📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি

📄 হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি


হাদিয়া আদান-প্রদান এবং মেহমানদারি অনেক বড় ও মহৎ গুণ, যা আত্মীয়তার বন্ধনকে মজবুত করে। বন্ধুত্বকে করে সুদৃঢ় এবং সামাজিক সৌহার্দ্য সৃষ্টিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি ছিল আমাদের নবীজীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নবীজীর উপর সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর যখন তিনি হয়রান ও পেরেশান হয়ে খাদিজা রা.-এর কাছে আসলেন তখন খাদিজা রা. তাঁকে সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন না। এরপর নবীজীর যে উত্তম গুণাবলীর উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিলো وَتَقْرِي الضَّيْفَ 'আপনি তো মেহমানের সমাদর করেন'।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
أن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان يقبل الهدية ويثيب عليها
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। ১০৭

হাদিয়া দেয়া-নেয়া এবং এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলো উদারতা, বদান্যতা এবং স্বচ্ছ ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ।

হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি আম্বিয়া আ: দের চরিত্র এবং তাদের মহান আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। আর এক্ষেত্রে আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছিলেন অগ্রগণ্য।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليكرم ضيفه جائزته يوم وليلة، والضيافة ثلاثة أيام فما بعد ذلك فهو صدقة ولا يحل له أن يثوي عنده حتى يحرجه
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। মেহমানের পারিতোষিক (বিশেষ মেহমানদারি) এক দিন ও এক রাত। (স্বাভাবিক) মেহমানদারি তিন দিন। এর অতিরিক্ত মেহমানদারি সদকাস্বরূপ। মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে সে মেহমান হতে হতে মেজবানকে বিরক্ত করে ফেলবে। ১০৮

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يُضِيفُ
যে মেহমানদারি করে না তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। ১০৯

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে নিয়ে অতীত বা বর্তমান কালে কোন দেশ, ভূমি বা জাতি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মত এমন অনুপম আদর্শ ও মহান চরিত্রের অধিকারী কাউকে দেখেনি। প্রিয় পাঠক! তুমি নিম্নে বর্ণিত হাদিসটি পড়ো ও কল্পনার জগতে সেই দৃশ্যটি দেখার চেষ্টা করো এবং তোমার চক্ষুদ্বয় শীতল করো।

আবু হাজেম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
جَاءَتِ امْرَأَةُ بِبُرْدَةٍ - قَالَ أَتَدْرُونَ مَا الْبُرْدَةُ فَقِيلَ لَهُ نَعَمْ، هِيَ الشَّمْلَةُ، مَنْسُوجٌ فِي حَاشِيَتِهَا - قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي نَسَجْتُ هَذِهِ بِيَدِي أَكْسُوكَهَا. فَأَخَذَهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مُحْتَاجًا إِلَيْهَا. فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَإِنَّهَا إِزَارُهُ. فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ يَا رَسُولَ اللَّهِ، اكْسُنِيهَا، فَقَالَ " نَعَمْ ". فَجَلَسَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم في الْمَجْلِسِ، ثُمَّ رَجَعَ فَطَوَاهَا، ثُمَّ أَرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِ. فَقَالَ لَهُ الْقَوْمُ مَا أَحْسَنْتَ، سَأَلْتَهَا إِيَّاهُ، لَقَدْ عَلِمْتَ أَنَّهُ لَا يَرُدُّ سَائِلاً. فَقَالَ الرَّجُلُ وَاللَّهِ مَا سَأَلْتُهُ إِلَّا لِتَكُونَ كَفَنِي يَوْمَ أَمُوتُ. قَالَ سَهْلُ فَكَانَتْ كَفَنَهُ.

এক মহিলা একটি বুরদা আনলেন। সাহল (রাঃ) বললেন, তোমরা জানো বুরদা কি? তাকে বলা হয়, হ্যাঁ। তা হলো এমন চাঁদর, যার পাড় বুনানো। মহিলা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে পরিধান করানোর জন্য আমি এটি নিজ হাতে বুনে নিয়ে এসেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন এবং তাঁর এর প্রয়োজন ছিলো। তারপর তিনি তা লুঙ্গির মত পরিধান করে আমাদের সামনে এলেন। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তা আমাকে পরিধান করতে দিন। তিনি বললেন, আচ্ছা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষন মজলিসে বসে থেকে পরে ফিরে গেলেন। তারপর চাঁদরটি ভাঁজ করে সেই লোকটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। লোকজন সে ব্যক্তিকে বললো, তুমি ভালো কাজ করোনি, তুমি তাঁর কাছে চাঁদরটি চেয়ে ফেললে, অথচ তুমি জানো যে, তিনি কোন সাওয়ালকারীকে ফিরিয়ে দেন না। সে লোকটি বললো, মহান আল্লাহ্ তা'আলার কসম, আমি চাদরটি এ জন্যই সাওয়াল করেছি যে, তা যাতে আমার মৃত্যুর পর আমার কাফন হয়। রাবী সাহল (রাঃ) বলেন, সেটি তার কাফন হয়েছিলো। ১১০

আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যাকে নির্বাচন করেছেন তাঁর রাসূল ও প্রতিনিধি হিসেবে এবং যাকে বানিয়েছেন মানুষের পথপ্রদর্শক ও তাদের জন্য উত্তম আদর্শ, তাঁর উত্তম চরিত্র দেখে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। বরং তাঁর আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তার অনুসরণ করো তাহলে তুমি ধন্য দুনিয়া ও আখেরাতে। দানশীলতা ও বদান্যতায় রাসূলুল্লাহ ছিলেন এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। হাকীম বিন হিযাম রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:

سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَعْطَانِي، ثُمَّ سَأَلْتُهُ فَأَعْطَانِي ثُمَّ قَالَ لِي "يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرُ حُلْو، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى ". قَالَ حَكِيمٌ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَا أَرْزَأُ أَحَدًا بَعْدَكَ شَيْئًا حَتَّى أُفَارِقَ الدُّنْيَا، فَكَانَ أَبُو بَكْرٍ يَدْعُو حَكِيمًا لِيُعْطِيَهُ الْعَطَاءَ فَيَأْبَى أَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ شَيْئًا، ثُمَّ إِنَّ عُمَرَ دَعَاهُ لِيُعْطِيَهُ فَيَأْبَى أَنْ يَقْبَلَهُ فَقَالَ يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ، إِنِّي أَعْرِضُ عَلَيْهِ حَقَّهُ الَّذِي قَسَمَ اللَّهُ لَهُ مِنْ هَذَا الْفَيْءِ فَيَأْبَى أَنْ يَأْخُذَهُ. فَلَمْ يَرْزَأُ حَكِيمُ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ بَعْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حَتَّى تُوُفِّيَ رَحِمَهُ اللَّهُ.

