📄 জিকিরের বর্ণনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। এই উম্মতের প্রধান মুরব্বি ও শিক্ষক নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক পরিমাণে আল্লাহর ইবাদত করতেন। আল্লাহ তা'আলার সাথে তার আত্মার সম্পর্ক ছিলো সার্বক্ষণিক সুদৃঢ়। কোন একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর জিকির, হামদ ও ছানা পড়া থেকে খালি যেতো না। অথচ তাঁর পূর্ব-পর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিলো। তিনি ছিলেন একজন চিরকৃতজ্ঞ বান্দা। শুকরিয়া আদায়কারী নবী এবং প্রশংসাকারী রাসূল। তিনি যথাযথভাবে তাঁর রবকে চিনতেন। এজন্য সর্বদাই তাঁর হামদ, ছানা ও জিকিরে মাশগুল থাকতেন। একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর আনুগত্য ব্যতীত কাটতো না। তিনি সময়ের মূল্য সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ অবগত। আর একারণেই প্রতিটি মুহূর্তই তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের ইবাদাত বন্দেগীতে কাটাতেন।
হাদিস শরীফে এসেছে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يذكر الله تعالى على كل أحيانه
রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। ১৫১
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫২
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
والله إني لأستغفر الله وأتوب إليه في اليوم أكثر من سبعين مرة
আল্লাহর শপথ করে বলছি, নিশ্চয় আমি দৈনিক ৭০ বারেরও বেশী আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তেগফার করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি। ১৫৩
ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব ! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনিই তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫৪
উম্মুল মুমিনীন ইম্মে সলামা রা. বলেন, রাসূল ﷺ যখন তাঁর নিকট থাকতেন তখন বেশি বেশি এই দো'আ পড়তেন,
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
হে অন্তর সমূহকে পরিবর্তণকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির করে দিন। ১৫৫
টিকাঃ
১৫১ মুসলিম, হাদিস: ৩৭৩
১৫২ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৩ বুখারী, হাদিস: ৬৩০৭
১৫৪ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৫ তিরমিযী, হাদিস: ২১৪০
📄 প্রতিবেশী
রাসূল ﷺ প্রতিবেশীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তাদের খোঁজ খবর নিতেন। বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়াতেন। প্রতিবেশীর প্রতি তার অন্তরে বিশেষ একটা স্থান ছিলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مازال جبريل يوصيني بالجار حتى ظننت أنه سيورثه
জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের এতো বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে, আমার মনে হয়েছে নিশ্চয়ই তাকে উত্তরাধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ১৫৬
রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু জর রা.কে ওসিয়ত করে বলেন,
يا أبا ذر إذا طبخت مرقة فأكثر ماءها وتعاهد جيرانك
আবু জর! যখন তরকারি রান্না করো তখন তার ঝোল বাড়িয়ে দাও এবং প্রতিবেশীকে তাতে শরিক করো। ১৫৭
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন,
لا يدخل الجنة من لا يأمن جاره بوائقه
যার অনিষ্ট ও খারাবি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ১৫৮
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন,
من كان يؤمن بالله واليوم الآخر، فليحسن إلى جاره
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করে। ১৫৯
টিকাঃ
১৫৬ বুখারী, ৬০১৪; মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫
১৫৭ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫
১৫৮ মুসলিম, হাদিস: ৪৬
