📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবার

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবার


সমাজের উঁচু শ্রেণী, ক্ষমতাবান ও ধনীদের বাড়িতে সবসময় খাবার দাবারের রমরমা অবস্থা ও বিলাসিতা লেগেই থাকে।

কিন্তু এই উম্মতের নবী, তিনি যে শুধু নবী তা কিন্তু নয়, তিনি একই সাথে উম্মতের নবী, রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান সেনাপতি, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা তার হাতে। রাষ্ট্রিয় কোষাগারের ক্ষমতা তার হাতে। উট বোঝাই হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে খাদ্য দ্রব্য এবং অন্যান্য সামগ্রী তার নিকট আসছে, তার সামনে স্বর্ণ রুপা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এই যার অবস্থা তাঁর জীবন যাপনের মান এবং খানা-পিনার অবস্থা কী? তিনি কি রাজা-বাদশাহদের মত জীবন-যাপন করেন নাকি তার চেয়েও উঁচু মানের বিলাসিতাপূর্ণ? তাঁর খাবার কি ধনী ও বিত্তশীলদের মত নাকি তার চেয়েও ভাল উন্নতমানের?

হে ভাই! একবার লক্ষ করে দেখো যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবারের মান ও পরিমাণ কেমন ছিলো? তুমি আশ্চর্য হয়ো না তার খাবারের মান ও পরিমাণ দেখে।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
إن النبي - صلى الله عليه وسلم - لم يجتمع عنده غداء ولا عشاء من خبز ولحم إلا على ضفف
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুপুর ও রাতের খাবারে কখনো রুটি গোস্ত একত্র হতো না, যদিও হতো তা হতো অতি সামান্য। ১৩৫ الضفف শব্দের অর্থ হলো, খাবার অল্প আর মানুষ বেশি। অর্থাৎ, তিনি তৃপ্তি সহকারে আহার করতে পারতেন না। যদি মেহমান আসতো তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ও তাদের আনন্দের জন্য তৃপ্ত হয়ে খাবার খেতেন।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما شبع آل محمد من خبز شعير يومين متتابعين حتى قبض رسول الله - صلى الله عليه وسلم
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবার তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পরপর দুই দিন যবের রুটি পেট ভরে খায়নি। ১৩৬

অন্য রেওয়াতে এসেছে,
ما شبع آل محمد منذ قام المدينة من طعام بر ثلاث ليال تباعًا حتى قبض
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমণের পর থেকে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবার লাগাতার তিন দিন পেট পূর্ণ করে গমের রুটি খায়নি। ১৩৭

বরং রাসূলুল্লাহ খাবার না পেয়ে খালি পেটে ঘুমিয়ে যেতেন, তাঁর পেটে একটি লোকমাও যেত না। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يبيت الليالي المتتابعة طاويًا هو وأهله، لا يجدون عشاء، وكان أكثر خبزهم خبز الشعير
রাসূলুল্লাহ ও তাঁর পরিবার ক্ষুধার্ত অবস্থায় লাগাতার কয়েক রাত অতিবাহিত করতেন। রাতের খাবার থাকতো না তাঁদের কাছে। আর তাদের বেশির ভাগ রুটিই ছিলো যবের রুটি। ১৩৮

খাবারের স্বল্পতা বা খাবার না থাকার কারণে যে এমনটি হতো তা নয়। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তো সর্বদা খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী আসতেই থাকতো, কখনো কখনো উট বোঝাই হয়ে পণ্য দ্রব্য আসতো তাঁর নিকট। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাথে সাথে তা দান করে দিতেন মানুষের মধ্যে। উকবা ইবনুল হারিস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর খুব দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলেন এবং অবস্থান না করেই আবার বের হয়ে এলেন। তখন আমি অথবা অন্য কেউ তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন,
كنت خلفت فى البيت تبراً - أى ذهباً - من الصدقة فكرهت أن أبيته فقسمته
ঘরে সাদকার কিছু স্বর্ণ রেখে এসে ছিলাম, সেগুলো ঘরে রেখে আমি রাত্রি যাপন করতে চাইনি, তাই সেগুলো বণ্টন করে দিলাম। ১৩৯

