📄 খায়বারের ইহুদী নেতৃবৃন্দ
বর্ণিত আছে, নবী করীম [সা] বিশ থেকে ত্রিশ দিন খায়বার অবরোধ করে রাখেন। পরে তারা এই শর্তে সন্ধি করে নেয় যে, কোনো জিনিস নবী করীম [সা] থেকে গোপন করা হবে না। তিনি বললেন- 'হে হাকীকের বংশধরেরা! মনে হয় তোমাদের শত্রুতা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে। তোমরা তোমাদের ভাইদেরকে যা কিছু দিয়েছো তা থেকে আমি বিরত হবো না। তাছাড়া তোমরা এ প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছো যে, কোনো কিছু আমার কাছ থেকে গোপন রাখবে না। যদি রাখো তাহলে তোমাদের রক্ত আমাদের জন্য হালাল হয়ে যাবে।' রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন- তোমাদের আসবাবপত্র কোথায়? তারা বললো- আমরা সবকিছু যুদ্ধে খরচ করে ফেলেছি। বর্ণনাকারী বলেন- অতঃপর তিনি সাহাবাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তাদের খানা তল্লাশী করে সবকিছু দখল করে নেয়ার জন্য। অতঃপর তাদেরকে হত্যা করা হলো। ইবনু ওকবা তাঁর গ্রন্থে বলেন- তারা এ শর্তের ওপর সন্ধি করেছিলো যে, তাদের কোনো কিছুই নবী করীম [সা] থেকে গোপন করবে না এবং তাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর তারা কোনো কিছুর ওপরই মালিকানা দাবী করবে না। যদি কিছু গোপন করে তাহলে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যিম্মা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।
আবু উবাইদা বলেন- আমার নিকট ইয়াজিদ বর্ণনা করেছেন, হুবাই ইবনু খাতাব নবী করীম [সা] এর সাথে এই চুক্তি করেছিলো যে, সে তাঁকে ছাড়া আর কাউকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা করবে না। চুক্তিতে আল্লাহকে জামিন বানিয়েছিলেন। যখন বনী কুরাইযার দিন এলো তখন তাকে এবং তার ছেলে সালমাকে রাসূল [সা] এর নিকট উপস্থিত করা হলো। রাসূল [সা] বললেন, 'এবার উচিত জবাব নাও।' তারপর বাপ বেটার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হলো। আবু উবাউদ আরো বলেছেন- তিনি কিছু লোককে আবুল হাকিকের নিকট পাঠিয়েছিলেন, যেন তাকে হত্যা করা হয়। তারা তাকে হত্যা করে। তার এক ধনভান্ডার ছিলো। তাকে মশকুল জামাল [উটের চামড়া] বলা হতো। একের পর এক সর্দার তার তত্তাবধান করতো। সে সেগুলো গোপন করে ফেললো। এ জন্য চুক্তি মোতাবেক নবী করীম [সা] তাকে হত্যা করেছিলেন।
ওয়াকিদী বলেছেন- সেই রত্নাগারে প্রায় দশ হাজার দীনার মূল্যের মালামাল ছিলো।
📄 আহযাব যুদ্ধ ও বনী গাতফান
আহযাব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো উহুদ যুদ্ধের দু'বছর পর। রাসূল [সা] মদীনার তিন দিকে পরিখা খনন করছিলেন। শত্রুপক্ষ দশ রাত মুসলমানদেরকে অবরোধ করে রেখেছিলো। মুসলমানগণ এতে বিচলিত ও পেরেশান হয়ে পড়ে, তখন রাসূল [সা] আল্লাহর দরবারে দু'আ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। প্রভু! যদি আপনার ইচ্ছে এই হয়ে থাকে যে, আপনার ইবাদত করা না হোক......। অতঃপর তিনি মদীনার খেজুর বাগানের উৎপাদিত ফসলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের শর্তে বনী গাতফান গোত্রকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ করে সংবাদ দেন। কিন্তু তারা উৎপাদিত ফসলের অর্ধৈক দাবী করে। তখন রাসূলূল্লাহ্ [সা] হযরত সা'দ ইবনু মায়ায ও সা'দ ইবনু উবাদাহ্ [রা] কে ডেকে পাঠান যারা খাযরাজ গোত্রের সর্দার ছিলেন। পুরো ঘটনা খুলে বললেন। তারা বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটা কি আপনার প্রতি কোনো নির্দেশ? তিনি বললেন, নির্দেশ হলে তো তোমাদের সাথে পরামর্শ করার কোনো প্রয়োজনই পড়তো না। এটা আমার নিজস্ব মতামত যা তোমাদের নিকট বললাম। তখন তারা বললেন- 'আমরা জাহেল ছিলাম। তখনও কাউকে কিছু দিয়ে সন্ধি করিনি। আর আজ আমরা মুসলমান, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সহায়। আল্লাহর কসম! আমরা তাদের সাথে তরবারী দিয়ে ফায়সালা করবো।' রাসূল [সা] বললেন- 'এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।'
📄 কাফিরদের সাথে সন্ধি
আবু উবায়দাহ্ বলেছেন- কাফিরদের সাথে সন্ধি করা হবে, না যুদ্ধ করতে হবে সে ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। একদল বলেন, তাদের সাথে সন্ধি করা বৈধ। তাদের দলিল হচ্ছে নিম্নোক্ত আয়াত দু'টো-
وَإِنْ جَنَحُوا لِلسِّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ (ط) إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
হে নবী! যদি শত্রুপক্ষ শাস্তি ও সন্ধির জন্য আগ্রহী হয় তবে তুমিও তার জন্য আগ্রহী হও এবং আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সব কিছু শোনেন ও জানেন। [সূরা আল আনফালঃ ৬১]
فَلَا تَهِنُوا وَتَدْعُوا إِلَي اسلم (ق) وَانْتُمُ الْأَعْلُونَ (3) وَاللَّهُ مَعَكُمْ وَلَنْ يُتْرِكُمْ أَعْمَالَكُمْ.
