📄 আনফাল (অতিরিক্ত) এর বর্ণনা
মুয়াত্তা, বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু কাতাদা [রা] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমরা রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর সাথে হুনায়ন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। যখন উভয় পক্ষ যুদ্ধ শুরু করলো তখন মুসলমানগণ ঘাবড়ে গিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। আমি দেখলাম, এক মুশরিক একজন মুসলমানকে কাবু করে ফেলছে। তখন আমি চুপি চুপি তাকে তার পেছন থেকে আক্রমণ করলাম। সে তৎক্ষনাৎ ঘুরে আমাকে এমন ভাবে ঝাপটে ধরলো, আমি মৃত্যুর মুখোমূখি হয়ে গেলাম। যাহোক কিছুক্ষন পর তার হাতের বাঁধন শিথিল হয়ে এলো, সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে লুটিয়ে পড়লো। আমি হযরত ওমর ইবনু খাত্তাব [রা] এর নিকট এসে বললাম- লোকদের হলো কি? তিনি উত্তর দিলেন- আল্লাহর ইচ্ছে। যখন লোকজন এসে জড়ো হলো, তখন রাসূল [সা] ঘোষণা করলেন- "যে ব্যক্তি কোনো শত্রুকে হত্যা করবে এবং একজন সাক্ষী হাজির করতে পারবে তাকে সেই শত্রু কর্তৃক পরিত্যাক্ত সমস্ত মাল দিয়ে দেয়া হবে।" তখন আমি দাঁড়িয়ে বললাম, আমার একটি আবেদন আছে। তারপর আমি বসে পড়লাম। রাসূল [সা] এভাবে তিনবার বললেন। আবু কাতাদা [রা] বলেন, যখন আমি পুনরায় দাঁড়ালাম তখন রাসূল [রা] বললেন, আবু কাতাদা কি কিছু বলতে চাও? আমি সমস্ত ঘটনা তাঁর নিকট বললাম। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, আবু কাতাদা সত্য কথা বলেছে। আর নিহত ব্যক্তির সমস্ত মালামাল আমার কাছে আছে। তাকে কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করে দিন। হযরত আবু বকর [রা] ঐ ব্যক্তির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বললেন, না, আল্লাহর কসম! তা হতে পারে না। আল্লাহর রাসূল [রা] এমন সিংহের দিকে নজর দিবেন না, যিনি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষে জিহাদ করেন। আর নিহত ব্যক্তির মালামাল তোমাকে দিয়ে দেবেন।
বুখারী শরীফে কিতাবুল আহকামে বর্ণিত আছে- আবু বকর [রা] বললেন, কক্ষনো নয়, এ সমস্ত মাল আল্লাহ্র সিংহের মধ্য থেকে এক সিংহকে বঞ্চিত করে কুরাইশের এক দুর্বল লোককে দেয়া যেতে পারে না। তখন নবী করীম [সা] ইরশাদ করলেন, তুমি সত্য বলেছো। সবগুলো মাল তাকে দিয়ে দাও। আবু কাতাদা [রা] বলেন, প্রাপ্ত সম্পদ থেকে আমি জেরা (যুদ্ধের পোশাক) বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে একটি বাগান ক্রয় করি। এটি ইসলাম গ্রহণের পর আমার প্রথম প্রাপ্ত সম্পদ।
📄 নিহত ব্যক্তির সম্পদে কি হত্যাকারীর প্রাপ্য?
