📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 নবীজি ﷺ এর কান্না

📄 নবীজি ﷺ এর কান্না


অনেক মানুষই তো কান্না করে। বেশির ভাগ মানুষের কান্না হয় লৌকিকতা করে, অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। যার জন্য কাঁদছে তাকে দেখানোর জন্য। তারা আসলে জানে না যে, কেন কান্না করতে হয়, কান্নার মূল উদ্দেশ্য কী?

সারা দুনিয়াটাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতের সামনেই ছিলো, তিনি হাত বাড়ালেই তা ধরতে পারতেন, সেই প্রস্তাব ও অধিকার আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি কাঁদতেন。

আল্লাহর দরবারে মুনাজাতে কাঁদতেন, নামাযের মধ্যে কাঁদতেন, কোরআন তেলাওয়াতের সময় কাঁদতেন, তেলাওয়াত শোনার সময় কাঁদতেন। তাঁর কান্না ছিলো সকল ধরণের লৌকিকতা মুক্ত ইবাদত, মহান প্রভুর বড়ত্বের সামনে নিজের তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্রতার প্রকাশ。

হাদিস শরীফে এসেছে, মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেছেন,
أتيت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وهو يصلي ولجوفه أزيز كأزيز المرجل من البكاء
আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আসলাম। তিনি তখন নামায আদায় করছিলেন। নামাযে অধিক কান্নার কারণে তার ভিতর থেকে পাতিলে উত্তপ্ত গরম পানির মত গড়গড় শব্দ বের হচ্ছিলো。

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
قال لي رسول الله - صلى الله عليه وسلم -: اقرأ علي» فقلت: يا رسول الله أقرأ عليك وعليك انزل؟ قال: إنى أحب أن أسمعه من غيري فقرات سورة النساء حتى بلغت ) وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاءِ شَهِيدًا ) قال: فرأيت عيني رسول الله تهملان
রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, আমাকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাও। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাবো! অথচ আপনার উপর কোরআন নাযিল হয়েছে!! তিনি বললেন, আমি অন্যের কাছ থেকে শুনতে ভালোবাসি। তখন আমি সূরা নিসা তেলাওয়াত করলাম। আমি যখন وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন লক্ষ করলাম রাসূল এর দু'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে。

হে ভাই! তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার উপরি ভাগের সাদা চুল এবং তাঁর প্রায় আঠারটি পাকা দাড়ি নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখো যে, এগুলো সাদা হওয়ার কারণ কী? তুমি রাসূলুল্লাহ এর পবিত্র জবানিতেই শোনো এই চুলগুলো সাদা হওয়ার কারণ কী ছিলো। আবু বকর রা. বললেন,
يا رسول الله قد شبت! قال - صلى الله عليه وسلم -: «شيبتني هود والواقعة والمرسلات، وعم يتساءلون، وإذا الشمس كورت.
হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন! তিনি বলেন, সূরা হুদ, সূরা ওয়াকিয়াহ, সূরা মুরসালাত, সূরা নাবা ও সূরা ইজাশামছু কুব্বিরাতের ভয়াবহতাই আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে。

টিকাঃ
৮৮ আবু দাউদ, হাদিস: ৯০৪
৮৯ বুখারী, হাদিস: ৫০৫৬
৯০ তিরমিযী, হাদিস: ৩২৯৭

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিনয়

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিনয়


রাসূলুল্লাহ ছিলেন, সকল মানুষের চেয়ে সর্বোত্তম গুণের এবং উর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তার চরিত্রে ছিলো না সামান্য খুঁত। এক কথায় তার চরিত্র ছিলো আল-কোরআন। যেমনিভাবে আয়েশা রা. বলেন,
كان خلقه القرآن
তার চরিত্র হলো আল-কোরআন।
এবং রাসূলুল্লাহ বলেন,
إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق
আমি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিনয়ের একটি দিক হলো, তিনি নিজের প্রশংসা ও নিজের গুণগান শুনতে পছন্দ করতেন না。

