📄 অন্যের সম্মান রক্ষা করা
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মজলিস হলো ইলম ও জিকিরের মজলিস। আর সেই মজলিসে যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ উপস্থিত থেকে ইলম শিক্ষা দেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন তাহলে সেই মজলিসের মান ও উচ্চতা হবে কত!
রাসূল ﷺ এর মজলিসের বিশুদ্ধতা ও তাঁর নির্মল চরিত্রের প্রমাণই হলো, তিনি ভুলকারীকে সংশোধন করতেন, অজ্ঞকে শিক্ষা দিতেন, উদাসীন-গাফেলকে সতর্ক করতেন। তাঁর উত্তম কথা ও কর্মই তাঁর মজলিসে গ্রহণযোগ্যতা পেতো। কেউ কথা বললে মনযোগ সহকারে তিনি তার কথা শুনতেন। তবে তিনি কখনই গিবত, চুগলখুরী, ও অন্যের অপবাদ দেওয়া মেনে নিতেন না। তিনি সর্বদাই অন্যের সম্মান রক্ষা করতেন। তার সামনে কারো সম্মান নষ্ট হওয়াকে তিনি মেনে নিতেন না।
আতবান ইবনে মালেক রা, হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
قام النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي فقال: «أين مالك بن الدخشم»؟ فقال رجل: ذلك منافق لا يحب الله ولا رسوله، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «لا تفعل ذلك، ألا تراه قد قال لا إله إلا الله يريد بذلك وجه الله، وإن الله قد حرم على النار من قال: لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে বললেন, মালেক ইবনুদ দাখশাম কোথায়? তখন এক লোক বলল, সে তো মুনাফিক। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পছন্দ করে না। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমনটি করো না। তুমি কি দেখ না যে, সে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করেছে! আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবুদ নেই") পাঠ করবে! আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দেন। ১৪৭
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এবং অন্যের অধিকার খর্ব করার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন:
ألا أنبئكم بأكبر الكبائر؟ قلنا : بلى يا رسول الله، قال: «الإشراك بالله، وعقوق الوالدين وكان متكئا فجلس فقال: «ألا وقول الزور» فما زال يكررها حتى قلنا ليته سكت.
আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহ সম্পর্কে বলবো না? আমরা বললাম, নিশ্চয়ই বলবেন, হে আল্লাহর রাসূল ! তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, অতঃপর সোজা হয়ে বসে বললেন, মিথ্যা কথা থেকে সাবধান থাকবে। তিনি একথা বার বার বলছিলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা (মনেমনে) বললাম, এখন যদি তিনি চুপ হতেন। ১৪৮
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.কে তিনি অত্যন্ত মুহাব্বত করা সত্তেও, গিবতের ব্যাপারে তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং এর ভয়াবহ বিপদের কথা তার সামনে স্পষ্ট করে বলেছেন।
আয়েশা রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
قلت للنبي - صلى الله عليه وسلم - حسبك من صفية كذا وكذا، قال بعض الرواة: تعني قصرها، فقالت: «لقد قلت كلمة لو مزجت بماء البحر المزجته
আমি নবী কারীম কে বললাম, আপনার জন্য তো এমন সফিয়্যাই যথেষ্ট। কোন কোন রাবী বলেন, এর মাধ্যমে তিনি তার খাটো হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তখন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই তুমি এমন কথা বলেছো, তা যদি সাগরের পানির সাথে মেশানো হতো তাহলে তা এর পানিকে পরিবর্তন করে দিতো। ১৪৯
যারা তার অন্য ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করবে তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من ذب عن عرض أخيه بالغيبة كان حقا على الله أن يعتقه من النار
যে ব্যক্তি অপর ভাইয়ের গীবত দমন করে তার সম্মান রক্ষা করলো, আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। ১৫০
টিকাঃ
১৪৭ বুখারী, হাদিস: ৫৪০১; মুসলিম, হাদিস: ৩৩
১৪৮ বুখারী, হাদিস: ২৬৫৪
১৪৯ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৫
১৫০ আহমাদ, হাদিস: ২৭৬০৯
📄 জিকিরের বর্ণনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। এই উম্মতের প্রধান মুরব্বি ও শিক্ষক নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক পরিমাণে আল্লাহর ইবাদত করতেন। আল্লাহ তা'আলার সাথে তার আত্মার সম্পর্ক ছিলো সার্বক্ষণিক সুদৃঢ়। কোন একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর জিকির, হামদ ও ছানা পড়া থেকে খালি যেতো না। অথচ তাঁর পূর্ব-পর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিলো। তিনি ছিলেন একজন চিরকৃতজ্ঞ বান্দা। শুকরিয়া আদায়কারী নবী এবং প্রশংসাকারী রাসূল। তিনি যথাযথভাবে তাঁর রবকে চিনতেন। এজন্য সর্বদাই তাঁর হামদ, ছানা ও জিকিরে মাশগুল থাকতেন। একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর আনুগত্য ব্যতীত কাটতো না। তিনি সময়ের মূল্য সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ অবগত। আর একারণেই প্রতিটি মুহূর্তই তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের ইবাদাত বন্দেগীতে কাটাতেন।
