📄 ফজরের পর
মদিনার রাত্র যখন তার কালো চাদর উঠিয়ে ফেলতো, ফজর আলোকিত হতো। মসজিদে গিয়ে জামাতের নামায আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ সূর্যদয় পর্যন্ত মসজিদেই বসে বসে আল্লাহর জিকির করতেন। সূর্যোদয়ের পর তিনি দুই রাকাত নামায আদায় করতেন। জাবের ইবনে সামুরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أَن النَّبِيَّ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - كَانَ إِذَا صَلَّى الْفَجْرَ جَلَسَ فِي مُصَلَّاهُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ حَسَنًا
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায আদায় করে জায়নামাযেই বসে থাকতেন, ভালোভাবে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত।
ফজরের নামাযের পর জায়নামাযে বসে আল্লাহর জিকির করা, অতঃপর দুই রাকাত নামায আদায়ের মধ্যে অনেক ফজিলত রয়েছে। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে এই মহান সুন্নত আদায় করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাতে তারা এই প্রতিদান আর্জন করতে পারে। আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ صَلَّى الْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ، ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ، تَامَّةٍ، تَامَّةٍ، تَامَّةٍ
যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজর নামায আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর জিকির করে অতঃপর দুই রাকাত নামায আদায় করে। তার একটি পূর্ণ হজ ও উমরার সাওয়াব হয়। পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ।
টিকাঃ
৮৩ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০
৮৪ তিরমিযী, হাদিস: ৫৮৬
📄 সালাতুদ দুহা বা চাশতের নামায
দ্বিপ্রহর হবে হবে ভাব, সূর্যের উত্তাপ প্রখর হয়ে উঠেছে। তাপে মুখ পুড়ে যাবার উপক্রম। এটাই হলো সালাতুদ দুহা বা চাশতের সময়। এই সময়টা কাজের সময়, প্রয়োজন পূরণের সময়। কাঁধে রিসালাতের ভারি বুঝা, বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাৎ, সাহাবাদের তালিম দেওয়া, এবং পরিবারের দায়িত্ব আদায় করা এসব কিছুর মধ্যেও রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলার ইবদত-বন্দেগীতে মাশগুল থাকতেন পূর্ণভাবে। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সালাতুদ দুহা তথা চাশতের নামায আদায় করতেন। মুআজাহ রা. বলেন,
قلت لعائشة رضي الله عنها: أكان النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي الضحى؟ قالت: «نعم أربع ركعات ويزيد ما شاء الله عز وجل
আমি আয়েশা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি চাশতের নামায আদায় করতেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ চার রাকাত নামায আদায় করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় বেশিও আদায় করতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাতুদ দুহা তথা চাশতের নামায আদয়ের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সাহাবাদেরও তা পড়ার ওসিয়ত করেছেন। আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أوصاني خليلي - صلى الله عليه وسلم - بصيام ثلاثة أيام من كل شهر، وركعتي الضحى، وأن أوتر قبل أن أرقد
আমার বন্ধু আমাকে প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখা, চাশতের সময় দুই রাকাত নামায আদায় করা এবং ঘুমের পূর্বেই বিতর নামায আদায়ের অসিয়ত করেছেন।
টিকাঃ
৮৫ মুসলিম, হাদিস: ৭১৯
৮৬ বুখারী, হাদিস: ১৯৮১; মুসলিম, হাদিস: ৭২১
📄 ঘরে নফল নামায আদায় করা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘর ছিল ঈমান দ্বারা নির্মিত এবং তা ছিলো, ইবাদত বন্দেগী ও জিকির আজকারের মাধ্যমে পূর্ণ। ইবাদত ও আল্লাহর জিকিরহীন ঘর হলো মৃত কবরের মত। রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে আদেশ করেছেন, আমরা যেন আমাদের ঘরে নামায আদায় করি এবং তাকে কবরে পরিণত না করি। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
اجعلوا في بيوتكم من صلاتكم ولا تتخذوها قبورًا
তোমরা তোমাদের ঘরে নামায (নফল নামায) আদায় করো এবং তাকে তোমরা কবরে পরিণত করো না।
ইবনে কাইয়্যুম রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ কোন কারণ ছাড়া সকল সুন্নত ও নফল নামায বাড়িতে আদায় করতেন। বিশেষ করে মাগরিবের সুন্নত। মাগরিবের সুন্নত তিনি কখনো মসজিদের পড়েছেন এমন কোন বর্ণনা নেই।
ঘরে নফল নামায পড়ার অনেক ফায়দা রয়েছে,
* সুন্নতের অনুসরণ।
* এর মাধ্যমে ঘরের মহিলা ও শিশুদের নামাযের কাইফিয়াত শিক্ষা দেওয়া হয়।
* জিকির ও কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঘর থেকে শয়তান দূর হয়।
* লৌকিকতা ও অহংকার মুক্ত থাকা যায়।
টিকাঃ
৮৭ বুখারী, হাদিস: ৪৩২
📄 নবীজি ﷺ এর কান্না
অনেক মানুষই তো কান্না করে। বেশির ভাগ মানুষের কান্না হয় লৌকিকতা করে, অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। যার জন্য কাঁদছে তাকে দেখানোর জন্য। তারা আসলে জানে না যে, কেন কান্না করতে হয়, কান্নার মূল উদ্দেশ্য কী?
