📄 কুরআন সুন্নাহর আলোকে বন্দী করে শাস্তি প্রদান
মুসান্নাফ আবু দাউদে নযর ইবনু সুমাইল কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে তিনি বলেন- আমি নবী করীম [সা] এর নিকট আমার এক পাওনাদারকে হাজির করলাম। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, 'তার সাথে সাথে লেগে থাকো। হে বনী তামীমের ভাই! তুমি তোমার কয়েদীর সাথে কিরূপ আচরণ করতে চাও?'
তাছাড়া আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি যারা বন্দীশালা সম্পর্কে কথা বলেন তাদের পক্ষের দলিল। ইরশাদ হচ্ছে-
فَامْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفَّا هُنَّ الْمَوْتُ
তাদেরকে (অভিযুক্ত মহিলা) গৃহবন্দী করে রাখো, যতোদিন মৃত্যু এদেরকে তুলে না নেয়।
আর নবী করীম [সা] এর এ উক্তি যা তিনি ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, এক ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য বন্দী করে রেখেছিলো। তিনি বলেছেন-' হত্যা করো হত্যাকারীকে, বন্দী করো বন্দীকারীকে।' আবু উবাইদ [রা] বলেন-'বন্দী করো বন্দীকারীকে।' একথার তাৎপর্য হচ্ছে- বন্দী করো ঐ ব্যক্তিকে যে হত্যা করার জন্য লোকদেরকে বন্দী করে রেখেছিলো তাকে আমৃত্যু বন্দী ক'রে রাখো।
এরকম একটি কথা আবদুর রাজ্জাক তার গ্রন্থে বর্ননা করেছেন। বলা হয়েছে- হযরত আলী [রা] বন্দীদের বন্দী করে রাখতেন যতোদিন তার মৃত্যু না হতো।
টিকাঃ
২. সাথে সাথে থাকা অর্থাৎ গৃহবন্দী বা নযর বন্দী, এটাও এক ধরনের কয়েদ।
📄 যুদ্ধবন্দী কাফিরদের সম্পর্কে নবী করীম [সা] এর ফায়সালা
বুখারী ও মুসলিমে হযরত আনাস ইবনু মালিক [রা] হতে বর্ণিত- একবার বনী আকল অথবা বনী উরাইনা গোত্রের কতিপয় লোক নবী করীম [সা] এর নিকট (মুসলমান হবার জন্য) এলো। কিন্তু মদীনার আবহাওয়া তাদের অনুকূল না হওয়ায় তারা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লো। তখন নবী করীম [সা] তাদেরকে যাকাতের উটের কাছে যাবার এবং তার পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেলো। কিছুদিনের মধ্যেই তারা সুস্থ হয়ে মোটা তাজা হয়ে উঠলো। একদিন তারা উটের রাখালকে হত্যা করে উটগুলো নিয়ে রওয়ানা হলো। এ খবর পাওয়া মাত্র নবী করীম (সা) তাদেরকে ধরার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বেড়ে উঠার পর তাদেরকে গ্রেফতার করে এনে হাজির করা হলো। তখন রাসূল [সা] এর নির্দেশে তাদের হাত পা কেটে দেয়া হলো। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুঁড়ে দেয়া হলো তারপর তাদেরকে বন্দী রাখার নির্দেশ দিলেন যতোদিন তারা তওবা না করে।
আবু কিলাবা [রা] বলেন- তারা চুরি করেছিলো, হত্যা করেছিলো, ঈমান আনার পর কুফুরী করেছিলো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। এ জন্য তাদেরকে এতো কঠোর শাস্তি দেয়া হয়েছিলো।
সাঈদ ইবনু যুবাইর মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক এবং মুহাম্মদ ইবনু সাইর- কিতাব আবি উবাইদে বর্ণনা করেছেন, এ ঘটনাটি ঘটেছিলো সূরা আল মায়িদার নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণের পূর্বে।
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقْتَلُوا وَيُصَلِّبُوا وَتَقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَارْجُلُهُم مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَؤُا مِنَ الْأَرْضِ
যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে লড়াই করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি হচ্ছে হত্যা কিংবা শূলে চড়ানো অথবা তাদের হাত ও পা উল্টো দিক হতে কেটে দেয়া কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা। [সূরা আল মায়িদা-৩৩)
