📄 ধৈর্য নম্রতা ও সহনশীলতা
ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই আমদের নবীর আগমণ। তিনি পৃথিবীতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বঞ্চিতের হক ফিরিয়ে দিয়েছেন। মানুষের সাথে কোমল ও নম্র আচরণ করেছেন। নিজের ব্যক্তিগত কারণে কখনো কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। নিজের প্রতি শত অত্যাচার ও কষ্ট প্রধানের ক্ষেত্রে তিনি সহনশীলতা ও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ কঠোরতা ও জোর-জবরদস্তি করে অধিকার আদায় করা, জালেম ও অত্যাচারীর চরিত্র। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তো রহমাতুললিল আলামীন, তিনি কখনো করো প্রতি জুলুম করেননি, কারো হক নষ্ট করেননি। বরং তাঁর প্রতি যারা খারাপ আচরণ করেছে, তাঁর সাথে অন্যায়ভাবে কঠোরতা করেছে, তিনি ছিলেন তাদের প্রতি সদয়, নম্র এবং ধৈর্যশীল ও সহনশীল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - شيئًا قط بيده، ولا امرأة ولا خادمًا إلا أن يجاهد في سبيل الله، وما نيل منه شيء قط فينتقم من صاحبه إلا أن ينتهك شيء من محارم الله تعالى فينتقم الله تعالى
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত, রাসূলুল্লাহ কখনো কারো গায়ে হাত তুলেননি। তিনি কখনো তাঁর কোন স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেননি এবং কোন খাদেমকে প্রহার করেননি। তিনি ব্যক্তিগত কারণে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে কেউ যদি আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘণ করেছে তাহলে তিনি আল্লাহ তা'আলর জন্য তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। ১২৭
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন
كنت أمشي مع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وعليه برد نجراني غليظ الحاشية، فأدركه أعرابي، فجبذه بردائه جبذة شديدة، فنظرت إلى صفحة عاتق النبي - صلى الله عليه وسلم - وقد أثرت بها حاشية الرداء من شدة جبذته، ثم قال: «يا محمد، مرلي من مال الله الذي عندك فالتفت إليه، فضحك ثم أمر له بعط
একবার আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে হাঁটছিলাম, তখন তাঁর গায়ে ছিল মোটা ঝালর বিশিষ্ট একটি নাজরানী চাদর। তখন এক বেদুঈন তাঁর নিকট এসে তাঁর চাদর ধরে অনেক জোরে এক টান দিল। আমি তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখি, এতো জোরে টানের কারণে চাদরের ঝালর তাঁর কাধে দাগ ফেলে দিয়েছে। অতঃপর লোকটি বলল, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তা'আলার যেই সম্পদ তোমার কাছে আছে সেখান থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার আদেশ করো। তখন রাসূল ﷺ হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু দানের আদেশ দিলেন। ১২৮
রাসূল ﷺ হুনাইনের যুদ্ধ থেকে ফেরার সময়, কয়েকজন বেদুইন তাঁর অনুসরণ করলো এবং তাঁর নিকট চাইতে থাকলো। অতঃপর তারা তাঁকে একটি গাছের দিকে নিয়ে এবং সওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায়ই তাঁর গায়ের চাদর টেনে নিয়ে গেলো। তখন তিনি বললেন,
ردوا علي ردائي، أتخشون علي البخل ؟ فقال: فوالله لو كان لي عدد هذه العضاة نعما لقسمته بينكم، ثم لا تجدوني بخيلاً ولا جبانا ولا كذابًا
তোমরা আমার চদর ফিরিয়ে দাও। তোমরা কি আমার উপর কৃপণতার ভয় করছো? অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার নিকট যদি এই গাছ পরিমাণ পশুও থাকতো তাহলে আমি তা তোমাদের মধ্যে বন্টণ করে দিতাম। এরপর তোমরা আমকে না কৃপণ, না কাপুরুষ, না মিথ্যাবাদী মনে করতে। ১২৯
প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ ছিলো, কোমল ও সহনশীল। তিনি প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই কল্যাণ ও অকল্যাণের দিকটার প্রতি লক্ষ্য করে কল্যাণের দিকটা প্রাধান্য দিতেন।
লক্ষ করুন, বেদুঈন লোকটি যখন ভুল করে মসজিদে পেশাব করলো আর সাহাবায়ে কেরামগণ রা. ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে বাধা দেওয়ার জন্য তেড়ে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবাদের এমনটি করতে নিষেধ করলেন। করণ লোকটি ছিলো অজ্ঞ, সে মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে জানতো না। অন্য দিকে ঐঅবস্থায় তাকে বাঁধা দেওয়া হলে তার শারীরিক সমস্যার আশংকা ছিলো। সাথে সাথে সাহাবীদের এমন কঠিন আচরণ দেখে সে ইসলাম গ্রহণ না করে হয়তো চলে যেতো। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
بال أعرابي في المسجد فقام الناس إليه ليقعوا فيه، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «دعوه وأريقوا على بوله سجلاً من ماء، أو ذنوبا من ماء، فإنما بعثتم ميسرين، ولم تبعثوا معسرين.
