📄 মুশরিকদের রাখা বস্তু
ইবনু ওয়াহাব বর্ণনা করেছেন- যখন নবী করীম [সা] খায়বার অবরোধ করেন তখন তাঁর কাছে কতিপয় লোক এসে বলে, আমাদেরকে কিছু দিন। তিনি তাদেরকে কিছুই দিলেন না। যখন তাঁরা কিছু কিল্লা বিজয় করলেন তখন মুসলমানের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি এক থলে চর্বি নিয়ে এলো। গণিমতের মালের দায়িত্বে নিয়োজিত কা'ব ইবনু আমর ইবনু যায়িদ আনসারী তাকে দেখে ফেললেন এবং ধরে আনলেন। সে ব্যক্তি বলতে লাগলো, আল্লাহর কসম! এটা আমি তোমাকে দেবো না। যতোক্ষণ আমাকে আমার সাথীদের কাছে নিয়ে না যাও। তিনি বললেন, এটা আমাকে দিয়ে দাও, লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেই। সে অস্বীকার করলো। দু'জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো। রাসূল [সা] বললেন- 'ঐ ব্যক্তির থলে তার কাছেই রেখে দাও, যেন সে তার সাথীদের কাছে নিয়ে যেতে পারে।'
📄 বনী নাযিরের পরিত্যক্ত সম্পদ
ইমাম বুখারী ও আবু উবাইদ বর্ণনা করেছেন, বনী নাযীরের সম্পদ যা আল্লাহ্ তাঁকে দান করেছিলেন, তা এমনভাবে হস্তগত হয়েছিলো, তার জন্য কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি। এ ছিলো নবী করীম (সা) এর জন্য নির্দিষ্ট। যা থেকে তিনি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন এবং অবশিষ্ট সম্পদ থেকে যুদ্ধের ঘোড়া ও সম্পদ ক্রয় করতেন। বনী নাযীরের পরিত্যাক্ত সম্পদকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়নি। কারণ তা ছিলো রাসূল [সা] এর জন্য নির্দিষ্ট। তবে বনী কুরাইযা হতে প্রাপ্ত সম্পদকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছিলেন। কেননা তা যুদ্ধের বিনিময়ে হস্তগত হয়েছিলো।
বনী নাযীরের ঘটনা সম্পর্কে আবু উবাইদ বলেছেন, বদর যুদ্ধের ছয় মাস পর সংঘটিত হয়েছিলো। বুখারীর বর্ণনাও অনুরূপ। ইবনু আবু যাইদ মুখতাসার মদুওনায় ইবনু শিহাবের নিকট হতে বর্ণনা করেছেন, বনী নাযীরের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো ৩য় হিজরীর মুহাররম মাসে। অন্য বর্ণনায় আছে- ৪র্থ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো এবং সূরা হাশর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়।
📄 খায়বারের গনিমতের মাল বণ্টন
ইমাম মালিক [রহ] বলেছেন, খায়বারের গণিমতের মাল মোট আঠারো ভাগ করে ১৮শ' লোকের মধ্যে বন্টন করা হয়েছিলো। প্রতি ১০০শ' লোকের জন্য এক ভাগ। (অর্থাৎ আঠারো ভাগকে আঠারো শ' ভাগে ভাগ করা হয়েছিলো।)
আবু উবাইদ বলেছেন, খায়বারের সমস্ত সম্পদকে মোট ৩৬ ভাগে ভাগ করা হয়েছিলো তার প্রতি ভাগ ছিলো ১০০ শ' ভাগের সমষ্টি। অর্ধেক রেখেছিলেন রাসূল [সা] এর নিজের জন্য ও রাষ্ট্রীয় জরুরী অবস্থার জন্য। অবশিষ্ট অর্ধেক উপরোক্ত নিয়মে مسلمانوں মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিলেন। যখন সমস্ত ভূখন্ড রাসূল [সা] এর হস্তগত হয়ে গেলো। তখন এমন লোকজন পাওয়া গেলোনা যারা ঐ সম্পূর্ণ ভুখন্ডকে আবাদ করতে পারে। তখন তিনি অর্ধেক ফসল দেবার শর্তে ইহুদীদের কাছে বর্গা দিয়েছিলেন। ওয়াজিহায় বর্ণিত আছে- বনী নাযীরের পরিত্যক্ত সম্পদ হতে নবী করীম [সা] ৭টি বাগান দান করে দিয়েছিলেন।
হযরত উমর [রা] বলেছেন, যদি আমার পরবর্তী লোকদের জন্য ভয় না হতো তবে আমি বিজিত সমস্ত সম্পদ লোকদের মধ্যে বন্টন করে দিতাম, যেভাবে রাসূলে আকরাম [সা] খায়বারের সম্পদ বন্টন করে দিয়েছিলেন।
