📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 চুরির শাস্তি

📄 চুরির শাস্তি


মুয়াত্তায় বর্ণিত হয়েছে- রাসূল [সা] একটি ঢাল চুরির অপরাধে এক চোরের হাত কেটে দিয়েছিলেন। যার মূল্য ছিলো তিন দিরহাম। ইমাম মালিক বলেছেন, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া [রা] হিজরত করে মদীনায় আসেন এবং চাদর মাথার নীচে দিয়ে মসজিদে ঘুমিয়ে পড়েন। এমন সময় সেখানে এক চোর এসে চাদরটি নিয়ে পালাতে যায়। বিচারে তিনি তাকে হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন। শুনে সাফওয়ান [রা] বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি এটা আশা করিনি। আমি তাকে আমার চাদরখানা দান করে দিলাম।' রাসূল [সা] বললেন, 'তুমি আমার এখানে অভিযোগ করার পূর্বে কেন এরূপ করলে না?'
নাসাঈ শরীফে আছে- একবার রাসূলে আকরাম [সা] এক চোরের হাত কেটে তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। বুখারী ও মুসলিমে আছে- একবার মাখজুমী গোত্রের এক কুরাইশী মহিলা চুরি করে ধরা পড়ে। নবী করীম [সা] তার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। নির্দেশ শুনে লোকজন খুব পেরেশান হয়ে পড়লো। কারণ সেই মহিলা ছিলো সম্ভ্রান্ত গোত্রের। তারা বলাবলি করতে লাগলো, উসামা ইবনু যায়িদ ছাড়া আর কে আছে? যাকে আল্লাহর রাসূল [সা] অত্যাধিক ভালোবাসেন। তারা হযরত উসামা [রা] কে বলে সুপারিশ করতে পাঠালেন নবী করীম [সা] এর কাছে। যখন তিনি রাসূলে করীম [সা] এর সাথে এ ব্যাপারে কথা বললেন, তখন নবী করীম [সা] বললেন- 'হে উসামা! তুমি কি আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা না করার ব্যাপারে সুপারিশ করতে এসেছো?' তখন হযরত উসামা ইবনু যায়িদ ভয় পেয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে মাফ করে দিন। আমার ভুল হয়েছে।' অতঃপর নবী করীম [সা] মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন। প্রথমে আল্লাহ তা'আলার হামদ্ ও সানা পেশের পর বললেন, 'হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকজন এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। যখন তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী লোক চুরি করতো তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো এবং দুর্বল লোক চুরি করলে তাকে শাস্তি দিতো। ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আজ যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করতো তবে আমি তার বেলায়ও হাত কাটার নির্দেশ দিতাম।' অপর হাদীসে আছে, মাখজুমা গোত্রের ঐ মহিলাটি অলংকার ও আসবাবপত্র চেয়ে নিতো পরে তা অস্বীকার করতো। অতঃপর নবী করীম [সা] তার হাত কেটে দেয়ার নির্দেশ দেন।
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে বর্ণিত হয়েছে- রাসূলে করীম [সা] এর নিকট এক ক্রীতদাসকে হাজির করা হলো, যে চুরি করেছিলো তাকে চারবার নবী করীম [সা] এর কাছে নেয়া হলো চারবারই তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। পঞ্চমবার তাকে হাজির করা হলো। তখন রাসূল তার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। পরে ৬ষ্ট বার তাকে আবার চুরির অপরাধে হাজির করা হলে তার একটি পা কেটে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ৭ম বার চুরির অপরাধে তার অপর হাত কেটে দিয়েছিলেন। কিন্তু ৮ম বার পুনরায় চুরি করলে তার দ্বিতীয় পাটিও কেটে দেয়া হয়।'