বুখারী শরীফে বলা হয়েছে- নিহত ব্যক্তির সম্পদ হত্যাকারীর প্রাপ্য। এটা গণিমতের মালের পাঁচ ভাগের বহির্ভূত একটি অংশ। এর থেকে গণিমতের মাল হিসেবে অংশ বের করা যাবেনা। ইমাম মালিক এবং তাঁর সঙ্গীরা বলেন- তা গণিমতের মালের অন্তর্ভূক্ত। তাদের দলীল হচ্ছে নিম্নের আয়াতটি-
وَعَلَمُوا أَنَّمَا غَنَمْتُمْ شَيْءٍ فَإِنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ
জেনে রাখো, গনীমত হিসেবে তোমরা যা কিছু পাবে তার এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের। [সূরা আল-আনফাল- ৪১]
তারা আরো বলেন- গনীমতের এক পঞ্চমাংশ রেখে দেয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট চার পঞ্চমাংশ বন্টন করে দেয়া হয়েছে। গনীমতের মাল বন্টন না করে কোনো অংশ পৃথক করে রাখা জায়েয নেই।
আমাদের [অর্থাৎ লেখকের] বক্তব্য হচ্ছে নবী করীম [সা] হুনাইন যুদ্ধে প্রথম বারের মতো গণিমতের মালে পাঁচ ভাগের বহির্ভূত অতিরিক্ত দান করেছিলেন। কারণ - আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁকে গনিমতের মালে পাঁচ ভাগের ব্যক্তিক্রম করা ও কাউকে কিছু দেয়ার অধিকার দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে- এ আয়াত খায়বার ও বনী নাযীরের অভিযান উপলক্ষে অবতীর্ণ হয়েছে। তাছাড়া নবী করীম [সা] এর কথা- 'নিহত ব্যক্তির সম্পদ হত্যাকারীর' -হুনাইন যুদ্ধ চলাকালিন নয় বরং যুদ্ধ যখন স্তিমিত হয়ে গেছে তখনকার। এটি যদি মিমাংসিত কথা হতো তা হযরত আবু কাতাদা [রা] এর অজানা থাকার কথা নয়। কেননা, তিনি ছিলেন রাসূল [সা] এর শাহ্ সওয়ার ও জলীলুল কদর (উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন) সাহাবী। নিহত ব্যক্তির সম্পদ হত্যাকারী পাবে এটি যদি কোনো আইন হতো তাহলে তিনি সে সম্পদের দাবী করতেন। রাসূল (সা) এর বার বার ঘোষণা প্রদানের প্রয়োজন ছিলো না।
আরো প্রমাণ হচ্ছে- নবী করীম [সা] তাকে সে সম্পদ শুধু একজনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দিয়ে দিয়েছেন। কোনো শপথগ্রহণ করেননি। যদি তা প্রকৃত গনমিতের সম্পদ হতো তাহলে তা প্রদানের জন্য আরো শক্তিশালী দলিল ও সাক্ষ্যের প্রয়োজন হতো যা অন্যান্য ব্যাপারে হয়ে থাকে।
আরেকটি দলিল হচ্ছে- যদি নিহত ব্যক্তির সম্পদ হত্যাকারী পাবে একথার বাধ্যবাধকতা থাকতো -তাহলে তাঁর কোনো সাক্ষ্য নেই ভেবে তিনি চুপ থাকতেন এবং বন্টন স্থগিত রাখতেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এটি একটি অতিরিক্ত উপহার ছিলো।
ইমাম মালিক [রহ] বলেন- হুনাইনের দিন ছাড়া আর কোনো দিন রাসূল [সা] এরূপ বলেছেন এই মর্মে কোনো বর্ণনা আমার কাছে পৌঁছেনি। এমনকি হযরত আবু বকর [রা] এবং হযরত ওমর [রা] এরকম করেছেন তারও কোনো প্রমাণ আমি পাইনি।
ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন- মুয়ায ইবনু আমর ইবনু জমূহ এবং মুয়ায ইবনু আযরা উভয়ে আনসার সাহাবী ছিলেন। তাঁরা বদর যুদ্ধের দিন আবু জাহেলের সাথে তরবারী দিয়ে যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করলেন। তারপর রাসূল [সা] কে সংবাদ দিলেন। রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা দু'জনের কে তাকে হত্যা করেছো? উভয়ে বললেন, আমি তাকে হত্যা করেছি। জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি তোমাদের তলোয়ার মুছে ফেলেছো? তারা না সূচক জবাব দিলেন। রাসূল [সা] তাদের তরবারী দেখলেন তারপর বললেন- তোমরা উভয়েই তাকে হত্যা করেছো কিন্তু তার মাল সামান পাবে মুয়ায ইবনু আমর ইবনু জুমূহ।