আল্লাহর রাসূল ﷺ এর নিকট আমি সওয়াল করলাম, তিনি আমাকে দান করলেন। আবার সওয়াল করলাম, তিনি আমাকে দান করলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, 'হে হাকীম! এই ধন সম্পদ সবুজ-শ্যামল, মধুর। যে ব্যক্তি দানশীলতার মনোভাব নিয়ে তা গ্রহণ করবে, তাতে তার বরকত হবে। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে, নফসের চাহিদার জন্য তাতে তার বরকত হবে না। সে ঐ ব্যক্তির মত যে খায়; কিন্তু তৃপ্ত হয় না। উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।' হাকীম (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আপনার পরে আমি দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগে আর কারো কাছে কিছু চাইব না। অতঃপর আবু বকর (রাঃ) কিছু দান করার জন্য হাকীমকে আহ্বান করেন, কিন্তু হাকীম (রাঃ) তাঁর নিকট হতে কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। অতঃপর 'উমর (রাঃ) -ও হাকীম (রাঃ)-কে কিছু দান করার জন্য ডেকে পাঠান, কিন্তু তাঁর কাছ থেকেও কিছু গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকার করেন। তখন 'উমর (রাঃ) বলেন, হে মুসলিম সমাজ! আমি আল্লাহ প্রদত্ত গনীমতের মাল থেকে প্রাপ্য তাঁর অংশ তাঁর সামনে পেশ করেছি, কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছেন; হাকীম (রাঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে আর কারো নিকট কিছু চাননি। ১১১

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
ما سئل النبي - صلى الله عليه وسلم - عن شيء قط فقال، لا.
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কোন কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো না করতেন না। ১১২

প্রিয় পাঠক! তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মত দানশীলতা, বদান্যতা ও উত্তম চরিত্রের কোন নজির খুঁজে পাবে না। তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দানশীল এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাঁর ঠোঁটে সর্বদা মিষ্টি হাসি লেগেই থাকতো। তিনি যার সাথে কথা বলতেন সেই মনে করতো যে, পৃথিবীতে রাসূল ﷺ তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। জারির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما حجبني رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ولا رآني منذ أسلمت إلا تبسم
আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ যখনই আমার থেকে আড়াল হয়েছেন এবং আমাকে দেখেছেন তখনই তিনি মুচকি হাসি দিয়েছেন। ১১৩

আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما رأيت أحدًا أكثر تبسما من رسول الله - صلى الله عليه وسلم -
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ চেয়ে অধিক মুচকি হাসি আর কারো মধ্যে দেখিনি। ১১৪

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وتبسمك في وجه أخيك صدقة
“হাস্যোজ্জ্বল মুখে তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করাটাও সাদকাহ”। ১১৫

রাসূল ﷺ এর খাদেম আনাস রা. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গুণ বর্ণনা করে বলেন,
أشد الناس لطفا فما سأله سائل قط إلا أصغى إليه فلا ينصرف رسول الله - صلى الله عليه وسلم - حتى يكون السائل هو الذي ينصرف وما تناول أحد يده قط إلا ناوله إياها فلا ينزع - صلى الله عليه وسلم - يده حتى يكون الرجل هو الذي ينزعها منها
“রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনয়ী। তাঁকে কেউ কোন প্রশ্ন করলে, তিনি তার দিকে মনযোগী হতেন। প্রশ্নকারী প্রস্থান করার পূর্বে তিনি প্রস্থান করতেন না। এবং কেউ তাঁর হাত ধরলে, সে লোক নিজ হাত টেনে সরিয়ে নেয়ার পূর্বে তিনি নিজ হাত সরিয়ে নিতেন না। ১১৬

প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এই বিনয়, অতিথি পরায়ণতা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর এমন দরদ ও ভালোবাসার কারণেই তিনি তাদের মধ্যে কখনো শরীয়ত বিরুদ্ধ কাজ সহ্য করতেন না। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত এই হাদিস এর প্রমাণ। তিনি বলেন,
أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - رأى خاتما من ذهب في يد رجل فنزعه فطرحه، وقال: «يعمد أحدكم إلى جمرة من نار فيجعلها في يده
একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ এক লোকের হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তা খুলে ফেলে দিলেন এবং বললেন, তোমাদের কেউ কি ইচ্ছা করে নিজ হতে আগুনের জ্বলন্ত আঙ্গার রাখবে? ১১৭

টিকাঃ
১০৭ বুখারী, হাদিস: ২৫৮৫
১০৮ বুখারী, হাদিস: ৬১৩৫; মুসলিম, হাদিস: ৪৮
১০৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪
১১০ বুখারী, হাদিস: ১২৭৭
১১১ বুখারী, হাদিস: ২৭৫০; মুসলিম, হাদিস: ১০৫২
১১২ বুখারী, হাদিস: ৬০৩৪
১১৩ বুখারী, হাদিস: ৩০৩৫
১১৪ তিরমিযী, হাদিস: ৩৬৪১
১১৫ তিরমিযী, হাদিস: ১৯৫৬
১১৬ আবু নাঈম ফিদ দালায়েল
১১৭ মুসলিম, হাদিস: ২০৯০

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 শিশুদের প্রতি দয়া

📄 শিশুদের প্রতি দয়া


যাদের হৃদয় কঠোর এবং যাদেও হৃদয়ে নেই কোন ভালোবাসা বা অবেগ- অনুভূতি তারা শক্ত পাথরের মত, তাদের হৃদয়ে দয়া ভালোবাসা বলতে কিছু নেই। দেয়া নেয়ার ক্ষেত্রে তারা রুক্ষ, অবেগ অনুভূতি ও ভালোবাসা বিনিময়ে তারা কৃপণ। অন্য দিকে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যাকে দয়া করে একটি সুন্দর হৃদয় দান করেছেন, এবং দয়া ভালোবাসা দিয়ে তাকে পূর্ণ করেছেন কেবল সে- ই নরম ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে পারে। তাদের অন্তর আবেগ অনুভূতি ও দয়া-ভালোবাসায় পূর্ণ থাকে। আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর হৃদয় ছিলো কোমল এবং দয়া ও ভালোবাসায় ছিলো পূর্ণ। আনাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
أن النبي - صلى الله عليه وسلم - أخذ ولده إبراهيم فقبله وشمه
নবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ছেলে ইব্রাহীমকে কোলে নিয়ে চুমু দিয়েছেন এবং তার [আরবের রীতি অনুযায়ী] ঘ্রাণ নিয়েছেন। ১১৮