অতএব তোমরা সাহসহীন হয়ে পড়ো না এবং সন্ধি করে বসো না। আসলে তোমরাই বিজয়ী হবে, কেননা আল্লাহ্ তোমাদের সাথে আছেন। তোমাদের আমল তিনি কখনো বিনষ্ট করবেন না। [সূরা মুহাম্মদ- ৩৫]
উপরোক্ত আয়াতদ্বয় প্রমাণ করে, মুসলামানগণ ইচ্ছে করলে সন্ধি করতে পারে। তবে সক্ষম অবস্থায় সন্ধির প্রস্তাব মুসলমানগণ আগে না দেওয়া উত্তম। এটি ইমাম মালিক [রা] এর অভিমত।
অন্য দলের মতে- 'কোনো অবস্থাতেই কাফিরদের সাথে সন্ধি করা যাবে না। ততোক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে যতোক্ষণ তারা ইসলাম গ্রহণ না করে অথবা জিযিয়া দিতে রাজী না হয়।'
ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত - যখন মুসলমানগণ যুদ্ধ করতে করতে দূর্বল হয়ে যাবে, তখন কোনো কিছুর বিনিময়ে সন্ধি করা বৈধ। অন্য বর্ণনায় আছে- মুয়াবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ান ও আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ান এরূপ করেছেন। এ বর্ণনাটি ইমাম আওযায়ী [রহ] এর। সন্ধির ব্যাপারে ইমাম মালিকের দলিল হচ্ছে- সাফওয়ান ইবনু উমাইয়াকে নবী করীম [সা] এই বলে ওয়াহাব ইবনু আমেরকে নিজের চাদর দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সাফওয়ানের জন্য দু'মাসের নিরাপত্তা প্রদান করা হলো। তাকে বলা হলো- সন্ধি করে নাও। সে বললো, অসম্ভব! আমি সন্ধি করবো না, যতোক্ষণ পর্যন্ত তুমি স্পষ্ট ঘোষণা না দেবে যে, রাসূল [সা] তোমাকে চার মাসের অবকাশ দিয়েছেন।
📄 গনিমতের মাল
বুখারী ও অন্যান্য কিতাবে আছে- গনিমতের মালে নবী করীম [সা] ঘোড়ার জন্য দুই অংশ এবং যারা বাহন ছাড়া তাদের জন্য এক অংশ নির্ধারণ করেছেন। এটি রাসূল [সা] এর আমলের দ্বারা প্রমাণিত এবং এ ব্যাপারে উলামাগণ একমত। তবে ইমাম আবু হানিফা বলেন, ঘোড়া ও তার সওয়ারীর জন্য দু'অংশ এবং যাদের ঘোড়া নেই তাদের জন্য এক অংশ। তিনি মুযমা ইবনু হারিসা বর্ণিত হাদীসকে দলিল হিসাবে পেশ করেন। সেখানে বলা হয়েছে- রাসূল [সা] খায়বার যুদ্ধে প্রত্যেক সওয়ারীকে দু'অংশ এবং পদাতিককে এক অংশ গণিমতের মাল প্রদান করেছেন। ইবনু মুবারকের হাদীসেও অনুরূপ বলা হয়েছে। এ দু'টো বর্ণনাও তাদের জন্য দলিল নয়। কেননা ইবনু আব্বাস [রা] খায়বারের গনিমত বন্টন সংক্রান্ত বিপরীত হাদীস বর্ণনা করেছেন। একমাত্র আবদুল্লাহ্ ইবনু ওমর [রা] ছাড়া সমস্ত সাহাবীই বিপরীত বর্ণনা করেছেন। খায়বারের গণিমতের মাল হুদাইবিয়ার ১৪শ সাহাবীর জন্য নির্দিষ্ট ছিলো। আহলে হুদাইবিয়ার মধ্যে একমাত্র জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ অনুপস্থিত ছিলেন না। তবু নবী করীম [সা] তার জন্য অংশ রেখে ছিলেন। সকল অভিযানেই নবী করীম [সা] ঘোড়ার জন্য দু'অংশ এবং আরোহীর জন্য এক অংশ এ ভাবে বন্টন করেছেন। ইবনু ইসহাক বলেছেন- বনী কুরাইযার অভিযানে ৩৬জন অশ্বারোহী ছিলো। মদুওনায় বর্ণিত হয়েছে- এটিই ছিলো মুসলমানদের প্রথম গণিমতের মাল যেখানে বন্টনের নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। সমস্ত মাল পাঁচ ভাগে বন্টন করা হয়েছিলো এবং সে ধারা এখনো অব্যহত আছে। কাজী ইসমাঈল বলেন, আমার মনে হয় পাঁচ ভাগে বন্টনের নির্দেশ তারপর অবতীর্ণ হয়েছে। এ ব্যাপারে হাদীসে কোনো সময়ের উল্লেখ নেই। তবে নিশ্চিত বলা যায়, এক পঞ্চমাংশ এর বর্ণনা হুনাইনের যুদ্ধে গনীমতের ব্যাপারে এসেছে। যে সব যুদ্ধে রাসূল [সা] অংশ গ্রহণ করেছেন এ হচ্ছে তাঁর অংশ গ্রহনে সর্বশেষ যুদ্ধ।