বুখারী ছাড়া অন্যরা লিখেছেন- আবু জাহেল যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়লো তখন আব্দুল্লাহ্ ইবনু মাউদ [রা] তাকে দেখলেন তলোয়ার দিয়ে লোকদের ফিরিয়ে রাখছে। তিনি তার কাছে গিয়ে ঘাড়ে পা রেখে বললেন- 'হে আল্লাহর দুশমন! আল্লাহ্ কি তোমাকে অপমানিত করলেন? আবু জেহেল বললো, 'হে অধম ছাগলের রাখাল! তুমি এখন আমার নাগালের বাইরে অবস্থান করছো।' আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ তখন তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলেন। কিছু হলো না। অতঃপর আবু জাহেলের তলোয়ার নিয়ে তার মাথা কেটে ফেললেন এবং সেই তলোয়ার নিয়ে নবী করীম [সা] এর কাছে হাজির হলেন। পুরস্কার স্বরূপ তিনি তাকে তলোয়ারটি দিয়ে দিলেন। আবু জাহেলকে প্রথম মুয়াজ ইবনুল জুমূহ আঘাত করেছিলেন।
📄 মুসলমানদের ঐ সমস্ত সম্পদ যা মুশরিকদের হস্তগত হয়
বুখারী শরীফে আছে- হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু ওমর [রা] এর এক ঘোড়া মাঠে চরার সময় শত্রুপক্ষ ধরে নিয়ে যায়। পরে যখন মুসলমানগণ তাদের ওপর বিজয়ী হয় তখন রাসূলুল্লাহ্ [সা] এর শাসনামলে ঐ ঘোড়া তাঁকে ফেরত দেয়া হয়। তাঁর এক গোলাম পালিয়ে রোমে চলে যায়। যখন মুসলমানগণ হযরত আবু বকর [রা] এর শাসনামলে রোম বিজয় করেন তখন আবদুল্লাহ্ [রা] কে সেই গোলাম ফেরত দেয়া হয়। মদুওনাহ, ওয়াজিহা ও অন্যন্য গ্রন্থে বর্ণিত আছে- মুসলমানদের মধ্যে এক ব্যক্তি নিজের হারিয়ে যাওয়া এক উট গনিমতের মালের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পেয়ে নবী করীম [সা] কে অবহিত করলেন। তিনি বললেন, যদি তুমি দেখো, গনিমতের মাল বন্টন করা হয়ে গেছে তবে তার মূল্য নেয়ার অধিকার তোমারআছে, যদি তুমি তা চাও।
বুখারী ও আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে- মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল [সা] এর কাছে আরজ করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কোথায় অবস্থান করবেন? তিনি উত্তর দিলেন, আকিল আমাদের জন্য, কোন্ ঘরটি অবশিষ্ট রেখেছে? আরো বললেন- আমরা সকলকে ইনশাআল্লাহ্ বনী কিনানা উপত্যকায় পাঠাবো যা মুহাচ্ছাবে অবস্থিত। তারা সেখানে যাবে কারণ বনী কিনানা কুরাইশদের সুরে সুর মিলিয়ে বনী হাশিমের বিরুদ্ধে শপথ করেছিলেন যে, তারা মুসলমানদের সাথে কোনো লেনদেন করবে না এবং তাদেরকে তাদের সাথে জায়গা দেবেনা।
