📄 হত্যাকারীকে কিভাবে হাজির করা হতো এবং তাকে হত্যা করার পদ্ধতি কী ছিল
মুসলিমে সামাক ইবনু হরবা হতে বর্ণিত হয়েছে, আলকামা ইবনু ওয়ায়েল তাঁর পিতা এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন- একবার আমরা নবী করীম (সা) এর দরবারে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে রশি দিয়ে বেঁধে টানতে টানতে রাসূলে আকরাম (সা) এর নিকট নিয়ে এলো এবং বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্। এ ব্যক্তি আমার ভাইকে হত্যা করেছে।'
তখন রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি হত্যা করেছো?' কিন্তু সে কোনো উত্তর দিলো না? তখন রাসূল [সা] বাদীকে বললেন, সে যদি স্বীকার না করে তবে তোমাকে স্বাক্ষী হাজির করতে হবে। ইত্যবসরে হত্যাকারী বললো, 'হ্যাঁ, আমি হত্যা করেছি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'কিভাবে হত্যা করেছো?' লোকটি বললো, আমি একটি গাছ থেকে লাকড়ী কাটছিলাম, লোকটি আমাকে গালি দিলো শুনে আমি রেগে গেলাম এবং মাথায় কুঠার দিয়ে আঘাত করলাম, ফলে সে মারা গেল। ঘটনা শুনে রাসূলে আকরাম [সা] তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নিকট কি এমন কোনো সম্পদ আছে যার বিনিময়ে তুমি বাঁচতে পারো?' সে বললো, 'আমার নিকট এ কুঠার এবং একটি কম্বল ছাড়া আর কিছুই নেই।' বলা হলো, 'তোমার সম্প্রদায় কি তোমাকে রক্তপণ দিয়ে মুক্ত করে নেবে?' সে বললো, 'আমি আমার সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট ব্যক্তি।' তখন নবী করীম (সা) তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, 'তুমিতো জান তোমার সাথী ঐ ব্যক্তি যে তোমাকে নিয়ে যাবে (হত্যার জন্য)।' যখন বাদী তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেললো তখন তিনি বললেন, 'তাকে হত্যা করলে সেও হত্যার অপরাধে অপরাধি হবে।' এ কথা শুনে বাদী ফিরে এলো এবং বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাকে হত্যা করলে আমিও হত্যার অপরাধে অপরাধী হবো? কিন্তু একেতো আমি আপনার নির্দেশেই বন্দী করেছি।' রাসূল [সা] বললেন, 'তুমি কি এটা চাও না যে, সে তার এবং তার দ্বারা নিহত ব্যক্তির গুনাহ একাই বহন করুক?' সে বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কেন নয়?' হুজুর [সা] বললেন, 'এরকমই হবে। (যদি তাকে তুমি হত্যা না করো।)' একথা শুনে লোকটিকে বাঁধন মুক্ত করে রশিটি দূরে ফেলে দিলো।'
অন্য বর্ণনায় আছে- যখন ঐ ব্যক্তি হত্যাকারীকে নিয়ে রওয়ানা দিলো তখন রাসূল [সা] বললেন, 'হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে।' একথা একজন তাকে গিয়ে বললো, অমনি সে তাকে ছেড়ে দিলো।
ইসমাঈল ইবনু সালেম বলেন, আমি হাবীব ইবনু আবি সাবিতের নিকট বর্ণনা করলাম তিনি বললেন, আমার নিকট ইবনু আশরা হাদীস বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) মার্জনাকারীকে বললেন, 'তুমি তাকে অবজ্ঞা করলে'। মুসনাদে ইবনে আবি শাইবায় ওয়ায়েল ইবনু হাজর আল হাজরামীর হাদীসটিও অনুরূপ।
সেখানে বলা হয়েছে- নবী করীম [সা] নিহত ব্যক্তির ওলীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তাকে মা'ফ করে দেবে?' সে বললো, 'না।' তিনি বললেন, 'তবে কি তাকে হত্যা করবে?' বললো, 'হ্যাঁ, আমি তাকে হত্যা করবো।' একথা সে তিনবার বললো। রাসূল [সা] বললেন, 'যদি তুমি তাকে মা'ফ করে দাও তবে সে তার গুনাহর ভাগী হয়ে যাবে।'
মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবায় আবু হুরাইরা [রা] কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তিকে হত্যার অপরাধে নবী করীম (সা) এর দরবারে হাজির করা হলো। তিনি তাকে নিহত ব্যক্তির ওলীর নিকট সোপর্দ করে দিলেন। হত্যাকারী বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাকে হত্যা করার ইচ্ছে আমার ছিল না। রাসূল [সা] নিহত ব্যক্তির ওলীকে বললেন, "যদি সে সত্য বলে থাকে তবে তাকে হত্যা করলে তুমিও জাহান্নামী হবে।" একথা শুনে নিহত ব্যক্তির ওলী তাকে ছেড়ে দিল। বর্ণনাকারী বলেন, সে রশি গুটিয়ে দূরে নিক্ষেপ করলো। এরপর থেকে সে যুনুসয়া (রশিওয়ালা) বলে পরিচিত হয়ে গেল। উক্ত মুসান্নাফ ছাড়া অন্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে আকরাম [সা] বলেছেন, "মনের ভুলে এবং হাতের ইচ্ছেয় কাজটি হয়েছে।" নাসীঈ শরীফে আছে, (হত্যাকারীর ভাষ্য) আল্লাহর কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তাকে কখনো হত্যা করার ইচ্ছে পোষণ করিনি। রাসূল [সা] তার ওলীকে বললেন, 'যদি তার বক্তব্য সঠিক হয় এবং তুমি তাকে হত্যা করো, তাহলে তুমি জাহান্নামী।
📄 ইসলামের প্রথম খুন, যার কিসাস (বদলা) নেয়া হয়েছিলো
ইবনু ইসহাক বর্ণিত- একবার নবী করীম [সা] তায়েফ যাচ্ছিলেন। যাত্রা পথ ছিলো- নাখলায়ে ইয়ামানিয়া এবং মালিহ লুব্বা ও হিররাতুর রায়া এর উপর দিয়ে। হিররাতুর রায়া পৌঁছে নবী করীম [সা] একটি মসজিদ নির্মাণ করান এবং সেখানে নামায আদায় করেন। আমর ইবনু শুয়াইব আমাকে বলেছে, সেদিন তিনি সেখানে একটি খুনের বদলা নিয়েছিলেন। যা ছিলো ইসলামের প্রথম খুন যার (বদলা) নেয়া হয়েছিলো।
বনী লাইসের এক ব্যক্তি বনি ফুজাইলের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন রাসূলে আকরাম [সা] হত্যার শাস্তি স্বরূপ তাকে হত্যা করেন। ওয়াযিহায় বর্ণিত হয়েছে, তাকে শপথের [কাসামত]' এর প্রেক্ষিতে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। ওয়াযিহা এবং সারীর এ বর্ণিত হয়েছে- মুহাল্লিম ইবনু জাসামাহ্, আমের ইবনু আজবাত আশযায়ীকে হত্যা করে। তখন তার ওয়ারিশগণ শপথ করেছিলো। অতঃপর নবী করীম [সা] তাদেরকে দিয়াত (রক্তপণ) প্রদানের প্রস্তাব দেন। তখন তারা দিয়াত (রক্তপণ) দিতে রাজী হয়। তখন নবী করীম [সা] তাদেরকে রক্তপণ হিসেবে একশ' উট ধার্য্য করেন।
এঘটনার পর (হত্যাকারী) মুহাল্লিম অল্প ক'দিন বেঁচে ছিলো। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন- মাত্র সাতদিন জীবিত ছিলো। যখন তাকে দাফন করা হলো, তখন কবর তার লাশ বাইরে নিক্ষেপ করলো। ঐতিহাসিকগণ আরো বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] তিনবার বলেছিলেন, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করোনা। এজন্য তাকে তিনবার দাফন করার পর তিনবারই কবর তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছিলো, এ ঘটনার পর রাসূল [সা] বলেছেন, জমিন এর চেয়েও বড় পাপীকে গ্রহণ করে কিন্তু একে গ্রহণ না করে আল্লাহ্ তোমাদেরকে শিক্ষা দিতে চান। তারপর লোকজন তাকে পাহাড়ের উপত্যকায় রেখে আসে এবং সেখানে হিংস্র জন্তু জানোয়ার তার লাশ ভক্ষণ করে।
টিকাঃ
৩. নাখলায়ে ইয়ামানিয়া একটি নদীর নাম যা মক্কা মুকাররমা হতে এক দিনের দূরত্বে অবস্থিত।
৪. নজদবাসীরা এখান থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধেন।
৫. দূর্গম পথ।
৬. কংকরময় দূর্গম পথ।
📄 পাথর নিক্ষেপ প্রসঙ্গে নবী করীম [সা] এর ফায়সালা
বুখারী শরীফে হযরত আনাস ইবনু মালিক [রা] থেকে বর্ণিত হয়েছে, একবার এক ইহুদী একটি মেয়ের মাথা পাথর দিয়ে থেতলে দেয়। অন্য বর্ণনায় আছে- এক ক্রীতদাসী অলংকার সজ্জিত হয়ে শহরের বাইরে গেলে এক ইহুদী তাকে পাথর নিক্ষেপ করে। মুমূর্ষ অবস্থায় মেয়েটিকে নবী করীম (সা) এর নিকট আনা হয়। তখন নবী করীম [সা] মেয়েটিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, অমুক ব্যক্তি কি তোমাকে মেরেছে? সে মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালো। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, এবারো মেয়েটি মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালো। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করার পর মেয়েটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর ইহুদীকে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। অবশেষে সে স্বীকার করলো। তখন রাসূলে করীম [সা] পাথর দিয়ে তার মাথা থেতলে দেবার নির্দেশ দিলেন। সহীহ্ মুসলিম ও মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল [সা] তাকে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদন্ড দিলেন।
টিকাঃ
৭. যখন কোনো লোকালয়ে মৃত্যুদেহ পাওয়া যায় এবং সেখানকার অধিবাসীগণ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে অজ্ঞতা প্রকাশ করে। তখন সেখানকার কতিপয় লোককে শপথ করানো হয়। এটাকে ইসলামী পরিভাষায় 'কাসামত' বলা হয়।
📄 গর্ভবর্তীকে প্রহার করে গর্ভপাত ঘটানো সম্পর্কে রাসূল [সা] এর ফায়সালা
বুখারী, মুসলিম ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক এ বর্ণিত হয়েছে, বনী হুজাইলের দু'মহিলা ঝগড়া করে একজন অপরজনকে পাথর নিক্ষেপ করে। আঘাতে ঐ মহিলার গর্ভপাত ঘটে যায়। নবী করীম [সা] জরিমানা স্বরূপ ঐ মহিলাকে একজন ক্রীতদাস বা ক্রীতদাসীকে প্রদানের নির্দেশ দেন। মুসলিমের অপর হাদীসে আছে- দু'মহিলা ঝগড়া করে একজন অপরজনকে পাথর নিক্ষেপ করলে তখন সেই মহিলা ও তার গর্ভস্থ সন্তান দু'জনই মারা যায়। অন্য বর্ণনায় আছে, উক্ত মহিলাকে তাবুর খুঁটি দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। মহিলা গর্ভবতী ছিলো এবং তারা পরস্পর সতীন ছিলো। যা হোক মহিলা নিহত হবার পর নবী করীম [সা] এর দরবারে মামলা দায়ের করা হলে তিনি নিহত মহিলার দিয়াত হত্যাকারীনী মহিলার আসাবাদের ওপর চাপিয়ে দেন এবং গর্ভস্থিত সন্তানের জন্য গুররাহ্ আদায়ের নির্দেশ দেন।
নাসাঈ শরীফে আছে- একজন অপরজনকে তাবুর খুঁটি দিয়ে প্রহার করে গর্ভন্ত সন্তানসহ তাকে হত্যা করে। তখন রাসূলুল্লাহ [সা] নিহত মহিলার গর্ভস্থ সন্তানের বিনিময়ে গুররাহ্ আদায়ের নির্দেশ দেন এবং হত্যাকারী মহিলাকে হত্যা করা হয়। নাসাঈ ছাড়াও অন্যান্য কিতাবে এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে আছে- রাসূলুল্লাহ [সা] গর্ভস্থ সন্তানের বিনিময়ে গুররাহ্র মূল্য আদায় করলেন। যার পরিমাণ ৫০ দিনার অথবা ৬০০ দিরহাম। এটি হযরত কাতাদাহ্ ও মালিক ইবনু আনাস এর বর্ণনা।
মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে ইকরামা থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক মহিলা আরেক মহিলাকে হত্যা করেছিলো, তাদের স্বামীর নাম ছিলো হাম্মল ইবনু মালিক এবং হত্যাকারীর নাম উম্মে আফীফ বিনতে মাসরূহ, বনী সা'দ ইবন হুযাইল গোত্রের মেয়ে। নিহত মহিলার নাম মালিকাহ্ বিনতে আওয়াইমির, বনী লিহইয়ান ইবনু হুযাইল গোত্রের মেয়ে। বুখারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, নবী করীম [সা] হত্যাকারী মহিলাকে হত্যা করেননি। হযরত আবু হুরাইরা [রা] এর হাদীস থেকে জানা যায়, নিহত মহিলার গর্ভস্থ সন্তানের বিনিময়ে গোলাম বা দাসী প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন কিন্তু অভিযুক্ত মহিলা (শাস্তি প্রদানের আগেই) মৃত্যুবরণ করে। তখন নবী করীম [সা] তার স্বামী কন্যাদের ওয়ারিশ ঘোষণা করলেন এবং আসাবাদের ওপর দিয়াত নির্ধারণ করলেন।
টিকাঃ
৮. আছাবা মৃত ব্যক্তির ঐ আত্মীয়কে বলা হয়, মৃত ব্যক্তির পরিত্যাক্ত সম্পদে যার কোনো নির্দিষ্ট অংশ নেই। বরং যাবিল ফুরুজগণ নিজ নিজ অংশ নেয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ (যদি থাকে) সে প্রাপ্ত হয়।
৯. গুররাহ্ ক্রীতদাস বা দাসীকে বলা হয়। পারিভাষিক অর্থে দিয়াতের (রক্তপণ) অংশ, যার পরিমাণ ৫০০ দিরহাম।