📄 নবী করীম [সা] ইহুদী ব্যভিচারীর শাস্তিতে রজমের নির্দেশ দিয়েছেন
মুয়াত্তায় বলা হয়েছে- একবার কয়েকজন ইহুদী নবী করীম (সা) এর কাছে এসে বললো, আমাদের এক মহিলা যিনা করেছে। রাসূল [সা] তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তওরাতে ব্যভিচারের জন্য কি শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে? তারা বললো, আমরা তাকে অপমাণিত করি এবং চাবুক মারি। তখন আবদুল্লাহ্ ইবনু সালাম [রা] (যিনি পূর্বে ইহুদী পন্ডিত ছিলেন) বললেন, তোমরা মিথ্যে বলছো। তওরাতে যিনার শাস্তি পাথর নিক্ষেপে হত্যার কথা উল্লেখ আছে। তারা তাওরাত নিয়ে এলো এবং তা পাঠের সময় হাতের আঙ্গুল দিয়ে রজমের কথা লুকিয়ে রাখলো। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম [রা] ইহুদী পন্ডিতকে বললেন, তোমার হাতের আঙ্গুল সরিয়ে নাও। যখন সে তা সরিয়ে নিলো তখন রজমের আয়াত বেরিয়ে গেলো। তখন রাসূলে আকরাম [সা] তাদের দু'জনকে রজমের (পাথর নিক্ষেপে হত্যার) নির্দেশ দিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু ওমর [রা] বলেন, আমি রজমের সময় লক্ষ্য করলাম, পুরুষটি বারবার ঝুকে পড়ছিলো; মনে হচ্ছিলো সে স্ত্রীলোকটিকে বাঁচাতে চাচ্ছে।
মারানিল কুরআনে হযরত জুযায [রা] হতে বর্ণিত হয়েছে খায়বারের ইহুদী সরদারদের মধ্যে যিনার প্রবণতা বেশী পরিলক্ষিত হতো এবং তওরাতে বিবাহিত ব্যভিচারের শাস্তি রজমের কথা উল্লেখ ছিলো। যাহোক একবার এক ইহুদী পুরুষ ও মহিলা যিনা করে, তারা তার বিচারের জন্য নবী করীম [সা] এর শরনাপন্ন হলো। এই আশায় যে, তিনি হয়তো বিবাহিত ব্যভিচারের জন্য চাবুক মারার নির্দেশ দেবেন। তাদের এ ষড়যন্তের কথা আল্লাহপাক প্রচার করে দিলেন, নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে-
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِنْ بَعْدِ مَواضِعِهِ (ج) يَقُولُونَ أَن أَتَيْتُمْ هَذَا فَخُذْهُ وَإِنْ لَّمْ تُؤْتُوهُ فَاحْذَرُوهُ (ط)
আল্লাহর কিতাবের শব্দসমূহ তার আসল স্থান থেকে সরিয়ে দেয় এবং লোকদেরকে বলে, তোমাদের এ নির্দেশ দেয়া হলে মানবে নইলে মানবেনা। (আল মায়িদা-৪৭)
আবু দাউদে আছে- এক ইহুদী পুরুষ ও মহিলা ব্যভিচার করে ধরা পড়লো এবং তাদেরকে বিচারের জন্য নবী করীম (সা) এর দরবারে হাজির করা হলো। তখন রাসূল [সা] তাদের গোত্রের দু'জন বড়ো আলিমকে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, 'এদের ব্যাপারে তোমরা তাওরাতে কি নির্দেশ পেয়েছো?' তারা বললো, 'আমরা তওরাতে এই পেয়েছি, যদি চার ব্যক্তি এরকম সাক্ষ্য দেয়, তারা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের গুপ্তস্থান এমনভাবে মিলিত অবস্থায় দেখেছে, যেভাবে সুরমাদানির মধ্যে সুরমা শলাকা ঢুকানো থাকে। তবে তাদেরকে রজম করতে হবে।' রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন, 'তাদেরকে রজমের বিধান কার্যকরী করতে তোমাদেরকে কে বাধা দিলো?' তারা বললো, 'এতে আমাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। তাছাড়া আমরা হত্যাকে অপছন্দ করি।'
নবী করীম [সা] তাদের ব্যাপারে চারজন সাক্ষ্য চাইলেন, তারা চারজন সাক্ষ্য হাজির করলো। অতঃপর তিনি তাদের দু'জনকে রজম (পাথর নিক্ষেপে হত্যা) করার নির্দেশ দিলেন।
