📄 মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বির্ণিত। তিনি বলেন:
كان النبي - صلى الله عليه وسلم - إذا بلغه عن الرجل الشيء لم يقل: ما بال فلان يقول؟ ولكن يقول: ما بال أقوام كذا وكذا؟
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কারো সম্পর্কে কোন দোষের সংবাদ পৌঁছলে তিনি একথা বলতেন না যে, ওমুকের কি হলে যে, সে এমনটি বলছে। বরং তিনি বলতেন মানুষের কি হলো যে, তারা এমন এমন বলছে। ১৬০
আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূল ﷺ এর নিকট এক লোক এলো আর তখন তার উপর হলুদ রং পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহﷺ অপছন্দ করেন, এমন কিছু নিয়ে কম লোকই তাঁর নিকট আসতো। লোকটি যখন বের হয়ে গেলো তখন তিনি বললেন,
لو أمرتم هذا أن يغسل ذا عنه
তোমরা যদি এ ব্যক্তিকে তা ধৌত করতে বলতে, তবে ভালো হতো। ১৬১
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
ألا أخبركم بمن يحرم على النار، أو بمن تحرم عليه النار؟ ترحم على كل قريب هين لين سهل
আমি কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দেবো না, যে ব্যক্তি জাহান্নামের জন্য হারাম এবং জাহান্নামও তার জন্য হারাম। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যই জাহান্নাম হারাম যে নৈকট্যশীল, সহজ সরল ও নরম পবৃত্তির। ১৬২
টিকাঃ
১৬০ আবু দাউদ: হাদিস: ৪৭৮৮
১৬১ আবু দাউদ, হাদিস: ۴৭৮৯
১৬২ আহমদ, হাদিস: ৩৯৩৮
📄 হক সমূহ আদায়
মানুষের উপর অনেকগুলো হক রয়েছে। প্রকৃত মুমিন বান্দাকে সেসকল হকগুলো আদায় করতে হয়। যেমন, আল্লাহর হক, পরিবারের হক, নিজের উপর নিজের হক, বান্দার হকসহ আরো অনেক হক রয়েছে যেগুলো একজন মুমিন বান্দাকে আদায় করতে হয়। সুতরাং আমরা এখন দেখবো এসকল হকগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ কিভাবে আদায় করেছেন এবং কিভাবে প্রতিটি মূহুর্ত থেকে সর্বোচ্ছ ফায়দা হাসিল করেছেন?
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
جاء ثلاثة رهط إلى بيوت النبي - صلى الله عليه وسلم - يسألون عن عبادته فلما أخبروا كأنهم تقالوها، وقالوا: أين نحن من النبي - صلى الله عليه وسلم - وقد غفر له ما تقدم من ذنبه وما تأخر، قال أحدهم: أما أنا فأصلي الليل أبدا، وقال الآخر: وأنا أصوم الدهر ولا أفطر، وقال الآخر: وأنا أعتزل النساء فلا أتزوج أبدًا، فجاء رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إليهم فقال: «أنتم الذين قلتم كذا وكذا؟ أما والله إني لأخشاكم الله وأتقاكم له لكني أصوم وأفطر، وأصلي وأرقد وأتزوج النساء، فمن رغب عن سنتي فليس مني
একবার নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাড়িতে তিনজন লোক এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। অতঃপর তাদেরকে যখন সে বিষয়ে জানানো হলো, তারা তা অতি অল্প মনে করলো। তারা বলল, কোথায় রাসূল ﷺ এর মর্যাদা আর কোথায় আমরা? তাঁর জীবনের পূর্বাপর সকল গুনাহই ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তখন তাদের একজন বলল, আমি সারা রাত ধরে নামায আদায় করবো। অন্যজন বলল, আমি সারা জীবন ধরে রোযা রাখবো, কখনো ছাড়বো না। অন্যজন বলল, আমি মহিলাদের এড়িয়ে চলবো, কখনো বিবাহ করবো না। তখন রাসূল ﷺ তাদের নিকট আসলেন এবং তাদের বললেন, তোমরাই কি এসব কথাবার্তা বলছিলে ?
আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমাদের চেয়ে আমিই আল্লাহকে বেশি ভয় করে থাকি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বেশি তাকওয়া অবলম্বন করি। তারপরও আমি কখনো রোযা রাখি আবার কখনো রোযা রাখি না, রাত্রির কিছু অংশে নামায আদায় করি আবার কিছু অংশে ঘুমাই, আর আমি বিবাহ করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ থাকলো, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৬৩
টিকাঃ
১৬৩ বুখারী, হাদিস: ৫০৬৩; মুসলিম, হাদিস: ১৪০১
📄 রাসূল ﷺ এর ধৈর্য ও বীরত্ব
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা নবী করীমকে অসীম সাহসিকতা আর পূর্ণ বীরত্ব দান করেছিলেন। বিশেষ করে দ্বীনের সাহায্য এবং আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল ﷺ এর বীরত্ব ছিল অসীম ও পরিপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা রাসূলকে যেসকল নেয়ামত দান করেছিলেন তিনি সর্বদা সেগুলো সঠিক ক্ষেত্রেই ব্যয় করতেন। কখনও তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেন না। বীরত্ব ও সাহসীকতাও তার অন্তর্ভুক্ত। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بيده شيئًا قط إلا أن يجاهد في سبيل الله ولا ضرب خادما ولا امرأة
রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনও নিজ হাতে কাউকে প্রহার করেননি। তবে জিহাদের ময়দান ব্যতীত। (জিহাদের ময়দানে রাসূলুল্লাহ সা: কাফেরদেরকে আঘাত করেছেন।) তিনি কোন খাদেমকে এবং কোন স্ত্রীকে কখনো প্রহার করেননি। ১৬৪
রাসূল ﷺ এর বীরত্ব ও সাহসীকতার এক উজ্জ্বল নমুনা হলো, আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা এই দ্বীনকে বিজয় করার আগ পর্যন্ত তিনি একাই মক্কার মুশরিক এবং কুরাইশ নেতাদের সামনে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেছেন এবং দৃঢ় পাহাড়ের মত অটল থেকেছেন। তিনি কখনই একথা বলে পিছপা হননি যে, আমি একা, আমার সাথে কেউ নেই, পুরো জাতি আমার বিপক্ষে। বরং তিনি একাই আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করে দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে বহন করে, মক্কার মুশরিক ও কুরাইশ নেতাদের সকল হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে তাদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেছেন। রাসূল ﷺ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাহসী, বীর এবং দৃঢ় সংকল্পকারী ও ধৈর্যশীল। মানুষ পলায়ন করতো আর তিনি অটল থাকতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যতদিন পর্যন্ত হেরা পর্বতের গুহায়, একাকি আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে মশগুল ছিলেন, কেউই তাকে বাধা দেয়নি, এজন্য সকল কাফের এক হয়ে তাকে কষ্ট প্রদান করেনি। কিন্তু তিনি যখন মানুষের নিকট তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে গেলেন, তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদতের কথা বললেন, তখনই কাফেররা অবাক হয়ে বলল,
أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهَا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٍ عُجَابٌ
সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্যের উপাসনা নির্ধারিত করে দিয়েছে! নিশ্চয়ই এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ১৬৫
তারা মূর্তি ও প্রতিমাকে তাদের মাঝে এবং আল্লাহর মাঝে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। যেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ : وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى
জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। ১৬৬