বুখারী ও মুসলিমে আছে, তারা সংখ্যায় আটজন ছিলো। গরম শলাকা দিয়ে চোখ ফুঁড়ে দেয়া হয়েছিলো, এটি আনাস [রা] এর বর্ণনা। মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে আছে, আমি আনাস [রা] কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিভাবে চোখ ফুঁড়ে দেয়া হয়েছিলো? তিনি বললেন, লোহার শিক গরম করে তাদের দু'চোখে এমনভাবে লাগানো হতো চোখ গলে পানির মতো বেরিয়ে যেতো।
📄 হত্যাকারীকে কিভাবে হাজির করা হতো এবং তাকে হত্যা করার পদ্ধতি কী ছিল
মুসলিমে সামাক ইবনু হরবা হতে বর্ণিত হয়েছে, আলকামা ইবনু ওয়ায়েল তাঁর পিতা এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন- একবার আমরা নবী করীম (সা) এর দরবারে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে রশি দিয়ে বেঁধে টানতে টানতে রাসূলে আকরাম (সা) এর নিকট নিয়ে এলো এবং বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্। এ ব্যক্তি আমার ভাইকে হত্যা করেছে।'
তখন রাসূল [সা] জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি হত্যা করেছো?' কিন্তু সে কোনো উত্তর দিলো না? তখন রাসূল [সা] বাদীকে বললেন, সে যদি স্বীকার না করে তবে তোমাকে স্বাক্ষী হাজির করতে হবে। ইত্যবসরে হত্যাকারী বললো, 'হ্যাঁ, আমি হত্যা করেছি।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'কিভাবে হত্যা করেছো?' লোকটি বললো, আমি একটি গাছ থেকে লাকড়ী কাটছিলাম, লোকটি আমাকে গালি দিলো শুনে আমি রেগে গেলাম এবং মাথায় কুঠার দিয়ে আঘাত করলাম, ফলে সে মারা গেল। ঘটনা শুনে রাসূলে আকরাম [সা] তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার নিকট কি এমন কোনো সম্পদ আছে যার বিনিময়ে তুমি বাঁচতে পারো?' সে বললো, 'আমার নিকট এ কুঠার এবং একটি কম্বল ছাড়া আর কিছুই নেই।' বলা হলো, 'তোমার সম্প্রদায় কি তোমাকে রক্তপণ দিয়ে মুক্ত করে নেবে?' সে বললো, 'আমি আমার সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট ব্যক্তি।' তখন নবী করীম (সা) তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, 'তুমিতো জান তোমার সাথী ঐ ব্যক্তি যে তোমাকে নিয়ে যাবে (হত্যার জন্য)।' যখন বাদী তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেললো তখন তিনি বললেন, 'তাকে হত্যা করলে সেও হত্যার অপরাধে অপরাধি হবে।' এ কথা শুনে বাদী ফিরে এলো এবং বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাকে হত্যা করলে আমিও হত্যার অপরাধে অপরাধী হবো? কিন্তু একেতো আমি আপনার নির্দেশেই বন্দী করেছি।' রাসূল [সা] বললেন, 'তুমি কি এটা চাও না যে, সে তার এবং তার দ্বারা নিহত ব্যক্তির গুনাহ একাই বহন করুক?' সে বললো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কেন নয়?' হুজুর [সা] বললেন, 'এরকমই হবে। (যদি তাকে তুমি হত্যা না করো।)' একথা শুনে লোকটিকে বাঁধন মুক্ত করে রশিটি দূরে ফেলে দিলো।'
অন্য বর্ণনায় আছে- যখন ঐ ব্যক্তি হত্যাকারীকে নিয়ে রওয়ানা দিলো তখন রাসূল [সা] বললেন, 'হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে।' একথা একজন তাকে গিয়ে বললো, অমনি সে তাকে ছেড়ে দিলো।
ইসমাঈল ইবনু সালেম বলেন, আমি হাবীব ইবনু আবি সাবিতের নিকট বর্ণনা করলাম তিনি বললেন, আমার নিকট ইবনু আশরা হাদীস বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) মার্জনাকারীকে বললেন, 'তুমি তাকে অবজ্ঞা করলে'। মুসনাদে ইবনে আবি শাইবায় ওয়ায়েল ইবনু হাজর আল হাজরামীর হাদীসটিও অনুরূপ।