এ হাদীসটি থেকে যে সব ফিক্হী মাসয়ালা জানা যায় তার মধ্যে একটি হচ্ছে ইহুদীরা যখন ইসলামের ফায়সালার ওপর রাজী থাকবে তখন ইহুদী আলিমদের মতামত না নিয়েই বিচারক রায় দিতে পারেন। দ্বিতীয় মাসয়ালা হচ্ছে- ইহুদীদের বেলায় গর্ত না খুঁড়ে তাদেরকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা। যদি ইহুদীদেরকে গর্ত করে রজম করা হতো তাহলে পুরুষটি মহিলার প্রতি ঝুঁকে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারতো না। এটি ইমাম মালিক [রহ] এর মসলক। কতিপয় আলিমের অভিমত হচ্ছে বিচারক ইচ্ছে করলে গর্ত খনন করতে পারেন আবার নাও করতে পারেন। তৃতীয় মাসয়ালা হচ্ছে- যাকে রজম করা হবে তাকে বেত্রাঘাত করা যাবেনা। সুনান আবু দাউদ এবং কিতাবুশ শরফে বর্ণিত হয়েছে- রাসূলাল্লাহ [সা] এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তার স্ত্রীর বাঁদীর সাথে সহবাস করেছিলো এবং স্ত্রী তার জন্য তা হালাল করে দিয়েছিলো। যদি হালাল করে না দিতো তবে তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার নির্দেশ দেয়া হতো।
📄 অবিবাহিত ও অসুস্থ ব্যভিচারীর শাস্তি
মুয়াত্তায় বর্ণিত হয়েছে- একবার দু'ব্যক্তি রাসূল [সা] এর দরবারে মামলা দায়ের করলো, তাদের একজন বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দিন।' দ্বিতীয়জন বললো, হাঁ আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করে দিন। তবে তার আগে আমাকে কয়েকটি কথা বলার অনুমতি দিন। নবী করীম (সা) বললেন, ঠিক আছে, বলো। সে বলতে লাগলো, আমার ছেলে তার নিকট চাকুরী করতো। সে তার স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। লোকজন আমাকে বলেছে, আমার ছেলে হত্যাযোগ্য অপরাধ করেছে। এ জন্য আমি তাকে (অর্থাৎ ঐ মহিলার স্বামীকে) একশ' ছাগল ও একটি দাসী ক্ষতিপূরণ দিয়েছি। এরপর আমি বিজ্ঞ লোকদের সাথে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেছি, তারা বলেছে- তোমার ছেলেকে একশ' বেত্রাঘাত ও এক বৎসরের নির্বাসন দেয়া হবে এবং ঐ মহিলাকে রজম করা হবে। রাসূল [সা] বললেন, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করবো। তোমার ছাগল ও দাসী তোমাকে ফেরত দেয়া হবে। [তিনি তার ছেলেকে একশ' বেত্রাঘাত করে এক বৎসরের নির্বাসন দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন, তার স্ত্রীর নিকট গিয়ে স্বীকারোক্তি নাও। যদি সে স্বীকার করে তবে তাকে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদন্ড দাও। তখন তার নিকট গিয়ে স্বীকারোক্তি চাওয়া হলো। সে স্বীকৃতি দিলো, অতঃপর তাকে রজম [পাথর নিক্ষেপে হত্যা] করা হলো।
ইমাম মালিক [রহ] বলেন- উক্ত হাদীসে আসীফ ]عسيف[ শব্দ রয়েছে যার অর্থ ভৃত্য। কতিপয় ওলামা বলেন- নবী করীম [সা] এর কথা, 'আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করবো' এর অর্থ হচ্ছে আমি ওহীর ভিত্তিতে ফায়সালা করবো যদিও তা কুরআনে নেই। তার প্রমাণ আল্লাহ্ তা'আলার বাণী 'তাঁর কাছে কি গায়েবের ইলম আছে যে, তিনি নির্দেশ দেন।'
এ হাদীস থেকে কয়েকটি ফিক্হী মাসয়ালা জানা যায় -
মাসয়ালা- ১ যিনা করার পর কোনরূপ সন্ধি করে নেয়া অবৈধ।
মাসয়ালা ২ হদ প্রয়োগের ব্যাপারে প্রতিনিধি নিয়োগ করা। ইমাম আবু হানিফা দ্বিমত পোষন করে বলেন- হদ প্রয়োগে প্রতিনিধি নিয়োগ বৈধ নয় বিশেষ করে সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে।
মাসয়ালা- ৩ ব্যভিচারীর একবার স্বীকারোক্তি প্রদান করাই যথেষ্ট।
মাসয়ালা ৪ যার ওপর রজম অপরিহার্য তাকে বেত্রাঘাত করা যাবে না।