যখন নবী করীম [সা] হিজরত করেন তখন আকিল বনী হাশিমের সমস্ত সম্পদ দখল করে নেয়। ইসলাম গ্রহণের পরও সেগুলো তার কাছে ছিলো। পরে হুজুরে পাক [সা] ফরমান জারি করেন, ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে ব্যক্তি যে সম্পদের অধিকারী ছিলো তাকে তার সেই সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। খাত্তাবী বলেন, সে আবদুল মুত্তালিবের ঘর বিক্রি করে দিয়েছিলো। কেননা তা আবু তালিব ওয়ারিশ হিসাবে পেয়েছিলো। হযরত আলী [রা] তাঁর পিতার মৃত্যুর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে ওয়ারিশ পাননি। আর রাসূল [সা] এর কোনো ঘর ছিলো না। কারণ দাদা জীবিত থাকাবস্থায় তাঁর পিতা ইন্তিকাল করেছিলেন। তাছাড়া আবদুল মুত্তালিবের জীবদ্দশায় তাঁর অধিকাংশ সন্তানের মৃত্যু হওয়ায় তার সম্পদ আবু তালিবের হস্তগত হয়। পরবর্তীতে আকিল তার মালিক হয়। যে সব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মদিনা হিজরত করেছিলেন, মুশরিকগণ তাদের সমস্ত সম্পদ দখল করে বিক্রি করে দিয়েছিলো।
📄 জিম্মি ও হারবী কর্তৃক প্রদত্ত উপহার
ইবনু সাহ্নুনের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম [সা] আবু সুফিয়ান, জিম্মী, ওয়াহাই, মকুকাশ প্রমুখ কর্তৃক প্রদত্ত হাদীয়া গ্রহণ করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও তাদের মধ্যে অনেককে হাদীয়া বা উপঢৌকন পাঠাতেন। তবে মাজাশানীর উপহার তিনি কবুল করেননি।
মাকুকাশ প্রদত্ত হাদীয়ার মধ্যে ছিলো মারিয়া নামক এক দাসী যার গর্ভে নবী করীম [সা] এর ঔরসে ইব্রাহীম নামক এক ছেলের জন্ম হয়েছিলো। তা ছাড়া একটি গাধা এবং খচ্চরও ছিলো। তিনি সেগুলো নিজের জন্য গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ওফাতের পূর্বপর্যন্ত সেই গাধা ও খচ্চর ছিলো। বাদশাহ্ মকুকাশের কাছ থেকে হযরত হাতিব ইবনু বালতায়া [রা] এ সমস্ত হাদিয়া নিয়ে এসেছিলেন। কারণ তাঁকে রাসূলে আকরাম [সা] ৬ষ্ঠ হিজরীতে উক্ত বাদশাহর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আরো বর্ণিত আছে, তিন জন দাসী নবী করীম [সা] এর নিকট উপহার পাঠিয়েছিলেন। নবী করীম [সা] তার থেকে জাহম ইবনু হুজাইফা [রা] এর দায়িত্বে তুরকা নামের দাসীকে দিয়ে দেন এবং মারিয়ার বোন শিরীনকে হাসান ইবনে সাবিত [রা] কে দেন, যার গর্ভে আবদুর রহমান জন্ম গ্রহণ করেন।
মুসলিম শরীফে আছে- ফরওয়া ইবনু নুকাছাহ্ রাসূল [সা] কে একটি সাদা খচ্চর উপহার দিয়েছিলো। হুনায়নের যুদ্ধের দিন তিনি তার উপর সওয়ার ছিলেন।
আবু উবাদা তার কিতাবুল আমওয়ালে বলেছেন- আমের ইবনু মালেক নবী করীম [সা] কে একটি ঘোড়া উপহার দেয়, কিন্তু তিনি তা ফেরত দেন এবং বলেন, আমরা মুশরিকদের উপহার গ্রহণ করতে পারি না। এরকম কথা তিনি আয়াজ মাজাশায়ীকেও বলে দিয়েছিলেন। আবু উবাদা বলেন, তিনি যখন আবু সুফিয়ানের উপহার গ্রহণ করেছিলেন, তখন মক্কার অধিবাসীদের সাথে সন্ধি চুক্তি বলবত ছিলো। মাকুকাশ বাদশাহর উপহার গ্রহণ করার কারণ হচ্ছে- রাসূল [সা] তার নিকট যে দূতকে পাঠিয়েছিলেন তিনি তাকে অত্যন্ত সমাদর করেছিলেন। তাছাড়া তিনি নবুয়্যতের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং সে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে দূতকে নিরাশ করেননি।
উপরোক্ত আলোচনায় বুঝা যায়, তিনি যে সব মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার ইচ্ছে পোষণ করতেন তাদের পাঠানো কোনো উপহার উপঢৌকন গ্রহণ করতেন না।