সেখানে বলা হয়েছে- নবী করীম [সা] নিহত ব্যক্তির ওলীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তাকে মা'ফ করে দেবে?' সে বললো, 'না।' তিনি বললেন, 'তবে কি তাকে হত্যা করবে?' বললো, 'হ্যাঁ, আমি তাকে হত্যা করবো।' একথা সে তিনবার বললো। রাসূল [সা] বললেন, 'যদি তুমি তাকে মা'ফ করে দাও তবে সে তার গুনাহর ভাগী হয়ে যাবে।'
মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবায় আবু হুরাইরা [রা] কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তিকে হত্যার অপরাধে নবী করীম (সা) এর দরবারে হাজির করা হলো। তিনি তাকে নিহত ব্যক্তির ওলীর নিকট সোপর্দ করে দিলেন। হত্যাকারী বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাকে হত্যা করার ইচ্ছে আমার ছিল না। রাসূল [সা] নিহত ব্যক্তির ওলীকে বললেন, "যদি সে সত্য বলে থাকে তবে তাকে হত্যা করলে তুমিও জাহান্নামী হবে।" একথা শুনে নিহত ব্যক্তির ওলী তাকে ছেড়ে দিল। বর্ণনাকারী বলেন, সে রশি গুটিয়ে দূরে নিক্ষেপ করলো। এরপর থেকে সে যুনুসয়া (রশিওয়ালা) বলে পরিচিত হয়ে গেল। উক্ত মুসান্নাফ ছাড়া অন্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে আকরাম [সা] বলেছেন, "মনের ভুলে এবং হাতের ইচ্ছেয় কাজটি হয়েছে।" নাসীঈ শরীফে আছে, (হত্যাকারীর ভাষ্য) আল্লাহর কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তাকে কখনো হত্যা করার ইচ্ছে পোষণ করিনি। রাসূল [সা] তার ওলীকে বললেন, 'যদি তার বক্তব্য সঠিক হয় এবং তুমি তাকে হত্যা করো, তাহলে তুমি জাহান্নামী।
📄 ইসলামের প্রথম খুন, যার কিসাস (বদলা) নেয়া হয়েছিলো
ইবনু ইসহাক বর্ণিত- একবার নবী করীম [সা] তায়েফ যাচ্ছিলেন। যাত্রা পথ ছিলো- নাখলায়ে ইয়ামানিয়া এবং মালিহ লুব্বা ও হিররাতুর রায়া এর উপর দিয়ে। হিররাতুর রায়া পৌঁছে নবী করীম [সা] একটি মসজিদ নির্মাণ করান এবং সেখানে নামায আদায় করেন। আমর ইবনু শুয়াইব আমাকে বলেছে, সেদিন তিনি সেখানে একটি খুনের বদলা নিয়েছিলেন। যা ছিলো ইসলামের প্রথম খুন যার (বদলা) নেয়া হয়েছিলো।
বনী লাইসের এক ব্যক্তি বনি ফুজাইলের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তখন রাসূলে আকরাম [সা] হত্যার শাস্তি স্বরূপ তাকে হত্যা করেন। ওয়াযিহায় বর্ণিত হয়েছে, তাকে শপথের [কাসামত]' এর প্রেক্ষিতে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। ওয়াযিহা এবং সারীর এ বর্ণিত হয়েছে- মুহাল্লিম ইবনু জাসামাহ্, আমের ইবনু আজবাত আশযায়ীকে হত্যা করে। তখন তার ওয়ারিশগণ শপথ করেছিলো। অতঃপর নবী করীম [সা] তাদেরকে দিয়াত (রক্তপণ) প্রদানের প্রস্তাব দেন। তখন তারা দিয়াত (রক্তপণ) দিতে রাজী হয়। তখন নবী করীম [সা] তাদেরকে রক্তপণ হিসেবে একশ' উট ধার্য্য করেন।
এঘটনার পর (হত্যাকারী) মুহাল্লিম অল্প ক'দিন বেঁচে ছিলো। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন- মাত্র সাতদিন জীবিত ছিলো। যখন তাকে দাফন করা হলো, তখন কবর তার লাশ বাইরে নিক্ষেপ করলো। ঐতিহাসিকগণ আরো বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ [সা] তিনবার বলেছিলেন, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করোনা। এজন্য তাকে তিনবার দাফন করার পর তিনবারই কবর তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছিলো, এ ঘটনার পর রাসূল [সা] বলেছেন, জমিন এর চেয়েও বড় পাপীকে গ্রহণ করে কিন্তু একে গ্রহণ না করে আল্লাহ্ তোমাদেরকে শিক্ষা দিতে চান। তারপর লোকজন তাকে পাহাড়ের উপত্যকায় রেখে আসে এবং সেখানে হিংস্র জন্তু জানোয়ার তার লাশ ভক্ষণ করে।
টিকাঃ
৩. নাখলায়ে ইয়ামানিয়া একটি নদীর নাম যা মক্কা মুকাররমা হতে এক দিনের দূরত্বে অবস্থিত।
৪. নজদবাসীরা এখান থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধেন।
৫. দূর্গম পথ।
৬. কংকরময় দূর্গম পথ।