📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 গুপ্তচর ও গোয়েন্দাগিরি

📄 গুপ্তচর ও গোয়েন্দাগিরি


বুখারী ও অন্যান্য গ্রন্থে আয়াস ইবনু সালমা ইবনু উকু হতে বর্ণিত হয়েছে, এক মুশরিক গুপ্তচর নবী করীম [সা] এর নিকট আসছিলো। তিনি সাহাবীদেরকে নিয়ে বসা ছিলেন। যখন সে কাছাকাছি পৌঁছলো তখন নবী করীম [সা] বললেন, ঐ ব্যক্তিকে ধরে আন এবং হত্যা কর। তখন লোকজন তাকে ধরার জন্য বেরিয়ে গেলো। আয়াস [রা] বলেন, আমার পিতা ঘোড়া দৌড়ে তাকে ধরে আনলেন এবং তার উটনীও নিয়ে এলেন। অতঃপর তাকে হত্যা করলেন। নবী করীম [সা] নিহত ব্যক্তির মালামাল তাকে গণিমত হিসেবে প্রদান করলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আবু রাফে [রা] বলেন, আমি হযরত আলী ইবনু আবু তালিব [রা] কে বলতে শুনেছি, নবী করীম [সা] যুবায়ের, মিকদাদ ও আমাকে এক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আমাদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, তোমরা খুব তাড়াতাড়ি রওযায়ে খাক নামক স্থানে পৌঁছবে এবং সেখানে উটের ওপর আরোহী এক মহিলাকে দেখবে। তার কাছে একটি পত্র আছে। তোমরা পত্রটি নিয়ে আসবে। 'কিতাবুল ফযল' এ আছে- তোমরা দু'জন তার থেকে পত্রটি নিয়ে আসবে এবং তাকে ছেড়ে দেবে। যদি সে পত্র দিতে অস্বীকার করে তবে তাকে হত্যা করবে। বর্ণিত আছে- নবী করিম [সা] জিব্রাঈল (আ) কর্তৃক খবর পেয়েছিলেন। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিলো আমার ঘোড়া আমাকে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই রওযায়ে খাকে পৌঁছে গেলাম এবং উদ্দিষ্ট মহিলাকে দেখতে পেলাম। আমরা তাকে বললাম, তুমি পত্রটি আমাদের দিয়ে দাও, অন্যথায় তোমাকে বিবস্ত্র করে আমরা তার সন্ধান করবো। শুনে মহিলা তার চুলের খোপা থেকে পত্রটি বের করে দিয়ে দিলো। আমরা তা নিয়ে রাসূল [সা] এর নিকট উপস্থিত হলাম। দেখা গেলো, হযরত হাতিব ইবনু আবী বালতায়া মক্কার কয়েকজন নেতৃস্থানীয় মুশরিকদের সম্বোধন করে রাসূল [সা] এর কিছু আচরণ ও গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য পাচার করেছে।
রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন, হাতিব! এটা কি? সে উত্তর দিলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করবেন না। কারণ আমি এমন এক লোক, কুরাইশদের মাঝে বড়ো হয়েছি কিন্তু আমি তাদের বংশের কেউ নই। আপনার সাথে যে সব মুহাজির আছেন মক্কায় তাদের বংশধর আছে। যারা তাদের পরিবার ও সম্পদের হিফাজত করছে। আমি চেয়েছিলাম যেহেতু আমার কোনো বংশগত সম্পর্ক নেই তাই তাদেরকে কিছু ইহসান করি, যেন তারা আমার পরিবার পরিজনকে এ উসিলায় কিছু সাহায্য সহযোগীতা করে। এ সিদ্ধান্ত মুরতাদ ও কুফরীর দিকে ফিরে যাবার নিমিত্তে করিনি। একথা শুনে হুজুর [সা] উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, সে তোমাদের সত্য কথাই বলেছে। হযরত ওমর [রা] উঠে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি এ মুনাফিকটার গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেন, এ তো বদর যুদ্ধের অংশ গ্রহণ করেছে। তুমি কি জানো না, যারা বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলে দিয়েছেন, যা চাও করো, আমি তোমাদেরকে মাফ করে দিয়েছি। অতঃপর আল্লাহ্ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন। ইরশাদ হচ্ছে- يَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوكُم أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ (ج) (الي اخر الاياة)
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি জিহাদ করার জন্য ও আমার সন্তোষ লাভের মানসে (দেশ ছেড়ে ঘর হতে) বের হয়ে থাকো তবে আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু বানিয়ে নিয়োনা। তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করো অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে এসেছে তা মেনে নিতে তারা ইতোপূর্বেই অস্বীকার করেছে। (সূরা আল মুমতাহিনা-১)
আবু উবাইদ, তাঁর কিতাবুল আমওয়াল এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন, উষ্ট্রারোহী যে মহিলার নিকট পত্র পাওয়া গিয়েছিলো তার নাম ছিলো- সারা। রাসূল [সা] মক্কা বিজয়ের দিন তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হিশাম বলেছেন, ঐ মহিলা ছিলো মুজায়না গোত্রের।