সারা দুনিয়াটাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতের সামনেই ছিলো, তিনি হাত বাড়ালেই তা ধরতে পারতেন, সেই প্রস্তাব ও অধিকার আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি কাঁদতেন。
আল্লাহর দরবারে মুনাজাতে কাঁদতেন, নামাযের মধ্যে কাঁদতেন, কোরআন তেলাওয়াতের সময় কাঁদতেন, তেলাওয়াত শোনার সময় কাঁদতেন। তাঁর কান্না ছিলো সকল ধরণের লৌকিকতা মুক্ত ইবাদত, মহান প্রভুর বড়ত্বের সামনে নিজের তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্রতার প্রকাশ。
হাদিস শরীফে এসেছে, মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেছেন,
أتيت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وهو يصلي ولجوفه أزيز كأزيز المرجل من البكاء
আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আসলাম। তিনি তখন নামায আদায় করছিলেন। নামাযে অধিক কান্নার কারণে তার ভিতর থেকে পাতিলে উত্তপ্ত গরম পানির মত গড়গড় শব্দ বের হচ্ছিলো。
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
قال لي رسول الله - صلى الله عليه وسلم -: اقرأ علي» فقلت: يا رسول الله أقرأ عليك وعليك انزل؟ قال: إنى أحب أن أسمعه من غيري فقرات سورة النساء حتى بلغت ) وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلاءِ شَهِيدًا ) قال: فرأيت عيني رسول الله تهملان
রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, আমাকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাও। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাবো! অথচ আপনার উপর কোরআন নাযিল হয়েছে!! তিনি বললেন, আমি অন্যের কাছ থেকে শুনতে ভালোবাসি। তখন আমি সূরা নিসা তেলাওয়াত করলাম। আমি যখন وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন লক্ষ করলাম রাসূল এর দু'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে。
হে ভাই! তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার উপরি ভাগের সাদা চুল এবং তাঁর প্রায় আঠারটি পাকা দাড়ি নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখো যে, এগুলো সাদা হওয়ার কারণ কী? তুমি রাসূলুল্লাহ এর পবিত্র জবানিতেই শোনো এই চুলগুলো সাদা হওয়ার কারণ কী ছিলো। আবু বকর রা. বললেন,
يا رسول الله قد شبت! قال - صلى الله عليه وسلم -: «شيبتني هود والواقعة والمرسلات، وعم يتساءلون، وإذا الشمس كورت.
হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন! তিনি বলেন, সূরা হুদ, সূরা ওয়াকিয়াহ, সূরা মুরসালাত, সূরা নাবা ও সূরা ইজাশামছু কুব্বিরাতের ভয়াবহতাই আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে。
টিকাঃ
৮৮ আবু দাউদ, হাদিস: ৯০৪
৮৯ বুখারী, হাদিস: ৫০৫৬
৯০ তিরমিযী, হাদিস: ৩২৯৭