রাসূলুল্লাহ এর দানশীলতা ও বদান্যতার আশ্চর্যজনক আরেকটি দিক হলো, তাঁর নিকট কেউ কিছু চাইলে সাথে সাথে তিনি তাকে তা দান করে দিতেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما سئل رسول الله - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزاً ولقد جاءه رجل، فأعطاه غنما بين جبلين، فرجع إلى قومه فقال: «يا قوم أسلموا، فإن محمدًا يعطي عطاء من لا يخشى الفقر
কেউ যদি ইসলামের দোহাই দিয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট কিছু চাইতো, তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতেন না। একবার এক লোক এসে তার নিকট চাইলে, তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত এক পাল ছাগল দান করলেন। লোকটি তার কওমের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, হে কওমের লোকসকল ! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, কেননা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দান করেন, যাতে আর অভাবের আশঙ্কা নেই। ১৪০

হে ভাই! এবার চিন্ত করে দেখো এমন দানশীল নবীর খাবারের অবস্থা কী? আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لم يأكل النبي - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزاً مرفقا حتى مات
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত কখনো উন্নতমানের বিলাসী দস্তরখানা বা খাবার টেবেলি বসে খাননি এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পাতলা নরম রুটি খাননি। ১৪১

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে এসে বলতেন,
أعندك غداء؟ فتقول: لا، فيقول: «إني صائم
তোমার নিকট কি কোন খাবার আছে? তিনি (আয়েশা রা.) যখন বলতেন 'না'। তখন তিনি বলতেন, তাহলে আমি রোযা। ১৪২

এমনও প্রমাণিত আছে যে, রাসূল ﷺ ও তার পরিবার দুই মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র খেজুর আর পানি খেয়ে জীবন ধারণ করেছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে,
أنه كان يقيم الشهر والشهرين، لا يعيشه هو وآل بيته إلا الأسودان: التمر والماء.
তিনি এক দুই মাস কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু তাঁর ও তাঁর পরিবারের জীবন ধারণের জন্য দুই কাল বস্তু তথা খেজুর ও পানি ব্যতীত কিছুই জুটতো না। ১৪৩

এত স্বল্প খাবার ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের পরেও কখনো তিনি আল্লাহ তা'আলার নাশুকরি করেননি। বরং সর্বদাই তিনি আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করেছেন। খাবার যেমনই হোক তিনি তা খেয়ে নিতেন অতঃপর আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করে খাবার প্রস্তুতকারীর শুকরিয়া আদায় করতেন। তিনি কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। খাবার খারাপ হলে খাবার প্রস্তুতকারীকে তিরস্কারও করতেন না। কারণ খাবার প্রস্তুত করাটা একট শিল্প বা ইজতেহাদি বিষয় এতে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং তিনি কখনো খাবার প্রস্তুতকারীকে তিরস্কার করতেন না। উপস্থিত খাবার ফেরৎ দিতেন না এবং যা নেই তা তালাশ করতেন না। তিনি হলেন উম্মতের নবী। তাঁর চিন্তা চেতনা বা টার্গেট কখনই পেট আর পেট ভরার বস্তু নিয়ে ছিলো না।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما عاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - طعاما قط إن اشتهاه أكله وإن كرهه تركه.
রাসূলুল্লাহ কখনো খাবারের দোষ বর্ণনা করতেন না, যদি তাঁর ভালো লাগতো তাহলে খেতেন আর না লাগলে খেতেন না। ১৪৪