সামনুন বলেন, যখন কোন মুসলমান দারুল হরবের কাফিরদের সাথে অন্যদের চিঠিপত্র বা অন্য কোন মাধ্যমে যোগাযোগ করবে তখন তাকে হত্যা করতে হবে। তাকে তাওবা করার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করা যাবে না। তার মাল সম্পদ ওয়ারিশগণ পাবে। অন্যদের মতে তাকে বেত্রাঘাতের মাধ্যমে কঠিন শাস্তি দিতে হবে এবং তাকে দীর্ঘ মেয়াদ জেলে আটক রাখতে হবে এবং কাফিরদের কাছ থেকেও তাকে অনেক দূরে রাখতে হবে।
ইবনে কাসেম বলেছেন, তাকে তওবা করার কারণে মুক্তি না দিয়ে বরং হত্যা করতে হবে। কেননা সে যিন্দিকের মতো। আল্লাহ্ বলেছেন এবং তোমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা তোমাদের কথা কাফেরদের নিকট বলে দেয়। আর এরাই হচ্ছে গুপ্তচর।
সানমুনের কথাই অধিকতর সঠিক। যার প্রমাণ হাতিব সংক্রান্ত হাদীস এবং হযরত ওমর [রা] কর্তৃক তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে ফায়সালা

📄 যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে ফায়সালা


ইবনু ওয়াহাব বর্ণনা করেছেন- রক্তপাতের কারণে যারা বন্দী হতো নবী করীম [সা] তাদেরকে হত্যা করতেন। বদর যুদ্ধে যারা বন্দী হয়েছিলো তাদের মধ্যে একমাত্র উকবাকে আসেম ইবনু সাবিত শিরোচ্ছেদ করেন। কেউ কেউ বলেন, হযরত আলী ইবনু আবী তালিব [রা] শিরোচ্ছেদ করেন।
ঐতিহাসিক ইবনু হিশام বলেছেন- নযর ইবনু হারিসকে হযরত আলী ইবনু আবী তালিব [রা] বন্দী করে রাসূল [সা] এর সামনে তাকে হত্যা করেছিলেন ছাফরা নামক স্থানে।
ইবনু হিশামের নিজস্ব গবেষণা হচ্ছে- তাকে আছিল নামক জায়গায় হত্যা করা হয়েছিলো। ইবনু হাবীব বর্ণনা করছেন- সে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো। [এ ব্যাপারে আল্লাহ্ ভালো জানেন যে, উপরোক্ত বর্ণনায় কোনটা সঠিক।
ইবনু কুতায়বা বলেছেন- বদর যুদ্ধে যারা বন্দী হয়েছিলো রাসূল [সা] তাদের মধ্যে তিনজনকে হত্যা করেছিলেন। তারা হচ্ছে- উকবা বিনু আবু মুয়ীত, তায়ীমা ইবনু আব্দ্দী এবং নযর ইবনু হারিস। বাকীদের মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। মুক্তিপণের সর্ব্বোচ্চ পরিমাণ ধার্য করা হয়েছিলো চার হাজার এবং সর্বনিম্ন ছিলো মুসলমানদের লেখাপড়া শিখানোর বিনিময়ে মুক্তি। ইবনু ওয়াহাব বলেন, তখন মদীনাবাসী অল্প সংখ্যক লোক লেখা পড়া জানতো।
ইবনু সালামের তাফসীরে আছে- রাসূল [রা] বন্দীদের ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে যারা চেয়েছে তারা মক্কা চলে গেছে। 'কিতাবুল আ'রাব' এবং নুহাসের 'মাআনিল কুরআনে' হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ [রা] হতে বর্ণিত হয়েছে- যখন বদর যুদ্ধের বন্দীদের হাজির করা হলো, তখন রাসূল [রা] সাহাবাদের নিকট বন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন। হযরত আবু বকর [রা] বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এরাতো আপনারই গোত্রের কাজেই এদেরকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করুন। যাতে পরবর্তীতে এরা তওবা করার সুযোগ পায়।
হযরত ওমর [রা] বললেন- ইয়া রাসুলাল্লাহ্! এরা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং আপনাকে দেশান্তর করেছে আর এদের যুদ্ধারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কাজেই এদেরকে শিরোচ্ছেদ করুন। তখন আল্লাহ্ অবতীর্ণ করেন-
مَا كَانَ لِنَبِيَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرِي حَتَّي يُتَّخِنَ فِي الْأَرْضِ (ط) تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا (3) وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ (ط) وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
কোন নবীর জন্য এটা শোভা পায়না যে, তার কাছে বন্দী থাকবে যতোক্ষণ সে জমিনে শত্রু বাহিনীকে খুব ভালো করে মথিত না করবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও, অথচ আল্লাহ্ চান আখিরাতের। বস্তুত আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানী। (সূরা আনফাল-৬৭)