ওমর ইবনে খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لا تطروني كما أطرت النصارى عيسى ابن مريم، إنما أنا عبد، فقولوا: عبد الله ورسوله
তোমরা আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করো না যেমনিভাবে নাসারারা ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে থাকে। নিশ্চয়ই আমি একজন বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে বলবে, আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أن ناسا قالوا: يا رسول الله يا خيرنا وابن خيرنا، وسيدنا وابن سيدنا، فقال: «يا أيها الناس، قولوا بقولكم، ولا يستهوينكم الشيطان، أنا محمد عبد الله ورسوله، ما أحب أن ترفعوني فوق منزلتي التي أنزلني الله عز وجل
মানুষ বলতো “হে আল্লাহর রাসূল! হে আমাদের সকলের চেয়ে উত্তম লোক! আমাদের সবার চেয়ে উত্তম লোকের ছেলে! আমাদের সরদার, আমাদের সরদারের ছেলে! তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে মানুষ! তোমরা তোমাদের কথা বলে যাও। তবে শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। আমি মুহাম্মদ, আল্লাহর একজন বান্দা এবং তাঁর রাসূল, আল্লাহ তা'আলা আমকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, তারচেয়ে তোমরা আমাকে উপরে স্থান দাও এটা আমি চাই না।

কোন কোন মানুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করে এবং তাঁর ব্যাপারে অলীক ধারণা করে থাকে। যেমন মানুষ মনে করে তিনি গায়েব জানেন, উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা তার হাতে রয়েছে, তিনি ক্ষতিগ্রস্তের উপকার করতে পারেন এবং অসুস্থকে সুস্থ করতে পারেন। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা এসকল ধারণাকে বাতিল করে দিয়ে বলেন,
قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ
বলুন! আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের উপকার-অপকারের উপর অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তবে তো আমি অধিকাংশ কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতো না।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন জমিনের উপর আসমানের নিচে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে বেশি নৈকট্যশীল বান্দা। কিন্তু তার মধ্যে নেই কোন অহঙ্কার এবং তিনি অহংকার ও হিংসা-বিদ্বেষ পছন্দও করেন না। তিনি নিরহঙ্কার বিনয়ী। তিনি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বিনয়ী ও কোমল। আল্লাহ তা'আলার সামনে চির নত ও বিনয়ী বান্দা。

আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لم يكن شخص أحب إليهم من رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قال: وكانوا إذا رأوه لم يقوموا لما يعلمون من كراهته لذلك
সাহাবায়ে কেরামদের নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেয়ে অধিক প্রিয় আর কেউ ছিলো না। তিনি বলেন, তাঁরা যখন তাঁকে দেখতো বসা থেকে দাঁড়াতো না, কারণ তারা জানতো তিনি এটা অপছন্দ করেন।

প্রিয় ভাই! এবার তুমি এই উম্মতের নবীর বিনয়, কোমলতা ও উত্তম চরিত্রের এক মহান নিদর্শন দেখো। আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
إن امرأة جاءت إلى النبي - صلى الله عليه وسلم - فقالت له: إن لي إليك حاجة، فقال: «اجلسي في أي طريق المدينة شئت أجلس إليك
এক মহিলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, আপনার সাথে আমার কথা বলার প্রয়োজন আছে। তখন তিনি বললেন, তুমি মদিনার যে রাস্তায় বসতে চাও আমি সেখানে বসে তোমার কথা শুনবো।

রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিনয়ী ও কোমল চরিত্রের অধিকারী। আবু হুরায়রা রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেছেন,
لو دعيت إلى ذراع أو كراع لأجبت، ولو أهدي إلي ذراع أو كراع لقبلت
যদি ছাগলের পায়ের একটি নলি অথবা একটি খুর খাওয়ার জন্যও আমন্ত্রিত হই, তা আমি সাদরে গ্রহণ করবো, আর ছাগলের পায়ের একটি নলি অথবা একটি খুরও যদি আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয় আমি তা সাদরে গ্রহণ করবো।

রাসূলুল্লাহ ﷺ সকল অহংকারী ও দাম্ভিকদের সতর্ক করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. নবী কারীম সূত্রে বর্ণনা করে বলেন,
لا يدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبر
যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

