📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 বনী কুরাইযা ও বনী নাযীরের ব্যাপারে ফায়সালা

📄 বনী কুরাইযা ও বনী নাযীরের ব্যাপারে ফায়সালা


বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- আহযাব যুদ্ধের সময় হযরত সা'দ ইবনু মায়াজ [রা] কে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, ফলে তাঁর বাহুর প্রধান রগ কেটে যায়। রাসূল [সা] তাঁর ক্ষতস্থান আগুন দিয়ে ছ্যাঁকা দেন, তবু তার ক্ষতস্থান ফুলে ইনফেকশন হয়ে যায়। তখন তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করেন, "ইয়া আল্লাহ! আমাকে বনী কুরাইযার পরিণতি না দেখিয়ে মৃত্যু দিওনা।" এরপর তার ক্ষতস্থান সাময়িক ভাবে ভালো মনে হয়। এদিকে বনী কুরাইযা ও বনী নাযীর হযরত সা'দ ইবনু মায়াজকে বিচারক মেনে নেয়। তখন রাসূল [সা] তাকে উপস্থিত হওয়ার জন্য খবর পাঠান। তিনি অল্প দূরেই থাকতেন। খবর পেয়ে গাধার পিঠে করে এসে উপস্থিত হলেন। যখন তিনি মসজিদের নিকটবর্তী হলেন তখন হুজুর [সা] জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের নেতাকে এগিয়ে আনো। লোকজন তার দিকে এগিয়ে গেল। তিনি এসে নবী করীম [সা] এর কাছে বসে পড়লেন। হুজুরে পাক [সা] তাঁকে বললেন, এরা তোমাকে বিচারক মনোনীত করেছে।
হযরত সা'দ বললেন- আমি তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিচ্ছি, যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে। শিশু ও মহিলাদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের মালামাল (গনিমতের মাল হিসেবে) বন্টন করা হবে। রায় শুনে রাসূল [সা] বললেন- নিশ্চয়ই তুমি মহান আল্লাহর ইচ্ছেনুযায়ী ফায়সালা করেছো। তখন তাদের শিশু ও মহিলাদেরকে কিল্লা থেকে বের করে মদীনার বনী নাজ্জার গোত্রের এক মহিলা যিনি বিনতে হারিস নামে খ্যাত তার বাড়ি নিয়ে বন্দী করে রাখা হ এবং সক্ষম পুরুষদেরকে শিরোচ্ছেদ করা হয়।
তাদের সংখ্যা ছিলো প্রায় ৬/৭ শ'। তার মধ্যে তাদের সর্দার হুয়াই ইবনু আখতার এবং কাব ইবনু আসা'দ ও ছিলো। আরেক দলের মতে তাদের সংখ্যা ছিলো আটশ' থেকে এক হাজার। কা'ব ইবনু আসাদকে যখন নবী করীম [সা] এর দরবারের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, তখন বনী কুরাইযা তাকে উদ্দেশ্য করে বললো- হে কা'ব! আমাদের সাথে কি আচরণ করা হবে? সে উত্তর দিলো, তোমরা কি সর্বদা বোকাই রইলে? তোমরা দেখছো না আহবানকারী নমনীয় হবার পাত্র নয় এবং তোমাদের কাছ, থেকে যে যাচ্ছে সে আর ফিরে আসছে না। এতো আল্লাহ্র ইচ্ছেনুযায়ী হত্যা। আয়িশা [রা] বলেছেন- তাদের মধ্যে একজন স্ত্রীলোক ছাড়া আর কোনো স্ত্রীলোককে হত্যা করা হয়নি। নিহত মহিলার নাম ছিলো বুনানা। এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছিলো যে, সে খালদু ইবনে সুয়াইদকে উপর থেকে যাতা (চাককী) ফেলে হত্যা করেছিলো।
আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই ইবনু সুলুল হযরত সা'দ ইবনু মায়াযকে বনী কুরাইযার ব্যাপারে সুপারিশ করলো এবং বললো- তারা আমার দু'বাহুর মধ্যে একটি বাহু (স্বরূপ)। তাছাড়া তাদের মাত্র তিনশ' লোক সসস্ত্র বাকী ছয়শ' নিরস্ত্র। সা'দ [রা] তাকে বললেন- সা'দ শপথ করেছে, আল্লাহর সাথে যারা ষড়যন্ত্র করে তাদের কারো কোনো সুপারিশ গ্রহন করা হবে না। যাহোক তাদেরকে হত্যা করে বাড়ী পৌঁছা মাত্র তাঁর অসুখ বেড়ে গেলো এবং সেই অসুখেই তিনি ইন্তিকাল করেন।
ইবনু শিহাব মুখতাছারে মদুওনায় বর্ণনা করেছেন, বনু নাযীরের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো তৃতীয় হিজরীর মুহাররম মাসে। কেউ কেউ বলেছেন ৪র্থ অথবা ৫ম হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসের ৯ তারিখে।
২৩ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখা হয়েছিলো। আয়িশা [রা] বলেছেন, ২৫ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখা হয়েছিলো।
অন্য বর্ণনায় আছে- রাসূল [সা] ২১ রাত তাদেরকে অবরোধ করে রাখেন। অতঃপর তারা সন্ধি করার জন্য আবেদন জানায়। কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন এবং বলে দেন, 'তাদেরকে মদীনা হতে বহিস্কার করা হবে।' তারা এ শর্ত মেনে নেয়। রাসূল [সা] তাদেরকে প্রতি তিন পরিবারের মালামাল একটি উটে যা নেয়া যায় সেই পরিমাণ নিয়ে যেতে এবং অবশিষ্ট মালামাল রেখে যেতে নির্দেশ দেন। তখন তারা শাম (সিরিয়া) এর দিকে চলে যায়।
এটাই তাদের হাশর বা জমায়েত হওয়ার স্থান। আবু উবাইদ কিতাবুল আহমওয়ালে বর্ণনা করেছেন- ইহুদীদেরকে বলা হয়েছিলো, তোমরা রাসূল (সা) এর ফয়সালা মেনে নাও। কিন্তু তারা বললো, আমরা সা'দ ইবনু মায়াযের ফয়সালা মানবো। হুজুর (সা) বললেন- ঠিক আছে তার ফায়সালার ওপরই আস্থা রাখো।
আবু দাউদ শরীফে আছে- বনী নাযীর বনী কুরাইযার চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ছিলো এবং তাদের উভয় গোত্রই হারুন (আ) এর বংশধর। কিতাবুল মুফাদ্দালে বর্ণিত হয়েছে- বনী নাযীরকে নির্বাসন দেয়ার কারণ হচ্ছে- একবার নবী করীম (সা) তাদের নিকট তাশরীফ নিলেন এবং তাঁর সাথে একদল সাহাবাও ছিলো। তাদের সাথে আলোচনার বিষয় ছিলো বনু কিলাব গোত্রের নিহত দু'ব্যক্তির দিয়াত সম্পর্কে। যাদেরকে আমর ইবনু উমাইয়া হত্যা করেছিলো। তারা বললো- হে আবুল কাশেম! আমরা আপনার রায় মেনে নেবো। এদিকে তারা গোপনে পরামর্শ করলো, রাসূল (সা) কে তারা হত্যা করবে। আমর ইবনু জাহাশ নাদেরী বললো, আমি ছাদের ওপর চড়ে সেখান থেকে পাথর ফেলে দেবো। সালাম মাশকুম বললো, তোমরা একাজ করোনা, আল্লাহর কসম! তোমরা যা ইচ্ছে করেছো অবশ্যই আল্লাহ্ তাকে সে সম্পর্কে অবহিত করবেন। তাছাড়া এটা আমাদের ও তাদের মধ্যের কৃত ওয়াদার পরিপন্থী। এদিকে রাসূলে পাক (সা) এর নিকট তাদের ষড়যন্ত্রের সংবাদ পৌঁছে গেলো। অন্য বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি জিব্রাইল (আ) কর্তৃক সংবাদ পেয়েছিলেন। তৎক্ষনাৎ তিনি সেখান থেকে উঠে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। দেখাদেখি সাহাবীগণও তার অনুসরণ করলেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসূল চলে এলেন অথচ আমরা বুঝতেও পারলাম না। তখন হুজুর (সা) বললেন, ইহুদী বিশ্বাস ঘাতকতার ইচ্ছে করেছিলো, আল্লাহ্ আমাকে অভিহিত করেছেন।