বর্তমানে আমাদের মত নবী কারীম শুধুমাত্র নিজ পরিবারের শিশুদের প্রতি নরমদিল ও কোমল ছিলেন না। বরং তাঁর ভালোবাসা ছিলো সকল মুসলিম শিশুদের প্রতি সমান। তিনি শিশুদের মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে তাদের কোলে তুলে নিতেন। মিষ্টি ভাষায় কথা বলতেন এবং আদর করতেন। তাদের সাথে কখনো কঠোর আচরণ করতেন না।

জাফর রা. এর স্ত্রী আসমা বিনতে ওমাইস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
دخل علي رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فدعا بني جعفر فرأيته شمهم، وذرفت عيناه، فقلت: يا رسول الله، أبلغك عن جعفر شيء؟ قال: «نعم، قتل اليوم» فقمنا نبكي ورجع فقال: «اصنعوا لآل جعفر طعامًا فإنه قد جاء ما يشغلهم
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার বাড়িতে আসলেন এবং জাফরের সন্তানদের ডাকলেন। আমি দেখলাম তিনি তাদেরকে চুমু দিয়ে ঘ্রাণ নিলেন, আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাফর সম্পর্কে আপনার নিকট কি কোন সংবাদ এসেছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, সে আজ নিহত হয়েছে। তখন আমরাও কাঁদতে লাগলাম। আর তিনি চলে গিয়ে মানুষদের বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করো কেননা তারা শোকাহত। ১১৯

তাদের মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহﷺ এর দুচোখ থেকে যাখন অশ্রু ঝরছিল তখন সা'দ ইবনে উবাদা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কি!! আপনিও কাঁদছেন। রাসূল তখন বললেন,
هذه رحمة جعلها الله في قلوب عباده، وإنما يرحم الله من عباده الرحماء
এটাই দয়া, যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের হৃদয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর দয়াশীল বান্দাদের দয়া করেন। ১২০

আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. যখন দেখলেন, ছেলে ইবরাহীমের মৃত্যুতে নবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুচোখ থেকে অশ্রু পড়ছে তখন তিনি তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কাঁদছেন? তখন তিনি বললেন,
يا ابن عوف، إنها رحمة ثم أتبعها بأخرى وقال: إن العين تدمع والقلب يحزن، ولا نقول إلا ما يرضي ربنا، وإنا لفراقك يا إبراهيم لمحزنون.
ইবনে আউফ! এটা দয়া। অতঃপর তিনি আবার কাঁদলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই চোখ অশ্রু প্রবাহিত করে, অন্তর ব্যথিত হয় কিন্তু আমরা আমদের রবের অসন্তুষ্টি মূলক কিছু বলি না। (অতঃপর বললেন) ইবরাহীম ! তোমার বিচ্ছেদে আমারা ব্যথিত। ১২১

আমরা যারা তাঁর উম্মত হওয়ার দাবি করি আমাদের উপর কর্তব্য ও আবশ্যক হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতিটি সুন্নাহ সম্পর্কে জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। রাসূলুল্লাহ এর মহান আদর্শে আদর্শবান হওয়ার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কিন্তু আফসোস আমরা বর্তমানে অন্যান্য সুন্নতের মত এই সুন্নতটি তথা ছোটদের প্রতি দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার সুন্নত থেকে অনেক দূরে। ছোটদের প্রতি কোমলতা ও সুন্দর আচরণের পরিবর্তে আমরা তাদের সাথে কঠোরতা ও কর্কশ ব্যবহার করে থাকি, কথায় কথায় তাদের ধমক দেই। কিন্তু একবারও ভাবি না যে, আজকে যারা ছোট তারাই তো আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, জাতির কর্ণধার তাদের হাত ধরেই আসবে ইসলামের নতুন প্রভাত।

শিশুদের প্রতি কঠোর আচরণ একদিকে যেমন আমাদের মূর্খতা, স্বল্প বুদ্ধি ও বিবেক হীনতার পরিচয় অন্য দিকে এর মাধ্যমে শিশুদের কোমল হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া হয় এবং তাদের হৃদয়ের প্রশস্ততার সামনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। শিশুদের সাথে খারাপ আচরণ করা স্পষ্ট সুন্নতেরও খেলাপ। কারণ আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের ভালোবাসতেন তাদের আদর করতেন এবং তাদের সাথে কখনো কখনো হাসি ঠাট্টাও করতেন।

আনাস রা. যখন শিশুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তখন তিনি তাদের সালাম দিতেন এবং বলতেন,
كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يفعله
নবী কারীম এমনটি করতেন। ১২১

স্বভাবগত ভাবেই শিশুরা হয়ে থাকে চঞ্চল প্রকৃতির। হুড়োহুড়ি দৌড়াদৌড়ি এটা তাদের স্বভাবেরই অংশ। যা অনেক ক্ষেত্রেই বড়দের জন্য বিরক্তিকর। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের এই স্বাভাবিক চঞ্চলতায় বিরক্ত হতেন না। তাদের ধমক দিতেন না। বরং তিনি তাদেরকে আদর করে কাছে ডেকে নিতেন এবং আদর করে দিতেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يؤتى بالصبيان فيدعو لهم فأتي بصبي قبال على ثوبه فدعا بماء فأتبعه إياه ولم يغسله
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আসা হতো। তিনি তাদের জন্য দো'আ করে দিতেন। একবার তাঁর কাছে এক বাচ্চা ছেলে আনা হলে, সে তাঁর কাপড়ে পেশাব করে দিল। তখন তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন। অতঃপর তিনি তা পেশাবের স্থানে ঢেলে দিলেন, (শিশু ছেলেটাকে রেখে) তাড়াহুড়া করে প্রথমে নিজের কাপড় ধৌত করতে লেগে যান নি। ১২২

প্রিয় পাঠক! তুমি তো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘরে প্রবেশ করলে, সেখানে কিছু সময় অবস্থান করলে এবং দেখলে যে, শিশুদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ কেমন ছিলো! এর পরও কি তুমি ছোটদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে না, তাদের সাথে হাসি ঠাট্টা করবে না? তাদের সুন্দর সুন্দর বিরক্তিকর প্রশ্নের ক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে কোমলভাবে উত্তর দিবে না! অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ শিশুদের সাথে হাসি ঠাট্টা করতেন তাদের সাথে মজা করে তাদের আদর করতেন।