হাসান বসরী বলেছেন, এ ব্যাপারে কোনো ওহী অবতীর্ণ হয়নি বরং তিনি সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করে মুক্তিপণ নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেবার ফায়সালা গ্রহণ করেন। চার হাজার করে মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল [সা] সেদিন কোনো রক্তপাত সংঘটিত করেননি।
কিতাবুস শরফে আছে- ইসলামে সর্বপ্রথম যার মাথা ঝুলানো হয় সে হচ্ছে আবু উজ্জা। বর্শার মাথায় গেঁথে তা মদীনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সীরাত গ্রন্থ সমূহে বলা হয়েছে- বদর যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে আবু উজ্জা ও আমর ইবনু আবদুল্লাহ্ কবি ছিলো। তারা লোকদের রাসূল [সা] এর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতো কবিতা ও গাঁথার মাধ্যমে। তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূল [সা] উবাই ইবনু হলফকে হত্যা করেছিলেন। তার ঘাড়ে ছোট একটি বল্লমের খোঁচা লেগেছিলো, সাথে সাথে তার ঘাড়ে যন্ত্রণা শুরু হয়ে গিয়েছিলো। তখন সে হত্যাকান্ড বন্ধ করে দিয়ে চিৎকার করতে থাকে, 'মুহাম্মদ আমাকে মেরে ফেলছে।' কাফির কুরাইশরা বললো, তোমার মনে ভয় ঢুকে গেছে তাই প্রলাপ বকছো। আল্লাহর ঐ দুশমন- শারফ নামক স্থানে প্রাণ ত্যাগ করে। উহুদ যুদ্ধে মাত্র ৭০০শ মুসলমান জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করছিলো আর বিপক্ষে কাফির সৈন্য ছিলো তিন হাজার।
বুখারী শরীফে আছে- হযরত সা'দ ইবনু মায়াজ [রা] উমাইায়া ইবনু খালফকে মক্কায় এসে বললেন, আমি নবী করীম [সা] কে বলতে শুনেছি, তোমাকে তিনি হত্যা করবেন। সে বললো, তা তো আমি জানিনা। একথা শুনার পর সে ভীষণ ঘাবড়ে গেলো। যখন বদর যুদ্ধের দিন ঘনিয়ে এলো তখন আবু জাহেল লোকদেরকে উত্তেজিত করতে লাগলো। কিন্তু উমাউয়া ইবনু খালফ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রইলো। আবু জাহেল তার কাছে এসে বললো, 'হে আবু সাফওয়ান! যদি তুমিই বসে পড়ো তবে তো তোমার দলের সব লোকই বসে পড়বে। তুমি হচ্ছো দলপতি, কাজেই তোমাকে ঘাবড়ালে চলবে না।' তখন উমাইয়া বললো, ঠিক আছে তুমি যখন এতো করে বলছো তখন আমি ভালো একটি উট ক্রয় করে নেবো।
তখন সে তার স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বললো, হে সাফওয়ানের মা! তুমি আমার যাবার ব্যবস্থা করে দাও। স্ত্রী বললো, তুমি বলো কি! মদীনার সেই বন্ধুর কথাটি তুমি ভুলে বসে আছো? সে বললো, না ভুলিনি। তবে আমি কিছুদুর গিয়েই ফিরে আসবো। পরে সে যখন বদর অভিমুখে রওয়ানা হল তখন কিছুদুর গিয়েই উটকে পেছনে ফেরাতে চাইলো কিন্তু উট শুধু সামনের দিকে এগুতে লাগলো। আবার কিছু দূর গিয়ে উটকে ফেরাবার চেষ্টা করলো কিন্তু উট আর তার কথা শুনলো না। এমনি ভাবে আল্লাহ্ তাকে বদর প্রান্তরে পৌঁছে দিলেন। নুহাস বলেন, তাকে আল্লাহর রাসূল [সা] নিজ হাতে হত্যা করেছেন।
ইয়ামামার সর্দার আবু উমামাকে বন্দী করে রাসূল [সা] এর সামনে উপস্থিত করা হলো। তখন তাঁর নির্দেশে তাকে মসজিদে বেঁধে রাখা হলো। রাসূল [সা] প্রতিদিন তিনবার তার কাছে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাতে লাগলেন। কিন্তু সে অস্বীকার করতে লাগলো। অবশেষে তাকে প্রস্তাব দেয়া হলো, যদি তুমি চাও তোমাকে মুক্ত করে দেয়া হবে, আর যদি চাও তবে মুক্তিপণ নেয়া হবে, তাছাড়া যদি তুমি চাও যে তোমাকে হত্যা করা হোক তবে তোমাকে হত্যা করা হবে। সে বললো, আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে এক নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। আর যদি মুক্তিপণ চান তাহলে দাবী অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে। আর যদি মুক্তি দেন তাহলে এক কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে মুক্তি দেবেন। আল্লাহর কসম! আমি নিরূপায় হয়ে ইসলাম গ্রহণ করবো না। অতঃপর রাসূল [সা] এর নির্দেশে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। সে রাসূল [সা] এর ব্যবহারে এতো মুগ্ধ হয় যে, সাথে সাথে বলে উঠে-
أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَإِنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ
[আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই, আপনি আল্লাহর রাসূল]