তিনি মদীনায় পৌঁছে তাদের নিকট সংবাদ পাঠালেন তোমরা আমাদের শহর থেকে চলে যাও, কারণ তোমরা গাদ্দারী করেছো। কাজেই আমাদের সাথে বসবাস করার কোনো অধিকার তোমাদের নেই। তোমাদেরকে দশ দিনের অবকাশ দিলাম। এরপর যাকে পাওয়া যাবে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে।' এদিকে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই তাদেরকে সংবাদ পাঠালো, 'তোমরা নিজের ঘর থেকে নড়বেনা। আমার দু'হাজার যোদ্ধা যুবক তোমাদের কিল্লায় এসে তোমাদের সাথে মিলবে। তা ছাড়া বনী কুরাইযা ও বনী গাতফান হতেও তোমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সহযোগীতা পাবে।' একথা শুনে বনী নাযীরের সর্দার দারুন মানসিক স্বস্তি লাভ করলো এবং দাম্ভিকতার সাথে নবী করীম [সা] কে সংবাদ পাঠালো, 'আমরা নিজেদের ঘর ছাড়বো না তোমাদের যা খুশী তা করতে পারো।' অতঃপর রাসূল [সা] আল্লাহু আকবার বলে সাহাবীদেরকে তাদের ওপর আক্রমণের নির্দেশ দিলেন এবং হযরত আলী ইবনু আবি তালিবের হাতে ঝান্ডা তুলে দিলেন।
যখন তারা এদৃশ্য দেখলো তখন সবাই কিল্লার ভেতর গিয়ে আশ্রয় নিলো। এদিকে বনী কুরাইযা নিরবতা অবলম্বন করলো। বনী গাতফান প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলো। রাসূল [সা] তাদেরকে অবরোধ করে রাখলেন এবং তাদের খেজুর বাগানসমূহ ধ্বংস করে দিলেন। তখন তারা খবর পাঠালো, আমরা আপনাদের শহর ছেড়ে চলে যেতে রাজী। রাসূল [সা] বলে পাঠালেন, আমরা তোমাদের কথা বিশ্বাস করিনা। যদি যেতে চাও, তবে অবিলম্বে চলে যাও। আত্মরক্ষার অস্ত্র ছাড়া এবং যা কিছু উটে করে নেয়া সম্ভব তাছাড়া আর কিছু নিতে পারবেনা।' তারা এ শর্ত মেনে নিয়ে চলে যায়। তাদের অবশিষ্ট মালামাল ও অস্ত্রসস্ত্র নবী করীম (সা) এর হস্তগত হয় এবং তিনি বনী নাযীর থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ মালামাল নিজের প্রয়োজনের জন্য রেখে দেন। এ সমস্ত মাল তিনি বন্টন করেননি কেননা এটা ছিলো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্ প্রদত্ত দান। এতে মুসলমানগণ কোনো যুদ্ধ বা ঝুকির সম্মুখীন হয়নি।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, 'যারা তোমাদের মধ্যে এরূপ কাজ করে তাদের শাস্তি আর কী হতে পারে যে, তারা দুনিয়ার জীবনে লাঞ্চিত ও অপদস্ত হবে।' [সূরা আল বাকারা ১০ম রুকু]
আল্লাহ্ সূবহানাহু তাআলা আরো ইরশাদ করেন- 'যেন পাপীদেরকে অপমানিত করে।' -[সূরা আল হাশর: ১ম রুকু]
তিন হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে নবী করীম [সা] বনী কুরাইযার ওপর চড়াও হন। তাদেরকে ১৫দিন অবরোধ করে রাখা হয়। তারা বলে পাঠায় যে, তাদের কাছে যেন আবু লুবাবাহ [রা] কে পাঠানো হয়। তিনি তাকে পাঠিয়ে দিলেন। বনী কুরাইযা তাদের ব্যাপারে তাঁর সাথে পরামর্শ করে। তিনি নিজের ঘাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝালেন তোমাদেরকে হত্যা করা হবে। পরে তিনি তার ভুল বুঝতে পেয়ে অনুতপ্ত হন। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়েন এবং বলেন, আমিতো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের খিয়ানত করেছি। তখন তিনি রাসূল [সা] এর নিকট না গিয়ে সোজা মসজিদে গিয়ে একটি খুটির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখলেন। যতোক্ষণ আল্লাহ্ তাঁর তওবা কবুলের সুসংবাদ না দিয়েছেন ততোক্ষণ তিনি এভাবেই নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন। শুধু নামায ও হাজতের সময় তাঁর বাঁধন খুলে দেয়া হতো।
অতঃপর বনী কুরাইযা নবী করীম [সা] এর কাছে নতি স্বীকার করলো। তাদের ব্যাপারে তিনি মুহাম্মদ ইবনু মুসলিমকে নির্দেশ দিলেন। তিনি গিয়ে তাদের মশকগুলো উল্টে দিলেন তারপর আবদুল্লাহ ইবনু সালাম [রা] কে আদেশ দিলেন পরিত্যক্ত মালামাল সংগ্রহের জন্য। যে সমস্ত মাল তাদের পরিত্যক্ত কিল্লায় পাওয়া গিয়েছিলো তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার যুদ্ধাস্ত্র যেমন- দেড় হাজার তলোয়ার তিনশ' বর্ম, এক হাজার বর্শা, পাঁচশ' ঢাল এবং শরাবের মটকী। মটকীগুলোকে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিলো। সেই গনীমতের মাল থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করা হয়নি।
আওস গোত্র তাদের ব্যাপারে রাসূল [সা] কে বলছিলো, তাদেরকে মা'ফ করে দেয়ার জন্য। কারণ তারা তাদের সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলো। নবী করীম [সা] তাদের ফায়সালা সা'দ ইবনু মায়ায [রা] এর ওপর ন্যাস্ত করেছিলেন। সা'দ [রা] তাদের যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন সকল পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদের বন্দী এবং তাদের মালামাল গনিমত হিসেবে বন্টনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
রাসূল [সা] বলেছিলেন- তোমার ফায়সালা সাত আসমান জমিনের বাদশাহ অনুরূপ ফায়সালা হয়েছে। অতঃপর তাদের সক্ষম ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা হলো। যাদের সংখ্যা ছয়শ' থেকে সাতশ' পর্যন্ত ছিলো। নবী করীম [সা] তাঁর জন্য রেহানা বিনতে আমরকে রাখলেন এবং লুণ্ঠিত মালামাল জমা করার নির্দেশ দিলেন। সমস্ত মাল এবং বন্দীদের পাঁচ ভাগে ভাগ করে এক পঞ্চমাংশ রেখে অবশিষ্টগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। সর্বমোট তিন হাজার বাহাত্তর ভাগ হয়েছিলো। দু'অংশ ঘোড়ার জন্য এবং এক অংশ আরোহীর জন্য এ ভাবে বন্টন করে দিলেন। অবশ্য রাসূল [সা] বন্দীদের মধ্যে অনেককে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আবার কাউকে দান করে দিয়েছিলেন। আবার কাউকে খেদমতে লাগিয়ে ছিলেন।
ইমাম মালিক [রহ] বলেছেন- নবী করীম (সা) বনী কুরাইযার মাল থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করেছেন কিন্তু বনী নাযীরের সম্পদ থেকে বের করেননি।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 মক্কা বিজয়ের দিন নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কে