মাসয়ালা- ৫ মাসয়ালার ব্যাপারে বিজ্ঞ আলিমের কাছে জিজ্ঞেস করা।
মাসয়ালা ৬ কোনো মহিলার ওপর যিনার অপবাদ আরোপ করলে এবং তা প্রমাণ করতে না পারলে অপবাদ আরোপকারীকে শাস্তি প্রদান বাধ্যতামূলক।
মাসয়ালা-৭ বিধিবিধানের ব্যাপারে খবরে ওয়াহিদ গ্রহণযোগ্য।
মাসয়ালা -৮ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় আত্মপক্ষ সমর্থন করার অধিকার তার আছে।
মাসয়ালা-৯ অবিবাহিত ব্যাভিচারীকে নির্বাসন দেয়া যাবে।
মাসয়ালা-১০ মহিলা এবং ক্রীতদাসকে নির্বাসন দেয়া যাবে না। কারণ, মহিলাদের গোপনে থাকার কর্তব্য এবং ক্রীতদাস সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বুখারী নির্বাসনের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে তাকে এলাকা থেকে বহিস্কার করে দিতে হড়ো। তিনি বুখারী শরীফের একটি শিরোনাম নির্বাচন করেছেন এ প্রসঙ্গে- 'অবিবাহিত পুরুষ মহিলা যিনা করলে তাদেরকে বেত্রাঘাত করে নির্বাসনে পাঠানো।' গ্রন্থকার বলেন, নির্বাসন বলতে এতোটুকু দূরে তাকে যেতে বাধ্য করা যতোটুকু দূরে গেলে নামায কসর করা হয়।
📄 ব্যভিচারের অপবাদের শাস্তি
হযরত আয়িশা [রা] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করে আয়াত নাযিল হলো, তখন নবী করীম [সা] মিম্বারে দাঁড়িয়ে অবতীর্ণ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে লোকদের শুনিয়ে দিলেন। যখন তিনি মিম্বর থেকে নিচে নামলেন তখন দু'জন পুরুষ ও একজন মহিলা সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন, তাদের হদ প্রয়োগের জন্য।
বুখারীতে হযরত উরওয়া [রা] থেকে বর্ণিত- ইফকের ঘটনার সাথে হিসান, মুসতাহ্ এবং হোমনা বিনতে জাহাশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য একটি দল ছিলো সক্রিয়। যার মূল নায়ক ছিলো মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনে আস্ সুলুল।
📄 লিওয়াতাতের শাস্তি
নবী করীম (সা) লিওয়াতাতের (সমকামের) শাস্তি স্বরূপ কাউকে রজম করেছেন অথবা তার নির্দেশ দিয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ নেই। শুধুমাত্র এতটুকু প্রমাণ আছে, তিনি লিওয়াতাতকারী এবং যার সঙ্গে লিওয়াতাত করা হয় তাদের উভয়কেই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী ইবনে আব্বাস [রা] ও আবু হুরাইরা [রা]।
হযরত আবু হুরাইরা [রা]-এর বর্ণনায় আরো আছে, চাই সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত। একথার ওপর হযরত আবু বকর [রা] ফায়সালা দিয়েছেন। আর এ ফায়সালা খাইরুল কুরুন এর পরামর্শ ভিত্তিক সিদ্ধান্তের পর হযরত খালিদ [রা] এর নিকট লিখে পাঠান। এ ব্যাপারে হযরত আলী [রা] অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি এ অপকর্মের শাস্তি স্বরূপ সমকামীদের পুড়িয়ে হত্যা করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইবনু আব্বাস [রা] বলেছেন, যদি অবিবাহিত হয় তবে তাকে রজম করাই সমুচীন। ইবনু ফুজ্জার [রা] বলেন, সাহাবাগণ এ ব্যাপারে একমত।
হযরত আবুবকর [রা] বলেছেন, তাদের দুজনকে কোনো উঁচু দালানের ছাদ থেকে ফেলে দিতে হবে। হযরত আলী [রা] এর অপর বক্তব্য হচ্ছে, তাদের দুজনকে দেয়ালের নীচে দাঁড় করিয়ে তাদের দেয়াল চাপা দিয়ে হত্যা করতে হবে।”
টিকাঃ
১১. লিওয়াতাতের শাস্তি উভয়কে হত্যা করা। এ ব্যাপারে সমস্ত সাহাবী একমত। কিন্তু কি ভাবে হত্যা করতে হবে এ সম্পর্কে মতভেদ আছে। -অনুবাদক।