যদিও তারা তাওহীদুর রুবুবিয়্যাতকে স্বীকার করতো না। ইরশাদ হয়েছে,
قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ . فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ، فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ
তুমি জিজ্ঞেস করো, কে রিযিক দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছো না? ১৬৭
প্রিয় মুসলিম ভাই! একবার চিন্তা করে দেখো, বর্তমানে কিভাবে মুসলিম বিশ্বে শিরক ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিমরা কবরের সামনে গিয়ে মৃত মানুষের নিকট প্রার্থনা করছে, তার জন্য মান্নত করছে। আশা ও ভয় নিয়ে মানুষ কবরের সামনে যাচ্ছে। আর এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাথে তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ এটা স্পষ্ট শিরক। এর মাধ্যমে একজন সামন্য মৃত মানুষকে এক মহান চিরঞ্জিব সত্তার সমপর্যায়ে নিয়ে দাঁড় করানো হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ
নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। ১৬৮
আমরা কিছু সময়ের জন্য রাসূল ﷺ এর বাড়ি থেকে বের হয়ে তাঁর বাড়ির বামদিকে একটি পাহাড়ের দিকে দৃষ্টি ফেরাই। তাহলে আমরা তার বীরত্ব ও সাহসীকতার এক বিশাল নিদর্শন দেখতে পাবো। হ্যাঁ আমরা এখন উহুদ পর্বতের দিকে দৃষ্টি ফেরাবো। উহুদ পর্ববত মুসলিম ইতিহাসের এক মহান স্থান। এখানে মুসলমানদের অনেক বীরত্বপূর্ণ স্মৃতি রয়েছে। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ এর বীরত্ব সাহসীকতা আর ধৈর্যের স্মৃতি। তিনি এখানে যুদ্ধের ময়দানে কাফেরদের মাধ্যমে আহত হয়েছেন, তার পবিত্র চেহারা রক্তাক্ত হয়েছে, সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে, মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন।
উহুদের ময়দানে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আহত হওয়া সম্পর্কে সাহল ইবনে সা'দ রা. বলেন,
أما والله إني لأعرف من كان يغسل جرح رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ومن كان يسكب الماء وبما دووى قال: كانت فاطمة عليها السلام بنت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - تغسله وعلى بن أبي طالب يسكب الماء بالمجن فلما رأت فاطمة أن الماء لا يزيد الدم إلا كثرة أخذت قطعا من حصیر وأحرقتها وألصقتها فاستمسك الدم وكسرت رباعيته وجرح وجهه وكسرت البيضة على رأسه
অবশ্যই আমি জানি কে রাসূল ﷺ এর ক্ষতস্থান ধৌত করেছে? কে তাতে পানি ঢেলেছে? আর কিসের মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়েছে? তিনি বলেন, ফাতেমা বিনতে রাসূল তা ধৌত করেছেন। আলী ইবনে আবু তালিব রা. লোটা থেকে পানি ঢেলেছেন। ফাতেমা রা. যখন দেখলেন, পানির চেয়ে রক্ত বেশি পড়ছে তখন তিনি চাটাইয়ের একটা অংশ নিয়ে তা জ্বালিয়ে ক্ষতস্থানের সাথে লাগিয়ে দিলেন। আর তখন রক্ত বন্ধ হয়ে গেলো। তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিলো। চেহারায় আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তাঁর লৌহ বর্ম ভেঙ্গে মাথায় আঘাত পৌঁছে যায়। ১৬৯
হুনাইনের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রা. বলেন, যখন মুসলমানগণ পেছন দিকে পলায়ন করতে শুরু করলো। রাসূলুল্লাহ তাঁর গাধার উপরে আরোহণ করে কাফেরদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। আর আমি তখন লাগাম টেনে ধরে তার গতি রোধ করলাম। রাসূলুল্লাহ তখন বলছিলেন,
أنا النبي لا كذب أنا ابن عبد المطلب
আমি সত্য নবী। মিথ্যা নবী নই। আমি আব্দুল মুত্তলিবের বংশদর ১৭০
প্রসিদ্ধ বীর ও সাহসী যুদ্ধা আলী ইবনে আবু তালিব রা. রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে বলেন, যুদ্ধ যখন প্রচণ্ড আকার ধারণ করতো, একদল অপর দলের মুখোমুখি হতো আমরা তখন রাসূল এর আশ্রয়ে যেতাম। তিনি শত্রুর সবচেয়ে বেশি কাছা কাছি থাকতেন। ১৭১
দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ এর ধৈর্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। দাওয়তী ক্ষেত্রে তাঁর দৃঢ়তা ও ধৈর্য আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। তার ধৈর্য আর ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা এই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন পৃথিবীর বুকে এবং এই দ্বীনের সওয়ারী অবাধে বিচরণ করেছে জাজিরাতুল আরব শাম ও মাওরাউন নাহারে। এই অঞ্চলগুলো কাচা পাকা কোন ঘরই বাকি নেই যেখানে দ্বীনের আলো পৌঁছায়নি।
হাদিস শরীফে এসেছে,
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لَقَدْ أُخِفْتُ فِي اللَّهِ وَمَا يُخَافُ أَحَدٌ وَلَقَدْ أُوذِيتُ فِي اللهِ وَمَا يُؤْذَى أَحَدٌ وَلَقَدْ أَتَتْ عَلَى ثَلَاثُونَ مِنْ بَيْنِ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ وَمَا لِي وَلِبِلالٍ طَعَامُ يَأْكُلُهُ ذُو كَبِدٍ إِلَّا شَيْءٌ يُوَارِيهِ إِبْطُ بِلَالٍ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ . - وَمَعْنَى هَذَا الْحَدِيثِ حِينَ خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَارًا مِنْ مَكَّةَ وَمَعَهُ بِلالُ إِنَّمَا كَانَ مَعَ بِلالٍ مِنَ الطَّعَامِ مَا يَحْمِلُهُ تَحْتَ إِبْطِهِ
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর পথে আমাকে যতটা ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে অন্য কাউকে সে পরিমাণ ভয় দেখানো হয়নি। আল্লাহর জন্য আমাকে যতটা যাতনা দেওয়া হয়েছে, আর কাউকে এত যাতনা দেওয়া হয় নি। এক নাগাড়ে ত্রিশটি দিন ও রাত্র এমনও অতিবাহিত হয়েছে যে, বিলালের বগলের তলে রক্ষিত সামান্য খাদ্য ছাড়া আমার ও বিলালের জন্য এতটুকু খাদ্যও ছিলো না যা কোন প্রাণী খেতে পারে। ১৭২
আল্লাহ তা'আলা রাসূল ﷺ এর হাতে অনেক অঞ্চলের বিজয় দান করেছেন, তাঁর হাতে প্রচুর পরিমাণ সম্পদ গনিমত হিসেবে এসেছে তা সত্ত্বেও তিনি একটি স্বর্ণ রুপাও মিরাছ হিসেবে রেখে যাননি। বরং তিনি মিরাছ হিসেবে রেখে গেছেন। দ্বীনে ইলম। ইলমই হলো নবুওয়তের মিরাছ। সুতরাং যার ইচ্ছা হয় সে এই মিরাছ গ্রহণ করুক। এই মিরাছ গ্রহণের জন্য সকলকেই স্বগতম।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
مَا تَرَكَ رَسُولُ اللهِ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا، وَلَا شَاةً، وَلَا بَعِيرًا، وَلَا أَوْصَى بِشَيْءٍ
রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন দিনার দেরহাম রেখে যাননি। তিনি কোন বকরী বা উট রেখে যাননি এবং কোন কিছুর ওসিয়তও করে যাননি। ১৭৩
টিকাঃ
১৬৪ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮
১৬৫ সূরা ছা'দ-আয়াত: ৫
১৬৬ সূরা যুমার-আয়াত: ৩
১৬৭ সূরা ইউনুস-৩১
১৬۸ সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৭২
১৬৯ মুসলিম, হাদিস: ১৭৯০
১৭০ মুসলিম, হাদিস: ১৭৭৬; বুখারি, হাদিস: ২৮৭৪
১৭১ বাগাবী শরহে সুন্নাতে বর্ণনা করেছেন, এবং দেখুন: সহীহ মুসলিম ৩/১৪০১
১৭২ তিরমিযী, হাদিস: ২৪৭২; আহমাদ, হাদিস: ১৪০৫৫ সহীহ, ইবনু মাজাহ ১৫১
১৭৩ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩৫
📄 রাসূল ﷺ এর দো‘আ
দো'আ অনেক বড় একটি ইবাদত। আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো নিকট দো'আ করা জায়েজ নেই। আর দো'আ হলো আল্লাহ তা'আলার নিকট নিজের দুর্বলতা ও অভাব প্রকাশ করে তাঁর সাহায্য প্রর্থনা করা। দো'আ দাসত্বের নিদর্শন বহন করে, মহান রবের সামনে বান্দার ছোট হওয়া প্রকাশ করে। দো'আর মধ্যে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা থাকে এবং দো'আ ও অনুগ্রহের বিষয়টা আল্লাহ তা'আলার দিকে ন্যস্ত করা হয়। আর একারণেই রাসূল বলেছেন