📄 মক্কা বিজয়ের দিন নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কে


মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- মক্কা বিজয়ের দিন নবী করীম [সা] যখন পবিত্র মক্কা শরীফে প্রবেশ করেন তখন তাঁর মাথায় শিরস্ত্রাণ ছিলো। মক্কায় প্রবেশ করে শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলার পর এক লোক এসে বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ্। ইবনু খাতাল বাইতুল্লাহ্ গেলাফের আড়ালে আত্মগোপন করে রয়েছে। তিনি বললেন, "তাকে হত্যা করো।"
ইবনু শিহাব হতে ইবনু মালিকের বর্ণনাও অনুরূপ।
বুখারী ও মুসলিমে আরো বলা হয়েছে- তিনি সেদিন এক উটনীর ওপর সওয়ার ছিলেন এবং তাঁর পেছনে উসামা ইবনু যায়িদ বসা ছিলেন। তিনি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, আহতদের হত্যা করা যাবে না। পলায়নরত কোনো ব্যক্তির পশ্চাৎ ধাবন করা যাবে না, বন্দীদের হত্যা করা যাবে না। যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরে অবস্থান করবে সে নিরাপদ।
নাসাঈ ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত আছে, রাসূল [সা] বললেন, 'যে কা'বা ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, আর যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে সেও নিরাপদ এবং যে অস্ত্র সমর্পণ করবে সেও নিরাপদ, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।' এভাবে তিনি সব লোককে নিরাপত্তা প্রদান করলেন। শুধুমাত্র চারজন পুরুষ ও দুজন স্ত্রীলোক ছাড়া। ইবনু হাবীব বলেছেন, ছয়জন পুরুষ ও চারজন স্ত্রী। কারণ তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করা হয়েছিলো। যদিও তারা কাবা ঘরের গেলাফ ধরে ঝুলে থাকে। নাসাঈ ও অন্যান্য গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতাল, ইকরামা ইবনু আবু জাহেল, মুকাইশ ইবনু ছাবাবা এবং আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ ইবনু আবু সুরাহ এর মৃতদন্ড ঘোষণা করা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনু খাতালকে, কা'বা শরীফের গেলাফের নিচে আত্মগোপন অবস্থায় পাওয়া যায়। দেখামাত্র তারকে সাঈদ ইবনু হারিসা এবং আম্মার ইবনু ইয়াসির একযোগে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করেন। মুকাইশ ইবনু ছাবা'কে লোকজন বাজারে নিয়ে হত্যা করে। নবী করীম [সা] ইবনু খাতালের মালামাল আটক করেননি। ইবনু হিশام বলেছেন, মুকাইশকে তার গোত্রেরই এক ব্যক্তি হত্যা করে এবং আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতালকে সাঈদ ইবনু হারিস ও আবু বুরজা আসলামী এক সঙ্গে হত্যা করেন। ইকরামা সমুদ্রপথে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে, কিন্তু পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে যায়। তখন নাবিক যাত্রীদের লক্ষ্য করে বলে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর • ইবাদতে মশগুল হয়ে হয়ে যাও। কারন অন্যান্য দেবদেবীরা এ বিপদ থেকে বাঁচাতে অক্ষম। একথা শুনে ইকরামা বলে উঠে, 'আল্লাহর কসম! এখানে যদি একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে না পারে তবে শুকনো জমিনেও আর কারো বাঁচানোর ক্ষমতা নেই। প্রভু আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যদি এ যাত্রা থেকে বেঁচে যাই তবে মুহাম্মদ [সা] এর কাছে গিয়ে আমি আমাকে তাঁর হাতে সোপর্দ করে দেবো। কেননা আমি তাকে অত্যন্ত দয়ালু হিসেবে জানি। 'অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করে। আবদুল্লাহ্ বিন সা'দ ইবনু আবু সুরাহ হযরত ওসমান [রা] এর কাছে গিয়ে আত্মগোপন করে। রাসূল [সা] যখন লোকদের বাইয়াত করাচ্ছিলেন তখন তাকে বাইয়াতের জন্য হাজির করা হয় এবং আরজ করা হয়, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাকে বাইয়াত করান।' এভাবে তিনবার বলা হলো, কিন্তু তিনি তিনবারই নিরবতা পালন করলেন। অবশেষে তার বাইয়াত গ্রহন করেন। তারপর সাহাবাদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা যখন আমাকে তার বাইয়াতের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত দেখলে তখন উঠে তাকে হত্যা করলে না কেন? তারা আরজ করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আপনার মনের কথা কি করে জানবো? আপনি যদি আমাদেরকে একটু ইঙ্গিত করতেন, তবেই হতো। তিনি বললেন, 'এ কাজ নবীর দ্বারা শোভা পায়না।'
ইবনু হিশামের হাওয়ালা দিয়ে ইবনু হাবীব বলেছেন- নবী করীম [সা] উল্লেখিত পুরুষ ও স্ত্রী ছাড়া হেরাছ ইবনু নাযীর ইবনু ওয়াহাব ইবনু আবদে মানাফ ইবনু কুশাইকেও হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত আলী ইবনু আবী তালিব [রা] তাকে বন্দী করে হত্যা করেন।
ইবনু হাবীব উল্লেখিত মহিলাদ্বয় ছাড়া আরো দু'জন মহিলার কথা বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতালকে হত্যা করার পর যারা রাসূল [সা] এর বিরুদ্ধে কুৎসা মূলক করে গান গেয়েছিলো। একজনের নাম ছিলো ফারতানা এবং অপরজনের নাম কারইয়াবাহ। ফারতানা পরবর্তীতে মুসলমান হয়ে যায় ও হযরত ওসমান [রা] এর খিলাফতকালে ইন্তেকাল করে। কারইয়াবাহ ও সারাকে হত্যা করা হয়। হিন্দা বিনতে উতবাও মুসলমান হয় এবং বাইয়াত গ্রহণ করে।
ইবনে ইসহাক বলেছেন, সারাকে রাসূল [সা] নিরাপত্তা প্রদান করেন। সে ওমর ইবনু খাত্তাব (রা) এর শাসনামল পর্যন্ত জীবিত ছিলো, পরে এক দূর্ঘটনায় নিহত হয়। আবু উবাইদ কিতাবুল আমওয়ালে লিখেছেন, এই সারা-ই হাতিব [রা] এর পত্র মক্কায় নিয়ে যাচ্ছিলো। ইবনু ইসহাক আরো বলেছেন- রাসূল [সা] আবদুল্লাহ্ ইবনু আবু সূরাহকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ সে মুসলমান হওয়ার পর নবী করীম [সা] এর কাতিবে ওহী বা ওহী লিখকের দায়িত্ব পালন করতো। পরে মুরতাদ হয়ে যায় এবং শির্কে লিপ্ত হয়। আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতালও অবশ্য মুসলমান হয়েছিলো। একবার রাসূল [সা] তাকে একজন আনসার ও তার এক মুসলমান চাকর সহ কোনো দায়িত্ব দিয়ে এক জায়গায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে এক মনজিল অতিক্রম করার পর চাকরকে তার জন্য একটি ছাগল যবেহ্ করে রান্না করার নির্দেশ দেয়। চাকর তার কথা না শুনার কারণে চাকরকে হত্যা করে এবং মুরতাদ হয়ে পালিয়ে যায়। আর হেরাছ ইবনু নাযীর ঐ সমস্ত লোকদের অন্যতম যারা মক্কায় থাকাকালীন অবস্থায় হুজুর [সা] এর সাথে দুর্ব্যাবহার করতো এবং হযরত আব্বাস ইবনু মুত্তালিব [রা] যখন হযরত ফাতিমা ও উম্মে কুলসুমকে মদীনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন সে একটি কাঠ দিয়ে তাদেরকে প্রহার করে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলো। মুকাইশ এক আনসারীকে হত্যা করেছিলো, যিনি তার ভাইকে ভুলবশতঃ হত্যা করেছিলেন। উক্ত আনসারীকে হত্যা করে সে মুরতাদ হয়ে মক্কায় পালিয়ে যায়।
ইবনু হিশাম বর্ণনা করেছেন- প্রথম নিহত ব্যক্তি মক্কা বিজয়ের দিন যার দিয়াত আদায় করা হয়েছিলো, তিনি হচ্ছেন জয়নাব বিনতে উকু। বনু কা'ব তাকে হত্যা করেছিলো। তিনি তার দিয়াত বাবদ ১০০শ' উট আদায় করেছিলেন এবং বলেছিলেন, হে খাজায়া গোত্র, এবার তোমরা হত্যা বন্ধ করো, কেননা হত্যা তো অনেক হয়েছে।
ইবনু হাবীব বলেন- রাসূল [সা] বনী খাজায়াকে বনী বকরের বিরুদ্ধে আসর পর্যন্ত যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ইবনু হিশام বলেন, ঘটনাটি হচ্ছে, হুদাইবিয়ার বৎসর নবী করীম [সা] ও আহলে মক্কার মধ্যে যে সন্ধি সম্পাদিত হয়েছিলো তাতে একটি শর্ত ছিলো "যে গোত্র বা দল যার সাথে ইচ্ছে মিলে থাকতে পারবে।" বনী খাজায়া গোত্র মুসলমানদের সাথে এবং বনী বকর গোত্র আহলে মক্কার পক্ষ অবলম্বন করে। সন্ধি বলবত থাকাবস্থায় একদিন হঠাৎ করে বনী বকর গোত্র বনী খাজায়া গোত্রের ওপর হামলা করে বসে এবং তাদের পর্যদস্ত করে দেয়। এ ঘটনার পর আমর ইবনু সালেম এসে নবী করীম [সা] কে সব ঘটনা জানায় এবং তাঁর সাহায্য কামনা করে। ঐ সময় মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি চলছিলো। তখন রাসূল [সা] তাদেরকে মুকাবিলা করার অনুমতি দেন। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন, সেদিন বনী খাজায়া কর্তৃক মক্কায় যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো, তাদের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে পঞ্চাশ জন।
আবু সুফিয়ান অভিযোগ করলো- ইয়া রাসূলূল্লাহ্! কুরাইশদের শস্যক্ষেত ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। রাসূল [সা] বললেন- আজকের পর আর কোনো কুরাইশের সাথে যুদ্ধ হবে না এবং আর কাউকে বন্দী করে হত্যা করা হবে না।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 নামাযে কসর করার নির্দেশ

📄 নামাযে কসর করার নির্দেশ