১৫৯ মুসলিম, হাদিস: ৪৭
📄 মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বির্ণিত। তিনি বলেন:
كان النبي - صلى الله عليه وسلم - إذا بلغه عن الرجل الشيء لم يقل: ما بال فلان يقول؟ ولكن يقول: ما بال أقوام كذا وكذا؟
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কারো সম্পর্কে কোন দোষের সংবাদ পৌঁছলে তিনি একথা বলতেন না যে, ওমুকের কি হলে যে, সে এমনটি বলছে। বরং তিনি বলতেন মানুষের কি হলো যে, তারা এমন এমন বলছে। ১৬০
আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূল ﷺ এর নিকট এক লোক এলো আর তখন তার উপর হলুদ রং পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহﷺ অপছন্দ করেন, এমন কিছু নিয়ে কম লোকই তাঁর নিকট আসতো। লোকটি যখন বের হয়ে গেলো তখন তিনি বললেন,
لو أمرتم هذا أن يغسل ذا عنه
তোমরা যদি এ ব্যক্তিকে তা ধৌত করতে বলতে, তবে ভালো হতো। ১৬১
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
ألا أخبركم بمن يحرم على النار، أو بمن تحرم عليه النار؟ ترحم على كل قريب هين لين سهل
আমি কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দেবো না, যে ব্যক্তি জাহান্নামের জন্য হারাম এবং জাহান্নামও তার জন্য হারাম। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যই জাহান্নাম হারাম যে নৈকট্যশীল, সহজ সরল ও নরম পবৃত্তির। ১৬২
টিকাঃ
১৬০ আবু দাউদ: হাদিস: ৪৭৮৮
১৬১ আবু দাউদ, হাদিস: ۴৭৮৯
১৬২ আহমদ, হাদিস: ৩৯৩৮
📄 হক সমূহ আদায়
মানুষের উপর অনেকগুলো হক রয়েছে। প্রকৃত মুমিন বান্দাকে সেসকল হকগুলো আদায় করতে হয়। যেমন, আল্লাহর হক, পরিবারের হক, নিজের উপর নিজের হক, বান্দার হকসহ আরো অনেক হক রয়েছে যেগুলো একজন মুমিন বান্দাকে আদায় করতে হয়। সুতরাং আমরা এখন দেখবো এসকল হকগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ কিভাবে আদায় করেছেন এবং কিভাবে প্রতিটি মূহুর্ত থেকে সর্বোচ্ছ ফায়দা হাসিল করেছেন?
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
جاء ثلاثة رهط إلى بيوت النبي - صلى الله عليه وسلم - يسألون عن عبادته فلما أخبروا كأنهم تقالوها، وقالوا: أين نحن من النبي - صلى الله عليه وسلم - وقد غفر له ما تقدم من ذنبه وما تأخر، قال أحدهم: أما أنا فأصلي الليل أبدا، وقال الآخر: وأنا أصوم الدهر ولا أفطر، وقال الآخر: وأنا أعتزل النساء فلا أتزوج أبدًا، فجاء رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إليهم فقال: «أنتم الذين قلتم كذا وكذا؟ أما والله إني لأخشاكم الله وأتقاكم له لكني أصوم وأفطر، وأصلي وأرقد وأتزوج النساء، فمن رغب عن سنتي فليس مني
একবার নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাড়িতে তিনজন লোক এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। অতঃপর তাদেরকে যখন সে বিষয়ে জানানো হলো, তারা তা অতি অল্প মনে করলো। তারা বলল, কোথায় রাসূল ﷺ এর মর্যাদা আর কোথায় আমরা? তাঁর জীবনের পূর্বাপর সকল গুনাহই ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তখন তাদের একজন বলল, আমি সারা রাত ধরে নামায আদায় করবো। অন্যজন বলল, আমি সারা জীবন ধরে রোযা রাখবো, কখনো ছাড়বো না। অন্যজন বলল, আমি মহিলাদের এড়িয়ে চলবো, কখনো বিবাহ করবো না। তখন রাসূল ﷺ তাদের নিকট আসলেন এবং তাদের বললেন, তোমরাই কি এসব কথাবার্তা বলছিলে ?
আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমাদের চেয়ে আমিই আল্লাহকে বেশি ভয় করে থাকি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বেশি তাকওয়া অবলম্বন করি। তারপরও আমি কখনো রোযা রাখি আবার কখনো রোযা রাখি না, রাত্রির কিছু অংশে নামায আদায় করি আবার কিছু অংশে ঘুমাই, আর আমি বিবাহ করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ থাকলো, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৬৩
টিকাঃ
১৬৩ বুখারী, হাদিস: ৫০৬৩; মুসলিম, হাদিস: ১৪০১