প্রিয় ভাই! যারা খানা-পিনার বিলাসিতায় পড়ে গেছে, তাদের জন্য শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কথাকে সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করছি।
খাদ্য ও পোশাকের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শই হলো সর্বোত্তম আদর্শ। খাদ্যের ব্যাপারে তাঁর আদর্শ হলো, ভালো লাগলে পরিমিত খেতেন। উপস্থিত কোন খাবার ফেরত দিতেন না এবং যা নেই তা কখনো অনুসন্ধান করতেন না। যদি রুটি ও গোশত উপস্থিত হতো তাহলে তাই খেতেন, আবার যদি ফল, উপস্থিত হতো তাহলেও তাই খেতেন। আবার যদি কখনো শুধু রুটি বা শুধু খেজুর উপস্থিত হতো তাহলেও সেটাই খেতেন। তাঁর কাছে দুই প্রকার খাবার আনা হলে তিনি এ কথা বলতেন না যে, আমি দুই প্রকার খাদ্য গ্রহণ করবো না। আর মজাদার ও মিষ্টি খাদ্য গ্রহণ করা থেকেও তিনি বিরত হতেন না। হাদীসে এসেছে, নবী কারীম বলেন:
لكني أصوم وأفطر، وأقوم وأنام، وأتزوج النساء وآكل اللحم فمن رغب عن سنتي فليس مني
কিন্তু আমি কখনো রোযা রাখি, আবার কখনো রোযা ছেড়েও দেই। রাত্রে কিছু অংশ জেগে ইবাদাত করি ও কিছু অংশে ঘুমাই, আমি তো বিবাহ করেছি এবং গোশতও ভক্ষণ করে থাকি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ থাকবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৪৫

আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা পবিত্র খাবার গ্রহণ এবং এজন্য শুকরিয়া আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং যে পবিত্র বস্তুকে হারাম করলো সে হলো সীমালঙ্ঘণকারী আর যে শুকরিয়া আদায় করলো না সে আল্লাহর হক নষ্টকারী।
খাবারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পন্থাই হলো সঠিক ও সরল পন্থা। আর এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ দু'টি ভ্রান্ত পথে চলতে থাকে।
১. অপচয় আর নিজের নফসানি খায়েশাত পূর্ণ করার পথ।
২. আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম করে, বৈরাগ্যতা সৃষ্টির পথ। আর ইসলামে কোন বৈরাগ্যতা নেই।

এর পর শাইখুল ইসলাম রা. বলেন, প্রতিটি হালালই পবিত্র, আর প্রতিটি পবিত্র জিনিসই হালাল। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা আমাদেরকে পবিত্র খাবার গ্রহণ করতে বলেছেন আর খাবায়েছ তথা অপবিত্র খাবার গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। আর পবিত্র খাবার হলো উপকারী ও সুস্বাদু। আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষয় হারাম। আমাদের দেহের জন্য উপকারী বিষয়কেই আমাদের জন্য হালাল করেছেন।
খাবার ও পোশাক, ক্ষুধা ও তৃপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। এমনকি এগুলোর ক্ষেত্রে কখনো কখনো একেক জনের অবস্থাও একেক রকম হয়ে থাকে। তবে সর্বোত্তম আমল হলো যার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে এবং তা ব্যক্তির জন্যও উপকারী। ১৪৬

টিকাঃ
১৩৫ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৫৬
১৩৬ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০
১৩৭ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০
১৩৮ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৬০
১৩৯ বুখারি, হাদিস: ১৪৩০
১৪০ মুসলিম, হাদিস: ২৩১২
১৪১ বুখারী, হাদিস: ৬৪৫০
১৪২ তিরমিযি, হাদিস: ৭৩৪
১৪৩ বুখারী, হাদিস: ২৫৬৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৭২
১৪৪ বুখারী, হাদিস: ৩৫৩৬; মুসলিম, হাদিস: ২০৬৪
১৪৫ মুসলিম, হাদিস: ১৪০১; নাসায়ী, হাদিস: ৩২১৭
১৪৬ মাজমুউল ফাতাওয়া ২২/৩১০ সংক্ষেপিত

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 অন্যের সম্মান রক্ষা করা

📄 অন্যের সম্মান রক্ষা করা


পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মজলিস হলো ইলম ও জিকিরের মজলিস। আর সেই মজলিসে যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ উপস্থিত থেকে ইলম শিক্ষা দেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন তাহলে সেই মজলিসের মান ও উচ্চতা হবে কত!