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ليدلع لسانه للحسن بن علي، فيرى الصبي حمرة لسانه، فيهش له
রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ইবনে আলীর জন্য তাঁর জিহ্বা বের করতেন, ছোট ছেলে জিহ্বার লালিমা দেখে প্রফুল্ল হয়ে যেত। ১২৩

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يلاعب زينب بنت أم سلمة، وهو يقول: يا زوینب یا زوينب مرارا
রাসূলুল্লাহ যায়নাব বিনতে উম্মে সালমাকে নিয়ে খেলা করতেন আর বারবার তাকে বলতেন, হে যুয়াইনাব! হে যুয়াইনাব! ১২৪

বাচ্চাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ এর আদর ও স্নেহ এতটাই গভীর ছিলো যে, তিনি কখনো কখনো মাহান রবের ইবাদত করার সময় তাদেরকে কাছে রাখতেন। যেমন মেয়ে যায়নাবের কন্যা উমামাকে কোলে নিয়ে নামাযে দাঁড়াতেন। সিজদা করার সময় তাকে পাশে রেখে সিজদা করতেন।[বুখারী ও মুসলিম] মাহমুদ ইবনুর রবী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
عقلت من رسول الله - صلى الله عليه وسلم - مجة مجها في وجهي من دلو، من بئر كانت في دارنا، وأنا ابن خمس سنين
আমার মনে পড়ে, আমাদের বাড়িতে একটি কুয়া ছিলো, তার বালতি থেকে মুখে পানি নিয়ে রাসূলুল্লাহ আমার চেহারার উপর ছিটিয়ে দিয়ে ছিলেন। তখন আমার বয়স ছিলো পাঁচ বছর। ১২৫

রাসূলুল্লাহ শুধুমাত্র বড়দেরই শিক্ষা দিতেন না বরং তিনি যেমন বড়দের শিক্ষা দিতেন তেমন ছেটদেরও শিক্ষা দিতেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ এর পিছনে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন,
يا غلام إني أعلمك كلمات: احفظ الله يحفظك، احفظ الله تجده تجاهك، إذا سألت فاسأل الله وإذا استعنت فاستعن بالله
বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি বিষয় শিক্ষা দিচ্ছি। তুমি আল্লাহর বিধানের হেফাজত করো (আল্লাহর সকল বিধানগুলো মেনে চলো), তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে হেফাজত করবেন। তুমি আল্লাহর বিধানের হেফাজত করো তাহলে তুমি আল্লাহ তা'আলাকে তোমার পাশে পাবে। তুমি কিছু চাইলে তা আল্লাহ তা'আলার নিকট চাও। সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য চাও। ১২৬

প্রিয় ভাই! রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সীরাত ও তাঁর মহান আদর্শ আমরা জানবো এবং সে অনুযায়ী আমল করে আমাদের জীবনকে সাজাবো। আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে সুন্নতের উপর আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবো। বিশেষ করে শিশুদের সাথে কোমল আচরণ করে তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে আগামী দিনের ইসলামের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলবো।

টিকাঃ
১১৮ ইবনে সাআদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ
১১৯ বুখারী, হাদিস: ১২৮৪
১২০ বুখারী, হাদিস: ১৩০৩
১২১ বুখারী, হাদিস: ৬২৪৭
১২২ বুখারী, হাদিস: ৬৩৫৫
১২৩ সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদিস নং ৭০
১২৪[আহাদীসুস সহীহাহ ২৪১৪, সহীহুল জামে ৫০]
১২৫ বুখারী, হাদিস: ৭৭
১২৬ তিরমিযী, হাদিস: ২৫১৬

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 ধৈর্য নম্রতা ও সহনশীলতা

📄 ধৈর্য নম্রতা ও সহনশীলতা


ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই আমদের নবীর আগমণ। তিনি পৃথিবীতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বঞ্চিতের হক ফিরিয়ে দিয়েছেন। মানুষের সাথে কোমল ও নম্র আচরণ করেছেন। নিজের ব্যক্তিগত কারণে কখনো কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। নিজের প্রতি শত অত্যাচার ও কষ্ট প্রধানের ক্ষেত্রে তিনি সহনশীলতা ও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ কঠোরতা ও জোর-জবরদস্তি করে অধিকার আদায় করা, জালেম ও অত্যাচারীর চরিত্র। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তো রহমাতুললিল আলামীন, তিনি কখনো করো প্রতি জুলুম করেননি, কারো হক নষ্ট করেননি। বরং তাঁর প্রতি যারা খারাপ আচরণ করেছে, তাঁর সাথে অন্যায়ভাবে কঠোরতা করেছে, তিনি ছিলেন তাদের প্রতি সদয়, নম্র এবং ধৈর্যশীল ও সহনশীল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - شيئًا قط بيده، ولا امرأة ولا خادمًا إلا أن يجاهد في سبيل الله، وما نيل منه شيء قط فينتقم من صاحبه إلا أن ينتهك شيء من محارم الله تعالى فينتقم الله تعالى
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত, রাসূলুল্লাহ কখনো কারো গায়ে হাত তুলেননি। তিনি কখনো তাঁর কোন স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেননি এবং কোন খাদেমকে প্রহার করেননি। তিনি ব্যক্তিগত কারণে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে কেউ যদি আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘণ করেছে তাহলে তিনি আল্লাহ তা'আলর জন্য তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। ১২৭

আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন
كنت أمشي مع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وعليه برد نجراني غليظ الحاشية، فأدركه أعرابي، فجبذه بردائه جبذة شديدة، فنظرت إلى صفحة عاتق النبي - صلى الله عليه وسلم - وقد أثرت بها حاشية الرداء من شدة جبذته، ثم قال: «يا محمد، مرلي من مال الله الذي عندك فالتفت إليه، فضحك ثم أمر له بعط
একবার আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে হাঁটছিলাম, তখন তাঁর গায়ে ছিল মোটা ঝালর বিশিষ্ট একটি নাজরানী চাদর। তখন এক বেদুঈন তাঁর নিকট এসে তাঁর চাদর ধরে অনেক জোরে এক টান দিল। আমি তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখি, এতো জোরে টানের কারণে চাদরের ঝালর তাঁর কাধে দাগ ফেলে দিয়েছে। অতঃপর লোকটি বলল, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তা'আলার যেই সম্পদ তোমার কাছে আছে সেখান থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার আদেশ করো। তখন রাসূল ﷺ হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু দানের আদেশ দিলেন। ১২৮