এক গ্রাম্য বেদুঈন মসজিদের ভিতরে পেশাব করে দিলো। তখন উপস্থিত লোকেরা তাকে বাধা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও। এবং তার পেশাবের উপর এক বালতি বা কয়েক বালতি পানি ঢেলে দাও। নিশ্চয়ই তোমরা তো সহজতার জন্যই প্রেরিত হয়েছো, কঠোরতা করার জন্য প্রেরিত হওনি। ১৩০
রাসূলুল্লাহ এর অনুসারী দাবিদারকে অবশ্যই নিজেদের নফসের অনুসরণ বাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ এর অনুসরণ করতে হবে এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর মত ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে হবে। হাদিস শরীফে এসেছে
عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ حَدَّثَنِي عُرْوَةُ، أَنَّ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها - زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حَدَّثَتْهُ أَنَّهَا قَالَتْ لِلنَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم هَلْ أَتَى عَلَيْكَ يَوْمُ كَانَ أَشَدَّ مِنْ يَوْمٍ أُحُدٍ قَالَ " لَقَدْ لَقِيتُ مِنْ قَوْمِكِ مَا لَقِيتُ، وَكَانَ أَشَدُّ مَا لَقِيتُ مِنْهُمْ يَوْمَ الْعَقَبَةِ، إِذْ عَرَضْتُ نَفْسِي عَلَى ابْنِ عَبْدِ يَالِيلَ بْنِ عَبْدِ كلالٍ، فَلَمْ يُجِبْنِي إِلَى مَا أَرَدْتُ، فَانْطَلَقْتُ وَأَنَا مَهْمُومٌ عَلَى وَجْهِي، فَلَمْ أَسْتَفِقُ إلا وَأَنَا بِقَرْنِ النَّعَالِبِ، فَرَفَعْتُ رَأْسِي، فَإِذَا أَنَا بِسَحَابَةٍ قَدْ أَظَلَّتْنِي، فَنَظَرْتُ فَإِذَا فِيهَا جِبْرِيلُ فَنَادَانِي فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ وَمَا رَدُّوا عَلَيْكَ، وَقَدْ بَعَثَ إِلَيْكَ مَلَكَ الْجِبَالِ لِتَأْمُرَهُ بِمَا شِئْتَ فِيهِمْ، فَنَادَانِي مَلَكُ الْجِبَالِ، فَسَلَّمَ عَلَى ثُمَّ قَالَ يَا مُحَمَّدُ، فَقَالَ ذَلِكَ فِيمَا شِئْتَ، إِنْ شِئْتَ أَنْ أُطْبِقَ عَلَيْهِم الأَخْشَبَيْنِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا ".
ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে উরউয়া বর্ণনা করে বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একবার তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন, উহুদের দিনের চাইতে কঠিন কোন দিন আপনার উপর এসেছিলো কি? তিনি বললেন, আমি তোমার কওম থেকে যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, তা তো হয়েছি। তাদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, আকাবার দিন আমি যখন নিজেকে ইবনে আবদে ইয়ালীল ইবনে আবদে কলালের নিকট পেশ করেছিলাম। আমি যা চেয়েছিলাম, সে তাঁর জবাব দেয়নি। তখন আমি এমন বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম যে, কারনুস সাআলিবে পৌঁছা পর্যন্ত আমার চিন্তা লাঘব হয়নি। তখন আমি মাথা উপরে উঠালাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম এক টুকরো মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি সে দিকে দৃষ্টি দিলাম। তার মধ্যে ছিলেন জিবরীল (আলাইহিস সালাম)।
তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনার কওম আপনাকে যা বলেছে এবং তারাপ্রতি উত্তরে যা বলেছে তা সবই আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার কাছে পাহাড়ের (দায়িত্বে নিয়োজিত) ফিরিশতাকে পাঠিয়েছেন। এদের সম্পর্কে আপনার যা ইচ্ছা আপনি তাঁকে হুকুম দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফিরিশতা আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, হে মুহাম্মদ! এসব ব্যাপার আপনার ইচ্ছাধীন। আপনি যদি চান, তাহলে আমি তাদের উপর আখশাবাইন কে চাপিয়ে দিব। উত্তরে নাবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (না, তা হতে পারে না) বরং আমি আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন যে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। ১৩১
বর্তমানে দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেকেই তাড়াহুড়া করে এবং দ্রুত তার ফল পেতে চায়। কিন্তু দাওয়াতের ক্ষেত্রে শর্ত হলো, নফসের অনুসরণ না করে পূর্ণ এখলাসের সাথে দাওয়াতি কাজ করা এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করা। আর এগুলোর ঘাটতি থাকার কারণেই আমরা বর্তমানে অনেককে দাওয়াতের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হতে দেখা যায়। সুতরাং আমাদেরকে তাড়াহুড়া না করে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তো আর এক দিনেই তাঁর দাওয়াতের ফল পাওয়া শুরু করেননি বরং অনেক বছর লাগাতার ধৈর্যের সাথে মেহনতের পরই তাঁর আশা পূর্ণ হয়েছে, মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেছে। দেখুন কী সীমাহীন ধৈর্য ছিল আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর।
ইবনে মাসউদ রা, থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
كأني أنظر إلى رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يحكي نبيا من الأنبياء صلوات الله وسلامه عليه ضربه قومه فأدموه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول: «اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون
মনে হচ্ছিলো আমি রাসূলুল্লাহ কে কোন এক নবীর ঘটনা বর্ণনা করতে দেখছি, যাকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রহার করে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। আর তিনি তার চেহারার রক্ত মুছতে মুছতে বলছেন, হে আল্লাহ আপনি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা জানে না। ১৩২
একবার রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবীদের সাথে কোন এক জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। তখন ঋণ ফেরত চাওয়ার জন্য যায়েদ ইবনে সুআনাহ নামক এক ইহুদি আসলো এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জামার কলার ও চাদর ধরে তার দিকে চোখ বড়বড় করে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, হে মুহাম্মদ! তুমি কি আমার ঋণ পরিশোধ করবে না? এবং সে লোকদের সামনেই তাঁকে অনেক কঠিন কঠিন কথা বলছিলো। ওমর ইবনে খাত্তাব রা. তখন ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি যায়েদের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন যেন তার চক্ষুদ্বয় ঘূর্ণয়মান নক্ষত্রের মত স্বীয় কক্ষপথে ঘুরছে। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, হে আল্লাহর শত্রু! তুই আমার চোখের সামনে রাসূলুল্লাহ কে এগুলো বললি, তাঁর সাথে এমন আচরণ করলি? ঐসত্তার শপথ করে বলছি যিনি তাকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আমি যদি তার তিরস্কারের ভয় না করতাম তাহলে আমার তরবারি দিয়ে তোর মাথা দ্বিখন্ডিত করে দিতাম। রাসূলুল্লাহ ওমর রা. এর দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
يا عمر، أنا وهو كنا أحوج إلى غير هذا، أن تأمرني بحسن الأداء، وتأمره بحسن التباعة، اذهب به يا عمر فأعطه حقه، وزده عشرين صاعا من تمر
ওমর! আমি এবং সে তোমার থেকে এমন আচরণ আশা করি যে, তুমি আমাকে অনুরোধ করবে, সুন্দর ভাবে তার ঋণ আদায় করে দিতে, আর তাকে আদেশ করবে সুন্দর আচরণ করতে। ওমর! তাকে নিয়ে যাও এবং তার হক তাকে আদায় করে দাও। তাকে বিশ সা' খেজুর বেশি দিবে।
ওমর রা. যখন তাকে বিশ সা' খেজুর বেশি দিলো, তখন ইহুদি যায়েদ বললো, ওমর! এই বেশি অংশ কীসের? ওমর রা. বললেন, রাসূলুল্লাহ তোমার কঠোরতার পরিবর্তে আমকে এই বেশি অংশ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। যায়েদ বললো, ওমর! তুমি কি আমাকে চেনো? তিনি বললেন, না। কে তুমি? যায়েদ ইবনে সুআনাহ বলল, আল হিবর (তথা ইহুদী পাদ্রী)। ওমর রা. বললেন, ইহুদি পদ্রী? তুমি বলছো তুমি ইহুদী পাদ্রী যায়েদ ইবনে সুআনাহ!! তিনি বলেন, তাহলে তুমি রাসূলুল্লাহ এর সাথে এমন কঠোর আচরণ করলে কেন? তার সাথে এমন কঠোর ভাষায় কথা বললে কেন?