প্রিয় ভাই! একবার চিন্তা করে দেখো, অন্তরে যদি অণু পরিমাণ অহংকার থাকে তাহলে জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে হেফাজত করুন। আহ! অহংকারের পরিণতি কি ভয়াবহ! অণু পরিমাণ অহংকারের কারণেও জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না। তাহলে আমরা যারা সামান্য অর্থ সম্পদ বা পদ পদবির অহংকারে মাথা উঁচু করে বুক টান করে জমিনের উপর হাঁটি, যেন আমাদের পা মাটিতে পড়তে চায় না। তাহলে আমাদের অবস্থা কি হবে? আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
بينما رجل يمشي في حلة تعجبه نفسه، مرجل رأسه يختال في مشيته، إذ خسف الله به، فهو يتجلجل في الأرض إلى يوم القيامة
এক ব্যক্তি আত্ম-অহমিকা নিয়ে দামী-জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে মাথা আঁচড়িয়ে ফ্যাশন করে হেলেদুলে হাঁটছিলো, তখন আল্লাহ তাকে জমিনের ভিতর দাবিয়ে দিলেন। সে কিয়ামত পর্যন্ত জমিনের মধ্যে ডুবতেই থাকবে।

টিকাঃ
৯১ আহমদ, হাদিস: ২৫৮১৩
৯২ আহমাদ, হাদিস: ৮৯৫২
৯৩ বুখারি, হাদিস: ৩৪৪৫; আহমদ: ১৫৪
৯৪ মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৩৫৯৬
৯৫ আল- আরাফ, আয়াত: ১৮৮
৯৬ তিরমিয, হাদিস: ২৭৫৪
৯৭ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮১৮
৯৮ বুখারী, হাদিস: ২৫৬৮
৯৯ মুসলিম, হাদিস: ৯১
১০০ বুখারী, হাদিস: ৫৭৮৯; মুসলিম, হাদিস: ৬২২

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূল ﷺ এর খাদেম

📄 রাসূল ﷺ এর খাদেম


বর্তমান সময়ে কাজের লোক, শ্রমিক ও মজুরদের একেবারে নিম্ন শ্রেণীর মনে করা হয়। সমাজে তাদের কোন অবস্থান নেই, তাদের কোন মূল্য নেই, তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থই মনে করা হয়। কিন্তু আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রমিক, মজুর ও কাজের লোকদের যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলার নিকট শ্রমিকদের মর্যাদা কিন্তু তার শারীরিক দুর্বলতা বা সক্ষমতার উপর নির্ভর করে হয় না বারং আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের মর্যাদা হবে দ্বীনদারি ও তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে। শ্রমিক, মজুর ও কাজেল লোকদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
هم إخوانكم، جعلهم الله تحت أيديكم، فأطعموهم مما تأكلون، وألبسوهم مما تلبسون، ولا تكلفوهم ما يغلبهم فإن كلفتموهم فأعينوهم
তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তোমাদের অধিনস্ত করেছেন। সুতরাং তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তাই খাওয়াবে। তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরকেও তাই পরিধান করাবে। সক্ষমতার বাইরে তাদের উপর কোন কাজ চাপিয়ে দিবে না। আর যদি তাদেরকে অতিরিক্ত কোন কাজ দাও তাহলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করো। ১০১

প্রিয় ভই! একবার চিন্তা করে দেখো, যারা রাসূলুল্লাহ এর খাদেম ছিলেন। যারা তাঁর কাজ করেছেন। তারা কখনই তার বদনাম করেননি। সারা জীবনে একবারও তাঁর ব্যাপারে কথা বলেননি। বরং রাসূলুল্লাহ এর মহান চরিত্র দেখে তারা মুগ্ধ হয়েছেন, সর্বদাই তারা তাঁর প্রশংসাই করেছেন। রাসূলুল্লাহ এর খেদমত করতে পেরে গর্বিত হয়েছেন। আমাদের বর্তমান সময়ে এমনটি কি ভাবা যায়? আমাদের খাদেম বা কাজের লোকদের ব্যাপারে কি আমরা এতটুকু আস্থাশীল যে, তারা আমার অগোচরে আমার শুধু প্রশংসাই করবে? কখনই আমার বদনাম করবে না?

