তুমি উসামাকে বিয়ে করো। অতপর আমি তাকে বিয়ে করলাম, ফলে আল্লাহ তাকে মঙ্গল দান করলেন। যার কারণে আমার প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা হতো।
উপরোক্ত আলোচনায় কয়েকটি ফিকহী মাসয়ালা বের হয়। যথা-
মাসয়ালা-১: একই সাথে কোনো মহিলাকে একাধিক ব্যক্তি বিয়ের পয়গাম পাঠাতে পারে।
মাসয়ালা-২: যদি কোনো ব্যক্তি বিয়ের পয়গাম পাঠায় তবে তার দোষ আলোচনা করা বৈধ এবং তা গীবতের পর্যায়ে পড়বেনা।
মাসয়ালা-৩: কারো দোষালোচনা করলে কৌশলে ও বিজ্ঞতার সাথে করতে হবে। যেমন রাসূল [সা] আবু জাহমের কথা বলেছেন, 'তার কাধ থেকে লাঠি নামে না।' একথা দ্বারা অবশ্যই এটা বুঝা যায় না যে সে খাওয়া, ঘুম, গোসল ইত্যাদি বাদ দিয়ে শুধু লাঠি কাধে করে বসে থাকেন। বরং বুঝানো হয়েছে, তার স্ত্রীকে মারার অভ্যাস বেশী।
মাসয়ালা- ৪: যদি কোনো তালাক প্রাপ্ত মহিলা স্বামীর পরিবারের কারো সাথে দূর্ব্যবহার করে তবে বিচারক তাকে স্বামীর ঘর থেকে বহিস্কার করতে পারেন।
মাসয়ালা-৫ : তালাকপ্রাপ্ত মহিলার জন্য ব্যয় নির্বাহের দায়দায়িত্ব স্বামীর। এমনকি বসবাসের জন্য কোনো ঘর পাওয়ারও অধিকার তার নেই।
মাসয়ালা-৬: কোনো মহিলাকে বিয়ে করতে হলে তাকে আগেই দেখে নেয়া উচিত।
মাসয়ালা-৭ : অনুপস্থিত থেকেও ফায়সালা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। যেমন আবু আমর সিরিয়ায় থেকেও তালাক পাঠিয়েছিলেন।
আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত ওমর ইবনু খাত্তাব [রা] বলেছেন, একজন স্ত্রীলোকের কথায় আমরা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলে সুন্নাহর বিপরীত ফায়সালা দিতে পারিনা। কারণ আমাদের জানা নেই, তার স্মৃতি শক্তি যা সংরক্ষণ করেছে তা সঠিক কিনা।
টিকাঃ
১. স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটে যে তালাকের মাধ্যমে তাকে 'তালাক-ই- আল বাত্তা' বলে।- অনুবাদক।
📄 স্ত্রীর ব্যয় নির্বাহ স্বামীর জিম্মায়
হযরত আয়িশা [রা] থেকে বর্ণিত এক হাদীস যা ইমাম বুখারী ও মুসলিম স্ব-স্ব গ্রন্থে সংকলন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে- একদিন হিন্দ বিনতে উতবা এসে বললো, আমার স্বামী খুব কৃপণ, সে আমাকে এমন পরিমাণ সম্পদ দেয়না যা দিয়ে আমি ও আমার ছেলেমেয়ে চলতে পারি। সে জন্য তার অগোচরে আমি কিছু নিয়ে থাকি। তখন রাসূল [সা] বললেন, 'হ্যাঁ এতোটুকু পরিমাণ নিতে পারো যা তোমার ও তোমার ছেলেমেয়ের প্রয়োজন মিটে। তার অতিরিক্ত নয়।'
এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বুঝা যায়, কারো অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে বিচারক ফায়সালা দিতে পারেন। যদি বিচারকের অপবাদ ও কুধারনার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভবনা না থাকে তবে তিনি তার নিজের ধারনা অনুযায়ী দৈনন্দিন জীবনের টুকিটাকি বিষয়ে আসামীর অনুপুস্থিতিতে ফায়সালা করতে পারেন। যে অপরের হক পুরোপুরি আদায় করেনা হকদার যদি তার কোনো সম্পদ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে না জানিয়ে গ্রহণ করে তা জায়েয আছে। তবে এ ব্যাপারে মতপার্থক্যও আছে।
📄 স্বামী স্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন
ওয়াজিহায় বর্ণিত আছে- রাসূল [সা] এর নিকট যখন আলী (রা) এবং ফাতিমা [রা] উভয়ে কাজকর্ম ও দায়িত্ব নিয়ে নালিশ করেছিলেন, তখন তিনি হযরত ফাতিমা [রা] কে অন্দরমহলে এবং হযরত আলী [রা] কে বাইরে কাজ কর্ম করার দায়িত্ব অর্পন করেন। ইবনু হাবীব বলেন, অন্দর মহলের কাজের মধ্যে আছে- আটা পেষা, রুটি তৈরী করা, বিছানা গুটানো, ঘর ঝাড়ু দেয়া, পানি ভরা, ইত্যাদি।
বুখারী, মুসলিম এবং নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- হযরত ফাতিমা [রা] একদিন নবী করীম [সা] এর দরবারে এসে অভিযোগ করলেন, আটা পিষে পিষে হাতে ফুস্কা পড়ে গেছে এবং তিনি শুনতে পেয়েছেন, রাসূল [সা] এর নিকট কিছু দাসী আছে এজন্য তিনি এসেছেন। তখন নবী করীম [সা] বললেন, 'তুমি যার জন্য আজ আমার কাছে এসেছো আমি তার চেয়েও ভালো জিনিস তোমাকে দিচ্ছি। তা হচ্ছে- যখন তুমি বিছানায় ঘুমুতে যাবে, তখন ৩৩বার সুবহানাল্লাহ্, ৩৩ বার আল হাম্দুলিল্লাহ্ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। এটা তোমাদের খাদেমের চেয়ে ভালো হবে।' ফাতিমা [রা] বলেন, এরপর আমি এ ওয়াজিফা কখনো ছাড়িনি। প্রশ্ন করা হলো, সিফফিন যুদ্ধের রাতেও কি বাদ পড়েনি? তিনি উত্তর দিলেন, না সেদিনও বাদ পড়েনি।