রাসূল ﷺ হুনাইনের যুদ্ধ থেকে ফেরার সময়, কয়েকজন বেদুইন তাঁর অনুসরণ করলো এবং তাঁর নিকট চাইতে থাকলো। অতঃপর তারা তাঁকে একটি গাছের দিকে নিয়ে এবং সওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায়ই তাঁর গায়ের চাদর টেনে নিয়ে গেলো। তখন তিনি বললেন,
ردوا علي ردائي، أتخشون علي البخل ؟ فقال: فوالله لو كان لي عدد هذه العضاة نعما لقسمته بينكم، ثم لا تجدوني بخيلاً ولا جبانا ولا كذابًا
তোমরা আমার চদর ফিরিয়ে দাও। তোমরা কি আমার উপর কৃপণতার ভয় করছো? অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার নিকট যদি এই গাছ পরিমাণ পশুও থাকতো তাহলে আমি তা তোমাদের মধ্যে বন্টণ করে দিতাম। এরপর তোমরা আমকে না কৃপণ, না কাপুরুষ, না মিথ্যাবাদী মনে করতে। ১২৯

প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ ছিলো, কোমল ও সহনশীল। তিনি প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই কল্যাণ ও অকল্যাণের দিকটার প্রতি লক্ষ্য করে কল্যাণের দিকটা প্রাধান্য দিতেন।

লক্ষ করুন, বেদুঈন লোকটি যখন ভুল করে মসজিদে পেশাব করলো আর সাহাবায়ে কেরামগণ রা. ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে বাধা দেওয়ার জন্য তেড়ে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবাদের এমনটি করতে নিষেধ করলেন। করণ লোকটি ছিলো অজ্ঞ, সে মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে জানতো না। অন্য দিকে ঐঅবস্থায় তাকে বাঁধা দেওয়া হলে তার শারীরিক সমস্যার আশংকা ছিলো। সাথে সাথে সাহাবীদের এমন কঠিন আচরণ দেখে সে ইসলাম গ্রহণ না করে হয়তো চলে যেতো। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
بال أعرابي في المسجد فقام الناس إليه ليقعوا فيه، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «دعوه وأريقوا على بوله سجلاً من ماء، أو ذنوبا من ماء، فإنما بعثتم ميسرين، ولم تبعثوا معسرين.
এক গ্রাম্য বেদুঈন মসজিদের ভিতরে পেশাব করে দিলো। তখন উপস্থিত লোকেরা তাকে বাধা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও। এবং তার পেশাবের উপর এক বালতি বা কয়েক বালতি পানি ঢেলে দাও। নিশ্চয়ই তোমরা তো সহজতার জন্যই প্রেরিত হয়েছো, কঠোরতা করার জন্য প্রেরিত হওনি। ১৩০

রাসূলুল্লাহ এর অনুসারী দাবিদারকে অবশ্যই নিজেদের নফসের অনুসরণ বাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ এর অনুসরণ করতে হবে এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর মত ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে হবে। হাদিস শরীফে এসেছে
عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ حَدَّثَنِي عُرْوَةُ، أَنَّ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها - زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حَدَّثَتْهُ أَنَّهَا قَالَتْ لِلنَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم هَلْ أَتَى عَلَيْكَ يَوْمُ كَانَ أَشَدَّ مِنْ يَوْمٍ أُحُدٍ قَالَ " لَقَدْ لَقِيتُ مِنْ قَوْمِكِ مَا لَقِيتُ، وَكَانَ أَشَدُّ مَا لَقِيتُ مِنْهُمْ يَوْمَ الْعَقَبَةِ، إِذْ عَرَضْتُ نَفْسِي عَلَى ابْنِ عَبْدِ يَالِيلَ بْنِ عَبْدِ كلالٍ، فَلَمْ يُجِبْنِي إِلَى مَا أَرَدْتُ، فَانْطَلَقْتُ وَأَنَا مَهْمُومٌ عَلَى وَجْهِي، فَلَمْ أَسْتَفِقُ إلا وَأَنَا بِقَرْنِ النَّعَالِبِ، فَرَفَعْتُ رَأْسِي، فَإِذَا أَنَا بِسَحَابَةٍ قَدْ أَظَلَّتْنِي، فَنَظَرْتُ فَإِذَا فِيهَا جِبْرِيلُ فَنَادَانِي فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ وَمَا رَدُّوا عَلَيْكَ، وَقَدْ بَعَثَ إِلَيْكَ مَلَكَ الْجِبَالِ لِتَأْمُرَهُ بِمَا شِئْتَ فِيهِمْ، فَنَادَانِي مَلَكُ الْجِبَالِ، فَسَلَّمَ عَلَى ثُمَّ قَالَ يَا مُحَمَّدُ، فَقَالَ ذَلِكَ فِيمَا شِئْتَ، إِنْ شِئْتَ أَنْ أُطْبِقَ عَلَيْهِم الأَخْشَبَيْنِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا ".

ইবনে শিহাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে উরউয়া বর্ণনা করে বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একবার তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন, উহুদের দিনের চাইতে কঠিন কোন দিন আপনার উপর এসেছিলো কি? তিনি বললেন, আমি তোমার কওম থেকে যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, তা তো হয়েছি। তাদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, আকাবার দিন আমি যখন নিজেকে ইবনে আবদে ইয়ালীল ইবনে আবদে কলালের নিকট পেশ করেছিলাম। আমি যা চেয়েছিলাম, সে তাঁর জবাব দেয়নি। তখন আমি এমন বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম যে, কারনুস সাআলিবে পৌঁছা পর্যন্ত আমার চিন্তা লাঘব হয়নি। তখন আমি মাথা উপরে উঠালাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম এক টুকরো মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি সে দিকে দৃষ্টি দিলাম। তার মধ্যে ছিলেন জিবরীল (আলাইহিস সালাম)।

তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনার কওম আপনাকে যা বলেছে এবং তারাপ্রতি উত্তরে যা বলেছে তা সবই আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার কাছে পাহাড়ের (দায়িত্বে নিয়োজিত) ফিরিশতাকে পাঠিয়েছেন। এদের সম্পর্কে আপনার যা ইচ্ছা আপনি তাঁকে হুকুম দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফিরিশতা আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, হে মুহাম্মদ! এসব ব্যাপার আপনার ইচ্ছাধীন। আপনি যদি চান, তাহলে আমি তাদের উপর আখশাবাইন কে চাপিয়ে দিব। উত্তরে নাবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (না, তা হতে পারে না) বরং আমি আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন যে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। ১৩১