সুবহানাল্লাহ! কি উত্তম চরিত্র দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি তাদের। দেখুন আনাস রা. গর্ব করে বলছেন,
خدمت رسول الله - صلى الله عليه وسلم
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খেদমত করেছি।

আরেকটি হাদিসের প্রতি লক্ষ করুন, দেখুন কি অনাবিল ভালোবাসাপূর্ণ চরিত্র দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি তাদের। আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন,
خدمت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - عشر سنين فما قال لي أف قط، وما قال لي لشيء صنعته [لم صنعته؟] ولا لشيء تركته لم تركته؟
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দশ বছর খেদমত করেছি। তিনি কখনই আমাকে ধমকের স্বরে উফ শব্দটি বলেননি। আমি কোন কাজ করলে তিনি কখনো বলেননি এটা কেন করলে? আর কোন কাজ না করলে কখনই বলেননি, এটা কেন করলে না? ১০২

এক দিন দুই দিন না, এক মাস দুই মাস না দীর্ঘ দশ বছরে একবারও তিনি তাঁর খাদেমকে ধমক দেননি। কী আশ্চর্যজনক চরিত্র! কি মধুর ব্যবহার!! এমন মহামানবের খেদমত করে গর্ব করে বলবেই তো, “আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খেদমত করেছি”।

দীর্ঘ দশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মানুষের মনের ও অবস্থার কত পরিবর্তন আসে। তার জীবনে আনন্দ-খুশি, দুঃখ-বেদনা, সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতার কত পরিবর্তনই না আসে, কিন্তু তিনি কোন অবস্থাতেই তার খাদেমকে একটা গালি বা ধমক পর্যন্ত দেননি। কখনো বলেননি এটা করলে কেন? বা এটা কেন করলে না? এমন মানুষের ক্ষেত্রেই তো বলা যায়, 'আপনার জন্য আমার মাতা পিতা কুরবান হোক'।

আনাস রা. বলেন, আমার মা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আপনার খাদেমের (আনাসের) জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট দো'আ করুন। তিনি বললেন,
اللهم أكثر ماله وولده، وبارك له فيما أعطيته
হে আল্লাহ! আপনি তার সম্পদ ও সন্তানাদি বৃদ্ধি করে দিন এবং তাকে যা কিছু দান করেন তার মধ্যে বরকত দান করুন। ১০৩

অন্যায়ভাবে কাউকে কখনো প্রহার না করা, কারো সম্মানে আঘাত না দেওয়া তো প্রকৃত বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয়। হ্যাঁ আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কাউকে অন্যায় ভাবে প্রহার করেননি এবং কারো সম্মান নষ্ট করেননি। তিনি তাঁর অধিনস্তদের সাথে কখনো কঠোর আচরণ করেননি এবং কাউকে কখনো প্রহারও করেননি। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بيده شيئًا قط إلا أن يجاهد في سبيل الله ولا ضرب خادمًا ولا امرأة
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ তাঁর হাত দিয়ে কখনই কাউকে প্রহার করেননি। তিনি কখনো তাঁর কোন খাদেমকে প্রহার করেননি এবং কোন স্ত্রীর গায়েও কখনো হাত তুলেননি। ১০৪

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বারবার রাসূলুল্লাহ এর উত্তম আদর্শ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ এর উত্তম চরিত্র ও মহান আখলাক সম্পর্কে তো মক্কার মুশরিকরা পর্যন্ত দ্বিমত পোষণ করতে পারে না। তাই তো আমরা দেখি, আবু সুফিয়ান কাফের থাকা অবস্থায়ও রোম সম্রাটের সামনে তার চরিত্র সম্পর্কে একটা মাত্র ত্রুটিপূর্ণ কথাও বলতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ এর উত্তম চরিত্র সম্পর্কে আয়েশা রা. বলেন,
ما رأيت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - منتصرا من مظلمة ظلمها قط ما لم ينتهك من محارم الله تعالى شيء، فإذا انتهك من محارم الله تعالى شيء، كان من أشدهم في ذلك غضبًا، وما خير بين أمرين إلا اختار أيسرهما ما لم يكن مأثما
রাসূল ﷺ কে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনের ক্ষেত্র ব্যতীত নিজের প্রতি কোন জুলুম-অবিচারের প্রতিশোধ নিতে দেখিনি। কেউ আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করলে, সে ক্ষেত্রে তিনি হতেন সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত। আর তাকে দু'টি বিষয়ের কোন একটি গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হলে গোনাহের কাজ না হলে তিনি সহজটাই বেছে নিতেন। ১০৫

রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষকে কোমল আচরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন,
إن الله رفيق يحب الرفق في الأمر كل
নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা কোমল, আর তিনি প্রতিটি বিষয়েই কোমলতা পছন্দ করেন। ১০৬

টিকাঃ
১০১ বুখারি, হাদিস: ৬০৫০; মুসলিম, হাদিস: ১৬৬১
১০২ মুসলিম, হাদিস: ২৩০৯
১০৩ বুখারী, হাদিস: ৬৩৪
১০৪ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮
১০৫ আহমদ, হাদিস: ২৪৯৮৫
১০৬ বুখারী, হাদিস: ৬৯২৭; মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৩

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি

📄 হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি


হাদিয়া আদান-প্রদান এবং মেহমানদারি অনেক বড় ও মহৎ গুণ, যা আত্মীয়তার বন্ধনকে মজবুত করে। বন্ধুত্বকে করে সুদৃঢ় এবং সামাজিক সৌহার্দ্য সৃষ্টিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি ছিল আমাদের নবীজীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নবীজীর উপর সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর যখন তিনি হয়রান ও পেরেশান হয়ে খাদিজা রা.-এর কাছে আসলেন তখন খাদিজা রা. তাঁকে সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন না। এরপর নবীজীর যে উত্তম গুণাবলীর উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিলো وَتَقْرِي الضَّيْفَ 'আপনি তো মেহমানের সমাদর করেন'।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
أن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان يقبل الهدية ويثيب عليها
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। ১০৭

হাদিয়া দেয়া-নেয়া এবং এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলো উদারতা, বদান্যতা এবং স্বচ্ছ ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ।

হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারি আম্বিয়া আ: দের চরিত্র এবং তাদের মহান আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। আর এক্ষেত্রে আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছিলেন অগ্রগণ্য।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليكرم ضيفه جائزته يوم وليلة، والضيافة ثلاثة أيام فما بعد ذلك فهو صدقة ولا يحل له أن يثوي عنده حتى يحرجه
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। মেহমানের পারিতোষিক (বিশেষ মেহমানদারি) এক দিন ও এক রাত। (স্বাভাবিক) মেহমানদারি তিন দিন। এর অতিরিক্ত মেহমানদারি সদকাস্বরূপ। মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে সে মেহমান হতে হতে মেজবানকে বিরক্ত করে ফেলবে। ১০৮

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يُضِيفُ
যে মেহমানদারি করে না তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। ১০৯

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে নিয়ে অতীত বা বর্তমান কালে কোন দেশ, ভূমি বা জাতি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মত এমন অনুপম আদর্শ ও মহান চরিত্রের অধিকারী কাউকে দেখেনি। প্রিয় পাঠক! তুমি নিম্নে বর্ণিত হাদিসটি পড়ো ও কল্পনার জগতে সেই দৃশ্যটি দেখার চেষ্টা করো এবং তোমার চক্ষুদ্বয় শীতল করো।

আবু হাজেম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাহল ইবনু সা'দ (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
جَاءَتِ امْرَأَةُ بِبُرْدَةٍ - قَالَ أَتَدْرُونَ مَا الْبُرْدَةُ فَقِيلَ لَهُ نَعَمْ، هِيَ الشَّمْلَةُ، مَنْسُوجٌ فِي حَاشِيَتِهَا - قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي نَسَجْتُ هَذِهِ بِيَدِي أَكْسُوكَهَا. فَأَخَذَهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مُحْتَاجًا إِلَيْهَا. فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَإِنَّهَا إِزَارُهُ. فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ يَا رَسُولَ اللَّهِ، اكْسُنِيهَا، فَقَالَ " نَعَمْ ". فَجَلَسَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم في الْمَجْلِسِ، ثُمَّ رَجَعَ فَطَوَاهَا، ثُمَّ أَرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِ. فَقَالَ لَهُ الْقَوْمُ مَا أَحْسَنْتَ، سَأَلْتَهَا إِيَّاهُ، لَقَدْ عَلِمْتَ أَنَّهُ لَا يَرُدُّ سَائِلاً. فَقَالَ الرَّجُلُ وَاللَّهِ مَا سَأَلْتُهُ إِلَّا لِتَكُونَ كَفَنِي يَوْمَ أَمُوتُ. قَالَ سَهْلُ فَكَانَتْ كَفَنَهُ.