ইবনু হাবীব বলেন- যখন রাসূল [সা] মক্কা বিজয়ের পর সেখানে ১৫ রাত অবস্থান করেন। তখন তিনি নামায কসর করতে থাকেন। বুখারী শরীফে হযরত ইবনু আব্বাস [রা] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- মক্কায় নবী করীম [সা] ১৯ দিন অবস্থান করেন এবং নামায কসর করেন। আনাস [রা] বলেছেন, আমরা রাসূল [সা] এর সাথে মক্কায় ১০ দিন অবস্থান করি এবং নামায কসর আদায় করি। ইবনু আব্বাস [রা] বলেন- তিনি ১৯ দিন অবস্থান করে কসর আদায় করেন যদি বেশী থাকতেন তবে পুরো নামাযই আদায় করতেন। ইমাম শাফিঈ বর্ণনা করেন, তিনি মক্কা বিজয়ের পর সেখানে ১৮ দিন অবস্থান করেন এবং কসর আদায় করেন। আবু দাউদে হযরত জাবির [রা] থেকে বর্ণিত নবী করীম [সা] তাবুক যুদ্ধে ২০ দিন অবস্থান করেন এবং সেখানে তিনি কসর আদায় করেন।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 খায়বারের ইহুদী নেতৃবৃন্দ

📄 খায়বারের ইহুদী নেতৃবৃন্দ


বর্ণিত আছে, নবী করীম [সা] বিশ থেকে ত্রিশ দিন খায়বার অবরোধ করে রাখেন। পরে তারা এই শর্তে সন্ধি করে নেয় যে, কোনো জিনিস নবী করীম [সা] থেকে গোপন করা হবে না। তিনি বললেন- 'হে হাকীকের বংশধরেরা! মনে হয় তোমাদের শত্রুতা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে। তোমরা তোমাদের ভাইদেরকে যা কিছু দিয়েছো তা থেকে আমি বিরত হবো না। তাছাড়া তোমরা এ প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছো যে, কোনো কিছু আমার কাছ থেকে গোপন রাখবে না। যদি রাখো তাহলে তোমাদের রক্ত আমাদের জন্য হালাল হয়ে যাবে।' রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন- তোমাদের আসবাবপত্র কোথায়? তারা বললো- আমরা সবকিছু যুদ্ধে খরচ করে ফেলেছি। বর্ণনাকারী বলেন- অতঃপর তিনি সাহাবাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তাদের খানা তল্লাশী করে সবকিছু দখল করে নেয়ার জন্য। অতঃপর তাদেরকে হত্যা করা হলো। ইবনু ওকবা তাঁর গ্রন্থে বলেন- তারা এ শর্তের ওপর সন্ধি করেছিলো যে, তাদের কোনো কিছুই নবী করীম [সা] থেকে গোপন করবে না এবং তাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর তারা কোনো কিছুর ওপরই মালিকানা দাবী করবে না। যদি কিছু গোপন করে তাহলে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যিম্মা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।
আবু উবাইদা বলেন- আমার নিকট ইয়াজিদ বর্ণনা করেছেন, হুবাই ইবনু খাতাব নবী করীম [সা] এর সাথে এই চুক্তি করেছিলো যে, সে তাঁকে ছাড়া আর কাউকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা করবে না। চুক্তিতে আল্লাহকে জামিন বানিয়েছিলেন। যখন বনী কুরাইযার দিন এলো তখন তাকে এবং তার ছেলে সালমাকে রাসূল [সা] এর নিকট উপস্থিত করা হলো। রাসূল [সা] বললেন, 'এবার উচিত জবাব নাও।' তারপর বাপ বেটার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হলো। আবু উবাউদ আরো বলেছেন- তিনি কিছু লোককে আবুল হাকিকের নিকট পাঠিয়েছিলেন, যেন তাকে হত্যা করা হয়। তারা তাকে হত্যা করে। তার এক ধনভান্ডার ছিলো। তাকে মশকুল জামাল [উটের চামড়া] বলা হতো। একের পর এক সর্দার তার তত্তাবধান করতো। সে সেগুলো গোপন করে ফেললো। এ জন্য চুক্তি মোতাবেক নবী করীম [সা] তাকে হত্যা করেছিলেন।
ওয়াকিদী বলেছেন- সেই রত্নাগারে প্রায় দশ হাজার দীনার মূল্যের মালামাল ছিলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00