বর্তমানে দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেকেই তাড়াহুড়া করে এবং দ্রুত তার ফল পেতে চায়। কিন্তু দাওয়াতের ক্ষেত্রে শর্ত হলো, নফসের অনুসরণ না করে পূর্ণ এখলাসের সাথে দাওয়াতি কাজ করা এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণ করা। আর এগুলোর ঘাটতি থাকার কারণেই আমরা বর্তমানে অনেককে দাওয়াতের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হতে দেখা যায়। সুতরাং আমাদেরকে তাড়াহুড়া না করে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তো আর এক দিনেই তাঁর দাওয়াতের ফল পাওয়া শুরু করেননি বরং অনেক বছর লাগাতার ধৈর্যের সাথে মেহনতের পরই তাঁর আশা পূর্ণ হয়েছে, মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেছে। দেখুন কী সীমাহীন ধৈর্য ছিল আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর।

ইবনে মাসউদ রা, থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
كأني أنظر إلى رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يحكي نبيا من الأنبياء صلوات الله وسلامه عليه ضربه قومه فأدموه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول: «اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون
মনে হচ্ছিলো আমি রাসূলুল্লাহ কে কোন এক নবীর ঘটনা বর্ণনা করতে দেখছি, যাকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রহার করে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। আর তিনি তার চেহারার রক্ত মুছতে মুছতে বলছেন, হে আল্লাহ আপনি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা জানে না। ১৩২

একবার রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবীদের সাথে কোন এক জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। তখন ঋণ ফেরত চাওয়ার জন্য যায়েদ ইবনে সুআনাহ নামক এক ইহুদি আসলো এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জামার কলার ও চাদর ধরে তার দিকে চোখ বড়বড় করে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, হে মুহাম্মদ! তুমি কি আমার ঋণ পরিশোধ করবে না? এবং সে লোকদের সামনেই তাঁকে অনেক কঠিন কঠিন কথা বলছিলো। ওমর ইবনে খাত্তাব রা. তখন ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি যায়েদের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন যেন তার চক্ষুদ্বয় ঘূর্ণয়মান নক্ষত্রের মত স্বীয় কক্ষপথে ঘুরছে। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, হে আল্লাহর শত্রু! তুই আমার চোখের সামনে রাসূলুল্লাহ কে এগুলো বললি, তাঁর সাথে এমন আচরণ করলি? ঐসত্তার শপথ করে বলছি যিনি তাকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আমি যদি তার তিরস্কারের ভয় না করতাম তাহলে আমার তরবারি দিয়ে তোর মাথা দ্বিখন্ডিত করে দিতাম। রাসূলুল্লাহ ওমর রা. এর দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
يا عمر، أنا وهو كنا أحوج إلى غير هذا، أن تأمرني بحسن الأداء، وتأمره بحسن التباعة، اذهب به يا عمر فأعطه حقه، وزده عشرين صاعا من تمر
ওমর! আমি এবং সে তোমার থেকে এমন আচরণ আশা করি যে, তুমি আমাকে অনুরোধ করবে, সুন্দর ভাবে তার ঋণ আদায় করে দিতে, আর তাকে আদেশ করবে সুন্দর আচরণ করতে। ওমর! তাকে নিয়ে যাও এবং তার হক তাকে আদায় করে দাও। তাকে বিশ সা' খেজুর বেশি দিবে।

ওমর রা. যখন তাকে বিশ সা' খেজুর বেশি দিলো, তখন ইহুদি যায়েদ বললো, ওমর! এই বেশি অংশ কীসের? ওমর রা. বললেন, রাসূলুল্লাহ তোমার কঠোরতার পরিবর্তে আমকে এই বেশি অংশ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। যায়েদ বললো, ওমর! তুমি কি আমাকে চেনো? তিনি বললেন, না। কে তুমি? যায়েদ ইবনে সুআনাহ বলল, আল হিবর (তথা ইহুদী পাদ্রী)। ওমর রা. বললেন, ইহুদি পদ্রী? তুমি বলছো তুমি ইহুদী পাদ্রী যায়েদ ইবনে সুআনাহ!! তিনি বলেন, তাহলে তুমি রাসূলুল্লাহ এর সাথে এমন কঠোর আচরণ করলে কেন? তার সাথে এমন কঠোর ভাষায় কথা বললে কেন?

সে বলল, ওমর! আমি যখন তাঁর চেহারার দিকে তাকালাম, তখন নবুওয়াতের দু'টি আলামত ব্যতীত আর সকল আলামতই তার চেহারার মধ্যে বুঝতে পারলাম। দু'টি আলামত সম্পর্কে জানতে পারিনি।
আলামত দুটি হলো, ১. তাঁর সহিষ্ণুতা অজ্ঞতার উপর অগ্রগামী কি না। ২. মুর্খতা বশত কঠিন আচরণ তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতাকেই কেবল বৃদ্ধি করবে। সুতরাং আমি তার এই দুইটা আলামত পরীক্ষা করে দেখলাম।
ওমর! তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহ তা'আলাকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে মেনে নিলাম। এবং তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমার সম্পদের অর্ধেক আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উম্মতের উপর সাদাকা করলাম। ওমর রা. বললেন, বরং তুমি বলো, আমি তাদের কতেকের উপর সাদাকা করলাম করণ তুমি তাদের সকলকে দিতে সক্ষম হবে না। যায়েদ বললেন, তাদের কতেকের উপর। তখন ইহুদি যায়েদ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট ফিরে গেলো এবং বললো,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
অর্থ্যাৎ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।
সে তাঁর উপর ঈমান আনলো ও তাঁকে নবী রূপে বিশ্বাস করলো। ১৩৩