সে বলল, ওমর! আমি যখন তাঁর চেহারার দিকে তাকালাম, তখন নবুওয়াতের দু'টি আলামত ব্যতীত আর সকল আলামতই তার চেহারার মধ্যে বুঝতে পারলাম। দু'টি আলামত সম্পর্কে জানতে পারিনি।
আলামত দুটি হলো, ১. তাঁর সহিষ্ণুতা অজ্ঞতার উপর অগ্রগামী কি না। ২. মুর্খতা বশত কঠিন আচরণ তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতাকেই কেবল বৃদ্ধি করবে। সুতরাং আমি তার এই দুইটা আলামত পরীক্ষা করে দেখলাম।
ওমর! তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহ তা'আলাকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে মেনে নিলাম। এবং তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমার সম্পদের অর্ধেক আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মতের উপর সাদাকা করলাম। ওমর রা. বললেন, বরং তুমি বলো, আমি তাদের কতেকের উপর সাদাকা করলাম করণ তুমি তাদের সকলকে দিতে সক্ষম হবে না। যায়েদ বললেন, তাদের কতেকের উপর। তখন ইহুদি যায়েদ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট ফিরে গেলো এবং বললো,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
অর্থ্যাৎ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।
সে তাঁর উপর ঈমান আনলো ও তাঁকে নবী রূপে বিশ্বাস করলো। ১৩৩
প্রিয় ভাই! আমরা যদি এই দীর্ঘ হাদিসে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ এবং তার ফলাফল নিয়ে চিন্তা করি তাহলেই আমরা পেয়ে যাবো দাওয়াতের ক্ষেত্রে পথ ও পন্থার এবং বুঝতে পারবো দাওয়াতের ক্ষেত্রে কী সিমাহীন ধৈর্য, কোমলতা ও সহশীলতা প্রয়োজন আমাদের। দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ হলো কোমল আচরণ দিয়ে মানুষের মন জয় করা।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
اعتمرت مع النبي - صلى الله عليه وسلم - من المدينة حتى إذا قدمت مكة، قلت: بأبي أنت وأمي يا رسول الله قصرت وأتممت، وأفطرت وصمت، قال: أحسنت يا عائشة» وما عاب علي
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে মদিনা থেকে উমরা করার উদ্দেশ্যে বের হলাম এবং যখন মক্কায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার জন্য আমার মাতা পিতা কুরবান হোক। আমি কখনো কছর পড়েছি আবার কখনো পূর্ণ সালাত আদায় করেছি। কখনো রোযা ভঙ্গ করেছি আবার কখনো রোযা রেখেছি। তিনি বললেন, আয়েশা! তুমি ভালই করেছো। তিনি আমাকে দোষারুপ করেননি। ১৩৪
টিকাঃ
১২৭ আহমাদ, হাদিস: ২৫৭১৫
১২৮ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮
১২৯ হাদীসটি বাগবী তার শারহুস সুন্নায় বর্ণনা করেন, এবং আলবানী তা সহীহ বলেন
১৩০ বুখারী, হাদিস: ৬১২৮
১৩১ বুখারী, হাদিস:৩২৩১; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯৫
১৩২ বুখারী, হাদিস: ৬৯২৯; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯২
১৩৩ বুখারী, হাদিস: ৬৯২৯; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯২
১৩৪ নাসায়ী, হাদিস: ১৪৫৬
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবার
সমাজের উঁচু শ্রেণী, ক্ষমতাবান ও ধনীদের বাড়িতে সবসময় খাবার দাবারের রমরমা অবস্থা ও বিলাসিতা লেগেই থাকে।
কিন্তু এই উম্মতের নবী, তিনি যে শুধু নবী তা কিন্তু নয়, তিনি একই সাথে উম্মতের নবী, রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান সেনাপতি, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা তার হাতে। রাষ্ট্রিয় কোষাগারের ক্ষমতা তার হাতে। উট বোঝাই হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে খাদ্য দ্রব্য এবং অন্যান্য সামগ্রী তার নিকট আসছে, তার সামনে স্বর্ণ রুপা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এই যার অবস্থা তাঁর জীবন যাপনের মান এবং খানা-পিনার অবস্থা কী? তিনি কি রাজা-বাদশাহদের মত জীবন-যাপন করেন নাকি তার চেয়েও উঁচু মানের বিলাসিতাপূর্ণ? তাঁর খাবার কি ধনী ও বিত্তশীলদের মত নাকি তার চেয়েও ভাল উন্নতমানের?