আসবাগ ইবনুল মাওয়ায এর গ্রন্থে বলেছেন- ইমামের উচিত কোনো বন্দীকে হত্যার পূর্বে তার নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদান করা এবং তাকে জিজ্ঞেস করা যে, যারা তাকে বন্দী করেছে তাদের কারো সাথে তার কোনো চুক্তি হয়েছে কিনা? ইবনু আব্বাস [রা] বলেন, রাসূল [সা] বন্দীদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নেয়া, তাদেরকে সৌজন্যতা প্রদর্শন করে ছেড়ে দেয়া, মৃত্যুদন্ড দেয়া কিংবা গোলাম বানানোর ইখতিয়ার দিয়েছেন, যেটি খুশী করতে পারেন।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 বনী কুরাইযা ও বনী নাযীরের ব্যাপারে ফায়সালা

📄 বনী কুরাইযা ও বনী নাযীরের ব্যাপারে ফায়সালা


বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- আহযাব যুদ্ধের সময় হযরত সা'দ ইবনু মায়াজ [রা] কে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করা হয়েছিল, ফলে তাঁর বাহুর প্রধান রগ কেটে যায়। রাসূল [সা] তাঁর ক্ষতস্থান আগুন দিয়ে ছ্যাঁকা দেন, তবু তার ক্ষতস্থান ফুলে ইনফেকশন হয়ে যায়। তখন তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করেন, "ইয়া আল্লাহ! আমাকে বনী কুরাইযার পরিণতি না দেখিয়ে মৃত্যু দিওনা।" এরপর তার ক্ষতস্থান সাময়িক ভাবে ভালো মনে হয়। এদিকে বনী কুরাইযা ও বনী নাযীর হযরত সা'দ ইবনু মায়াজকে বিচারক মেনে নেয়। তখন রাসূল [সা] তাকে উপস্থিত হওয়ার জন্য খবর পাঠান। তিনি অল্প দূরেই থাকতেন। খবর পেয়ে গাধার পিঠে করে এসে উপস্থিত হলেন। যখন তিনি মসজিদের নিকটবর্তী হলেন তখন হুজুর [সা] জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের নেতাকে এগিয়ে আনো। লোকজন তার দিকে এগিয়ে গেল। তিনি এসে নবী করীম [সা] এর কাছে বসে পড়লেন। হুজুরে পাক [সা] তাঁকে বললেন, এরা তোমাকে বিচারক মনোনীত করেছে।
হযরত সা'দ বললেন- আমি তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিচ্ছি, যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে। শিশু ও মহিলাদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের মালামাল (গনিমতের মাল হিসেবে) বন্টন করা হবে। রায় শুনে রাসূল [সা] বললেন- নিশ্চয়ই তুমি মহান আল্লাহর ইচ্ছেনুযায়ী ফায়সালা করেছো। তখন তাদের শিশু ও মহিলাদেরকে কিল্লা থেকে বের করে মদীনার বনী নাজ্জার গোত্রের এক মহিলা যিনি বিনতে হারিস নামে খ্যাত তার বাড়ি নিয়ে বন্দী করে রাখা হ এবং সক্ষম পুরুষদেরকে শিরোচ্ছেদ করা হয়।
তাদের সংখ্যা ছিলো প্রায় ৬/৭ শ'। তার মধ্যে তাদের সর্দার হুয়াই ইবনু আখতার এবং কাব ইবনু আসা'দ ও ছিলো। আরেক দলের মতে তাদের সংখ্যা ছিলো আটশ' থেকে এক হাজার। কা'ব ইবনু আসাদকে যখন নবী করীম [সা] এর দরবারের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, তখন বনী কুরাইযা তাকে উদ্দেশ্য করে বললো- হে কা'ব! আমাদের সাথে কি আচরণ করা হবে? সে উত্তর দিলো, তোমরা কি সর্বদা বোকাই রইলে? তোমরা দেখছো না আহবানকারী নমনীয় হবার পাত্র নয় এবং তোমাদের কাছ, থেকে যে যাচ্ছে সে আর ফিরে আসছে না। এতো আল্লাহ্র ইচ্ছেনুযায়ী হত্যা। আয়িশা [রা] বলেছেন- তাদের মধ্যে একজন স্ত্রীলোক ছাড়া আর কোনো স্ত্রীলোককে হত্যা করা হয়নি। নিহত মহিলার নাম ছিলো বুনানা। এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছিলো যে, সে খালদু ইবনে সুয়াইদকে উপর থেকে যাতা (চাককী) ফেলে হত্যা করেছিলো।
আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই ইবনু সুলুল হযরত সা'দ ইবনু মায়াযকে বনী কুরাইযার ব্যাপারে সুপারিশ করলো এবং বললো- তারা আমার দু'বাহুর মধ্যে একটি বাহু (স্বরূপ)। তাছাড়া তাদের মাত্র তিনশ' লোক সসস্ত্র বাকী ছয়শ' নিরস্ত্র। সা'দ [রা] তাকে বললেন- সা'দ শপথ করেছে, আল্লাহর সাথে যারা ষড়যন্ত্র করে তাদের কারো কোনো সুপারিশ গ্রহন করা হবে না। যাহোক তাদেরকে হত্যা করে বাড়ী পৌঁছা মাত্র তাঁর অসুখ বেড়ে গেলো এবং সেই অসুখেই তিনি ইন্তিকাল করেন।
ইবনু শিহাব মুখতাছারে মদুওনায় বর্ণনা করেছেন, বনু নাযীরের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো তৃতীয় হিজরীর মুহাররম মাসে। কেউ কেউ বলেছেন ৪র্থ অথবা ৫ম হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসের ৯ তারিখে।
২৩ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখা হয়েছিলো। আয়িশা [রা] বলেছেন, ২৫ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখা হয়েছিলো।