হাদিস শরীফে এসেছে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يذكر الله تعالى على كل أحيانه
রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। ১৫১
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫২
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
والله إني لأستغفر الله وأتوب إليه في اليوم أكثر من سبعين مرة
আল্লাহর শপথ করে বলছি, নিশ্চয় আমি দৈনিক ৭০ বারেরও বেশী আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তেগফার করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি। ১৫৩
ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব ! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনিই তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫৪
উম্মুল মুমিনীন ইম্মে সলামা রা. বলেন, রাসূল ﷺ যখন তাঁর নিকট থাকতেন তখন বেশি বেশি এই দো'আ পড়তেন,
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
হে অন্তর সমূহকে পরিবর্তণকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির করে দিন। ১৫৫
টিকাঃ
১৫১ মুসলিম, হাদিস: ৩৭৩
১৫২ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৩ বুখারী, হাদিস: ৬৩০৭
১৫৪ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৫ তিরমিযী, হাদিস: ২১৪০
📄 প্রতিবেশী
রাসূল ﷺ প্রতিবেশীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তাদের খোঁজ খবর নিতেন। বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়াতেন। প্রতিবেশীর প্রতি তার অন্তরে বিশেষ একটা স্থান ছিলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مازال جبريل يوصيني بالجار حتى ظننت أنه سيورثه
জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের এতো বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে, আমার মনে হয়েছে নিশ্চয়ই তাকে উত্তরাধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ১৫৬
রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু জর রা.কে ওসিয়ত করে বলেন,
يا أبا ذر إذا طبخت مرقة فأكثر ماءها وتعاهد جيرانك
আবু জর! যখন তরকারি রান্না করো তখন তার ঝোল বাড়িয়ে দাও এবং প্রতিবেশীকে তাতে শরিক করো। ১৫৭
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন,
لا يدخل الجنة من لا يأمن جاره بوائقه
যার অনিষ্ট ও খারাবি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ১৫৮
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন,
من كان يؤمن بالله واليوم الآخر، فليحسن إلى جاره
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করে। ১৫৯
টিকাঃ
১৫৬ বুখারী, ৬০১৪; মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫
১৫৭ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫
১৫৮ মুসলিম, হাদিস: ৪৬
১৫৯ মুসলিম, হাদিস: ৪৭
📄 মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বির্ণিত। তিনি বলেন:
كان النبي - صلى الله عليه وسلم - إذا بلغه عن الرجل الشيء لم يقل: ما بال فلان يقول؟ ولكن يقول: ما بال أقوام كذا وكذا؟
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কারো সম্পর্কে কোন দোষের সংবাদ পৌঁছলে তিনি একথা বলতেন না যে, ওমুকের কি হলে যে, সে এমনটি বলছে। বরং তিনি বলতেন মানুষের কি হলো যে, তারা এমন এমন বলছে। ১৬০
আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূল ﷺ এর নিকট এক লোক এলো আর তখন তার উপর হলুদ রং পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহﷺ অপছন্দ করেন, এমন কিছু নিয়ে কম লোকই তাঁর নিকট আসতো। লোকটি যখন বের হয়ে গেলো তখন তিনি বললেন,
لو أمرتم هذا أن يغسل ذا عنه
তোমরা যদি এ ব্যক্তিকে তা ধৌত করতে বলতে, তবে ভালো হতো। ১৬১
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
ألا أخبركم بمن يحرم على النار، أو بمن تحرم عليه النار؟ ترحم على كل قريب هين لين سهل
আমি কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দেবো না, যে ব্যক্তি জাহান্নামের জন্য হারাম এবং জাহান্নামও তার জন্য হারাম। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যই জাহান্নাম হারাম যে নৈকট্যশীল, সহজ সরল ও নরম পবৃত্তির। ১৬২
টিকাঃ
১৬০ আবু দাউদ: হাদিস: ৪৭৮৮
১৬১ আবু দাউদ, হাদিস: ۴৭৮৯
১৬২ আহমদ, হাদিস: ৩৯৩৮