হে ভাই! একবার লক্ষ করে দেখো যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবারের মান ও পরিমাণ কেমন ছিলো? তুমি আশ্চর্য হয়ো না তার খাবারের মান ও পরিমাণ দেখে।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
إن النبي - صلى الله عليه وسلم - لم يجتمع عنده غداء ولا عشاء من خبز ولحم إلا على ضفف
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুপুর ও রাতের খাবারে কখনো রুটি গোস্ত একত্র হতো না, যদিও হতো তা হতো অতি সামান্য। ১৩৫ الضفف শব্দের অর্থ হলো, খাবার অল্প আর মানুষ বেশি। অর্থাৎ, তিনি তৃপ্তি সহকারে আহার করতে পারতেন না। যদি মেহমান আসতো তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ও তাদের আনন্দের জন্য তৃপ্ত হয়ে খাবার খেতেন।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما شبع آل محمد من خبز شعير يومين متتابعين حتى قبض رسول الله - صلى الله عليه وسلم
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবার তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পরপর দুই দিন যবের রুটি পেট ভরে খায়নি। ১৩৬
অন্য রেওয়াতে এসেছে,
ما شبع آل محمد منذ قام المدينة من طعام بر ثلاث ليال تباعًا حتى قبض
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমণের পর থেকে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবার লাগাতার তিন দিন পেট পূর্ণ করে গমের রুটি খায়নি। ১৩৭
বরং রাসূলুল্লাহ খাবার না পেয়ে খালি পেটে ঘুমিয়ে যেতেন, তাঁর পেটে একটি লোকমাও যেত না। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يبيت الليالي المتتابعة طاويًا هو وأهله، لا يجدون عشاء، وكان أكثر خبزهم خبز الشعير
রাসূলুল্লাহ ও তাঁর পরিবার ক্ষুধার্ত অবস্থায় লাগাতার কয়েক রাত অতিবাহিত করতেন। রাতের খাবার থাকতো না তাঁদের কাছে। আর তাদের বেশির ভাগ রুটিই ছিলো যবের রুটি। ১৩৮
খাবারের স্বল্পতা বা খাবার না থাকার কারণে যে এমনটি হতো তা নয়। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তো সর্বদা খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী আসতেই থাকতো, কখনো কখনো উট বোঝাই হয়ে পণ্য দ্রব্য আসতো তাঁর নিকট। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাথে সাথে তা দান করে দিতেন মানুষের মধ্যে। উকবা ইবনুল হারিস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর খুব দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলেন এবং অবস্থান না করেই আবার বের হয়ে এলেন। তখন আমি অথবা অন্য কেউ তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন,
كنت خلفت فى البيت تبراً - أى ذهباً - من الصدقة فكرهت أن أبيته فقسمته
ঘরে সাদকার কিছু স্বর্ণ রেখে এসে ছিলাম, সেগুলো ঘরে রেখে আমি রাত্রি যাপন করতে চাইনি, তাই সেগুলো বণ্টন করে দিলাম। ১৩৯
রাসূলুল্লাহ এর দানশীলতা ও বদান্যতার আশ্চর্যজনক আরেকটি দিক হলো, তাঁর নিকট কেউ কিছু চাইলে সাথে সাথে তিনি তাকে তা দান করে দিতেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما سئل رسول الله - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزاً ولقد جاءه رجل، فأعطاه غنما بين جبلين، فرجع إلى قومه فقال: «يا قوم أسلموا، فإن محمدًا يعطي عطاء من لا يخشى الفقر
কেউ যদি ইসলামের দোহাই দিয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট কিছু চাইতো, তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতেন না। একবার এক লোক এসে তার নিকট চাইলে, তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত এক পাল ছাগল দান করলেন। লোকটি তার কওমের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, হে কওমের লোকসকল ! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, কেননা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দান করেন, যাতে আর অভাবের আশঙ্কা নেই। ১৪০
হে ভাই! এবার চিন্ত করে দেখো এমন দানশীল নবীর খাবারের অবস্থা কী? আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لم يأكل النبي - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزاً مرفقا حتى مات
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত কখনো উন্নতমানের বিলাসী দস্তরখানা বা খাবার টেবেলি বসে খাননি এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পাতলা নরম রুটি খাননি। ১৪১
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে এসে বলতেন,
أعندك غداء؟ فتقول: لا، فيقول: «إني صائم
তোমার নিকট কি কোন খাবার আছে? তিনি (আয়েশা রা.) যখন বলতেন 'না'। তখন তিনি বলতেন, তাহলে আমি রোযা। ১৪২
এমনও প্রমাণিত আছে যে, রাসূল ﷺ ও তার পরিবার দুই মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র খেজুর আর পানি খেয়ে জীবন ধারণ করেছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে,
أنه كان يقيم الشهر والشهرين، لا يعيشه هو وآل بيته إلا الأسودان: التمر والماء.