অন্য বর্ণনায় আছে- রাসূল [সা] ২১ রাত তাদেরকে অবরোধ করে রাখেন। অতঃপর তারা সন্ধি করার জন্য আবেদন জানায়। কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন এবং বলে দেন, 'তাদেরকে মদীনা হতে বহিস্কার করা হবে।' তারা এ শর্ত মেনে নেয়। রাসূল [সা] তাদেরকে প্রতি তিন পরিবারের মালামাল একটি উটে যা নেয়া যায় সেই পরিমাণ নিয়ে যেতে এবং অবশিষ্ট মালামাল রেখে যেতে নির্দেশ দেন। তখন তারা শাম (সিরিয়া) এর দিকে চলে যায়।
এটাই তাদের হাশর বা জমায়েত হওয়ার স্থান। আবু উবাইদ কিতাবুল আহমওয়ালে বর্ণনা করেছেন- ইহুদীদেরকে বলা হয়েছিলো, তোমরা রাসূল (সা) এর ফয়সালা মেনে নাও। কিন্তু তারা বললো, আমরা সা'দ ইবনু মায়াযের ফয়সালা মানবো। হুজুর (সা) বললেন- ঠিক আছে তার ফায়সালার ওপরই আস্থা রাখো।
আবু দাউদ শরীফে আছে- বনী নাযীর বনী কুরাইযার চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ছিলো এবং তাদের উভয় গোত্রই হারুন (আ) এর বংশধর। কিতাবুল মুফাদ্দালে বর্ণিত হয়েছে- বনী নাযীরকে নির্বাসন দেয়ার কারণ হচ্ছে- একবার নবী করীম (সা) তাদের নিকট তাশরীফ নিলেন এবং তাঁর সাথে একদল সাহাবাও ছিলো। তাদের সাথে আলোচনার বিষয় ছিলো বনু কিলাব গোত্রের নিহত দু'ব্যক্তির দিয়াত সম্পর্কে। যাদেরকে আমর ইবনু উমাইয়া হত্যা করেছিলো। তারা বললো- হে আবুল কাশেম! আমরা আপনার রায় মেনে নেবো। এদিকে তারা গোপনে পরামর্শ করলো, রাসূল (সা) কে তারা হত্যা করবে। আমর ইবনু জাহাশ নাদেরী বললো, আমি ছাদের ওপর চড়ে সেখান থেকে পাথর ফেলে দেবো। সালাম মাশকুম বললো, তোমরা একাজ করোনা, আল্লাহর কসম! তোমরা যা ইচ্ছে করেছো অবশ্যই আল্লাহ্ তাকে সে সম্পর্কে অবহিত করবেন। তাছাড়া এটা আমাদের ও তাদের মধ্যের কৃত ওয়াদার পরিপন্থী। এদিকে রাসূলে পাক (সা) এর নিকট তাদের ষড়যন্ত্রের সংবাদ পৌঁছে গেলো। অন্য বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি জিব্রাইল (আ) কর্তৃক সংবাদ পেয়েছিলেন। তৎক্ষনাৎ তিনি সেখান থেকে উঠে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। দেখাদেখি সাহাবীগণও তার অনুসরণ করলেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসূল চলে এলেন অথচ আমরা বুঝতেও পারলাম না। তখন হুজুর (সা) বললেন, ইহুদী বিশ্বাস ঘাতকতার ইচ্ছে করেছিলো, আল্লাহ্ আমাকে অভিহিত করেছেন।
তিনি মদীনায় পৌঁছে তাদের নিকট সংবাদ পাঠালেন তোমরা আমাদের শহর থেকে চলে যাও, কারণ তোমরা গাদ্দারী করেছো। কাজেই আমাদের সাথে বসবাস করার কোনো অধিকার তোমাদের নেই। তোমাদেরকে দশ দিনের অবকাশ দিলাম। এরপর যাকে পাওয়া যাবে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে।' এদিকে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই তাদেরকে সংবাদ পাঠালো, 'তোমরা নিজের ঘর থেকে নড়বেনা। আমার দু'হাজার যোদ্ধা যুবক তোমাদের কিল্লায় এসে তোমাদের সাথে মিলবে। তা ছাড়া বনী কুরাইযা ও বনী গাতফান হতেও তোমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সহযোগীতা পাবে।' একথা শুনে বনী নাযীরের সর্দার দারুন মানসিক স্বস্তি লাভ করলো এবং দাম্ভিকতার সাথে নবী করীম [সা] কে সংবাদ পাঠালো, 'আমরা নিজেদের ঘর ছাড়বো না তোমাদের যা খুশী তা করতে পারো।' অতঃপর রাসূল [সা] আল্লাহু আকবার বলে সাহাবীদেরকে তাদের ওপর আক্রমণের নির্দেশ দিলেন এবং হযরত আলী ইবনু আবি তালিবের হাতে ঝান্ডা তুলে দিলেন।
যখন তারা এদৃশ্য দেখলো তখন সবাই কিল্লার ভেতর গিয়ে আশ্রয় নিলো। এদিকে বনী কুরাইযা নিরবতা অবলম্বন করলো। বনী গাতফান প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলো। রাসূল [সা] তাদেরকে অবরোধ করে রাখলেন এবং তাদের খেজুর বাগানসমূহ ধ্বংস করে দিলেন। তখন তারা খবর পাঠালো, আমরা আপনাদের শহর ছেড়ে চলে যেতে রাজী। রাসূল [সা] বলে পাঠালেন, আমরা তোমাদের কথা বিশ্বাস করিনা। যদি যেতে চাও, তবে অবিলম্বে চলে যাও। আত্মরক্ষার অস্ত্র ছাড়া এবং যা কিছু উটে করে নেয়া সম্ভব তাছাড়া আর কিছু নিতে পারবেনা।' তারা এ শর্ত মেনে নিয়ে চলে যায়। তাদের অবশিষ্ট মালামাল ও অস্ত্রসস্ত্র নবী করীম (সা) এর হস্তগত হয় এবং তিনি বনী নাযীর থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ মালামাল নিজের প্রয়োজনের জন্য রেখে দেন। এ সমস্ত মাল তিনি বন্টন করেননি কেননা এটা ছিলো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্ প্রদত্ত দান। এতে মুসলমানগণ কোনো যুদ্ধ বা ঝুকির সম্মুখীন হয়নি।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, 'যারা তোমাদের মধ্যে এরূপ কাজ করে তাদের শাস্তি আর কী হতে পারে যে, তারা দুনিয়ার জীবনে লাঞ্চিত ও অপদস্ত হবে।' [সূরা আল বাকারা ১০ম রুকু]