রাসূল ﷺ এর মজলিসের বিশুদ্ধতা ও তাঁর নির্মল চরিত্রের প্রমাণই হলো, তিনি ভুলকারীকে সংশোধন করতেন, অজ্ঞকে শিক্ষা দিতেন, উদাসীন-গাফেলকে সতর্ক করতেন। তাঁর উত্তম কথা ও কর্মই তাঁর মজলিসে গ্রহণযোগ্যতা পেতো। কেউ কথা বললে মনযোগ সহকারে তিনি তার কথা শুনতেন। তবে তিনি কখনই গিবত, চুগলখুরী, ও অন্যের অপবাদ দেওয়া মেনে নিতেন না। তিনি সর্বদাই অন্যের সম্মান রক্ষা করতেন। তার সামনে কারো সম্মান নষ্ট হওয়াকে তিনি মেনে নিতেন না।

আতবান ইবনে মালেক রা, হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
قام النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي فقال: «أين مالك بن الدخشم»؟ فقال رجل: ذلك منافق لا يحب الله ولا رسوله، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «لا تفعل ذلك، ألا تراه قد قال لا إله إلا الله يريد بذلك وجه الله، وإن الله قد حرم على النار من قال: لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে বললেন, মালেক ইবনুদ দাখশাম কোথায়? তখন এক লোক বলল, সে তো মুনাফিক। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পছন্দ করে না। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমনটি করো না। তুমি কি দেখ না যে, সে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করেছে! আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবুদ নেই") পাঠ করবে! আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দেন। ১৪৭

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এবং অন্যের অধিকার খর্ব করার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন:
ألا أنبئكم بأكبر الكبائر؟ قلنا : بلى يا رسول الله، قال: «الإشراك بالله، وعقوق الوالدين وكان متكئا فجلس فقال: «ألا وقول الزور» فما زال يكررها حتى قلنا ليته سكت.
আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহ সম্পর্কে বলবো না? আমরা বললাম, নিশ্চয়ই বলবেন, হে আল্লাহর রাসূল ! তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, অতঃপর সোজা হয়ে বসে বললেন, মিথ্যা কথা থেকে সাবধান থাকবে। তিনি একথা বার বার বলছিলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা (মনেমনে) বললাম, এখন যদি তিনি চুপ হতেন। ১৪৮

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.কে তিনি অত্যন্ত মুহাব্বত করা সত্তেও, গিবতের ব্যাপারে তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং এর ভয়াবহ বিপদের কথা তার সামনে স্পষ্ট করে বলেছেন।
আয়েশা রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
قلت للنبي - صلى الله عليه وسلم - حسبك من صفية كذا وكذا، قال بعض الرواة: تعني قصرها، فقالت: «لقد قلت كلمة لو مزجت بماء البحر المزجته
আমি নবী কারীম কে বললাম, আপনার জন্য তো এমন সফিয়্যাই যথেষ্ট। কোন কোন রাবী বলেন, এর মাধ্যমে তিনি তার খাটো হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তখন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই তুমি এমন কথা বলেছো, তা যদি সাগরের পানির সাথে মেশানো হতো তাহলে তা এর পানিকে পরিবর্তন করে দিতো। ১৪৯

যারা তার অন্য ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করবে তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من ذب عن عرض أخيه بالغيبة كان حقا على الله أن يعتقه من النار
যে ব্যক্তি অপর ভাইয়ের গীবত দমন করে তার সম্মান রক্ষা করলো, আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। ১৫০