তিনি এক দুই মাস কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু তাঁর ও তাঁর পরিবারের জীবন ধারণের জন্য দুই কাল বস্তু তথা খেজুর ও পানি ব্যতীত কিছুই জুটতো না। ১৪৩
এত স্বল্প খাবার ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের পরেও কখনো তিনি আল্লাহ তা'আলার নাশুকরি করেননি। বরং সর্বদাই তিনি আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করেছেন। খাবার যেমনই হোক তিনি তা খেয়ে নিতেন অতঃপর আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করে খাবার প্রস্তুতকারীর শুকরিয়া আদায় করতেন। তিনি কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। খাবার খারাপ হলে খাবার প্রস্তুতকারীকে তিরস্কারও করতেন না। কারণ খাবার প্রস্তুত করাটা একট শিল্প বা ইজতেহাদি বিষয় এতে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং তিনি কখনো খাবার প্রস্তুতকারীকে তিরস্কার করতেন না। উপস্থিত খাবার ফেরৎ দিতেন না এবং যা নেই তা তালাশ করতেন না। তিনি হলেন উম্মতের নবী। তাঁর চিন্তা চেতনা বা টার্গেট কখনই পেট আর পেট ভরার বস্তু নিয়ে ছিলো না।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما عاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - طعاما قط إن اشتهاه أكله وإن كرهه تركه.
রাসূলুল্লাহ কখনো খাবারের দোষ বর্ণনা করতেন না, যদি তাঁর ভালো লাগতো তাহলে খেতেন আর না লাগলে খেতেন না। ১৪৪
প্রিয় ভাই! যারা খানা-পিনার বিলাসিতায় পড়ে গেছে, তাদের জন্য শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কথাকে সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করছি।
খাদ্য ও পোশাকের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শই হলো সর্বোত্তম আদর্শ। খাদ্যের ব্যাপারে তাঁর আদর্শ হলো, ভালো লাগলে পরিমিত খেতেন। উপস্থিত কোন খাবার ফেরত দিতেন না এবং যা নেই তা কখনো অনুসন্ধান করতেন না। যদি রুটি ও গোশত উপস্থিত হতো তাহলে তাই খেতেন, আবার যদি ফল, উপস্থিত হতো তাহলেও তাই খেতেন। আবার যদি কখনো শুধু রুটি বা শুধু খেজুর উপস্থিত হতো তাহলেও সেটাই খেতেন। তাঁর কাছে দুই প্রকার খাবার আনা হলে তিনি এ কথা বলতেন না যে, আমি দুই প্রকার খাদ্য গ্রহণ করবো না। আর মজাদার ও মিষ্টি খাদ্য গ্রহণ করা থেকেও তিনি বিরত হতেন না। হাদীসে এসেছে, নবী কারীম বলেন:
لكني أصوم وأفطر، وأقوم وأنام، وأتزوج النساء وآكل اللحم فمن رغب عن سنتي فليس مني
কিন্তু আমি কখনো রোযা রাখি, আবার কখনো রোযা ছেড়েও দেই। রাত্রে কিছু অংশ জেগে ইবাদাত করি ও কিছু অংশে ঘুমাই, আমি তো বিবাহ করেছি এবং গোশতও ভক্ষণ করে থাকি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ থাকবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৪৫
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা পবিত্র খাবার গ্রহণ এবং এজন্য শুকরিয়া আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং যে পবিত্র বস্তুকে হারাম করলো সে হলো সীমালঙ্ঘণকারী আর যে শুকরিয়া আদায় করলো না সে আল্লাহর হক নষ্টকারী।
খাবারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পন্থাই হলো সঠিক ও সরল পন্থা। আর এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ দু'টি ভ্রান্ত পথে চলতে থাকে।
১. অপচয় আর নিজের নফসানি খায়েশাত পূর্ণ করার পথ।
২. আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম করে, বৈরাগ্যতা সৃষ্টির পথ। আর ইসলামে কোন বৈরাগ্যতা নেই।