ইমাম মালিক ও আবু উবাইদ বর্ণনা করেছেন, হযরত বেলাল ও তাঁর কতিপয় সঙ্গী হযরত ওমর [রা] এর কাছে গিয়ে বললেন, শাম (সিরিয়া) এর বিজিত জমি আমাদের মধ্যে ভাগ করে দিন। এ ব্যাপারে হযরত বেলাল [রা] বেশী রকম চাপ প্রয়োগ করলেন। তখন হযরত ওমর [রা] দু'আ করলেন, 'আল্লাহ্! তুমি বেলাল ও তাঁর সাথীদের থেকে আমাকে রক্ষা করো।' এরপর বছর যেতে না যেতেই সবাই মৃত্যু বরণ করলেন।
ইবনু হিশাম বলেছেন, খায়বারের যুদ্ধ ৬ষ্ঠ হিজরীর সফর মাসে সংঘটিত হয়েছিলো। ইমাম মালিক বলেন, খায়বারের যুদ্ধ হয়েছিলো শীতকালে। যুদ্ধ চলাকালে রাসূল [সা] এর কাছে সাহাবাগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মনে হয় আমরা যুদ্ধ করতে পারবো না। রাসূল [সা] প্রশ্ন করলেন, কেন? তাঁরা বললেন, শীত ও ক্ষুধার তীব্রতার কারণে। একথা শুনে নবী করীম [সা] আল্লাহর নিকট দু'আ করলেন, 'ইলাহী! আজ তাদেরকে এমন একটি কিল্লার বিজয় দিন, যেখানে প্রচুর পরিমাণ খাদ্য ও চর্বি থাকে।' সেদিনই খায়বার বিজয় হয়ে গেলো।
ইবনু হিশাম বলেছেন, খায়বারের মাল হুদাইবিয়ার অধিবাসীদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছিলো। যারা খায়বার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং যারা অনুপস্থিত ছিলেন প্রত্যেককেই তিনি গণিমতের মাল দিয়েছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি, হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ সেদিন অনুপস্থিত ছিলেন না। নবী করীম [রা] তাঁর অংশ উপস্থিত ব্যক্তিদের প্রাপ্ত অংশের সমান নির্ধারণ করেছিলেন। মুফাযযাল বলেছেন - নবী করীম [সা] তাদেরকে পর্যন্ত খাদ্য সামগ্রী দান করেছিলেন যারা আহলে ফাদকদের সঙ্গে রাসূল [সা] এর পক্ষ থেকে সন্ধি করতে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মুহায়িয়সা ইবনু মাসউদ [রা] অন্যতম। তাকে তিনি ত্রিশ ওয়াসাক যব দিয়েছিলেন।
📄 কাফিরদের সাথে কৃত সন্ধি রক্ষা ও দূতকে হত্যা না করা
আবু দাউদ শরীফে হযরত নাঈম ইবনু মাসউদ [রা] হতে বর্ণিত হয়েছে- মুসায়লামা একটি পত্র লিখে [দু'জন দূতের মাধ্যমে] নবী করীম [সা] এর নিকট পাঠালো। যখন তিনি পত্রখানা পাঠ করলেন তখন আমার উপস্থিতিতেই তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা দু'জন কোন কথার উপর বিশ্বাসী? তারা উত্তর দিলো, পত্রে যা লিখা আছে আমরা সেই কথার উপর বিশ্বাসী। তখন রাসূল [সা] বললেন, আল্লাহর কসম! যদি দূত হত্যা অবৈধ ঘোষণা করা না হতো তবে অবশ্যই আমি তোমাদের দু'জনকে হত্যা করতাম।
আবু রাফে [রা] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে কুরাইশরা রাসূল [সা] এর কাছে পাঠিয়েছিলো, যখন আমি রাসূল [সা] এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তখন মনে হলো) আমার অন্তরে ইসলাম প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ আমি আর তাদের কাছে ফিরে যেতে চাইনা। শুনে তিনি বললেন, 'আমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারিনা এবং দূতকেও বাধা দিতে পারি না। বরং তুমি এখন চলে যাও। তারপর যদি তোমার মনের অবস্থা বর্তমান থাকে যা এখন অনুভব করছো, তবে তুমি চলে এসো।' সত্যিই সেদিন তিনি চলে গিয়েছিলেন এবং পরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