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 চুরির অপরাধে হত্যা

📄 চুরির অপরাধে হত্যা


একবার নবী করীম (সা) এর দরবারে এক চোরকে হাজির করা হলো। তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। লোকজন জিজ্ঞেস করলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতো শুধু চুরি করেছে। তিনি বললেন, 'তার হাত কেটে দাও। কিছু দিন পর পুনরায় তাকে চুরির অপরাধে হাজির করা হলো। এবার তিনি বললেন- তাকে হত্যা করে ফেলো। লোকেরা বললো- হে আল্লাহর রাসূল! সে তো শুধু চুরি করেছে। তিনি বললেন- তার পা কেটে দাও। এভাবে সে বারবার চুরি করে ধরা পড়ায় তার চার হাত পা কেটে দেয়া হলো। হযরত আবু বকর [রা] এর শাসনামলে মুখ দিয়ে ধরে চুরি করার অপরাধে খলিফার নিকট হাজির করা হলে তাকে হত্যা করা হলো।
অধিকাংশ উলামার দৃষ্টিতে এ ঘটনাটি ঐ ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট। ইমাম মালিক বলেন, পঞ্চমবার চুরির অপরাধে তাকে হত্যা করা যাবে। আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, আমরা তাকে পাথর নিক্ষেপ করবো। উসাইলী তার উস্তাদ বাগদাদী থেকে যে বর্ণনা করেছেন, তা আমি তার চিঠিতে দেখেছি। সেখানে আছে- এক ব্যক্তি ছোট বাচ্চাদের চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিলো। তাকে ধরে নবী করীম [সা] এর দরবারে হাজির করা হলো। তিনি তাকে হাত কেটে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
অন্য বর্ণনায় আছে- রাসূল [সা] এর দরবারে এমন এক চোরকে আনা হলো, যে কিছু খাদ্যদ্রব্য চুরি করেছিলো। কিন্তু তিনি তার হাত কেটে দেয়ার নির্দেশ দেননি। সুফিয়ান [রা] বলেন- যে জিনিস এক দিনেই বিকৃত বা নষ্ট হয়ে যায়। যেমনঃ গোশত, তরকারী ইত্যাদি সেগুলো চুরি করলে হাত কাটা যাবেনা। তবে অন্য শাস্তি দেয়া যেতে পারে।

📘 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বিচারালয় > 📄 নবী করীম [সা] এর মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুণ্নকারীর শাস্তি

📄 নবী করীম [সা] এর মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুণ্নকারীর শাস্তি