টিকাঃ
১৪৭ বুখারী, হাদিস: ৫৪০১; মুসলিম, হাদিস: ৩৩
১৪৮ বুখারী, হাদিস: ২৬৫৪
১৪৯ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৫
১৫০ আহমাদ, হাদিস: ২৭৬০৯

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 জিকিরের বর্ণনা

📄 জিকিরের বর্ণনা


রাসূলুল্লাহ ﷺ অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। এই উম্মতের প্রধান মুরব্বি ও শিক্ষক নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক পরিমাণে আল্লাহর ইবাদত করতেন। আল্লাহ তা'আলার সাথে তার আত্মার সম্পর্ক ছিলো সার্বক্ষণিক সুদৃঢ়। কোন একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর জিকির, হামদ ও ছানা পড়া থেকে খালি যেতো না। অথচ তাঁর পূর্ব-পর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিলো। তিনি ছিলেন একজন চিরকৃতজ্ঞ বান্দা। শুকরিয়া আদায়কারী নবী এবং প্রশংসাকারী রাসূল। তিনি যথাযথভাবে তাঁর রবকে চিনতেন। এজন্য সর্বদাই তাঁর হামদ, ছানা ও জিকিরে মাশগুল থাকতেন। একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর আনুগত্য ব্যতীত কাটতো না। তিনি সময়ের মূল্য সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ অবগত। আর একারণেই প্রতিটি মুহূর্তই তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের ইবাদাত বন্দেগীতে কাটাতেন।

হাদিস শরীফে এসেছে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يذكر الله تعالى على كل أحيانه
রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। ১৫১

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫২

আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
والله إني لأستغفر الله وأتوب إليه في اليوم أكثر من سبعين مرة
আল্লাহর শপথ করে বলছি, নিশ্চয় আমি দৈনিক ৭০ বারেরও বেশী আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তেগফার করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি। ১৫৩

ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব ! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনিই তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫৪

উম্মুল মুমিনীন ইম্মে সলামা রা. বলেন, রাসূল ﷺ যখন তাঁর নিকট থাকতেন তখন বেশি বেশি এই দো'আ পড়তেন,
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
হে অন্তর সমূহকে পরিবর্তণকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির করে দিন। ১৫৫

টিকাঃ
১৫১ মুসলিম, হাদিস: ৩৭৩
১৫২ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৩ বুখারী, হাদিস: ৬৩০৭
১৫৪ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৫ তিরমিযী, হাদিস: ২১৪০

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 প্রতিবেশী

📄 প্রতিবেশী


রাসূল ﷺ প্রতিবেশীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তাদের খোঁজ খবর নিতেন। বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়াতেন। প্রতিবেশীর প্রতি তার অন্তরে বিশেষ একটা স্থান ছিলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مازال جبريل يوصيني بالجار حتى ظننت أنه سيورثه
জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের এতো বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে, আমার মনে হয়েছে নিশ্চয়ই তাকে উত্তরাধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ১৫৬

রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু জর রা.কে ওসিয়ত করে বলেন,
يا أبا ذر إذا طبخت مرقة فأكثر ماءها وتعاهد جيرانك
আবু জর! যখন তরকারি রান্না করো তখন তার ঝোল বাড়িয়ে দাও এবং প্রতিবেশীকে তাতে শরিক করো। ১৫৭

রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন,
لا يدخل الجنة من لا يأمن جاره بوائقه
যার অনিষ্ট ও খারাবি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ১৫৮

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন,
من كان يؤمن بالله واليوم الآخر، فليحسن إلى جاره
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করে। ১৫৯

টিকাঃ
১৫৬ বুখারী, ৬০১৪; মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫
১৫৭ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫
১৫৮ মুসলিম, হাদিস: ৪৬
১৫৯ মুসলিম, হাদিস: ৪৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px