আল্লাহ্ সূবহানাহু তাআলা আরো ইরশাদ করেন- 'যেন পাপীদেরকে অপমানিত করে।' -[সূরা আল হাশর: ১ম রুকু]
তিন হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে নবী করীম [সা] বনী কুরাইযার ওপর চড়াও হন। তাদেরকে ১৫দিন অবরোধ করে রাখা হয়। তারা বলে পাঠায় যে, তাদের কাছে যেন আবু লুবাবাহ [রা] কে পাঠানো হয়। তিনি তাকে পাঠিয়ে দিলেন। বনী কুরাইযা তাদের ব্যাপারে তাঁর সাথে পরামর্শ করে। তিনি নিজের ঘাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝালেন তোমাদেরকে হত্যা করা হবে। পরে তিনি তার ভুল বুঝতে পেয়ে অনুতপ্ত হন। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়েন এবং বলেন, আমিতো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের খিয়ানত করেছি। তখন তিনি রাসূল [সা] এর নিকট না গিয়ে সোজা মসজিদে গিয়ে একটি খুটির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখলেন। যতোক্ষণ আল্লাহ্ তাঁর তওবা কবুলের সুসংবাদ না দিয়েছেন ততোক্ষণ তিনি এভাবেই নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন। শুধু নামায ও হাজতের সময় তাঁর বাঁধন খুলে দেয়া হতো।
অতঃপর বনী কুরাইযা নবী করীম [সা] এর কাছে নতি স্বীকার করলো। তাদের ব্যাপারে তিনি মুহাম্মদ ইবনু মুসলিমকে নির্দেশ দিলেন। তিনি গিয়ে তাদের মশকগুলো উল্টে দিলেন তারপর আবদুল্লাহ ইবনু সালাম [রা] কে আদেশ দিলেন পরিত্যক্ত মালামাল সংগ্রহের জন্য। যে সমস্ত মাল তাদের পরিত্যক্ত কিল্লায় পাওয়া গিয়েছিলো তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার যুদ্ধাস্ত্র যেমন- দেড় হাজার তলোয়ার তিনশ' বর্ম, এক হাজার বর্শা, পাঁচশ' ঢাল এবং শরাবের মটকী। মটকীগুলোকে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিলো। সেই গনীমতের মাল থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করা হয়নি।
আওস গোত্র তাদের ব্যাপারে রাসূল [সা] কে বলছিলো, তাদেরকে মা'ফ করে দেয়ার জন্য। কারণ তারা তাদের সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলো। নবী করীম [সা] তাদের ফায়সালা সা'দ ইবনু মায়ায [রা] এর ওপর ন্যাস্ত করেছিলেন। সা'দ [রা] তাদের যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন সকল পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদের বন্দী এবং তাদের মালামাল গনিমত হিসেবে বন্টনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
রাসূল [সা] বলেছিলেন- তোমার ফায়সালা সাত আসমান জমিনের বাদশাহ অনুরূপ ফায়সালা হয়েছে। অতঃপর তাদের সক্ষম ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা হলো। যাদের সংখ্যা ছয়শ' থেকে সাতশ' পর্যন্ত ছিলো। নবী করীম [সা] তাঁর জন্য রেহানা বিনতে আমরকে রাখলেন এবং লুণ্ঠিত মালামাল জমা করার নির্দেশ দিলেন। সমস্ত মাল এবং বন্দীদের পাঁচ ভাগে ভাগ করে এক পঞ্চমাংশ রেখে অবশিষ্টগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। সর্বমোট তিন হাজার বাহাত্তর ভাগ হয়েছিলো। দু'অংশ ঘোড়ার জন্য এবং এক অংশ আরোহীর জন্য এ ভাবে বন্টন করে দিলেন। অবশ্য রাসূল [সা] বন্দীদের মধ্যে অনেককে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আবার কাউকে দান করে দিয়েছিলেন। আবার কাউকে খেদমতে লাগিয়ে ছিলেন।
ইমাম মালিক [রহ] বলেছেন- নবী করীম (সা) বনী কুরাইযার মাল থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করেছেন কিন্তু বনী নাযীরের সম্পদ থেকে বের করেননি।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 মক্কা বিজয়ের দিন নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কে

📄 মক্কা বিজয়ের দিন নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কে


মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে- মক্কা বিজয়ের দিন নবী করীম [সা] যখন পবিত্র মক্কা শরীফে প্রবেশ করেন তখন তাঁর মাথায় শিরস্ত্রাণ ছিলো। মক্কায় প্রবেশ করে শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলার পর এক লোক এসে বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ্। ইবনু খাতাল বাইতুল্লাহ্ গেলাফের আড়ালে আত্মগোপন করে রয়েছে। তিনি বললেন, "তাকে হত্যা করো।"
ইবনু শিহাব হতে ইবনু মালিকের বর্ণনাও অনুরূপ।
বুখারী ও মুসলিমে আরো বলা হয়েছে- তিনি সেদিন এক উটনীর ওপর সওয়ার ছিলেন এবং তাঁর পেছনে উসামা ইবনু যায়িদ বসা ছিলেন। তিনি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, আহতদের হত্যা করা যাবে না। পলায়নরত কোনো ব্যক্তির পশ্চাৎ ধাবন করা যাবে না, বন্দীদের হত্যা করা যাবে না। যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরে অবস্থান করবে সে নিরাপদ।
নাসাঈ ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত আছে, রাসূল [সা] বললেন, 'যে কা'বা ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, আর যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে সেও নিরাপদ এবং যে অস্ত্র সমর্পণ করবে সেও নিরাপদ, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।' এভাবে তিনি সব লোককে নিরাপত্তা প্রদান করলেন। শুধুমাত্র চারজন পুরুষ ও দুজন স্ত্রীলোক ছাড়া। ইবনু হাবীব বলেছেন, ছয়জন পুরুষ ও চারজন স্ত্রী। কারণ তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করা হয়েছিলো। যদিও তারা কাবা ঘরের গেলাফ ধরে ঝুলে থাকে। নাসাঈ ও অন্যান্য গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতাল, ইকরামা ইবনু আবু জাহেল, মুকাইশ ইবনু ছাবাবা এবং আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ ইবনু আবু সুরাহ এর মৃতদন্ড ঘোষণা করা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনু খাতালকে, কা'বা শরীফের গেলাফের নিচে আত্মগোপন অবস্থায় পাওয়া যায়। দেখামাত্র তারকে সাঈদ ইবনু হারিসা এবং আম্মার ইবনু ইয়াসির একযোগে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করেন। মুকাইশ ইবনু ছাবা'কে লোকজন বাজারে নিয়ে হত্যা করে। নবী করীম [সা] ইবনু খাতালের মালামাল আটক করেননি। ইবনু হিশام বলেছেন, মুকাইশকে তার গোত্রেরই এক ব্যক্তি হত্যা করে এবং আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতালকে সাঈদ ইবনু হারিস ও আবু বুরজা আসলামী এক সঙ্গে হত্যা করেন। ইকরামা সমুদ্রপথে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে, কিন্তু পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে যায়। তখন নাবিক যাত্রীদের লক্ষ্য করে বলে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর • ইবাদতে মশগুল হয়ে হয়ে যাও। কারন অন্যান্য দেবদেবীরা এ বিপদ থেকে বাঁচাতে অক্ষম। একথা শুনে ইকরামা বলে উঠে, 'আল্লাহর কসম! এখানে যদি একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে না পারে তবে শুকনো জমিনেও আর কারো বাঁচানোর ক্ষমতা নেই। প্রভু আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যদি এ যাত্রা থেকে বেঁচে যাই তবে মুহাম্মদ [সা] এর কাছে গিয়ে আমি আমাকে তাঁর হাতে সোপর্দ করে দেবো। কেননা আমি তাকে অত্যন্ত দয়ালু হিসেবে জানি। 'অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করে। আবদুল্লাহ্ বিন সা'দ ইবনু আবু সুরাহ হযরত ওসমান [রা] এর কাছে গিয়ে আত্মগোপন করে। রাসূল [সা] যখন লোকদের বাইয়াত করাচ্ছিলেন তখন তাকে বাইয়াতের জন্য হাজির করা হয় এবং আরজ করা হয়, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাকে বাইয়াত করান।' এভাবে তিনবার বলা হলো, কিন্তু তিনি তিনবারই নিরবতা পালন করলেন। অবশেষে তার বাইয়াত গ্রহন করেন। তারপর সাহাবাদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা যখন আমাকে তার বাইয়াতের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত দেখলে তখন উঠে তাকে হত্যা করলে না কেন? তারা আরজ করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা আপনার মনের কথা কি করে জানবো? আপনি যদি আমাদেরকে একটু ইঙ্গিত করতেন, তবেই হতো। তিনি বললেন, 'এ কাজ নবীর দ্বারা শোভা পায়না।'