প্রিয় ভাই! আমরা যদি এই দীর্ঘ হাদিসে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ এবং তার ফলাফল নিয়ে চিন্তা করি তাহলেই আমরা পেয়ে যাবো দাওয়াতের ক্ষেত্রে পথ ও পন্থার এবং বুঝতে পারবো দাওয়াতের ক্ষেত্রে কী সিমাহীন ধৈর্য, কোমলতা ও সহশীলতা প্রয়োজন আমাদের। দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ হলো কোমল আচরণ দিয়ে মানুষের মন জয় করা।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
اعتمرت مع النبي - صلى الله عليه وسلم - من المدينة حتى إذا قدمت مكة، قلت: بأبي أنت وأمي يا رسول الله قصرت وأتممت، وأفطرت وصمت، قال: أحسنت يا عائشة» وما عاب علي
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে মদিনা থেকে উমরা করার উদ্দেশ্যে বের হলাম এবং যখন মক্কায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার জন্য আমার মাতা পিতা কুরবান হোক। আমি কখনো কছর পড়েছি আবার কখনো পূর্ণ সালাত আদায় করেছি। কখনো রোযা ভঙ্গ করেছি আবার কখনো রোযা রেখেছি। তিনি বললেন, আয়েশা! তুমি ভালই করেছো। তিনি আমাকে দোষারুপ করেননি। ১৩৪

টিকাঃ
১২৭ আহমাদ, হাদিস: ২৫৭১৫
১২৮ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮
১২৯ হাদীসটি বাগবী তার শারহুস সুন্নায় বর্ণনা করেন, এবং আলবানী তা সহীহ বলেন
১৩০ বুখারী, হাদিস: ৬১২৮
১৩১ বুখারী, হাদিস:৩২৩১; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯৫
১৩২ বুখারী, হাদিস: ৬৯২৯; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯২
১৩৩ বুখারী, হাদিস: ৬৯২৯; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯২
১৩৪ নাসায়ী, হাদিস: ১৪৫৬

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবার

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবার


সমাজের উঁচু শ্রেণী, ক্ষমতাবান ও ধনীদের বাড়িতে সবসময় খাবার দাবারের রমরমা অবস্থা ও বিলাসিতা লেগেই থাকে।

কিন্তু এই উম্মতের নবী, তিনি যে শুধু নবী তা কিন্তু নয়, তিনি একই সাথে উম্মতের নবী, রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান সেনাপতি, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা তার হাতে। রাষ্ট্রিয় কোষাগারের ক্ষমতা তার হাতে। উট বোঝাই হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে খাদ্য দ্রব্য এবং অন্যান্য সামগ্রী তার নিকট আসছে, তার সামনে স্বর্ণ রুপা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এই যার অবস্থা তাঁর জীবন যাপনের মান এবং খানা-পিনার অবস্থা কী? তিনি কি রাজা-বাদশাহদের মত জীবন-যাপন করেন নাকি তার চেয়েও উঁচু মানের বিলাসিতাপূর্ণ? তাঁর খাবার কি ধনী ও বিত্তশীলদের মত নাকি তার চেয়েও ভাল উন্নতমানের?

হে ভাই! একবার লক্ষ করে দেখো যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খাবারের মান ও পরিমাণ কেমন ছিলো? তুমি আশ্চর্য হয়ো না তার খাবারের মান ও পরিমাণ দেখে।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
إن النبي - صلى الله عليه وسلم - لم يجتمع عنده غداء ولا عشاء من خبز ولحم إلا على ضفف
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুপুর ও রাতের খাবারে কখনো রুটি গোস্ত একত্র হতো না, যদিও হতো তা হতো অতি সামান্য। ১৩৫ الضفف শব্দের অর্থ হলো, খাবার অল্প আর মানুষ বেশি। অর্থাৎ, তিনি তৃপ্তি সহকারে আহার করতে পারতেন না। যদি মেহমান আসতো তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ও তাদের আনন্দের জন্য তৃপ্ত হয়ে খাবার খেতেন।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما شبع آل محمد من خبز شعير يومين متتابعين حتى قبض رسول الله - صلى الله عليه وسلم
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবার তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পরপর দুই দিন যবের রুটি পেট ভরে খায়নি। ১৩৬

অন্য রেওয়াতে এসেছে,
ما شبع آل محمد منذ قام المدينة من طعام بر ثلاث ليال تباعًا حتى قبض
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমণের পর থেকে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবার লাগাতার তিন দিন পেট পূর্ণ করে গমের রুটি খায়নি। ১৩৭

বরং রাসূলুল্লাহ খাবার না পেয়ে খালি পেটে ঘুমিয়ে যেতেন, তাঁর পেটে একটি লোকমাও যেত না। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يبيت الليالي المتتابعة طاويًا هو وأهله، لا يجدون عشاء، وكان أكثر خبزهم خبز الشعير
রাসূলুল্লাহ ও তাঁর পরিবার ক্ষুধার্ত অবস্থায় লাগাতার কয়েক রাত অতিবাহিত করতেন। রাতের খাবার থাকতো না তাঁদের কাছে। আর তাদের বেশির ভাগ রুটিই ছিলো যবের রুটি। ১৩৮

খাবারের স্বল্পতা বা খাবার না থাকার কারণে যে এমনটি হতো তা নয়। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তো সর্বদা খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী আসতেই থাকতো, কখনো কখনো উট বোঝাই হয়ে পণ্য দ্রব্য আসতো তাঁর নিকট। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাথে সাথে তা দান করে দিতেন মানুষের মধ্যে। উকবা ইবনুল হারিস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর খুব দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলেন এবং অবস্থান না করেই আবার বের হয়ে এলেন। তখন আমি অথবা অন্য কেউ তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন,
كنت خلفت فى البيت تبراً - أى ذهباً - من الصدقة فكرهت أن أبيته فقسمته
ঘরে সাদকার কিছু স্বর্ণ রেখে এসে ছিলাম, সেগুলো ঘরে রেখে আমি রাত্রি যাপন করতে চাইনি, তাই সেগুলো বণ্টন করে দিলাম। ১৩৯

রাসূলুল্লাহ এর দানশীলতা ও বদান্যতার আশ্চর্যজনক আরেকটি দিক হলো, তাঁর নিকট কেউ কিছু চাইলে সাথে সাথে তিনি তাকে তা দান করে দিতেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما سئل رسول الله - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزاً ولقد جاءه رجل، فأعطاه غنما بين جبلين، فرجع إلى قومه فقال: «يا قوم أسلموا، فإن محمدًا يعطي عطاء من لا يخشى الفقر
কেউ যদি ইসলামের দোহাই দিয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট কিছু চাইতো, তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতেন না। একবার এক লোক এসে তার নিকট চাইলে, তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত এক পাল ছাগল দান করলেন। লোকটি তার কওমের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, হে কওমের লোকসকল ! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, কেননা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দান করেন, যাতে আর অভাবের আশঙ্কা নেই। ১৪০