বুখারী শরীফে আছে- আবু জান্দাল শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় খুঁড়াতে খুঁড়াতে এসে রাসূল [সা] এর কাছে হাজির হলেন। শিকলের ঘর্ষণে তাঁর জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছিলো। হুজুরে আকরাম [সা] শুধু সন্ধির এ শর্তের কারণে তাকে মক্কায় ফেরত পাঠায়েছিলেন, যাতে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি তাদের কাছে থেকে পালিয়ে مسلمانوں কাছে যায়, তবে তাকে ফেরত পাঠাতে মুসলমানগণ বাধ্য থাকবে।
আবু সুফিয়ান খাত্তাবী শরহে গারীবুল হাদীস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আবু জান্দালের ব্যাপারে নবী করীম [সা] এর আশংকা ছিলো না বিধায় তাকে তার পিতা ও বাড়ির দিকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। তবে যে সব স্ত্রীলোক এসেছিলো তাদেরকে ফেরত পাঠাননি। এ ব্যাপারে আল্লাহই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, কাফিরদের নিকট তাদেরকে ফেরত পাঠিও না। এ আলোচনা তাদের জন্য দলীল, যারা আল কুরআনের সাথে হাদীসও মানসুখ হওয়ার দাবী করেন। বুখারী শরীফে বলা হয়েছে, আবু জান্দালকে নবী করীম (সা) তার পিতা সুহাইল ইবনু আমরের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
তার কারণ হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রে তিনটি শর্ত লিখা ছিলো। শর্তগুলো হচ্ছে-
১. যারা মক্কা থেকে পালিয়ে مسلمانوں সাথে মিলিত হবে তাদেরকে মুসলমানগণ মক্কায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে।
২. যদি কোন মুসলমান (মুরতাদ হয়ে) পালিয়ে মক্কায় আসে তবে তাকে পুনরায় مسلمانوں কাছে ফেরত পাঠানো হবে না।
৩. আগামী বছর মুসলমানগণ মক্কায় আসবে এবং মাত্র তিন দিন অবস্থান করতে পারবে। মক্কায় প্রবেশের সময় তাদের কাছে আত্মরক্ষার জন্য কোষাবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া আর কোনো অস্ত্র সাথে আনতে পারবেনা।
সন্ধির ব্যাপারে রাসূলে আকরাম [সা] মন্তব্য করেছেন, সন্ধি ছিলো আমাদের জন্য (ঘরের) চৌকাঠের ন্যায়। অর্থাৎ তার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ।
যাহোক আবু জান্দাল যখন উপস্থিত হয়েছিলো তখনও সন্ধি পত্রে স্বাক্ষর করা হয়নি। বুখারী শরীফে কিতাবুল শুরুত অধ্যায়ে বলা হয়েছে- আবু জান্দালের পিতা সুহাইল ছিলো ঐ লোকদের অন্যতম যারা বদর যুদ্ধে مسلمانوں হাতে বন্দী হয়েছিলো।
এক বর্ণনায় আছে- হুদায়বিয়ার দিন সাবিয়া আসলামী মুসলমান হয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে এসে مسلمانوں সাথে মিলিত হয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর তার স্বামী খুঁজতে খুঁজতে এসে পৌঁছলো এবং বললো, হে মুহাম্মদ! আমার স্ত্রীকে আমার সাথে ফেরত যেতে দাও। তখন আল্লাহ্ অবতীর্ণ করেন- 'হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদের নিকট কোনো মুসলমান মহিলা হিজরত করে আসে... শেষ পর্যন্ত।
অতঃপর রাসূল [সা] মহিলাকে ডেকে শপথ নিলেন। সে বললো, প্রকৃত মাবুদের শপথ! ইসলামের সৌন্দর্য এবং তাঁর প্রতি অনুরাগই আমাকে আপনাদের সাথে মিলিত করেছে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ্ [সা] তার স্বামীকে ডেকে তার মোহরের টাকা ফেরত দিলেন এবং যা তার পেছনে খরচ করেছিলো তাও হিসেব করে তাকে দিয়ে দিলেন। তবু তার স্ত্রীকে ফেরত পাঠালেন না।