ইবনু হিশামের হাওয়ালা দিয়ে ইবনু হাবীব বলেছেন- নবী করীম [সা] উল্লেখিত পুরুষ ও স্ত্রী ছাড়া হেরাছ ইবনু নাযীর ইবনু ওয়াহাব ইবনু আবদে মানাফ ইবনু কুশাইকেও হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত আলী ইবনু আবী তালিব [রা] তাকে বন্দী করে হত্যা করেন।
ইবনু হাবীব উল্লেখিত মহিলাদ্বয় ছাড়া আরো দু'জন মহিলার কথা বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতালকে হত্যা করার পর যারা রাসূল [সা] এর বিরুদ্ধে কুৎসা মূলক করে গান গেয়েছিলো। একজনের নাম ছিলো ফারতানা এবং অপরজনের নাম কারইয়াবাহ। ফারতানা পরবর্তীতে মুসলমান হয়ে যায় ও হযরত ওসমান [রা] এর খিলাফতকালে ইন্তেকাল করে। কারইয়াবাহ ও সারাকে হত্যা করা হয়। হিন্দা বিনতে উতবাও মুসলমান হয় এবং বাইয়াত গ্রহণ করে।
ইবনে ইসহাক বলেছেন, সারাকে রাসূল [সা] নিরাপত্তা প্রদান করেন। সে ওমর ইবনু খাত্তাব (রা) এর শাসনামল পর্যন্ত জীবিত ছিলো, পরে এক দূর্ঘটনায় নিহত হয়। আবু উবাইদ কিতাবুল আমওয়ালে লিখেছেন, এই সারা-ই হাতিব [রা] এর পত্র মক্কায় নিয়ে যাচ্ছিলো। ইবনু ইসহাক আরো বলেছেন- রাসূল [সা] আবদুল্লাহ্ ইবনু আবু সূরাহকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ সে মুসলমান হওয়ার পর নবী করীম [সা] এর কাতিবে ওহী বা ওহী লিখকের দায়িত্ব পালন করতো। পরে মুরতাদ হয়ে যায় এবং শির্কে লিপ্ত হয়। আবদুল্লাহ্ ইবনু খাতালও অবশ্য মুসলমান হয়েছিলো। একবার রাসূল [সা] তাকে একজন আনসার ও তার এক মুসলমান চাকর সহ কোনো দায়িত্ব দিয়ে এক জায়গায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে এক মনজিল অতিক্রম করার পর চাকরকে তার জন্য একটি ছাগল যবেহ্ করে রান্না করার নির্দেশ দেয়। চাকর তার কথা না শুনার কারণে চাকরকে হত্যা করে এবং মুরতাদ হয়ে পালিয়ে যায়। আর হেরাছ ইবনু নাযীর ঐ সমস্ত লোকদের অন্যতম যারা মক্কায় থাকাকালীন অবস্থায় হুজুর [সা] এর সাথে দুর্ব্যাবহার করতো এবং হযরত আব্বাস ইবনু মুত্তালিব [রা] যখন হযরত ফাতিমা ও উম্মে কুলসুমকে মদীনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন সে একটি কাঠ দিয়ে তাদেরকে প্রহার করে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলো। মুকাইশ এক আনসারীকে হত্যা করেছিলো, যিনি তার ভাইকে ভুলবশতঃ হত্যা করেছিলেন। উক্ত আনসারীকে হত্যা করে সে মুরতাদ হয়ে মক্কায় পালিয়ে যায়।
ইবনু হিশাম বর্ণনা করেছেন- প্রথম নিহত ব্যক্তি মক্কা বিজয়ের দিন যার দিয়াত আদায় করা হয়েছিলো, তিনি হচ্ছেন জয়নাব বিনতে উকু। বনু কা'ব তাকে হত্যা করেছিলো। তিনি তার দিয়াত বাবদ ১০০শ' উট আদায় করেছিলেন এবং বলেছিলেন, হে খাজায়া গোত্র, এবার তোমরা হত্যা বন্ধ করো, কেননা হত্যা তো অনেক হয়েছে।
ইবনু হাবীব বলেন- রাসূল [সা] বনী খাজায়াকে বনী বকরের বিরুদ্ধে আসর পর্যন্ত যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ইবনু হিশام বলেন, ঘটনাটি হচ্ছে, হুদাইবিয়ার বৎসর নবী করীম [সা] ও আহলে মক্কার মধ্যে যে সন্ধি সম্পাদিত হয়েছিলো তাতে একটি শর্ত ছিলো "যে গোত্র বা দল যার সাথে ইচ্ছে মিলে থাকতে পারবে।" বনী খাজায়া গোত্র মুসলমানদের সাথে এবং বনী বকর গোত্র আহলে মক্কার পক্ষ অবলম্বন করে। সন্ধি বলবত থাকাবস্থায় একদিন হঠাৎ করে বনী বকর গোত্র বনী খাজায়া গোত্রের ওপর হামলা করে বসে এবং তাদের পর্যদস্ত করে দেয়। এ ঘটনার পর আমর ইবনু সালেম এসে নবী করীম [সা] কে সব ঘটনা জানায় এবং তাঁর সাহায্য কামনা করে। ঐ সময় মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি চলছিলো। তখন রাসূল [সা] তাদেরকে মুকাবিলা করার অনুমতি দেন। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন, সেদিন বনী খাজায়া কর্তৃক মক্কায় যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো, তাদের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে পঞ্চাশ জন।
আবু সুফিয়ান অভিযোগ করলো- ইয়া রাসূলূল্লাহ্! কুরাইশদের শস্যক্ষেত ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। রাসূল [সা] বললেন- আজকের পর আর কোনো কুরাইশের সাথে যুদ্ধ হবে না এবং আর কাউকে বন্দী করে হত্যা করা হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00