হে ভাই! এবার চিন্ত করে দেখো এমন দানশীল নবীর খাবারের অবস্থা কী? আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لم يأكل النبي - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزاً مرفقا حتى مات
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত কখনো উন্নতমানের বিলাসী দস্তরখানা বা খাবার টেবেলি বসে খাননি এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কখনো পাতলা নরম রুটি খাননি। ১৪১

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে এসে বলতেন,
أعندك غداء؟ فتقول: لا، فيقول: «إني صائم
তোমার নিকট কি কোন খাবার আছে? তিনি (আয়েশা রা.) যখন বলতেন 'না'। তখন তিনি বলতেন, তাহলে আমি রোযা। ১৪২

এমনও প্রমাণিত আছে যে, রাসূল ﷺ ও তার পরিবার দুই মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র খেজুর আর পানি খেয়ে জীবন ধারণ করেছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে,
أنه كان يقيم الشهر والشهرين، لا يعيشه هو وآل بيته إلا الأسودان: التمر والماء.
তিনি এক দুই মাস কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু তাঁর ও তাঁর পরিবারের জীবন ধারণের জন্য দুই কাল বস্তু তথা খেজুর ও পানি ব্যতীত কিছুই জুটতো না। ১৪৩

এত স্বল্প খাবার ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের পরেও কখনো তিনি আল্লাহ তা'আলার নাশুকরি করেননি। বরং সর্বদাই তিনি আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করেছেন। খাবার যেমনই হোক তিনি তা খেয়ে নিতেন অতঃপর আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করে খাবার প্রস্তুতকারীর শুকরিয়া আদায় করতেন। তিনি কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। খাবার খারাপ হলে খাবার প্রস্তুতকারীকে তিরস্কারও করতেন না। কারণ খাবার প্রস্তুত করাটা একট শিল্প বা ইজতেহাদি বিষয় এতে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং তিনি কখনো খাবার প্রস্তুতকারীকে তিরস্কার করতেন না। উপস্থিত খাবার ফেরৎ দিতেন না এবং যা নেই তা তালাশ করতেন না। তিনি হলেন উম্মতের নবী। তাঁর চিন্তা চেতনা বা টার্গেট কখনই পেট আর পেট ভরার বস্তু নিয়ে ছিলো না।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما عاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - طعاما قط إن اشتهاه أكله وإن كرهه تركه.
রাসূলুল্লাহ কখনো খাবারের দোষ বর্ণনা করতেন না, যদি তাঁর ভালো লাগতো তাহলে খেতেন আর না লাগলে খেতেন না। ১৪৪

প্রিয় ভাই! যারা খানা-পিনার বিলাসিতায় পড়ে গেছে, তাদের জন্য শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কথাকে সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করছি।
খাদ্য ও পোশাকের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শই হলো সর্বোত্তম আদর্শ। খাদ্যের ব্যাপারে তাঁর আদর্শ হলো, ভালো লাগলে পরিমিত খেতেন। উপস্থিত কোন খাবার ফেরত দিতেন না এবং যা নেই তা কখনো অনুসন্ধান করতেন না। যদি রুটি ও গোশত উপস্থিত হতো তাহলে তাই খেতেন, আবার যদি ফল, উপস্থিত হতো তাহলেও তাই খেতেন। আবার যদি কখনো শুধু রুটি বা শুধু খেজুর উপস্থিত হতো তাহলেও সেটাই খেতেন। তাঁর কাছে দুই প্রকার খাবার আনা হলে তিনি এ কথা বলতেন না যে, আমি দুই প্রকার খাদ্য গ্রহণ করবো না। আর মজাদার ও মিষ্টি খাদ্য গ্রহণ করা থেকেও তিনি বিরত হতেন না। হাদীসে এসেছে, নবী কারীম বলেন:
لكني أصوم وأفطر، وأقوم وأنام، وأتزوج النساء وآكل اللحم فمن رغب عن سنتي فليس مني
কিন্তু আমি কখনো রোযা রাখি, আবার কখনো রোযা ছেড়েও দেই। রাত্রে কিছু অংশ জেগে ইবাদাত করি ও কিছু অংশে ঘুমাই, আমি তো বিবাহ করেছি এবং গোশতও ভক্ষণ করে থাকি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ থাকবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৪৫

আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা পবিত্র খাবার গ্রহণ এবং এজন্য শুকরিয়া আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং যে পবিত্র বস্তুকে হারাম করলো সে হলো সীমালঙ্ঘণকারী আর যে শুকরিয়া আদায় করলো না সে আল্লাহর হক নষ্টকারী।
খাবারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পন্থাই হলো সঠিক ও সরল পন্থা। আর এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ দু'টি ভ্রান্ত পথে চলতে থাকে।
১. অপচয় আর নিজের নফসানি খায়েশাত পূর্ণ করার পথ।
২. আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম করে, বৈরাগ্যতা সৃষ্টির পথ। আর ইসলামে কোন বৈরাগ্যতা নেই।

এর পর শাইখুল ইসলাম রা. বলেন, প্রতিটি হালালই পবিত্র, আর প্রতিটি পবিত্র জিনিসই হালাল। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা আমাদেরকে পবিত্র খাবার গ্রহণ করতে বলেছেন আর খাবায়েছ তথা অপবিত্র খাবার গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। আর পবিত্র খাবার হলো উপকারী ও সুস্বাদু। আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষয় হারাম। আমাদের দেহের জন্য উপকারী বিষয়কেই আমাদের জন্য হালাল করেছেন।
খাবার ও পোশাক, ক্ষুধা ও তৃপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। এমনকি এগুলোর ক্ষেত্রে কখনো কখনো একেক জনের অবস্থাও একেক রকম হয়ে থাকে। তবে সর্বোত্তম আমল হলো যার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে এবং তা ব্যক্তির জন্যও উপকারী। ১৪৬

টিকাঃ
১৩৫ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৫৬
১৩৬ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০
১৩৭ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০
১৩৮ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৬০
১৩৯ বুখারি, হাদিস: ১৪৩০
১৪০ মুসলিম, হাদিস: ২৩১২
১৪১ বুখারী, হাদিস: ৬৪৫০
১৪২ তিরমিযি, হাদিস: ৭৩৪
১৪৩ বুখারী, হাদিস: ২৫৬৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৭২
১৪৪ বুখারী, হাদিস: ৩৫৩৬; মুসলিম, হাদিস: ২০৬৪
১৪৫ মুসলিম, হাদিস: ১৪০১; নাসায়ী, হাদিস: ৩২১৭
১৪৬ মাজমুউল ফাতাওয়া ২২/৩১০ সংক্ষেপিত

ফন্ট সাইজ
15px
17px