এক মহিলা একটি বুরদা আনলেন। সাহল (রাঃ) বললেন, তোমরা জানো বুরদা কি? তাকে বলা হয়, হ্যাঁ। তা হলো এমন চাঁদর, যার পাড় বুনানো। মহিলা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে পরিধান করানোর জন্য আমি এটি নিজ হাতে বুনে নিয়ে এসেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন এবং তাঁর এর প্রয়োজন ছিলো। তারপর তিনি তা লুঙ্গির মত পরিধান করে আমাদের সামনে এলেন। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তা আমাকে পরিধান করতে দিন। তিনি বললেন, আচ্ছা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষন মজলিসে বসে থেকে পরে ফিরে গেলেন। তারপর চাঁদরটি ভাঁজ করে সেই লোকটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। লোকজন সে ব্যক্তিকে বললো, তুমি ভালো কাজ করোনি, তুমি তাঁর কাছে চাঁদরটি চেয়ে ফেললে, অথচ তুমি জানো যে, তিনি কোন সাওয়ালকারীকে ফিরিয়ে দেন না। সে লোকটি বললো, মহান আল্লাহ্ তা'আলার কসম, আমি চাদরটি এ জন্যই সাওয়াল করেছি যে, তা যাতে আমার মৃত্যুর পর আমার কাফন হয়। রাবী সাহল (রাঃ) বলেন, সেটি তার কাফন হয়েছিলো। ১১০

আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যাকে নির্বাচন করেছেন তাঁর রাসূল ও প্রতিনিধি হিসেবে এবং যাকে বানিয়েছেন মানুষের পথপ্রদর্শক ও তাদের জন্য উত্তম আদর্শ, তাঁর উত্তম চরিত্র দেখে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। বরং তাঁর আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তার অনুসরণ করো তাহলে তুমি ধন্য দুনিয়া ও আখেরাতে। দানশীলতা ও বদান্যতায় রাসূলুল্লাহ ছিলেন এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। হাকীম বিন হিযাম রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:

سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَعْطَانِي، ثُمَّ سَأَلْتُهُ فَأَعْطَانِي ثُمَّ قَالَ لِي "يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرُ حُلْو، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى ". قَالَ حَكِيمٌ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَا أَرْزَأُ أَحَدًا بَعْدَكَ شَيْئًا حَتَّى أُفَارِقَ الدُّنْيَا، فَكَانَ أَبُو بَكْرٍ يَدْعُو حَكِيمًا لِيُعْطِيَهُ الْعَطَاءَ فَيَأْبَى أَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ شَيْئًا، ثُمَّ إِنَّ عُمَرَ دَعَاهُ لِيُعْطِيَهُ فَيَأْبَى أَنْ يَقْبَلَهُ فَقَالَ يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ، إِنِّي أَعْرِضُ عَلَيْهِ حَقَّهُ الَّذِي قَسَمَ اللَّهُ لَهُ مِنْ هَذَا الْفَيْءِ فَيَأْبَى أَنْ يَأْخُذَهُ. فَلَمْ يَرْزَأُ حَكِيمُ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ بَعْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حَتَّى تُوُفِّيَ رَحِمَهُ اللَّهُ.

আল্লাহর রাসূল ﷺ এর নিকট আমি সওয়াল করলাম, তিনি আমাকে দান করলেন। আবার সওয়াল করলাম, তিনি আমাকে দান করলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, 'হে হাকীম! এই ধন সম্পদ সবুজ-শ্যামল, মধুর। যে ব্যক্তি দানশীলতার মনোভাব নিয়ে তা গ্রহণ করবে, তাতে তার বরকত হবে। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে, নফসের চাহিদার জন্য তাতে তার বরকত হবে না। সে ঐ ব্যক্তির মত যে খায়; কিন্তু তৃপ্ত হয় না। উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।' হাকীম (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আপনার পরে আমি দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগে আর কারো কাছে কিছু চাইব না। অতঃপর আবু বকর (রাঃ) কিছু দান করার জন্য হাকীমকে আহ্বান করেন, কিন্তু হাকীম (রাঃ) তাঁর নিকট হতে কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। অতঃপর 'উমর (রাঃ) -ও হাকীম (রাঃ)-কে কিছু দান করার জন্য ডেকে পাঠান, কিন্তু তাঁর কাছ থেকেও কিছু গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকার করেন। তখন 'উমর (রাঃ) বলেন, হে মুসলিম সমাজ! আমি আল্লাহ প্রদত্ত গনীমতের মাল থেকে প্রাপ্য তাঁর অংশ তাঁর সামনে পেশ করেছি, কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছেন; হাকীম (রাঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে আর কারো নিকট কিছু চাননি। ১১১