শক্তিশালী সনদে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, একবার এক ইহুদী মহিলা বিষ মেশানো গোশত নবী করীম [সা] কে খেতে দেয়। সেই মহিলার নাম ছিলো, জয়নব বিনতে হারেস ইবনু সালাম। যখন গোশত নবী করীম [সা] এর নিকট রাখা হলো তিনি সিনার এক টুকরো গোশত উঠিয়ে খেতে শুরু করলেন। তাঁর সাথে বাশার ইবনু বাররাও খেতে বসেছিলেন। বাশার এক টুকরো গিলে ফেললেন কিন্তু নবী করীম [সা] গিলে ফেলার পূর্বেই টের পেলেন গোশতে বিষ মিশানো হয়েছে। তিনি মুখের গোশত ফেলে দিলেন এবং বললেন- এ হাড় আমাকে বলে দিচ্ছে, এর সাথে বিষ মিশানো হয়েছে। মহিলাকে ডাকা হলো। সে স্বীকার করলো। বললো আমি এ কারণেই বিষ মিশিয়েছি, যদি আপনি কোনো বাদশা হয়ে থাকেন তবে এ গোল্ড খেয়ে শেষ হয়ে যাবেন এবং আমরাও বেঁচে যাবো। আর যদি আপনি নবী হয়ে থাকেন তবে অবশ্যই আপনি টের পেয়ে যাবেন এবং আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। নবী করীম [সা.] তাকে মা'ফ করে দিলেন কিন্তু বাশার ইবনু বাররা ইন্তিকাল করলেন।
বুখারী, মুসলিম, কাজী ইসমাইল এবং ইবনু হিশাম এ ব্যাপারে একমত যে, নবী করীম [সা.] তাকে মা'ফ করে দিয়েছিলেন। ইমাম আবু দাউদ এবং শরফুল মুস্তফা গ্রন্থের লেখক বলেছেন- নবী করীম [সা.] একজন মুসলমানকে বিষাক্ত ছাগলের গোস্ত খাইয়ে হত্যা করার অপরাধে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শরফুল মুস্তফা গ্রন্থে অন্য এক হাদীসে আছে, তিনি তাকে শূলে দিয়েছিলেন।
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে বর্ণিত হয়েছে- এক যাদুকরকে উপস্থিত করা হলে, তাকে বন্দী করে রাখার নির্দেশ দেন এবং বলেন- যদি যাদুকরী তার পেশা হয়- তবে তাকে হত্যা করো। অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূল [সা.] যাদুকরকে তলোয়ার দিয়ে হত্যা করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু সালাম তাঁর তাফসীরে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কথিত আছে- আয়িশা [রা.] কে যাদু করার অপরাধে এক মুদাব্বারা দাসীকে তিনি হত্যা করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে শুধুমাত্র এতটুকু প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, তিনি তাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এ রকম আরেকটি ঘটনা হযরত হাফসা [রা.] এর সাথে সংশ্লিষ্ট। কাজী ইসমাইল তার আহকামুল কুরআন গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন- তিনি তাকে হত্যা করেছিলেন। তখন হযরত ওসমান [রা.] অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন, কেন তিনি বিচারকের ফায়সালা ছাড়া এ সিদ্ধান্ত নিলেন।
ইবনু মুনযুর থেকে বর্ণিত- হযরত আয়িশা [রা.] সেই দাসীকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন এবং নবী করীম [সা.] থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যাদুকরের শাস্তি তলোয়ার দিয়ে দিতে হবে।
এ হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আপত্তি আছে। কারণ এটি ইসমাঈল ইবনু মুসলিমের বর্ণনা এবং সে দূর্বল রাবীর অন্তর্ভূক্ত।
নাসাঈ ও আবু দাউদে ইবনু আব্বাস [রা.] থেকে বর্ণিত হয়েছে- এক অন্ধ ব্যক্তি শুনলো তার উম্মে ওয়ালাদ (দাসী) নবী করীম [সা.] কে গালাগালি করছে। শুনে সে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তাকে হত্যা করে ফেললো। নবী করীম [সা] তাকে দিয়াত থেকে রেহাই দিয়েছিলেন।
এ হাদীস থেকে এ মাসয়ালা জানা যায় যে, নবী করীম [সা] কে কোনো ব্যক্তি গালি দিলে তাকে হত্যা করতে হবে। তার তওবা কবুল করা হবে না। ইবনু মানযার বলেছেন, একথার ওপর অধিকাংশ আলিম একমত কিন্তু আবু হানিফা [রহ] বলেন, জিম্মিদের মধ্য থেকে যদি কেউ নবী করীম (সা কে গালী দেয় তবে তাকে হত্যা করা যাবে না। ইমাম আবু হানিফা [রহ] এর বক্তব্যের জবাবে বলা যেতে পারে, নবী করীম [সা] যখন কা'ব ইবনু আশরাফকে হত্যা করার নির্দেশ, তখনতো সে জিম্মীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। রাসূল [সা] এর আদেশক্রমে একদল লোক তাকে হত্যা করার দায়িত্বে নিয়োজিত হয় এবং তাকে হত্যা করে। অন্য বর্ণনায় আছে- তার মাথা কেটে নবী করীম [সা] এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
হযরত আবু বকর [রা] কে এক ব্যক্তি গালাগালি করে ও অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে কষ্ট দেয়। এ ঘটনা দেখে হযরত আবু বুরজা আসলামী [রা] তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন আবু বকর [রা] আবু বুরজাকে লক্ষ্য করে বলেন- এ অধিকার আল্লাহর রাসূল [সা] এর জন্য নির্দিষ্ট।
নবী করীম [সা] কে গালি দিলে তাকে হত্যা করতে হবে একথা প্রমাণিত এবং তাঁকে অন্য কোনোভাবে কষ্ট দেয়া অথবা তাঁর ওপর অপবাদ আরোপ করার শাস্তিও গালির অনুরূপ। এটিকে ঈসা ইবনু কাসেম হতে তাঁর সংকলিত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। ইবনু ওয়াহাব মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন- যদি কেউ রাসূল [সা] কে অবজ্ঞা প্রদর্শনার্থে কোনো পন্থা অবলম্বন করে, তাকে হত্যা করতে হবে।
ঈসার সংকলনে আরো বলা হয়েছে- তাকে তওবা করতে নির্দেশ দেয়া হবে এবং তওবা না করলে তাকে হত্যা করতে হবে। এটি ওয়াজিহায় বর্ণিত মলিক ও ইবনু কাসিম প্রমুখের মত। এ ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে বলা হয়েছে- তাকে তওবা করার আহবান না জানিয়েই হত্যা করতে হবে। এটি ইবনু হাকিম মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১২. যে ক্রীতদাসীকে তার মালিক বলে-'আমার মৃত্যুর পর তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।' এরূপ বাঁদীকে 'মাদাব্বারা' বলে। ক্রীতদাস হলে তাকে বলা হয় 'মুদাব্বার' এবং যে মালিক এরূপ প্রতিশ্রুতি দেয় তাকে 'মুদাব্বির' বলা হয়।-অনুবাদক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00