এর পর শাইখুল ইসলাম রা. বলেন, প্রতিটি হালালই পবিত্র, আর প্রতিটি পবিত্র জিনিসই হালাল। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা আমাদেরকে পবিত্র খাবার গ্রহণ করতে বলেছেন আর খাবায়েছ তথা অপবিত্র খাবার গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। আর পবিত্র খাবার হলো উপকারী ও সুস্বাদু। আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষয় হারাম। আমাদের দেহের জন্য উপকারী বিষয়কেই আমাদের জন্য হালাল করেছেন।
খাবার ও পোশাক, ক্ষুধা ও তৃপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। এমনকি এগুলোর ক্ষেত্রে কখনো কখনো একেক জনের অবস্থাও একেক রকম হয়ে থাকে। তবে সর্বোত্তম আমল হলো যার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে এবং তা ব্যক্তির জন্যও উপকারী। ১৪৬
টিকাঃ
১৩৫ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৫৬
১৩৬ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০
১৩৭ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০
১৩৮ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৬০
১৩৯ বুখারি, হাদিস: ১৪৩০
১৪০ মুসলিম, হাদিস: ২৩১২
১৪১ বুখারী, হাদিস: ৬৪৫০
১৪২ তিরমিযি, হাদিস: ৭৩৪
১৪৩ বুখারী, হাদিস: ২৫৬৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৭২
১৪৪ বুখারী, হাদিস: ৩৫৩৬; মুসলিম, হাদিস: ২০৬৪
১৪৫ মুসলিম, হাদিস: ১৪০১; নাসায়ী, হাদিস: ৩২১৭
১৪৬ মাজমুউল ফাতাওয়া ২২/৩১০ সংক্ষেপিত
📄 অন্যের সম্মান রক্ষা করা
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মজলিস হলো ইলম ও জিকিরের মজলিস। আর সেই মজলিসে যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ উপস্থিত থেকে ইলম শিক্ষা দেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন তাহলে সেই মজলিসের মান ও উচ্চতা হবে কত!
রাসূল ﷺ এর মজলিসের বিশুদ্ধতা ও তাঁর নির্মল চরিত্রের প্রমাণই হলো, তিনি ভুলকারীকে সংশোধন করতেন, অজ্ঞকে শিক্ষা দিতেন, উদাসীন-গাফেলকে সতর্ক করতেন। তাঁর উত্তম কথা ও কর্মই তাঁর মজলিসে গ্রহণযোগ্যতা পেতো। কেউ কথা বললে মনযোগ সহকারে তিনি তার কথা শুনতেন। তবে তিনি কখনই গিবত, চুগলখুরী, ও অন্যের অপবাদ দেওয়া মেনে নিতেন না। তিনি সর্বদাই অন্যের সম্মান রক্ষা করতেন। তার সামনে কারো সম্মান নষ্ট হওয়াকে তিনি মেনে নিতেন না।
আতবান ইবনে মালেক রা, হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
قام النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي فقال: «أين مالك بن الدخشم»؟ فقال رجل: ذلك منافق لا يحب الله ولا رسوله، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «لا تفعل ذلك، ألا تراه قد قال لا إله إلا الله يريد بذلك وجه الله، وإن الله قد حرم على النار من قال: لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে বললেন, মালেক ইবনুদ দাখশাম কোথায়? তখন এক লোক বলল, সে তো মুনাফিক। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পছন্দ করে না। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমনটি করো না। তুমি কি দেখ না যে, সে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করেছে! আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবুদ নেই") পাঠ করবে! আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দেন। ১৪৭
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এবং অন্যের অধিকার খর্ব করার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন:
ألا أنبئكم بأكبر الكبائر؟ قلنا : بلى يا رسول الله، قال: «الإشراك بالله، وعقوق الوالدين وكان متكئا فجلس فقال: «ألا وقول الزور» فما زال يكررها حتى قلنا ليته سكت.
আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গোনাহ সম্পর্কে বলবো না? আমরা বললাম, নিশ্চয়ই বলবেন, হে আল্লাহর রাসূল ! তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, অতঃপর সোজা হয়ে বসে বললেন, মিথ্যা কথা থেকে সাবধান থাকবে। তিনি একথা বার বার বলছিলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা (মনেমনে) বললাম, এখন যদি তিনি চুপ হতেন। ১৪৮
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.কে তিনি অত্যন্ত মুহাব্বত করা সত্তেও, গিবতের ব্যাপারে তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং এর ভয়াবহ বিপদের কথা তার সামনে স্পষ্ট করে বলেছেন।
আয়েশা রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
قلت للنبي - صلى الله عليه وسلم - حسبك من صفية كذا وكذا، قال بعض الرواة: تعني قصرها، فقالت: «لقد قلت كلمة لو مزجت بماء البحر المزجته
আমি নবী কারীম কে বললাম, আপনার জন্য তো এমন সফিয়্যাই যথেষ্ট। কোন কোন রাবী বলেন, এর মাধ্যমে তিনি তার খাটো হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তখন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই তুমি এমন কথা বলেছো, তা যদি সাগরের পানির সাথে মেশানো হতো তাহলে তা এর পানিকে পরিবর্তন করে দিতো। ১৪৯
যারা তার অন্য ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করবে তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من ذب عن عرض أخيه بالغيبة كان حقا على الله أن يعتقه من النار
যে ব্যক্তি অপর ভাইয়ের গীবত দমন করে তার সম্মান রক্ষা করলো, আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। ১৫০
টিকাঃ
১৪৭ বুখারী, হাদিস: ৫৪০১; মুসলিম, হাদিস: ৩৩
১৪৮ বুখারী, হাদিস: ২৬৫৪
১৪৯ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৫
১৫০ আহমাদ, হাদিস: ২৭৬০৯
📄 জিকিরের বর্ণনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ অধিক পরিমাণে আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। এই উম্মতের প্রধান মুরব্বি ও শিক্ষক নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক পরিমাণে আল্লাহর ইবাদত করতেন। আল্লাহ তা'আলার সাথে তার আত্মার সম্পর্ক ছিলো সার্বক্ষণিক সুদৃঢ়। কোন একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর জিকির, হামদ ও ছানা পড়া থেকে খালি যেতো না। অথচ তাঁর পূর্ব-পর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিলো। তিনি ছিলেন একজন চিরকৃতজ্ঞ বান্দা। শুকরিয়া আদায়কারী নবী এবং প্রশংসাকারী রাসূল। তিনি যথাযথভাবে তাঁর রবকে চিনতেন। এজন্য সর্বদাই তাঁর হামদ, ছানা ও জিকিরে মাশগুল থাকতেন। একটি মুহূর্তও তাঁর আল্লাহর আনুগত্য ব্যতীত কাটতো না। তিনি সময়ের মূল্য সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ অবগত। আর একারণেই প্রতিটি মুহূর্তই তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের ইবাদাত বন্দেগীতে কাটাতেন।
হাদিস শরীফে এসেছে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يذكر الله تعالى على كل أحيانه
রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা আল্লাহ তা'আলার জিকির করতেন। ১৫১
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫২
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
والله إني لأستغفر الله وأتوب إليه في اليوم أكثر من سبعين مرة
আল্লাহর শপথ করে বলছি, নিশ্চয় আমি দৈনিক ৭০ বারেরও বেশী আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তেগফার করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি। ১৫৩
ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক মজলিসেই একশত বার গণনা করতাম রাসূল ﷺ বলছেন,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমার রব ! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনিই তাওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। ১৫৪
উম্মুল মুমিনীন ইম্মে সলামা রা. বলেন, রাসূল ﷺ যখন তাঁর নিকট থাকতেন তখন বেশি বেশি এই দো'আ পড়তেন,
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
হে অন্তর সমূহকে পরিবর্তণকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির করে দিন। ১৫৫
টিকাঃ
১৫১ মুসলিম, হাদিস: ৩৭৩
১৫২ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৩ বুখারী, হাদিস: ৬৩০৭
১৫৪ আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬
১৫৫ তিরমিযী, হাদিস: ২১৪০