الدعاء هو العبادة
দো'আই হলো ইবাদত। ১৭৪
রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার সামনে নিজের তুচ্ছতা ও দাসত্ব প্রকাশ করে তাঁর নিকট অনেক বেশি পরিমাণে দো'আ করতেন। তিনি অল্প কথায় ব্যাপক অর্থবহ কথা বলতে পছন্দ করতেন এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট কাকুতি মিনতি করে দো'আ করতে পছন্দ করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দো'আর মধ্যে একটি দো'আ ছিলো,
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي * وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيْهَا مَعَاشِي وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي التَّيْ فِيْهَا مَعَادِي وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لَّي فِي كُلِّ خَيْرٍ وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِي مِنْ كُلِّ شَرٍ
হে আল্লাহ! আপনি আমার দ্বীনকে সঠিক করে দিন, যা আমার বিষয়াদির হেফাজতকারী। আমার দুনিয়াকে সঠিক করে দিন যেখানে আমার বসবাস। আমার আখেরাতকে সঠিক করে দিন যেখানে আমার চিরস্তায়ী আবাস। সকল কল্যাণের মধ্যে আমার হায়াত বৃদ্ধি করে দিন। আমার মৃত্যুকে বানান আমার জন্য সকল অকল্যাণ থেকে প্রশান্তির। ১৭৫
রাসূল ﷺ এর আরেকটি দো'আ ছিলো,
اللَّهُمَّ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ وَمَلِيْكَهُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي وَشَرِّ الشَّيْطَانِ وَشَرِكِهَ وَأَنْ أَقْتَرِفَ عَلَى نَفْسِي سُوْءاً أَوْ أَجِرْهُ إِلَى مُسْلِمٍ
হে আল্লাহ! আপনি দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত। আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা। সকল জিনিসের রব ও মালিক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ব্যতীত আর কোন সত্য মাবুদ নাই। আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি, আমার নিজের অকল্যাণ থেকে, শয়তানের অনিষ্ট থেকে, তার কুচক্র বা ফাঁদ থেকে এবং আমি যেন নিজের কোন অকল্যাণ না করি এবং কোন মুসলমানের দিকে অকল্যাণ বয়ে নিয়ে না যাই। ১৭৬
রাসূল ﷺ এই দো'আও করতেন,
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَاغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
হে আল্লাহ আপনার হারাম বস্তু থেকে রক্ষা করে আপনার হালাল বস্তুর মাধ্যমে আমাকে পরিতুষ্ট করুন। এবং আপনার অনুগ্রহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দিন। ১৭৭
তিনি আরো দো'আ করতেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَأَلْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى
হে আল্লাহ আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমাকে রাফিকুল আ'লা তথা সর্বোত্তম বন্ধুর মিলন দান করুন। ১৭৮
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুখে-দুঃখে, সহজ সময়, কঠিন সময়, অভাবের সময়, স্বচ্ছলতার সময় এক কথায় সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নিকট অনেক দো'আ করতেন। বদরের যুদ্ধের সময় তিনি মুসলমানদের বিজয় আর মুশরিকদের পরাজয়ের জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে এত পরিমাণে দো'আ করেছেন যে, তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গিয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, তাঁর সাহাবিদের জন্য এবং সকল মুসলমানদের জন্য দো'আ করতেন।
টিকাঃ
১৭৪ তিরমিযী, হাদিস: ২৯৬৯
১৭৫ মুসলিম, হাদিস: ২৭২০
১৭৬
১৭৭ তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৬৩
১৭৮ তিরমিযি, হাদিস: ৩৪৯৬; ইবনু মাজাহ, হাদিস: ১৬১৯