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
ما سئل النبي - صلى الله عليه وسلم - عن شيء قط فقال، لا.
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কোন কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো না করতেন না। ১১২

প্রিয় পাঠক! তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মত দানশীলতা, বদান্যতা ও উত্তম চরিত্রের কোন নজির খুঁজে পাবে না। তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দানশীল এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাঁর ঠোঁটে সর্বদা মিষ্টি হাসি লেগেই থাকতো। তিনি যার সাথে কথা বলতেন সেই মনে করতো যে, পৃথিবীতে রাসূল ﷺ তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। জারির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما حجبني رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ولا رآني منذ أسلمت إلا تبسم
আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ যখনই আমার থেকে আড়াল হয়েছেন এবং আমাকে দেখেছেন তখনই তিনি মুচকি হাসি দিয়েছেন। ১১৩

আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
ما رأيت أحدًا أكثر تبسما من رسول الله - صلى الله عليه وسلم -
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ চেয়ে অধিক মুচকি হাসি আর কারো মধ্যে দেখিনি। ১১৪

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وتبسمك في وجه أخيك صدقة
“হাস্যোজ্জ্বল মুখে তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করাটাও সাদকাহ”। ১১৫

রাসূল ﷺ এর খাদেম আনাস রা. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গুণ বর্ণনা করে বলেন,
أشد الناس لطفا فما سأله سائل قط إلا أصغى إليه فلا ينصرف رسول الله - صلى الله عليه وسلم - حتى يكون السائل هو الذي ينصرف وما تناول أحد يده قط إلا ناوله إياها فلا ينزع - صلى الله عليه وسلم - يده حتى يكون الرجل هو الذي ينزعها منها
“রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনয়ী। তাঁকে কেউ কোন প্রশ্ন করলে, তিনি তার দিকে মনযোগী হতেন। প্রশ্নকারী প্রস্থান করার পূর্বে তিনি প্রস্থান করতেন না। এবং কেউ তাঁর হাত ধরলে, সে লোক নিজ হাত টেনে সরিয়ে নেয়ার পূর্বে তিনি নিজ হাত সরিয়ে নিতেন না। ১১৬

প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এই বিনয়, অতিথি পরায়ণতা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর এমন দরদ ও ভালোবাসার কারণেই তিনি তাদের মধ্যে কখনো শরীয়ত বিরুদ্ধ কাজ সহ্য করতেন না। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত এই হাদিস এর প্রমাণ। তিনি বলেন,
أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - رأى خاتما من ذهب في يد رجل فنزعه فطرحه، وقال: «يعمد أحدكم إلى جمرة من نار فيجعلها في يده
একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ এক লোকের হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তা খুলে ফেলে দিলেন এবং বললেন, তোমাদের কেউ কি ইচ্ছা করে নিজ হতে আগুনের জ্বলন্ত আঙ্গার রাখবে? ১১৭

টিকাঃ
১০৭ বুখারী, হাদিস: ২৫৮৫
১০৮ বুখারী, হাদিস: ৬১৩৫; মুসলিম, হাদিস: ৪৮
১০৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪
১১০ বুখারী, হাদিস: ১২৭৭
১১১ বুখারী, হাদিস: ২৭৫০; মুসলিম, হাদিস: ১০৫২
১১২ বুখারী, হাদিস: ৬০৩৪
১১৩ বুখারী, হাদিস: ৩০৩৫
১১৪ তিরমিযী, হাদিস: ৩৬৪১
১১৫ তিরমিযী, হাদিস: ১৯৫৬
১১৬ আবু নাঈম ফিদ দালায়েল
১১৭ মুসলিম, হাদিস: ২০৯০

ফন্ট সাইজ
15px
17px